অঙ্ক কঠিন, তাই রসায়নে ভরসা। উচ্চমাধ্যমিক নয়, লোকসভা ভোটের আগে মুর্শিদাবাদের ভোটচিত্রকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়। আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, বিদায়ী লোকসভায় কংগ্রেসের দলনেতা অধীররঞ্জন চৌধুরীর গড় রক্ষার প্রশ্নটাও এখন অঙ্ক ছাড়িয়ে রসায়ননির্ভর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বেশ কয়েক দশক ধরে মুর্শিদাবাদ অধীর গড় বলেই পরিচিত ছিল। এই ব্র্যান্ডিংয়ে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের এক অংশের বড় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু একদিকে বিজেপির ধর্মনির্ভর রাজনীতি, উল্টোদিকে তৃণমূল কংগ্রেসেরও ধর্মীয় পরিচয়কেন্দ্রিক প্রচার, পেশিশক্তি এবং সরকারি ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে তৈরি করা ভোটযন্ত্রের চাপে সেই গড়ই এখন যায় যায়।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
মুর্শিদাবাদের তিনটি লোকসভা আসনের মধ্যে রাজনীতির নিরিখে এবছর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ আসন বহরমপুর। প্রথম কারণ, এই কেন্দ্র থেকেই বারবার জিতেছেন অধীর। নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে লোকসভায় কংগ্রেসের অন্যতম মুখ তিনি। দ্বিতীয় কারণও অধীর, যিনি প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি, কথায় কথায় তোপ দাগেন মমতা ব্যানার্জি, অভিষেক ব্যানার্জির বিরুদ্ধে। কংগ্রেসের যে অংশ তৃণমূলের বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে থাকতে চায়, অধীর নিজেকে সেই গোষ্ঠীরই মুখ হিসাবে প্রতিপন্ন করতে চান। তিনি আসলে স্পষ্ট বুঝেছেন, রাজ্যে কংগ্রেস দলকে টিকিয়ে রাখার একমাত্র উপায় হল তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে টক্কর দেওয়া। তৃণমূল আবার কৌশল হিসাবে কংগ্রেসকে গিলে খেতে চাইছে। রাজ্যের শাসক দলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে যেসব কংগ্রেস নেতার নামে এফআইআর, মামলা হয়েছে – তৃণমূল তাদেরই দলে টেনে নিয়েছে। জেলাস্তরে কংগ্রেসের নেতাদের বড় অংশই ছিল ঠিকাদারির সাথে যুক্ত। সেখানেও মোক্ষম আঘাত হেনেছে তৃণমূল। অগত্যা তাদেরও বড় অংশ যোগ দিয়েছে তৃণমূলে। তবে তৃণমূল জমানার ত্রয়োদশতম বছরে এসে কংগ্রেসের আর নরম হওয়ার জায়গা নেই। মুর্শিদাবাদ, মালদার মত জেলাতেও একথা বুঝতে পেরেছে কংগ্রেস নেতৃত্ব।
অধীরের নিজের কেন্দ্র বহরমপুর এক সময় আরএসপি দলের শক্ত ঘাঁটি ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনে কংগ্রেস, অনুশীলন সমিতির লড়াই পেরিয়ে ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে বহরমপুরের আশেপাশে জমির লড়াই গড়ে তোলায় আরএসপি দলের বড় ভূমিকা ছিল। ১৯৫২ সালে প্রথম লোকসভা নির্বাচনে বহরমপুর কেন্দ্রের সাংসদ নির্বাচিত হন আরএসপি নেতা ত্রিদিব চৌধুরী। স্বাধীনতা সংগ্রামী ত্রিদিব আমৃত্যু বহরমপুরের সাংসদ ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর আসন ফাঁকা হলে সাংসদ হন কংগ্রেসের অতীশচন্দ্র সিনহা। ত্রিদিব ছিলেন কৃষকশ্রেণি এবং গ্রামের মানুষের প্রতিনিধি, অন্যদিকে অতীশ কংগ্রেসের মধ্যে থাকা জমিদারদের প্রতিনিধি। ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে ফের জেতে আরএসপি। সেবার ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী ননী ভট্টাচার্য। ১৯৯১ সালেও তিনিই জেতেন। ১৯৯৬ সালে বহরমপুর থেকে জেতেন আরএসপি প্রার্থী প্রমথেশ মুখার্জি। তারপর ১৯৯৯ সাল থেকে এই কেন্দ্রে টানা জিতছেন অধীর। সেবার বিদায়ী সাংসদ প্রমথেশকে প্রায় ৯৫ হাজার ভোটে হারিয়েছিলেন তিনি।
তার আগে থেকেই নিজের ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন অধীর। কখনো নিজেকে তুলে ধরেছেন রবিন হুড হিসাবে, কখনো অসাম্প্রদায়িক নেতা হিসাবে, কখনো সংখ্যালঘুদরদি নেতা হিসাবে, আবার কখনো হিন্দু নেতা হিসাবে। যখন যেমন প্রয়োজন। রাজনৈতিক মহলের দাবি, এ কাজে অধীর বরাবরই সিদ্ধহস্ত। তবে রাজনীতির পাশাপাশি চুটিয়ে ব্যবসাও করেছেন। তবে বরাবরই তাঁর রাজনীতিতে পেশিশক্তির বড় ভূমিকা ছিল। সেইসময় বামফ্রন্টের দাবি ছিল, অধীর তৈরি করেছেন ‘মার্ডার সিন্ডিকেট’। একই কথা এখনো শোনা যায় তৃণমূল নেতাদের মুখে।
অধীরের হাত ধরেই কংগ্রেস হয়ে উঠেছিল ছোটবড় ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীদের আশ্রয়। অধীরের লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে কান্দি এবং বহরমপুর পৌরসভাও ছিল কংগ্রেসের দখলে। এই দুই এলাকায় পৌরসভায় অস্থায়ী চাকরি এবং উন্নয়নের কাজের ঠিকাদারি ছিল শহর এলাকায় সংগঠন ধরে রাখার ভিত্তি। একই কাজে পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, জেলা পরিষদকেও ব্যবহার করেছে কংগ্রেস। সঙ্গে ছিল ক্লাব ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির উপর কংগ্রেসের দখল। সব মিলিয়ে নিজের রাজনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুতন্ত্র নির্মাণ করেছিলেন অধীর।
বামফ্রন্ট জমানায় আরএসপি, সিপিএমের সঙ্গে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দিয়েই এই জমি ধরে রাখতে হয়েছে অধীরকে। কংগ্রেস-বামফ্রন্ট লড়াইয়ে নিজেকেই একমাত্র নেতা হিসাবে তৈরি করেছেন অধীর। জেলার বাকি নেতারা বরাবরই ঢাকা থেকেছেন অধীরের ছায়ায়। তৃণমূল জমানায় তাঁরাই আশ্রয় নিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসে।
২০২৪ সালে লোকসভা ভোটের আগে নেতৃত্বের সংকটও কংগ্রেসের বড় চ্যালেঞ্জ। অধীরের একদা ঘনিষ্ঠ অনুচর অপূর্ব সরকার বর্তমানে তৃণমূল কংগ্রেসের বহরমপুর মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি। তৃণমূলের মুর্শিদাবাদের সাংসদ আবু তাহের খান থেকে বহরমপুর মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলার চেয়ারম্যান রবিউল আলম চৌধুরী, বহরমপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নাড়ুগোপাল মুখার্জি থেকে ভরতপুরের বিধায়ক রবিউল আলম চৌধুরী, ভরতপুরের বিতর্কিত বিধায়ক হুমায়ুন কবীর, বেলডাঙার বিধায়ক হাসানুজ্জামান সেখ – সকলেই রাজনীতিতে নাম কামিয়েছেন অধীরের অভিভাবকত্বে। অধীরের নিজস্ব ভোটযন্ত্রের বড় অংশ ছিলেন এই নেতারাই। কিন্তু এঁরা সকলেই এখন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম সারিতে। তবে কংগ্রেস মহলের দাবি, অন্তত বহরমপুর আসনে এটাই আবার অধীরের সুবিধাও বটে।
