শান্তনু বোস
জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটেছে। ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী যে নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে নানাবিধ নৈরাজ্য দেখা দিচ্ছে দেশে। এর কারণ অভ্যুত্থানে শুধুমাত্র একটা সরকারের পতন ঘটেনি, একটা আস্ত শাসনকাঠামোর পতন ঘটেছে।
সরকার ও রাষ্ট্র দুটো আলাদা অস্তিত্ব। সরকার রাষ্ট্রের ম্যানেজার হিসাবে কাজ করে। কিন্তু বাংলাদেশে গত ১৬ বছরে লুঠপাট ও ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার এক ও অভিন্ন স্বার্থে রাষ্ট্র ও সরকার মিলেমিশে একক শাসনকাঠামোয় পরিণত হয়েছিল। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসনকাঠামোর কেবল সরকারের পতন ঘটেছে। কিন্তু ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র এখনো অক্ষত। তার সংস্কার বা পরিবর্তন ছাড়া দেশে চলমান নৈরাজ্যকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
লক্ষণীয়, ৫ অগাস্ট সরকার পতনের পর থেকেই ভারতের বেশকিছু সংবাদমাধ্যম হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলার মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ দৃষ্টিকটুভাবে প্রচার করে আসছে। ভারতের জনগণও ওই সংবাদমাধ্যমের তৈরি বয়ানে নানাভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এমন আচরণের রাজনৈতিক কারণ হল আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ফলে বাংলাদেশের উপর ভারত রাষ্ট্রের যে আধিপত্যমূলক প্রভাব তা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা। এর বড় প্রমাণ হল, আওয়ামী আমলে গত কয়েক বছর ধরে টানা হিন্দু মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাংচুর করার ঘটনা ঘটে আসছিল। সেখানে সরাসরি আওয়ামী নেতা, কর্মীদের জড়িত থাকার প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল এবং তাদের কারোর বিচার হয়নি। অথচ তখন ভারতীয় মিডিয়ায় আজকের মত উন্মাদনা দেখা যায়নি। সুতরাং এখনকার উন্মাদনা যে বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য উদ্বেগ থেকে নয়, বরং আওয়ামী সরকারের পতনে বাংলাদেশের উপরে ভারত রাষ্ট্রের আধিপত্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকেই এবং বিজেপির ভোটের স্বার্থে তৈরি করা হচ্ছে তা বলাই বাহুল্য।
একথা সত্য যে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন বরাবরই ছিল, এখনো চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই নির্যাতন বা সাম্প্রদায়িক আচরণ কি স্বতঃস্ফূর্ত জনতার কীর্তি, নাকি শাসকশ্রেণির চাপিয়ে দেওয়া? বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণির বিবর্তন, বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকতার পরিস্থিতি, হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের বিবর্তনের স্বরূপ সম্পর্কে ধারণা না থাকার ফলে ভারত, এমনকি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরাও সেখানকার মিডিয়ার প্রোপাগান্ডায় প্রভাবিত হচ্ছেন।
বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকতার স্বরূপ
সাম্প্রদায়িকতার প্রথম শর্ত হল তার সম্প্রদায়গত অর্থনৈতিক ভিত্তি বা স্বার্থ থাকতে হয়। দ্বিতীয় শর্ত, সেই অর্থনৈতিক স্বার্থের ভাগীদার পালটা শক্তিশালী সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব।
ব্রিটিশদের আগমনের পর বাংলার হিন্দু মধ্য শ্রেণি ব্রিটিশদের সহায়তায় অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে গেলেও মুসলমান অভিজাত ও মধ্য শ্রেণি তখনো তারা ‘বাংগালি না মুসলমান?’ – এই আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছিল। বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ভারতীয় সংস্কৃতি বলে এড়িয়ে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতির দিকেই তারা ঝুঁকে পড়েছিল। সিপাহী বিদ্রোহ এবং শেষ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহের পতনের পর থেকেই মূলত মুসলমান মধ্যবিত্তরা এখানকার অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠতে থাকে, মুসলিম লীগ দল গঠন হওয়ার মাধ্যমে যা চূড়ান্ত রাজনৈতিক রূপ পায়। ব্রিটিশ ভারতে মূলত মধ্যশ্রেণির হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থগত হিস্যার দ্বন্দ্বই সাম্প্রদায়িকতাকে একটা বস্তুগত রূপ দেয়। উল্লেখ্য, নিম্নবর্গের হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থগত এই দ্বন্দ্ব উপস্থিত না থাকায় সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বও সে অর্থে বস্তুগত রূপ পায়নি। সেকথা নিম্নবর্গের মানুষের সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতিতে ফুটে উঠেছে। তবে জাতীয় ও মধ্যশ্রেণির সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও আদর্শের প্রভাবে তারাও নানাভাবে আক্রান্ত ছিল।
