দেশের প্রধানমন্ত্রী ভোটের ভাষণে ব্যস্ত, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ব্যস্ত শিল্প সম্মেলনে নিজের ঢাক পেটাতে। এদিকে উত্তরকাশীর সিল্কিয়ারায় ১১ দিন ধরে পাহাড়ি সুড়ঙ্গে আটকে রয়েছেন দেশের ৪১ জন নির্মাণ শ্রমিক, যাঁদের মধ্যে তিনজন পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উন্মাদনায় এতদিন এই নিয়ে খুব একটা হইচই হয়নি, এখন সবার নজরে পড়েছে। হয়ত ভারত বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হলে এখনো মনে পড়ত না। এখন মূলধারার সংবাদমাধ্যমে উদ্ধার কাজের লাইভ সম্প্রচার হচ্ছে। বেশ একটা রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি। উদ্ধার কাজ কতটা এগোল, মন্ত্রীমশাইরা কী বললেন তার ধারা বিবরণী চলছে। আমরা নাগরিকরাও সংবাদমাধ্যমের কৃপায় উত্তেজনার তাপ অনুভব করছি। মিডিয়ার চাই হাতে গরম রোমাঞ্চকর খবর। সে বিখ্যাতদের খাওয়া, ফুর্তি করাই হোক বা আটকে পড়া শ্রমিকদের খবরই হোক। কখন কোন খবর মানুষকে গেলাতে হবে তা ঠিক হয় বাণিজ্যিক নিয়মে। বাণিজ্যের সঙ্গে অবশ্যই থাকে রাজনীতি। এখন আবার সিংহভাগ সংবাদমাধ্যমই সরকারবাদী। তাই মন্ত্রীমশাইরা খেলা, উৎসব, মেলায় মানুষকে মাতাতে চাইলে সংবাদমাধ্যম সেটাই করে। মন্ত্রীমশাইরা জনদরদী সাজার নাটক করলে সংবাদমাধ্যম সেটাই পরিবেশন করে।
আমরা আমজনতাও চিন্তাভাবনা সব বন্ধক রেখেছি তাদের কাছে। আমাদের দেশপ্রেম উথলে ওঠে ক্রিকেটে দেশের সাফল্যে, দেশের শ্রমিক বা কৃষকদের জীবন বিপন্ন হলে আমরা উদ্বিগ্ন হই না। সংবাদমাধ্যম যা গেলায়, আমরা সেটাই গিলি। তাই সহনাগরিকদের সংকট আমাদের ভাবায় না। আমরা ভাবি না এমন বিপদ আমাদেরও হতে পারে। পুঁজি নির্দেশিত বিকাশের রথের চাকায় পিষ্ট হতে পারি আমি, আপনিও। যে কোনোদিন, ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগতভাবে। এই চরম নাগরিক ঔদাসীন্য, সংবেদনহীনতাই আজ কর্পোরেট, সরকার, মিডিয়া – সবাইকে এতটা বেপরোয়া করে তুলেছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
উত্তরাখণ্ডের এই দুর্ঘটনা অনেকগুলি বিষয় আমাদের সামনে তুলে ধরল। পরিবেশ ধ্বংস করে, প্রকৃতির উপর খবরদারি করে চলা উন্নয়ন প্রকল্প নিরাপদ তো নয়ই, বরং মারাত্মক বিপর্যয় আমাদের শিয়রে। শ্রমিকদের ন্যূনতম নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করে চলছে সেই রথ। কৃষি বা অন্য কাজ ছেড়ে অসহায় মানুষ মজুরি শ্রমিক হয়ে গ্রাম ছাড়ছেন, হয়ে যাচ্ছেন শস্তা শ্রমের যোগানদার।
এসবই হল আর্থিক বিকাশের পরিণাম। জিডিপির হার, বিনিয়োগ ইত্যাদির প্রচারে যা আড়াল করে দেওয়া হচ্ছে।