মুর্শিদাবাদ জেলায় তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান ২০১৬ থেকে। ২০১৬ নির্বাচনের পর তৃণমূলের হয়ে মুর্শিদাবাদের দায়িত্ব পান এখনকার বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। শুরু হয় দল ভাঙানোর পর্ব। কংগ্রেস, বামফ্রন্টের একের পর এক পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি ভেঙে বোর্ড গঠন শুরু করে তৃণমূল। তৃণমূলে যোগ দেন কান্দির তখনকার বিধায়ক অপূর্ব সরকার, নওদার বিধায়ক থাকা আবু তাহের খান প্রমুখ। জাকির হোসেন, খলিলুর রহমানের মত জঙ্গিপুরের কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ বিড়ি ব্যবসায়ীদেরও দলের নেতা করে দেন শুভেন্দু। ২০১৮ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনে শুভেন্দু বাহিনীর দাপটে বিরোধীশূন্য পঞ্চায়েত মডেলের সার্থক রূপায়ণ হয় মুর্শিদাবাদে।
গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, পৌরসভাগুলি কাজে লাগিয়ে ভিত শক্ত করে তৃণমূল। গ্রামে গ্রামে যেসব বাহিনী এতকাল কখনো কংগ্রেস, কখনো বামফ্রন্টের হয়ে ভোট করে এসেছে তারা সকলেই যোগ দেয় তৃণমূলে। ভোটেও তার প্রভাব পড়ে।
২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন বিখ্যাত তৃণমূলী সন্ত্রাসের জন্য। সেই নির্বাচনকে গুরুত্ব না দিলেও মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদ থেকে জিতেছিলেন সিপিএম প্রার্থী বদরুদ্দোজা খান, বহরমপুর থেকে অধীর, জঙ্গিপুর থেকে প্রণব মুখার্জির পুত্র অভিজিৎ। তবে ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদের তিন আসনের মধ্যে দুটিতে জয়ী হয় তৃণমূল। জঙ্গিপুর থেকে অভিজিৎকে হারিয়ে জেতেন খলিলুর, মুর্শিদাবাদ থেকে জেতেন আবু তাহের খান। লড়াই করে নিজের গড় ধরে রাখেন অধীর। সেবার তৃণমূল প্রার্থী করে একসময়ের অধীর ঘনিষ্ঠ অপূর্ব সরকার ওরফে ডেভিডকে। কান্দির বিধায়ক পদ ত্যাগ করে লোকসভায় লড়ে হেরে যান ডেভিড। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে জঙ্গিপুর ও মুর্শিদাবাদে প্রার্থী দিয়েছিল সিপিএম। তবে বহরমপুরে অধীরের হয়েই প্রচারে নেমেছিলেন সিপিএম নেতা, কর্মীরা। ২০২১ সালের নির্বাচনে অবশ্য কংগ্রেসের ভোটে ধ্বস নামে।
তৃণমূল এবং বামফ্রন্টের সঙ্গে অধীরের সমীকরণ বুঝতে হলে একটু পিছিয়ে যাওয়াই ভাল, অন্তত ২০১১ পর্যন্ত। ২০১১ সালে রাজ্যে কংগ্রেস-তৃণমূল জোট হয়। প্রবল পরিবর্তনের হাওয়ায় সেই জোট ভোটও টেনেছিল। যদিও মুর্শিদাবাদ জেলায় সেই জোট মানেননি অধীর। মুর্শিদাবাদ জেলার ২২টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস জেতে ১৪টি আসনে, সাতটি জেতে বামফ্রন্ট, তৃণমূল শুধুমাত্র সাগরদীঘিতে জেতে। সেখানেও গোঁজ প্রার্থী দিয়েছিল কংগ্রেস। সেবার কংগ্রেসের গোঁজ প্রার্থীদের কারণে বেশকিছু আসন হাতছাড়া হয়েছিল তৃণমূলের। কিছুদিন কংগ্রেস বিধায়করা তৃণমূলের মন্ত্রিসভাতেও ছিলেন। কিন্তু তাতেও ছেদ পড়ে, আসে ২০১৪ সাল। ততদিনে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক তিক্ত হয়েছে তৃণমূলের। ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনে অধীরের বিরুদ্ধে তৃণমূল প্রার্থী হন ইন্দ্রনীল সেন। মুর্শিদাবাদের তিন আসনের মধ্যে জঙ্গিপুর ও বহরমপুরে জয়ী হয় কংগ্রেস, মুর্শিদাবাদ আসন জেতে সিপিএম। বহরমপুর আসনে সেবার ৫০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছিলেন অধীর।