স্বাভাবিকভাবেই একটা রাষ্ট্রে জনতার মধ্যে সম্পদের বন্টন সীমিত হলে তারা নিজেদের জাত, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গে বিভক্ত করে তার ভিত্তিতেই সীমিত সম্পদের উপর নিজেদের অধিকার দাবি করে। যেমন এখন অর্থনৈতিক সংকট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে অভিবাসীবিরোধী দক্ষিণপন্থী দলগুলোর উত্থান ঘটছে, কারণ অভিবাসীরা সেখানকার নাগরিকদের চাকরি ও অর্থনৈতিক সুযোগসুবিধায় ভাগ বসাচ্ছে। একইভাবে ব্রিটিশ আমলে বাংলার হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যেকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ এবং সম্পদ ভাগাভাগির দ্বন্দ্বই সাম্প্রদায়িকতার মূল নিয়ামক হিসাবে কাজ করেছিল।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ববাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের সামনে হিন্দু সম্প্রদায় আর অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক স্বার্থের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে রইল না। সেই জায়গা দখল করে নিল পশ্চিম পাকিস্তান। ফলে সাম্প্রদায়িকতার বদলে পূর্ববাংলার জাতীয় স্বার্থই রাজনীতির মূল নিয়ামক হয়ে দাঁড়াল। মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বার্থগত রাজনীতির প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ায় ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয় এবং আওয়ামী মুসলিম লীগও তার দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটা বাদ দিতে বাধ্য হয়। জাতীয় স্বার্থে পূর্ববাংলার জনগণের আর নিজেদের মধ্যেকার সাম্প্রদায়িকতার বিভাজনের প্রয়োজন পড়েনি। ফলে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান, সম্প্রদায়গত বিভাজন ভুলে একসঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে পড়েছিল। এই ধারাবাহিকতা বজায় থেকেছে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৯০ সালে গণঅভ্যুত্থানে, ২০১৫ সালের কোটা আন্দোলন, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং এবছরের জুলাই অভ্যুত্থানে। আন্দোলন ও অভ্যুথানগুলোর চরিত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে, নারী ও পুরুষ সমস্ত ভেদাভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাস্তায় নেমে লড়াই করেছে। তাদের স্লোগান বা কর্মসূচিতে কোনোরকম ধর্মীয় পরিচয় বা প্রতীক ছিল না, একমাত্র নিহতদের জন্য গায়েবানা জানাজা কর্মসূচি বাদে। একইভাবে কলকাতাতেও আর জি করের ডাক্তারের ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদ আন্দোলনে দেবী দুর্গার বিভিন্ন রূপকে প্রতিবাদের প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশে যদিও তনু ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসুচিতে হিন্দু বা মুসলমানদের কোনো ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করা হয়নি। অর্থাৎ এখানকার গণআন্দোলনের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র লক্ষণীয়।
একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে, জুলাই অভ্যত্থানে জুলাই ও অগাস্ট মাসে পুলিসের গুলিতে ১৩ জন হিন্দু মারা গেছেন, আহত হয়েছেন আরও অনেক হিন্দু আন্দোলনকারী। অথচ আওয়ামীর পতনের পর এখন পর্যন্ত সাধারণ হিন্দু একজনও মারা পড়েননি। গণপিটুনিতে যেসব পুলিস ও আওয়ামী নেতা মারা পড়েছিল, তাদের মধ্যে চারজন হিন্দু ছিল। কিন্তু তাদের উপর হিন্দু হিসাবে হামলা হয়নি, ফ্যাসিবাদের সহায়ক বলেই হামলা হয়েছিল। একইভাবে আওয়ামী নেতা, কর্মীরা পালিয়ে যাওয়ার পর পুরো দেশ প্রায় এক সপ্তাহের মত সম্পূর্ণ পুলিস প্রশাসনবিহীন অবস্থায় ছিল। সেইসময় বিভিন্ন প্রতিপক্ষ এসে আওয়ামী অধ্যুষিত এলাকায় তাদের অনেক দোকানপাট, ঘরবাড়ি ভাংচুর ও দখল করে। সেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের দোকান, ঘরবাড়িও ছিল। বিচ্ছিন্নভাবে মন্দির, মাজারও ভাংচুর হয়। সেইসময় ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বহু ভুয়ো ও বানোয়াট তথ্য দিয়ে দেখাতে চেয়েছিল যে বাংলাদেশে হিন্দু গণহত্যা এবং গণউচ্ছেদ চলছে। বরং সেইসময় হিন্দু, মুসলমান মিলে সরকারবিহীন একটা দেশে মন্দির, বাড়িঘর পাহারা দিয়েছিল, রাস্তায় ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বও নিয়েছিল।