পাহাড়ি সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকরা চার ধাম প্রকল্পে কাজ করছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের প্রকল্প। চার তীর্থস্থান বদ্রীনাথ, কেদারনাথ, গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রীর মধ্যে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে এই প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০১৬ সালের এই প্রকল্প নিয়ে প্রথম থেকেই কেন্দ্রীয় সরকারের প্রচারের শেষ নেই। এতে তীর্থযাত্রার সুবিধা হবে। তার সঙ্গে তোলা হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তার ধুয়ো। আন্তর্জাতিক সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। হিন্দুত্ববাদ আর জাতীয়তাবাদ মিশিয়ে মানুষকে গেলানোর উপযুক্ত প্যাকেজ। যদিও বিরোধিতা থেমে থাকেনি। শুরু থেকেই নানা মহল এই প্রকল্পে আপত্তি তুলে আসছে। প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে তৈরি হচ্ছে ৮২৫ কিলোমিটার লম্বা দুই লেনের এক্সপ্রেসওয়ে। নির্মিত হচ্ছে উড়ালপুল, সেতু, সুড়ঙ্গ পথ। হিমালয়ে এই ধরনের নির্মাণকাজ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে বলে প্রথম থেকেই অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
২০১৬ সালের এই প্রকল্প নিয়ে প্রথম থেকেই কেন্দ্রীয় সরকারের প্রচারের শেষ নেই। এতে তীর্থযাত্রার সুবিধা হবে। তার সঙ্গে তোলা হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তার ধুয়ো। আন্তর্জাতিক সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। হিন্দুত্ববাদ আর জাতীয়তাবাদ মিশিয়ে মানুষকে গেলানোর উপযুক্ত প্যাকেজ।
হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে একের পর এক নির্মাণকাজ, নদীবাঁধ কী বিপর্যয় ডেকে আনে তা আমরা উত্তরাখণ্ডেই দেখতে পেয়েছি। যোশীমঠ আজ বিপন্ন। যোশীমঠের এই বিপন্নতার অন্যতম কারণ চার ধাম প্রকল্প। বিজ্ঞানীদের মতে, একের পর এক প্রকল্পে হিমালয় অববাহিকায় বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। বাড়ছে ধসের ঘটনা। এই অঞ্চল জৈব বৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ। চার ধাম প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ৫০৮.৬৬ হেক্টর বনাঞ্চল। সেখানে আছে নানা উদ্ভিদ, জীবজন্তু। এইসব তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্প তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলেছে। রাস্তা বানাতে কাটা হচ্ছে গাছ, সংকটে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন ও জীবিকা। খোদ উত্তরাখণ্ড সরকার জানিয়েছে, চার ধাম প্রকল্পের মধ্যে ১৪৮টি দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা রয়েছে। তারমধ্যে ৮৬টি উত্তরকাশী অঞ্চলে, যেখানে পাহাড়ি সুড়ঙ্গে আটকে পড়েছেন শ্রমিকরা।
আরো পড়ুন যোশীমঠ বিপর্যয় কেবল পরিবেশ সংকট নয়
