শেষপর্যন্ত গণধর্ষণের মামলা রুজু করতে বাধ্য হয়েছে পুলিস। অভিযোগ উঠছে সন্দেশখালিতে তৃণমূলের নেতারা সরাসরি গণধর্ষণের সঙ্গে যুক্ত। কয়েকবছর ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের সঙ্গে ধর্ষণের সমানুপাতিক সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে ভারতের নানা প্রান্তেই। রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মীরা ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত – এরকম খবর প্রায়শই পাওয়া যাচ্ছে। হাথরাস, উন্নাও, নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর, কামদুনি – নানা সময়ে এই অভিযোগ উঠে এসেছে। তা সত্ত্বেও সন্দেশখালির অভিযোগ আরও ভয়ঙ্কর। সন্দেশখালি নীলকর সাহেবদের সময়কার আমাদের কৌম অচেতনকে নাড়া দিয়েছে। এখানে অভিযোগ – ধর্ষণ এবং রাজনৈতিক কারণে যৌন হেনস্থা হয়েছে কয়েকবছর ধরে, নিয়ম করে, নেটওয়ার্ক তৈরি করে। প্রশাসন সেই নেটওয়ার্কের অংশ। পার্টি অফিসে ডেকে পাঠিয়ে এ জিনিস চালানো হয়েছে। যেমনভাবে ডেকে বা তুলে আনা হত নীলকুঠিতে, সাহেবদের মনোরঞ্জন করতে নেটিভ মহিলাদের। মহিলারা সরাসরি জানাচ্ছেন, এই ব্যবস্থায় অংশ না নিলে, স্বামীর জবকার্ড কেড়ে নেওয়া হত, প্রকাশ্যে মারধর করা হত, জরিমানা করা হত। পুলিস প্রশাসনকে জানালে তারা ঘটনার শিকার মহিলাদের অভিযোগ গ্রহণ করত না। উল্টে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই শেখ শাহজাহান, শিবু হাজরা, অজিত মাইতিদের কাছে গিয়েই মিটিয়ে নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের পরামর্শ যে আদতে আদেশ, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

আজ নয়, তৃণমূল সরকার প্রতিষ্ঠার বছরখানেকের মধ্যেই সন্দেশখালির নির্বাচিত সিপিএম বিধায়ক, ক্ষেতমজুর আন্দোলনের আদিবাসী নেতা নিরাপদ সর্দার এই নিয়ম করে গণধর্ষণের অভিযোগ বিধানসভায় নথিবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। তখনকার তৃণমূল ডেপুটি স্পিকার, আজকের বিজেপি নেত্রী সোনালী গুহ মাইক বন্ধ করে দেন। মুখ্যমন্ত্রীর বিরোধীদের দশ বছর মুখে লিউকোপ্লাস্ট লাগিয়ে রাখার পরামর্শ তো সুবিদিত। আর কে না জানে পরামর্শ আদতে আদেশ? ওঁর হাতে শুধু পুলিস আছে এমন তো নয়, উনি একদা নিজেই জানিয়েছিলেন, উনি গুন্ডা কন্ট্রোল করেন। আসলে যে অভূতপূর্ব কাজটা এই মুখ্যমন্ত্রী করতে পেরেছেন তা হল, পুলিস আর গুন্ডা – এই দুটো আর আলাদা ব্যাপার নয় বাংলায়। খুবই সূক্ষ্ম, তবু একটা বিভাজন ছিল পুলিস আর গুন্ডায়। সেই বিভাজন কখনো কখনো সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়েছে। রুনু গুহ নিয়োগীর পদোন্নতি হয়েছে, কেওড়াতলার ছিঁচকে মস্তান সত্যজিৎ রায়ের মৃতদেহে সম্মান জানানোর আবদার নিয়ে পুলিস কমিশনারকে ‘সাহাদা’ বলে সম্বোধন করেছে। কিন্তু তারপরও, সম্ভবত স্বাধীন ভারতে, শাসক দলের পার্টি অফিসে মহিলাদের রাতে তলব করে আনা হচ্ছে, আর সে ব্যবস্থা মসৃণ রাখছে পুলিস মেশিনারি – এ ঘটনা নজিরবিহীন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সন্দেশখালিতে শেখ শাহজাহান এতদিন ধরে রাজ্য প্রশাসনের নাগালের বাইরে ছিলেন কেন? পার্থ চ্যাটার্জিকে গ্রেফতার করা গেছে, শাহজাহানের গুরু জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ওরফে বালুকে গ্রেফতার করা গেছে, শাহজাহানের মতই আর এক বাঘ অনুব্রত জেলে। শাহজাহানকে এতদিন ধরে গ্রেফতার করা যাচ্ছিল না কেন? তাহলে কি সন্দেশখালিতে শাহজাহান এদের চেয়ে বড় নেতা? বড় নেতা নয়, কিন্তু সম্ভবত এদের চেয়ে সামান্য বড় অপরাধী সে। শাহজাহান ওই সময়ে গ্রেফতার হয়ে গেলে সম্ভবত অনেক সাক্ষ্যপ্রমাণ বেরিয়ে পড়ত। তাই কিছুটা সময় নেওয়া হয়েছে। সম্ভবত একটা রফা হয়ে যাওয়ার পরেই শাহজাহানের গ্রেফতারির দিনক্ষণ পর্যন্ত বলে দিতে পেরেছেন তৃণমূল নেতা পার্থ ভৌমিক বা কুণাল ঘোষ। এইবার শাহজাহানকে ভুগতে হবে। কারণ যতদিন কারোর থেকে ফায়দা পাওয়া যায় ততদিনই তার কদর। এতদিন যে সম্পদ ছিল আজ সে খরচের খাতায়।