২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে বেশকিছু আসনে কংগ্রেস ও বামেদের মধ্যে সমঝোতা হলেও মুর্শিদাবাদ জেলায় সব আসনে সমঝোতা হয়নি। আবার সমঝোতা হওয়া আসনেও গোঁজ প্রার্থী দেয় কংগ্রেস। ফলে সামসেরগঞ্জের মত আসনও বামেদের হাতছাড়া হয়। কংগ্রেসের জেতা আসনে অবশ্য কংগ্রেসের হয়েই রাস্তায় নেমেছিল সিপিএম। আগেই বলা হয়েছে, ২০১৯ লোকসভায় মুর্শিদাবাদের বাকি দুই কেন্দ্রে সিপিএম এবং কংগ্রেসের মধ্যে বোঝাপড়া না হলেও, বহরমপুর আসনে অধীরের হয়ে প্রচার করে সিপিএম। তবে ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনেই অধীর গড়ে চোট পায় কংগ্রেস। সিপিএম, কংগ্রেস, আইএসএফ সংযুক্ত মোর্চা গড়ে ভোটে লড়েছিল। কিন্তু সামসেরগঞ্জ আসনে সিপিএম, কংগ্রেস দুই দলই প্রার্থী দেয়। বাকি আসনে সমঝোতা হলেও দুপক্ষেরই হাতছাড়া হয় সবকটি আসন। অধীরের কেন্দ্রেই দ্বিতীয় শক্তি হিসাবে উঠে আসে বিজেপি। অধীর চৌধুরী নিজে বারবার ধর্মীয় মেরুকরণকেই এর কারণ হিসাবে তুলে ধরতে চেয়েছেন, কিন্তু সংগঠনের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার কথা শোনা গিয়েছে কংগ্রেসের নেতাদের গলায়।
তারপর পৌরসভা এবং পঞ্চায়েত নির্বাচনে অবশ্য মুর্শিদাবাদ জেলায় বিজেপির উত্থান থমকে গিয়েছে। বহরমপুর এবং মুর্শিদাবাদ – দুই লোকসভা এলাকাতেই পঞ্চায়েত নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে সিপিএম ও কংগ্রেস। মুর্শিদাবাদ জেলায় এবারের পঞ্চায়েত ভোট ছিল রক্তাক্ত। তৃণমূল, কংগ্রেস এবং সিপিএম – তিন দলেরই একাধিক কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন নির্বাচনী হিংসায়। রানিনগর, ডোমকল থেকে ভরতপুর, খড়গ্রাম – ভোটে মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়েছেন বামফ্রন্ট, কংগ্রেস এবং তৃণমূলের কর্মীরা। হাতে গোনা কিছু পঞ্চায়েত ছাড়া তৃণমূলের বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে সেভাবে দেখা যায়নি বিজেপিকে।
পঞ্চায়েত নির্বাচন পর্বে সিপিএম এবং কংগ্রেসের মধ্যে জেলা পরিষদ আসনে বোঝাপড়া হয়েছিল। বাকি দুই স্তরের বোঝাপড়ার দায়িত্ব ছিল স্থানীয় নেতাদের উপরে। তারপরেও গ্রামের ভোটারদের কাছে দুই দল কার্যত এক হয়ে গিয়েছে। জেলা পরিষদে সাফল্য না এলেও সাফল্য এসেছে পঞ্চায়েত স্তরে। বহু এলাকাতেই দুই দলেরই প্রার্থী থাকলেও শেষ মুহূর্তে লড়াই থেকে পিছিয়ে এসেছে অন্য দল। গ্রাম মুর্শিদাবাদের ভোট লব্জে নতুন শব্দবন্ধ তৈরি হয়েছে – জোট পার্টি। সিপিএম, কংগ্রেস পরিচয় মুছে এই জোট পার্টির পরিচয় বড় সংখ্যার পঞ্চায়েত জিতিয়েছে।