২০২২ সালে চার ধাম প্রকল্পের জন্য গঠিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন চেয়ারম্যান রবি চোপড়া। এই পরিবেশবিদ তাঁর পদত্যাগপত্রে এই প্রকল্প কীভাবে হিমালয়ের ক্ষতি করছে তা ব্যাখ্যা করেন। তবু কেন্দ্রীয় সরকারের টনক নড়েনি। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাতেই চলবে সব। আইন ফাঁকি দিতেও সরকার পিছপা নয়। এনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট অনুসারে ১০০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা বানাতে পরিবেশ রক্ষার ছাড়পত্র চাই। তা এড়াতে সমগ্র প্রকল্পকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে ফেলা হয়েছে। ২০২২ সালের সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক সীমান্তবর্তী ১০০ কিলোমিটার এলাকায় এই প্রকল্পের জন্য পরিবেশের ছাড়পত্র দরকার নেই। কারণ এর সঙ্গে নাকি জাতীয় নিরাপত্তা জড়িত। যেন জাতীয় নিরাপত্তা আর পরিবেশ নিরাপত্তার অবস্থান বিপরীত মেরুতে। এই বছরেই অরণ্য সংরক্ষণ আইন সংশোধন করে কেন্দ্রীয় সরকার নিজেই পরিবেশ ধ্বংসের আইনি অধিকার মজবুত করেছে। আইন বা বিধিনিষেধ থাকলে রয়েছে ফাঁকি দেওয়ার নানা কৌশল। তার উপর দরকার হলে আইনই বদলে দেওয়া হচ্ছে। যে কোনো মূল্যে পুঁজির স্বার্থে বিকাশ চাই।
সেই বিকাশে ছোট রাজ্য উত্তরাখণ্ডে চলছে একের পর এক সড়ক, রেলপথ, সুড়ঙ্গ, নদীবাঁধ নির্মাণ। এবছরের জুলাই মাসে রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রী নীতিন গড়করি জানান, চার ধাম প্রকল্পে ইতিমধ্যে ৬০১ কিলোমিটার রাস্তা তৈরি হয়ে গেছে। নেওয়া হয়েছে হৃষীকেশ-কর্ণপ্রয়াগ রেলপথ প্রকল্প। একশো পঁচিশ কিলোমিটার বিস্তৃত এই রেলপথের মধ্যে ১০৫ কিলোমিটার যাবে পাহাড়ি সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে। এই প্রকল্প নিয়েও অনেকের তীব্র আপত্তি আছে। উত্তরাখণ্ডে একের পর এক নির্মাণকাজের বিরোধিতায়, গঙ্গা বাঁচানোর জন্য অনশন ব্রত পালন করছেন হরিদ্বার মাতৃ সদন আশ্রমের সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসিনীরা। ইতিমধ্যেই চারজন সন্ন্যাসী শহিদ হয়ে গিয়ে থাকলেও হিন্দুত্ববাদী সরকারের টনক নড়েনি। লড়াই ভাঙতে একাধিকবার আশ্রমে হানা দিয়েছে পুলিশ। গড়করির দেওয়া প্রতিশ্রুতিও পালিত হয়নি।
উত্তরকাশীতে সুড়ঙ্গ নির্মাণ করতে গিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের দুরবস্থার দায় কেন্দ্রীয় সরকার এড়াতে পারে না। প্রধানমন্ত্রীর শখ মেটাতে গিয়েই এই বিপত্তি। নির্মাণকাজের বরাত পাওয়া নবযুগ কোম্পানির ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। এই কোম্পানিই হৃষীকেশ-কর্ণপ্রয়াগ রেলপথ প্রকল্পের বরাতও পেয়েছে, যার অর্থমূল্য ২,০৭২ কোটি টাকা। প্রশ্ন উঠেছে, বিস্ফোরক ব্যবহার কতটা ঠিক হবে তা পরীক্ষা করা হয়েছিল কিনা। অনেকের অনুমান, পাহাড়ের সহনক্ষমতার বেশি বিস্ফোরক ব্যবহারেই বিপত্তি ঘটেছে। এই ধরনের ঝুঁকিবহুল কাজে শ্রমিকদের সুরক্ষার যথাযথ ব্যবস্থা যে হয়নি তা পরিষ্কার। সুড়ঙ্গে শ্রমিকরা গেলে একটা পাইপও ঢোকানো হয়। সেই হিউম পাইপ থাকে বিপদে পড়লে বের হয়ে আসার জন্য। সেই পাইপ থাকলে তাঁরা এমনভাবে আটকে পড়তেন না। কোনো সেফটি পয়েন্টও করা হয়নি। নিয়ম অনুসারে মাটি যাচাই করে তবেই