ওয়াকফ প্রসঙ্গে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে যখন ‘জমি জিহাদ’ বা ‘ওয়াকফ সন্ত্রাস’ জাতীয় শব্দবন্ধের ছড়াছড়ি, তখনই কলকাতায় প্রতিবাদে মুখর হলেন আইনজীবীদের একাংশ। মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ছড়িয়ে দেওয়া বয়ানের তথ্যনিষ্ঠ বিরোধিতা করেন তাঁরা।

সম্প্রতি কলকাতা প্রেস ক্লাবে একটি সাংবাদিক বৈঠকের আয়োজন করে ওয়াকফ সংক্রান্ত নানা গুজব ও ভুয়ো খবরের বিরোধিতা করলেন একদল আইনজীবী। ‘ল্যান্ড জিহাদ’, ‘ওয়াকফ টেরর’ ইত্যাদি বহুল প্রচারিত শব্দবন্ধের তীব্র সমালোচনা করে তাঁরা বলেন, এই ধরনের রটনাগুলির কোনো আইনি ভিত্তি নেই। ল ইয়ারস অফ ওয়াকফ ফোরাম নামে সংগঠনটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম বলেন, গণমাধ্যমে ইদানীংকালে প্রচারিত ওয়াকফ সংক্রান্ত নানা খবর যথেষ্টই একপেশে। তাঁর মতে ‘এটা বোঝা জরুরি যে ওয়াকফ বোর্ড, কৃষক বা অন্যান্য ব্যক্তির তোলা জমি সংক্রান্ত দাবিদাওয়া কিন্তু ওয়াকফ ট্রাইব্যুনাল, উচ্চ আদালত বা শীর্ষ আদালতের মতামতসাপেক্ষ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদগুলো এইরকম বিভিন্ন দাবিদাওয়া তুলে ধরছে কিন্তু আইনি সত্যতা আড়াল করে যাচ্ছে।’

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

উদাহরণস্বরূপ তিনি একাধিক সাম্প্রতিক মামলার উল্লেখ করেন। যেমন নভেম্বরেই শ্রী চেন্নু রাধাকৃষ্ণ বনাম তেলেঙ্গানা ওয়াকফ বোর্ডের মামলায় তেলেঙ্গানা হাইকোর্ট রায় দেয় যে চেন্নু রাধাকৃষ্ণের দখলের ৩০০ একর জমি আসলে ওয়াকফ বোর্ডেরই ছিল। ২০২৩ সালে পাঞ্জাব ওয়াকফ বোর্ড বনাম গ্রাম পঞ্চায়েতের মামলাতেও পাঞ্জাব-হরিয়ানা হাইকোর্ট ওয়াকফ ট্রাইব্যুনালের রায়কেই বহাল রাখে যে, গ্রাম পঞ্চায়েতের দাবি করা জমিটি আদতে ওয়াকফেরই সম্পত্তি। খুরশিদ আলম বলেন ‘এই ধরনের রায় থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় যে ওয়াকফ বোর্ড অনেকক্ষেত্রেই জবরদখলের শিকার।’

অ্যাডভোকেট আতাউল মুস্তাফা জানান, সাচার কমিটির রিপোর্টের ২৪৩ পাতায় এবং ১১.১ তম পরিশিষ্টে ৬০০ এরকম ওয়াকফ সম্পত্তির তালিকা আছে যা আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া থেকে শুরু করে অন্যান্য সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দখলে চলে গেছে। এই প্রসঙ্গে তিনি ২০১৯ সালের বিজেপির ফলো-আপ রিপোর্টের কথাও উল্লেখ করেন যাতে সাচার কমিটির রিপোর্টে উল্লিখিত ২৬৭টি দখল হওয়া সম্পত্তির ব্যাপারে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তরফের যুক্তিগুলো রয়েছে। তৎকালীন সংখ্যালঘু বিষয়ক দফতরের মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানান যে ৫৮,৯২৯টি ওয়াকফ সম্পত্তি জবরদখল অবস্থায় ছিল এবং বিভিন্ন ওয়াকফ বোর্ড সেগুলো উদ্ধারের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছিল। কেরালার নিসার কমিশনের রিপোর্টেও এই ধরনের জবরদখলের উল্লেখ আছে। মুস্তাফার মতে ‘এই রিপোর্টগুলো এবং সরকারের তরফে এগুলোর স্বীকৃতি থেকেই বোঝা যায় যে ওয়াকফ বোর্ড অন্যের জমি জবরদখল করছে না, বরং তারা নিজেরাই জবরদখলের শিকার।’

‘বাবাসাহেব আম্বেদকর প্রণীত সংবিধানে ওয়াকফ আইনের কোনো জায়গা নেই’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এহেন সাম্প্রতিক বক্তব্যের বিরোধিতা করে কলকাতা হাইকোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী অমর জাকি বলেন ‘এই মন্তব্য তো বিচারবিভাগকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। ওয়াকফ আইনের কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি না থাকলে উচ্চ আদালত বা শীর্ষ আদালত ওয়াকফ সংক্রান্ত বিষয়ে রায় দেয় কীভাবে? হিন্দু রিলিজিয়াস এনডাওমেন্ট অ্যাক্টের মতই ওয়াকফ আইনও সংবিধানের ২৬ ও ৩০ ধারায় স্বীকৃত। তদুপরি ১৯৩৭ সালের মুসলিম শরিয়ত অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট বহাল আছে, যার উপরে ভিত্তি করে ওয়াকফ আইন।’

আরো পড়ুন হিন্দুরাষ্ট্র ঠিক কেমন দেখতে?

ভারতীয় গণমাধ্যমে ওয়াকফ বোর্ডকে আগ্রাসী হিসাবে দেখানোর প্রচেষ্টার সম্মিলিত বিরোধিতা করেন এই আইনজীবীরা। ওয়াকফ সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলাগুলোর উল্লেখ করে তাঁরা এই ধর্মীয় ও দাতব্য সম্পত্তিগুলোকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন এবং আদালতের রায় ও প্রমাণিত তথ্যের ভিত্তিতে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অনুরোধ করেন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.