একটি হিন্দুরাষ্ট্রের চেহারা ঠিক কেমন? আজকের ভারত রাষ্ট্র তা থেকে কত দূরে দাঁড়িয়ে? বিশেষত পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সমর্থনে অযোধ্যার বিতর্কিত ভূমিতে রামমন্দির নির্মাণের পরে? সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রশ্নগুলি আমাদের ক্রমাগতই ভাবিয়ে তুলছে।

২০১২ সালের জুন মাসে গোয়াতে আয়োজিত হয় অখিল ভারতীয় হিন্দুরাষ্ট্র অধিবেশন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রায় এক ডজন শাখা সংগঠন তাতে অংশগ্রহণ করে হিন্দুরাষ্ট্র নির্মাণের বিষয়ে আলোচনার জন্য। কট্টর হিন্দুত্ববাদী চারুদত্ত পিঙ্গালে এই অধিবেশনে আদর্শ হিন্দুরাষ্ট্রের একটি ধারণা পেশ করেন। দেশের আইনি কাঠামো থেকে শুরু করে ইতিহাসের পাঠক্রম হয়ে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনের নানা আঙ্গিক ছুঁয়ে ফেলে তাঁর সেই নির্মাণ।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

যেমন একটি হিন্দুরাষ্ট্রের আইন, পিঙ্গালের মতে, হিন্দুদের স্বার্থ দেখবে। ধর্মান্তরকরণ নিষিদ্ধ হবে। শুধু রাষ্ট্র নয়, রাষ্ট্রীয় ধর্মেরও রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত থাকবে পুলিস। সংরক্ষণ বাতিল হবে। ধর্মঘট, আন্দোলন, মিছিল ইত্যাদিরও আইনি অনুমোদন থাকবে না। কৃষকরা রাষ্ট্রের উন্নতির কথা মাথায় রেখে শস্য উৎপাদন করবেন। রাষ্ট্রীয় সীমান্ত রক্ষা এবং অনুপ্রবেশ বন্ধ করার জন্য কঠোর আইন আনা হবে। রাষ্টের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারিত হবে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র অনুযায়ী আর সামাজিক নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে ধর্ম।

গোয়ার হিন্দুত্ববাদী সংগঠন সনাতন সংস্থা এবং তার শাখা সংগঠন হিন্দু জনজাগৃতি সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত এই অধিবেশনে অংশ নেয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হিন্দু সংগঠনগুলি। আয়োজক দুটি সংস্থারই দাবি অনুযায়ী, তারা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের আওতাধীন নয়। সংঘ পরিবারের অন্যতম মুখ, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুব্রমণ্যম স্বামী, এই অধিবেশনে স্বয়ং উপস্থিত না থাকলেও, উদ্যোক্তাদের অভিনন্দন জানিয়ে একটি শুভেচ্ছা বার্তা পাঠান। হিন্দু রক্ষার্থে আরেকটি স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তার জোরালো উল্লেখ ছিল তাঁর সেই বার্তায়। আরেকটি লিখিত শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছিলেন আর্ট অফ লিভিং ফাউন্ডেশনের শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর। তাতে ছিল গোরক্ষা ও মন্দিররক্ষার গুরুত্বের কথা। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের দিল্লি শাখার সাধারণ সম্পাদক সত্যেন্দ্র মোহন অথবা ভোপালের ভারত রক্ষা মঞ্চের আহ্বায়ক সূর্যকান্ত কেলকার থেকে শুরু করে সংঘ পরিবার ও অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের অনেক রথী মহারথী উপস্থিত ছিলেন ওই অধিবেশনে।

পিঙ্গালে-চিত্রিত হিন্দুরাষ্ট্রের বিদ্যায়তনগুলি চলবে গুরুকুল ব্যবস্থায়। ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি ইতিহাসের পাঠক্রম হবে দেশপ্রেম ও যোদ্ধাবৃত্তির পক্ষে উৎসাহব্যঞ্জক। সড়ক, সেতু, সভাস্থল ইত্যাদির নামকরণ হবে দেবদেবী ও মুনি, ঋষিদের নামে। আয়ুর্বেদ চিকিৎসাকে সম্পূর্ণ বৈধতা দেওয়া হবে এবং তার মাধ্যমে চলবে সাত্ত্বিক আহারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা । মন্দির পরিচালনার দায়িত্ব সরকারের পরিবর্তে ভক্তদের হাতে ন্যস্ত হবে।