শ্রমিকদের সুড়ঙ্গে পাঠানোর কথা। স্থানীয় অধিবাসীদের বক্তব্য, এসব কিছুই কোম্পানি করেনি। দুর্ঘটনার পর দেশের নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গগুলোর সুরক্ষা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ। এতদিন যে খতিয়ে দেখা হত না, তা এই বক্তব্যেই প্রমাণিত। কোম্পানির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা সরকার এখন পর্যন্ত জানায়নি।
আসলে শ্রমিক সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা সরকার বা কোম্পানি করে না। রাস্তা হলে মন্ত্রীমশাইরা ঘটা করে উদ্বোধন করবেন, ভোটের প্রচারে কাজে লাগাবেন। যাঁদের শ্রমে এসব হয় তাঁদের জীবনের কোনো মূল্য নেই। অগাস্ট মাসে রেলসেতু নির্মাণ করতে গিয়ে মিজোরামে ২৩ জন শ্রমিক মারা যান। তারপরেও কেন্দ্রীয় সরকারের টনক নড়েনি। ন্যূনতম নিরাপত্তা নেই; উলটে উদ্ধার কাজ চালাতেও চলেছে গড়িমসি। ১২ নভেম্বর শ্রমিকরা আটকে পড়ার পর যথাযথ উদ্ধার কাজ শুরু করতে অনেক দেরি হয়েছে। এখন প্রধানমন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী যাচ্ছেন, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থা ও সামরিক বাহিনীকে কাজে লাগানো হচ্ছে। উদ্ধারের পর আমরা হয়ত সংবাদমাধ্যমের সুরে সুর মিলিয়ে সরকারকে ধন্য ধন্য করব। প্রধানমন্ত্রী সেই সুযোগে ভাষণও দিতে পারেন। কিন্তু সত্যিই কি সরকারের ধন্যবাদ প্রাপ্য? উন্নয়নের নেশায় মত্ত যে সরকার শ্রমিকের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে অক্ষম, তাকে তীব্র ধিক্কার জানানোই নাগরিকের কর্তব্য।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শখ করে কেউ এইসব কাজে যায় না। সুড়ঙ্গে আটকে আছেন মনজিত লাল। তাঁর বড় ভাই একবছর আগে মুম্বাইতে বহুতল নির্মাণের কাজে গিয়ে তড়িতাহত হয়ে মারা যান। বড় ভাইয়ের মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মৃত্যুর পরেও মনজিতকে এমন কাজে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেতে হয়। আটকে থাকা শ্রমিকদের মধ্যে তিনজন পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে দুজনের বাড়ি হুগলী জেলার পুরশুড়া ব্লকে। রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে এই লেখকের সেই দুজনের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। চব্বিশ বছর বয়সী শৌভিক পাখিরার বাড়ি পুরশুড়ার কেলেপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের হরিণাখালি গ্রামে। সরকারি পলিটেকনিক থেকে ইলেকট্রিকাল নিয়ে পড়ে রাজ্যে চাকরি মেলেনি। বছর দুয়েক বেকার থাকার পর দশমাস আগে তিনি গিয়েছিলেন উত্তরাখণ্ডে সুড়ঙ্গ নির্মাণের কাজে। বাবা অসুস্থ, ভাইও রুজিরুটির জন্য থাকেন ঝাড়খণ্ডে। উনিশ বছর বয়সী জয়দেব প্রামাণিকের বাড়ি ডিহিবাতপুর পঞ্চায়েতের নিমডাঙ্গি গ্রামে। বাবার গ্রামে ছোট চায়ের দোকান, চাষের জমি নেই। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে বছরখানেক আগে তিনি চলে যান উত্তরাখণ্ড।