এই যে গণআন্দোলনে সম্প্রদায়গত পরিচয় ভুলে জাতীয় স্বার্থে এক হয়ে যাওয়ার প্রবণতা – এটা সম্ভবই হত না যদি এখানকার হিন্দু সম্প্রদায় প্রতিনিয়ত মুসলমানদের হাতে সাম্প্রদায়িক নিগ্রহ বা সংখ্যাগুরুর খবরদারির শিকার হত।
তাহলে কি বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা নেই? অবশ্যই আছে। তা হল সাংস্কৃতিক বা পরোক্ষ সাম্প্রদায়িকতা, যার দ্বারা হিন্দু মুসলমান উভয়েই ঐতিহাসিকভাবে আক্রান্ত। কিন্তু এই সাম্প্রদায়িকতার সংখ্যাগুরু মুসলমান সম্প্রদায়কে এমন কোনো নৈতিক শক্তি বা উৎসাহ দেওয়ার সামর্থ্য নেই যা তাদের সরাসরি হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলা করতে ইন্ধন দেবে। আরও খোলসা করে বললে, ভারতে একজন ব্যক্তি নিজের জাত বা ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে সামাজিক মর্যাদা, ক্ষেত্রবিশেষে অর্থনৈতিক সুবিধাও পায়। ফলে পরিচয়বাদী রাজনীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থেই প্রত্যক্ষ সাম্প্রদায়িকতার উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে একজন মুসলমানের পক্ষে নিজের ধর্মীয় বা বর্ণগত পরিচয় ব্যবহার করে কোনোরকম সামাজিক মর্যাদা বা অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়। বরং রাজনৈতিক (ক্ষমতাসীন) বা আর্থিক শ্রেণিগত পরিচয়ের কারণেই হিন্দু, মুসলমান উভয়েই অসাম্প্রদায়িকভাবে মর্যাদা বা সুবিধা পায়। ধর্মীয় পরিচয়বাদী রাজনীতির এই সুবিধা না থাকায় ভারতে বিজেপির মত ধর্মভিত্তিক দল ক্ষমতায় আসীন হলেও বাংলাদেশে ইসমালিস্ট দলগুলোর পক্ষে এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় যাওয়া তো দূরের কথা, সংসদে আসন পাওয়াও দুষ্কর। ফলে বাংলাদেশের মত মুসলমানগরিষ্ঠ দেশে দুই বড় রাজনৈতিক দলের নেত্রীই নারী। ইসলামিক দলগুলোকে ওই দুই নারীর সঙ্গেই জোট করতে হয়েছিল বা হচ্ছে। এখানকার জনতার চরিত্রই দলগুলোকে তা করতে বাধ্য করছে।
এদেশে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পরোক্ষ সাম্প্রদায়িকতা থাকলেও হিন্দুরা মুসলমানদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। ফলে দেশভাগের আগেকার মত বা ভারতের মত প্রত্যক্ষ সাম্প্রদায়িকতার প্রয়োজন এখানে পড়ছে না।
তাহলে প্রশ্ন আসে, সাম্প্রদায়িকতা যদি প্রত্যক্ষভাবে না-ই থাকে, তাহলে হিন্দুদের উপর হামলা চালাচ্ছে কারা? আর এখানেই আসছে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের প্রসঙ্গ।
ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার
সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মাধ্যমে জনগণের দুই বা ততোধিক সম্প্রদায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিপক্ষ হিসাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায় আর ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের মাধ্যমে শাসকশ্রেণি চেষ্টা করে ধর্মীয় বিভেদের দেওয়াল তুলে দিয়ে জনতার ঐক্যে বাধা দিতে।
১৯৪৭ সালের পর পূর্ববাংলায় মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বার্থগত রাজনীতির (প্রাকান্তরে সাম্প্রদায়িক) বাস্তবতা না থাকায় একদিকে মুসলিম লীগের বিলুপ্তি, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের নাম পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে। ফলে শাসকশ্রেণির কাছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাস্তবতা না থাকলেও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা এই প্রয়োগ দেখতে পাই।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এল। তাদের তত্ত্বাবধানেই ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল অন্যতম মূল নীতি। কিন্তু তা সত্ত্বেও শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে ওআইসি সম্মেলনে মুসলমান রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমানের আমলে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যোগ করা হয়। তারপর ১৯৮৮ সালে জেনারেল এরশাদ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ধর্ম করে দেন। হাস্যকর ব্যাপার হল, এখনো বাংলাদেশের সংবিধানের মূলনীতি হিসাবে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা আছে।
কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হল, এরশাদ যখন সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম বলে ঘোষণা করেন, তখন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, এমনকি জামাতও তার প্রতিবাদ করে হরতাল ডাকে এবং জনতার ঐক্য নষ্ট করার অভিযোগ আনে। ঘটনা হল, এরশাদ ব্যক্তিগত জীবনে মোটেই ধার্মিক ছিলেন না এবং ইসলামকে তিনি কোনো দায়বদ্ধতা থেকে রাষ্ট্র ধর্ম করেননি। বরং ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার স্বার্থেই ধর্মের এই রাজনৈতিক ব্যবহার করেছিলেন, যদিও ধর্মের এই কার্ড দুবছর পরেই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁর পতন রুখতে পারেনি।
আরো পড়ুন দ্বিতীয় শ্রেণির বাঙালি, দ্বিতীয় শ্রেণির মুসলমান
এরশাদের মত ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার আওয়ামী লীগ, বিএনপিও করেছে। আওয়ামী সর্বশেষ মদিনা সনদে দেশ চালানোর চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল এবং ৭০ খানার বেশি ইসলামিক দলের সঙ্গে জোট করেছিল। সংখ্যালঘু হিন্দুদের বন্ধুর তকমাধারী আওয়ামীর আমলে গত ১৫ বছরে টানা হিন্দুদের জমি দখল, মন্দিরে হামলা – সবই হয়েছে এবং তা হয়েছে প্রশাসনের মদতে। সেসবের কোনো বিচার আওয়ামী করেনি, বরং হামলার দায়ভার চাপিয়ে দেওয়া হত সাধারণ মুসলমানদের উপর।
হিন্দুদের বাড়িঘর বা মন্দিরে হামলার প্রচার এমনভাবে করা হত, যেন সমস্ত সাধারণ মুসলমান স্বতঃস্ফূর্তভাবে হামলাগুলো করেছে। অথচ দেখা যেত, হামলাকারীরা বেশিরভাগই অপরিচিত, বাইরে থেকে ভাড়া করে আনা লোক এবং অনেকসময় স্থানীয় মুসলমানরাই হামলা ঠেকানোর চেষ্টা করত। প্রায় প্রতিবছরই দুর্গাপুজো সমেত নানা পুজোয় প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনার মাধ্যমে আওয়ামী প্রমাণ করার চেষ্টা করত, বাংলাদেশের মুসলমান সম্প্রদায় হিন্দুদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে এবং তা থেকে বাঁচাতে আওয়ামী লীগের বিকল্প নেই।
তা সত্যি হলে এখানকার হিন্দুরা প্রকাশ্যে পুজো করার সাহসই পেত না। অথচ বরাবরই বাংলাদেশের হিন্দুরা প্রকাশ্যে খোলা রাস্তায় পুজো করে আসছে। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের মাধ্যমে এখানকার শাসকশ্রেণি জনতাকে বিভক্ত করার চেষ্টা চালালেও জনগণ যে পুরোপুরি বিভক্ত হয়নি, তা হিন্দুরাই নিজেদের জীবন দিয়ে আওয়ামী লীগের পতন ঘটিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে।
পরোক্ষ সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের শর্ত বাংলাদেশে বিদ্যমান আছে এখনো। ফলে বিক্ষিপ্ত বা চোরাগোপ্তা কিছু হামলা হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হয়েছে। কিন্তু সেগুলো বস্তুত বিভিন্ন গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার প্রচেষ্টা। যেমন সম্প্রতি মন্দির ভাঙতে গিয়ে কয়েকজন হিন্দু যুবক গ্রেফতার হয়েছে। আদালত চত্বরে একজন মুসলমান উকিলের হত্যার পিছনে বেশ কয়েকজন হিন্দুর নাম এসেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বা আওয়ামী লীগ যেভাবে বাংলাদেশের মুসলমান সম্প্রদায়কে প্রতিহিংসাপরায়ণ বলে তুলে ধরছে, তার কিয়দংশ সত্যি হলেও এর ফলে রক্তগঙ্গা বয়ে যেত। বাংলাদেশে এর আগেও অনেকবার মার্কিনীদের ইন্ধনে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের উত্থানের চেষ্টা করেছে, কিন্তু জনগণ তা ব্যর্থ করে দিয়েছেন।
কলকাতার বন্ধুদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, সংবাদমাধ্যমের প্রোপাগান্ডার ফাঁদে পা দেওয়ার আগে বাংলাদেশের জনগণের আর্থসামাজিক রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক জীবন খতিয়ে দেখুন। প্রতিবেশী বন্ধু হিসাবে সেটা জরুরিও বটে।
নিবন্ধকার রাজনৈতিক বিশ্লেষক
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








