অর্ণব সাহা

২০১৯ লোকসভা ভোটের ঠিক আগেই পুলওয়ামা কাণ্ড ঘটেছিল। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত জঙ্গি হামলার সম্ভাব্য খবর আগে থেকেই ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর কাছে থাকলেও কেন সেদিন নরেন্দ্র মোদীর সরকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়নি, কেন জওয়ানদের ওই বিপদসঙ্কুল রাস্তা আকাশপথে না গিয়ে স্থলপথেই পেরোতে হয়েছিল, কেন সরকার উড়ানের ব্যবস্থা করেনি, সর্বোপরি ওই কনভয়ের পথে বিস্ফোরক বোঝাই শত্রুর গাড়ি ঢুকে পড়ল কীভাবে – সে প্রশ্ন ২০২৩ সালের মাঝামাঝি তুলেছিলেন জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন রাজ্যপাল সত্যপাল মালিক। তাঁর আরও দাবি, তিনি ঘটনার পর মোদীকে জানিয়েছিলেন যে এর কারণ নিজেদের গাফিলতি। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে মুখ বুজে থাকতে বলেছিলেন। পুলওয়ামার ঘটনার পর পাকিস্তানের বালাকোটে ভারতীয় বায়ুসেনার বিতর্কিত হানা এবং সেই উগ্র যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রপ্রেমের জোয়ারে ভেসে তিনশোর বেশি আসন নিয়ে বিজেপির ক্ষমতায় ফেরার কৌশল আজ বহু আলোচিত।

২০২৪ লোকসভা ভোটের আগে বিজেপির নতুন রাজনৈতিক কৌশল অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ। একটা গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ দেশে প্রকাশ্য দিবালোকে ৫০০ বছরের পুরনো একটি মসজিদ গুঁড়িয়ে দিয়ে এই আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদী অভিযানের সূচনা। তারপর এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়, সুপ্রিম কোর্টের রায় পেরিয়ে সঙ্ঘ পরিবার আগামী ২২ জানুয়ারি ঠিক ওই জায়গাতেই রামলালার মন্দিরের উদ্বোধন করবে। গোটা হিন্দি বলয় এবং তার বাইরেও দেশের বহু এলাকা জুড়ে রামমন্দির উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে উগ্র উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে দেওয়ার একটাই উদ্দেশ্য – অর্থনীতি, সামাজিক নীতি, মানুষের দৈনন্দিন রুটিরুজির লড়াই, মানুষের পেটের খিদে সমস্ত কিছুই ধর্মের আফিমে ভুলিয়ে দেওয়া। মানুষকে জঙ্গি হিন্দুত্বের জিগির তুলে ভোটবাক্সে সংহত করার এটাই একমাত্র পথ। সংখ্যাগরিষ্ঠের মৌলবাদ। সংখ্যালঘুকে শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আক্রমণ নামিয়ে আনা। এটাই একুশ শতকে উগ্র দক্ষিণপন্থী বিজেপির কার্যপদ্ধতি – কর্পোরেট হিন্দুত্ববাদ।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ঠিক কত কোটি টাকা খরচ হচ্ছে রামমন্দির নির্মাণ করতে? ইন্টারনেটে খোঁজ করুন। পরিষ্কার বলা আছে, এটা সরকারি প্রকল্প নয়। রাম জন্মভূমি ট্রাস্ট এই টাকা তুলেছে দেশ বিদেশের ভক্তদের কাছ থেকে। আনুমানিক খরচ ৯০০ কোটি টাকা। কিন্তু সম্প্রতি একাধিক সংস্থা তাদের আভ্যন্তরীণ সমীক্ষায় দেখিয়েছে, অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ এবং সেই মন্দিরকে কেন্দ্র করে ২০৩১ সালের অযোধ্যা মাস্টার প্ল্যান কার্যকর করতে দশ বছরে বিনিয়োগ হবে মোট ৫০,০০০ কোটি টাকা। কারণ অযোধ্যাকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলে বিমানবন্দর থেকে আরম্ভ করে দেশি-বিদেশি ধনী পর্যটকদের বিনোদনের যাবতীয় ব্যবস্থা করতে চায় উত্তরপ্রদেশ সরকার। মন্দিরের জন্য দেওয়া জমির পাশেই যে মসজিদ নির্মাণ করার কথা বলা হয়েছিল, তার কাজ কিন্তু এখনো বিশ বাঁও জলে। কেউ জানে না কবে ওই মসজিদ গড়া হবে বা আদৌ হবে কিনা।