লোকসভা নির্বাচনে এই জোট পরিচয় থেকে সরে আসতে চাইছেন না দুই দলের বুথ স্তরের কর্মীদের বড় অংশ। একই মনোভাব অবশ্য সিপিএম ও কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদেরও। ইন্ডিয়া জোট নিয়ে জট যখন তুঙ্গে, তখনই নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া দৃঢ় করার কাজ করেছেন রাজ্যের সিপিএম ও কংগ্রেস নেতারা। রাহুল গান্ধীর ন্যায় যাত্রার মাঝেই জঙ্গিপুরে ছুটে গিয়েছেন সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। একদিকে যখন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে ন্যায় যাত্রায় অসহযোগিতার অভিযোগ করেছেন, তখনই সেলিম রাহুল গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে নমনীয়তার বার্তা দিয়েছেন। ন্যায় যাত্রার আগে খোদ বহরমপুরে এসে কংগ্রেসকে নিশানা করেছেন মমতা। তাঁর বয়ানকে হাতিয়ার করেছে সিপিএম এবং কংগ্রেস।
আরো পড়ুন ন্যায় যাত্রার কাঁটা বিছানো পথেও মানুষের থেকে ফুল পাচ্ছেন রাহুল
অধীর স্পষ্ট বুঝেছেন রাজ্যে তৃণমূল বিরোধিতার বিরোধিতার ঝাঁজ নরম করা মানে পায়ের তলায় মাটি নিজের হাতে সরিয়ে দেওয়া। শুধু রাজ্যে নয়, বহরমপুর কেন্দ্রেও অধীরের ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে বিজেপি। পঞ্চায়েত ও পৌরসভা ভোটে বিজেপি দাগ না কাটতে পারলেও তাদের ভরসা ধর্মীয় সংগঠন, মন্দির, ক্লাব এবং সামাজিক সংগঠনগুলি। ফলে তৃণমূলবিরোধিতার সুর নরম করলে বহরমপুরেই বিপন্ন হতে পারে কংগ্রেসের অস্তিত্ব। তাই সে পথে হাঁটতে আপত্তি অধীরের। অন্যদিকে রয়েছে সিপিএমের পাশে থাকার আশ্বাস।
এই আবহে ১৫ ফেব্রুয়ারি সমঝোতা নিয়ে বহরমপুরে মুখোমুখি বসার কথাও ছিল সেলিম আর অধীরের। কিন্তু বাতিল হয়েছে বৈঠক। অধীর যদিও নিজস্ব ভঙ্গিতেই অস্বীকার করেছেন বৈঠকের কথা। সেলিম দাবি করেছেন, সুবিধাজনক সময়, স্থান দেখেই হবে বৈঠক। তবে বৈঠক হোক আর না হোক। জোটের ব্যাপার আশাবাদী দুই দলই। সিপিএম এ ব্যাপারে এক পা এগিয়ে। তাঁদের একাংশের দাবি, তৃণমূল আর বিজেপির বিরুদ্ধে জোট তৈরি করতে সিপিএম কতটা আগ্রহী তা শুধু কংগ্রেস নয়, রাজ্যের মানুষকেও দিতে চাইছে সিপিএম।
মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলায় রাহুলের ন্যায় যাত্রা ঘিরে মানুষের উৎসাহ দেখে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে মমতার কপালেও। তাই একসময় কংগ্রেসের ঘাঁটি বলে পরিচিত এই দুই জেলায় এসে অধীরকে সরাসরি নিশানা করেছেন মমতা। ন্যায় যাত্রা রাজ্যে ছেড়ে যাওয়ার দিন কটাক্ষ করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। মুর্শিদাবাদের মত জেলায় তৃণমূলের বড় চিন্তা গোষ্ঠী কোন্দল। পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতির ক্ষমতা দখল ঘিরে ব্লকে ব্লকে একাধিক শিবিরে বিভিক্ত তৃণমূলের বিধায়ক থেকে ব্লক সভাপতিরা। এই কোন্দলের ফায়দা তুলতে চাইছে কংগ্রেস।
এইসব সমীকরণের রসায়নের কথা মাথায় রেখে মুর্শিদাবাদ ও মালদা নিয়ে আশাবাদী কংগ্রেস। পঞ্চায়েত নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত ভাল ফলের পর মুর্শিদাবাদ জেলা সিপিএমের কাছেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তবে অঙ্ক যেমন কঠিন, রসায়নও সহজ বিষয় নয়। সমঝোতা নিয়ে তাই তাড়াহুড়ো করতে নারাজ অধীর।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