গ্রামে গ্রামে নিয়োজিত গোরক্ষা সমিতিগুলির মাধ্যমে গরু পাচারকারীদের মোকাবিলার বিষয়টিও অধিবেশনে প্রাধান্য পায়। এই সমিতির সভ্যদের আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আহ্বান জানানো হয় আইনজীবীদের। এছাড়াও ভবিষ্যৎ কর্মসূচির তালিকায় ছিল পাঁচ কোটি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীর বিতাড়ন, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি লাগু করা, জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ বন্ধ করা, সংখ্যালঘুদের অবস্থা বিষয়ে সাচার কমিটির রিপোর্ট বাতিল করা, সংখ্যালঘুদের বিশেষ অধিকার খর্ব করা, ধর্মান্তরণের অপরাধে দণ্ডিতদের যাবজ্জীবন এবং গোহত্যা দমনের আইন।

পাশাপাশি ঋষি ও মনীষীদের নামে নানা প্রকল্পের নামকরণ এবং গান্ধী-নেহরু গোষ্ঠীর ব্যক্তিবর্গের নামে চালু থাকা প্রকল্পগুলির নাম বদলের লক্ষ্য স্থির করা হয়। হিন্দুধর্মের কোনো শাস্ত্র, পুরাণের অবমাননা বা ইতিহাসবিকৃতিকে জামিন অযোগ্য ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে বিবেচনা করার ব্যবস্থাও করতে চায় এই অধিবেশন।

এখানে উল্লেখ্য যে অধিবেশনে নির্ধারিত এই লক্ষ্যমাত্রাগুলির সবই সংঘ পরিবার বা উদ্যোক্তা সংগঠনগুলির সমর্থনপুষ্ট নয়। বরং ২০১৬ সাল থেকে সংঘ পরিবার এই অধিবেশনের সঙ্গে তাদের দূরত্ব খানিকটা বাড়ায়, যার পিছনে অন্যতম কারণ অবশ্যই সংঘের উপর অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্তৃত্ব বাড়তে না দেওয়া।

২০১৪ থেকে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শীর্ষ সঞ্চালক মোহন ভাগবত বলতে থাকেন যে ভারত বরাবরই একটি হিন্দু রাষ্ট্র, তবে সংঘের লক্ষ্য রাষ্ট্রীয়ভাবে তার পূর্ণ স্বীকৃতি আদায় করা। অন্তত আংশিক স্বীকৃতিস্বরূপ, ২০২৩ সালের একটি বক্তব্যে, ইন্ডিয়ার পরিবর্তে ভারত নামটি ব্যবহার করার জন্য মানুষকে আহ্বান জানান তিনি। ২০২৩ সালে বিজয়া দশমীর ওই বক্তব্যে ভাগবত আরও বলেন যে সত্য, করুণা, শুচিতা, ও কঠোরতা – হিন্দুরাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে এই চারটি আদর্শের উপর। তাই হিন্দুরাষ্ট্র কখনোই দমনমূলক হতে পারে না।

এক দশক আগে গোয়ায় আয়োজিত হিন্দুরাষ্ট্র সম্মেলনে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার কতটা তাহলে ইতিমধ্যে অর্জিত হল, আর কতটুকুই বা বাকি?

ওই অধিবেশনে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অনেকটাই আসলে নরেন্দ্র মোদীর প্রধানমন্ত্রিত্বের এই সাড়ে নয় বছরে অর্জিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) তৈরি করে অনুপ্রবেশকারী বিতাড়নের লক্ষ্যে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ) প্রণীত হয়েছে, এখনো বলবত না হলেও। অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রথম সংস্করণটি জানুয়ারি মাসে পাশ হয়েছে উত্তরাখণ্ডে। হিন্দুধর্মের চেতনায় আঘাত করার অপরাধে ধরপাকড় বেড়েছে, বিশেষত গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, সিকিম, বা মধ্যপ্রদেশের মত বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয়। গোহত্যা বন্ধে নতুন আইন আনা হয়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে গোরক্ষা প্রতিরোধের নামে নজরদারি ও গণপিটুনির ঘটনা। লোকসভায় অ্যাংলো ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষণ তুলে দেওয়া হয়েছে। এককথায়, জনমানসে হিন্দুত্বের ছাপ মারার কাজটি এগিয়ে চলেছে দ্রুতগতিতে।