সন্দেশখালি
সন্দেশখালির মহিলাদের কাছে লেখক, সৌরভ পালোধী, দেবদূত ঘোষ ও বাদশা মৈত্র। ছবি লেখকের ফেসবুক পেজ থেকে

কিছুদিন আগেই প্রয়াত তৃণমূল সাংসদ তাপস পালের স্ত্রী অভিযোগ করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী এখন আর ফিরেও তাকান না। প্রথম দিকের তৃণমূল নেতা পঙ্কজ ব্যানার্জির কথা আর কেউ মনে রেখেছেন? সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষ উচিত মর্যাদায় পালন করেছেন মমতা ব্যানার্জি? মহাশ্বেতা দেবীর নামে একটা মিউজিয়াম আছে বাইপাসের খালপাড়ে, কখনো খোলা হয় না। কারণ এঁদের ভাঙিয়ে আর ফায়দা তোলা যায় না। অবশেষে বুধবার সকালে গ্রেফতার প্রমাণ করছে শাহজাহানের মত লোককেও আর ঘাড়ে করে বইবেন না মমতা। এখন সামনে লোকসভা ভোট এবং বসিরহাট কেন্দ্রটা তৃণমূলের জন্য টলমলে হয়ে গেছে, তাই মমতা কৌশলগতভাবে শাহজাহানের মত নির্বাচন চালানোর লোককে নিয়ে কিঞ্চিৎ দ্বিধায় ছিলেন। সন্দেশখালির প্রায় সব মহিলা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের ভোট দিতে হয় না, ভোট পড়ে যায়। ভোট দিতে পারলে তৃণমূল কংগ্রেসের কিছু বিপদ আছে। সাংসদ নুসরত জাহান নিজেই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। তাঁর স্বামী বিজেপি করতেন। একজন সাংসদ ১৪৪ ধারাকে ১৭৪ ধারা বলে ফেলছেন – এটা কেবল মুখ ফস্কে বলা নয়, রাজনীতির সাধারণ জ্ঞানটুকুও না থাকার উদাহরণ। সব মিলিয়ে এই প্রথম তৃণমূলের ওই এলাকায় ল্যাজেগোবরে অবস্থা। একদিন পার্থ ভৌমিকরা কাউকে সংগঠনের দায়িত্ব দিয়ে আসছেন, পরদিনই দেখা যাচ্ছে এলাকার মহিলারা সেই মাননীয় নেতাকে ঝাঁটাপেটা করতে চাইছেন। মধুর সুরে কীর্তন গেয়েও ব্যাপার সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।

আরো পড়ুন হাঁসখালির নাবালিকাকে ধর্ষণ করে খুন: ‘আইনের স্নাতক’ মুখ্যমন্ত্রী আইন জানেন না?

বিজেপি ওখানে টাকা ছড়িয়ে এবং সংবাদমাধ্যমের সহায়তায় জমি তৈরি করতে চাইছে, কিন্তু তাতে এখন পর্যন্ত খুব সুবিধা হয়নি। বিশেষত, অনেককাল অত্যাচারের পর মানুষ যখন রুখে দাঁড়ানোর একটা সুযোগ পায়, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই একটা কৌম বোঝাপড়া তৈরি হয়ে যায়। সেটাকে দুম করে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত করে ফেলা খুব সহজ নয়। এই কঠিন সামাজিক ব্যবচ্ছেদ করার ক্ষমতা বিজেপির আছে। কিন্তু সামনেই ভোট, তাদের হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই, সংগঠন তো নেইই। আছে শুধু টাকা। টাকার ভিত্তিতে বোঝাপড়া ওখানে অনেককাল ধরে চলছে। শেখ শাহজাহান তৎকালীন তৃণমূল নেতা শুভেন্দু অধিকারীর লোক।

কৌম অচেতন শুধু নীলকর সাহেবদের অত্যাচার তুলে আনছে না। তুলে আনছে তিতুমীরের প্রতিরোধও। এই বসিরহাট মহকুমা ছিল তিতুমীরের এলাকা। প্রান্তিক কৃষক লড়ে বুঝে নেবে, হয় এসপার না হয় ওসপার – এই জেদ ওখানকার সাধারণ বোঝাপড়ায়, মানুষের ঘিলুতে আর পেশিতে আছে, রক্তে আছে। তেভাগা আন্দোলনে ওই এলাকা রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করেছে, সংযুক্ত ২৪ পরগণার সেই প্রতিরোধের ঐতিহ্য কমিউনিস্টদের স্মরণ রাখতে হবে। জেল থেকে বেরিয়ে এসে নিরাপদ সর্দারের শরীরী ভাষাও চমৎকার। সন্দেশখালিতে সিপিএমের কিছুটা সাংগঠনিক শক্তি এখনো অবশিষ্ট আছে। নিরাপদ ওখানে গেলে, যা দেখলাম, বুঝলাম – মানুষ অভ্যর্থনা করবেন। এই মুহূর্তে সিপিএমের উচিত বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রে ওঁকে প্রার্থী ঘোষণা করে দেওয়া। ওই কেন্দ্রটিতে বামফ্রন্টের হয়ে সিপিআই লড়ে, কিন্তু এই সুযোগ ছাড়া উচিত নয়। বামফ্রন্টের অভ্যন্তরে এই নিয়ে বিতর্ক করে শক্তিক্ষয় না করাই হয়ত সিপিআইয়ের পক্ষে ভাল।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.