ভারতীয় সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ। মন্দির, মসজিদ, গির্জা তৈরি রাষ্ট্রের কাজ নয়। কিন্তু রামমন্দির তৈরির ক্ষেত্রে সরকার ও রামমন্দির ট্রাস্ট মিলে যে বাজেট তৈরি করেছে তা প্রায় ১৮,০০০ কোটি টাকার। এখনো অব্দি কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার মিলে যে বাজেট তৈরি তা ৩০,৯২৩ কোটি টাকার। এই প্রকল্পগুলো ধাপে ধাপে ২০৪৭ সাল পর্যন্ত চলবে। আদিত্যনাথের সরকার ইতিমধ্যেই ৭০০ কোটি টাকা খরচ করেছে পরিকাঠামো খাতে। মন্দির উদ্বোধনের অনেক আগে থেকেই অযোধ্যার স্টেশন থেকে আরম্ভ করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রাস্তাঘাটের সৌন্দর্যায়নে হাত খুলে মুঠো মুঠো জনগণের টাকা খরচ করেছে উত্তরপ্রদেশ সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার। রামমন্দির নির্মাণের জন্য সুপ্রিম কোর্টের কাছে ১৮,০০০ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছিল রাম জন্মভূমি ট্রাস্ট। এরপরেই আরএসএস সহ গোটা সঙ্ঘ পরিবার মন্দির নির্মাণের জন্য টাকা সংগ্রহ অভিযানে নামে। মোদী সরকার প্রচার করছে রামমন্দির নির্মাণের মাধ্যমেই অর্থনীতির চাকা ঘুরতে শুরু করবে। আসলে বিজেপির কর্পোরেট অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়েই এক নয়া হিন্দুত্ব-কর্পোরেট উন্নয়ন মডেল আনতে চলেছে মোদী সরকার। সেখানে রামচন্দ্রের মত একটি কল্পচরিত্রকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হবে এবং ভোটের ময়দানে তারই প্রচার করা হবে। এটাই নয়া হিন্দুত্বের রাজনীতি।

আরো পড়ুন দুর্গাপুজোয় রামমন্দির: তৃণমূলের কাটা খালে হিন্দুত্ববাদের প্রবেশ

কীরকম সেই অর্থনীতি? একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা বোঝা যাবে। অযোধ্যা জুড়ে তৈরি হচ্ছে ঝাঁ চকচকে আধুনিক চওড়া রাস্তা। সেই মাস্টারপ্ল্যান কার্যকর করা জন্য ইতিমধ্যেই উচ্ছেদ করা হয়েছে শয়ে শয়ে হকার ও ছোট দোকানদারদের। মাত্র এক লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে তাদের। অথচ প্রস্তাবিত হাইটেক অযোধ্যা নগরীতে নতুন করে দোকান করতে গেলে প্রশাসনকে ২৫ লক্ষ টাকা দিয়ে লিজ নিতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই গরিব ছোট দোকানিরা আর ওই পুণ্যভূমিতে ব্যবসাবাণিজ্য করতে পারবে না। পুরো অর্থনীতি চলে যাবে বড় কর্পোরেটের হাতে। যদি পথের ধারে ওই পুরনো দোকানিরা অস্থায়ী পসরা সাজিয়ে বসেও, পুলিশ প্রশাসন যে কোনো মুহূর্তে তাদের দোকান ভেঙে দেবে, দোকানিদের গ্রেফতারও করতে পারে। রাস্তাগুলোর নতুন নাম ‘রামপথ’, ‘ভক্তিপথ’ ইত্যাদি। কিন্তু এই গোটা রামযজ্ঞে কোথাও গরিব মানুষের জন্য কোনো স্থান নেই। তারা অচ্ছুৎ।

লোকসভা ভোটের আগে মোদী সরকারের বিকাশের প্রকৃত ছবি ফুটে উঠেছে রিসার্চ ট্রায়াঙ্গল ইনস্টিটিউটের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায়। গত পাঁচ বছরে দেশের ৭০% পরিবারের আয় নিম্নমুখী, ৫৬% পরিবার প্রতিনিয়ত কাজ হারানোর আশঙ্কায় ভুগছে। চূড়ান্ত আর্থিক অনিশ্চয়তা তাদের নিত্যসঙ্গী। দেশের ৬৫% মানুষই আর্থিকভাবে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে প্রতিদিন। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন ১২ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে রিজিওনাল ওভারভিউ অফ ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ২০২৩ নামে যে রিপোর্ট পেশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ২০২১ সালে ভারতের ৭৪% মানুষ নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার পেত না। এই পরিস্থিতি কিন্তু প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা আর বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ। ঘটনাচক্রে, এই রিপোর্ট প্রকাশের ৭২ ঘন্টার মধ্যেই মধ্যপ্রদেশের নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার প্রকাশ্যে মাছ, মাংস, ডিম বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের দৈহিক পুষ্টির জন্য যে প্রাণিজ প্রোটিন দরকার, তা সঙ্ঘ পরিবারের এক দেশ, এক ধর্ম, এক নেতা, এক খাদ্যাভ্যাস নীতির কারণে ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে।

আপনার আমার পেটের খিদের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠছে নতুন হিন্দু ভারতবর্ষ, যেখানে রামচন্দ্রের নাম নিয়েই পিটিয়ে মারা যাবে সংখ্যালঘুদের, সাসপেন্ড করা যাবে বিরোধী সাংসদদের, জেলে ঢোকানো যাবে বেয়াড়া অবাধ্য সাংবাদিক, অধ্যাপক, ছাত্রদের।

এই নতুন রামরাজ্যে আপনাকে স্বাগত।

নিবন্ধকার শেঠ আনন্দরাম জয়পুরিয়া কলেজের শিক্ষক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.