এর পাশাপাশি বারোটি রাজ্যে ধর্মান্তরকরণ প্রতিরোধে বিশেষ আইন চালু হয়েছে। এমনকি ‘দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ’ – বিচারব্যবস্থার এই গোড়ার কথাটিকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে গুজরাট, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড – এই সাতটি রাজ্যে ধর্মান্তরকরণ বিধি লঙ্ঘনের অপরাধে কেউ অভিযুক্ত হলে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার দায় অভিযুক্তের উপরেই বর্তায়।

সংরক্ষণ বিষয়ে তাঁর ও সংঘের অবস্থান সাম্প্রতিককালে পাল্টালেও, ভাগবত বলেন যে লোভ দেখিয়ে বা বলপূর্বক ধর্মান্তরিত করা ও বেআইনি অনুপ্রবেশের ফলে জনবন্টনে যে বৈষম্য দেখা দিয়েছে তা দূর করার জন্য উপযুক্ত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প নেওয়া উচিত। ২০২২ সালের হিন্দুরাষ্ট্র অধিবেশনকে ‘হিন্দুরাষ্ট্রের বিজয়া দশমী’ অভিধায় ভূষিত করেছেন হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা। ২০২৫ সালের মধ্যেই হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজটি সম্পন্ন হবে এমন আশা থেকে উদ্যোক্তারা এই অধিবেশনকে হিন্দুদের প্রতি অত্যাচারের সমাপ্তি অনুষ্ঠান বলে ঘোষণা করেছেন।

আরো পড়ুন হিন্দুরাষ্ট্র: বিজয়বর্গীয়ের প্রোপাগান্ডা সরিয়ে সাদা চোখে

২০২২ সালের হিন্দুরাষ্ট্র অধিবেশনে কী কী হয়েছে? নাগরিকত্ব সংশোধন আইন অবিলম্বে বলবত করা, বাস্তুচ্যুত কাশ্মীরি পণ্ডিতদের জন্য পানুন কাশ্মীর (বাংলা করলে যার অর্থ দাঁড়ায় ‘আমাদের নিজস্ব কাশ্মীর’) বলে একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠন করা, সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ এবং ‘সমাজতান্ত্রিক’ শব্দদুটিকে সরিয়ে ‘আধ্যাত্মিক’ শব্দটি যোগ করা এবং ১৯৯১ সালের উপাসনাস্থল অধিনিয়ম বাতিল করার দাবি তোলা হয়েছে। এই শেষোক্ত দাবিটি, বলাই বাহুল্য, মথুরা এবং কাশীসহ বিভিন্ন জায়গায় মন্দিরের খাসজমি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার পক্ষে বিশেষ সহায়ক হবে।

মহারাষ্ট্র এবং ছত্তিসগড়ের হিন্দু জনজাগৃতি সমিতির সংগঠক সুনীল ঘনবতের কথায় “দশবছর আগে যখন হিন্দুরাষ্ট্রের প্রথম অধিবেশন হয়, তখন সকলেই হিন্দুরাষ্ট্র শব্দটিকে সন্দেহের চোখে দেখেছিল। এখন তা সর্বজনগ্রাহ্য।” পুরীর শঙ্করাচার্যের হিন্দু রাষ্ট্র সংঘ, কাশী বিদ্বৎ পরিষদের সংস্কৃতি সংসদ, দক্ষিণ ভারতের মন্দির বাঁচাও এবং মন্দির পুনরুদ্ধার করো জাতীয় আন্দোলন ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে বলে তাঁর বিশ্বাস।

২৩ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে আউটলুক পত্রিকায় প্রকাশিত মূল নিবন্ধ থেকে পত্রিকার অনুমতিক্রমে ভাষান্তরিত। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.