আটকে থাকা শ্রমিকদের মধ্যে তিনজন পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে দুজনের বাড়ি হুগলী জেলার পুরশুড়া ব্লকে। রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে এই লেখকের সেই দুজনের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
দুজনের বাড়ির লোকেরই এক কথা। চাষে লাভ নেই, জমি না থাকলে তো কথাই নেই। গ্রামের পর গ্রাম খালি করে যুবকরা চলে যাচ্ছেন ভিনরাজ্যে। অনেকে মাঝপথে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে চলে যাচ্ছেন। কেউ যাচ্ছেন নির্মাণকাজে, কেউ সোনার কাজে, কেউ আর কোনো কাজে। পুরশুড়া ব্লক আলু চাষের জন্য বিখ্যাত, কিন্তু আলু চাষে এখন আর লাভ হয় না। অনেকেই পাঞ্জাবে যাচ্ছেন আলুর হিমঘরের শ্রমিক হতে। অনেকে আবার চাষের মরশুমে গ্রামে থাকেন, অন্য সময়ে ভিনরাজ্যে। নতুন প্রজন্ম চাষের কাজ থেকে মুখ ফেরাচ্ছে।
এই চিত্র রাজ্যের সর্বত্র। মিজোরামে রেলসেতু নির্মাণ দুর্ঘটনায় মারা যান রাজ্যের ২৩ জন শ্রমিক। এই বছরেই ওড়িশায় রেল দুর্ঘটনায় মারা যান রাজ্যের শতাধিক শ্রমিক। তাঁরা কাজ করতে যাচ্ছিলেন দক্ষিণ ভারতে। প্রধানমন্ত্রীর বিকাশের মতোই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী উন্নয়ন নিয়ে স্লোগান দিতে ব্যস্ত। কৃষিতে লোকসান হয় বলেই রাজ্যের মানুষ পাড়ি জমান ভিনরাজ্যে। এদিকে শিল্প সম্মেলনে শিল্পপতিরা কৃষিক্ষেত্রে পুঁজি বিনিয়োগের কথা বলেন।
কৃষিকাজে আটকে থাকা, নাকি পিছিয়ে পড়া? কৃষিক্ষেত্রে পুঁজি বিনিয়োগ উন্নয়নের লক্ষণ, যে উন্নয়নে কৃষকের ছেলে হয়ে যান কম মজুরির শ্রমিক, শস্তা শ্রমের যোগানদার। তাঁদের নামে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের প্রকল্পের শেষ নেই। যাঁরা শ্রমিক তাঁদের সমস্যারও শেষ নেই। আর্থিক বিকাশের মানে হল শ্রমিকের বিনাশ। বিনাশ ঘটে তাঁর অধিকারের, মানবিক সত্তার। হয়ত কাজ করে তাঁর আর্থিক অবস্থা কিছুটা সচ্ছল হয়, কিন্তু যে পরিবেশে কাজ করেন, ঘন্টার পর ঘন্টা শ্রমশক্তি বিক্রিতে বাধ্য হন, তাতে মানবিক সত্তার কিছু বাকি থাকে না। কেউ দুর্ঘটনার মধ্যে পড়েন, কারোর মৃত্যু পর্যন্ত হয়। অমানুষিক পরিশ্রমে কারোর শ্রম করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। শ্রমের বাজারে আসেন নতুন মানুষ, হয়ে যান শ্রমিকশ্রেণির একজন। শ্রেণির বিলোপ ঘটে না। এটাই পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় উন্নয়নের স্বরূপ। শ্রমিকশ্রেণি এমন এক শ্রেণি যারা নিজেদের ত্যাগের মাধ্যমে নিজের শ্রেণিকে বিনাশের হাত থেকে রক্ষা করে। অনেকটা এমনই বলেছিলেন কার্ল মার্কস। ১৮৪৪ সালে লেখা তাঁর ইকনমিক অ্যান্ড ফিলজফিক ম্যানুস্ক্রিপ্টস রচনায়। প্রায় ১৮০ বছর পরেও পুঁজিবাদের সেই চরিত্র আর শ্রমিকশ্রেণির অবস্থা বদলায়নি।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








