শিবপ্রসাদ মিত্র
নির্বাচনের মুখে বিজেপি সরকার নিয়মাবলী জারি করে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) চালু করে দিল। উদ্দেশ্য যে ভোট, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোট, তাতে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই। বিজেপি নেতারা উল্লসিত। তাঁরা সদম্ভে ঘোষণা করছেন, বহুদিনের বঞ্চনার অবসান হল। উদ্বাস্তুরা অবশেষে নাগরিক অধিকার পাবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। সিএএ চালু করা হলে উদ্বাস্তুরা বাস্তবে কী পাবেন বা আদৌ তাঁরা কিছু পাবেন কিনা, তা নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব। আমরা আলোচনা করে দেখাব, এই আইন চালু হলেও এদেশে যাঁরা গত ৩০-৪০-৫০ বছর ধরে বাস করছেন সেই সব উদ্বাস্তুদের কোনো লাভ হবে না, বরং তাঁরা আরও গভীর সংকটে পড়ে যেতে পারেন। কিন্তু সেই আলোচনায় প্রবেশের আগে, সামগ্রিকভাবে আমরা দেখে নেব জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) চালু করার যে কথা বিজেপি সরকার আবার তুলছে তার আসল চরিত্র কী এবং কীভাবে তারা দেশের একটা ব্যাপক অংশের মানুষের নাগরিক অধিকার হরণের চক্রান্ত করছে।
প্রথমেই বলে নিতে চাই, আমাদের সংগঠন এনআরসি-সিএএ বিরোধী নাগরিক কমিটি প্রথম থেকেই এনআরসি-সিএএর প্রবল বিরোধিতা করে আসছে। সিএএ নিয়মাবলী জারির পর গত ১২ মার্চ সংগঠনের সম্পাদক শ্রী গোপাল বিশ্বাস এক বিবৃতিতে বলেছেন ‘জনগণকে বিভক্ত করার উদ্দেশ্যে বিজেপি সমগ্র দেশে এনআরসি চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের রুলও জারি হয়েছে একই জঘন্য পরিকল্পনার অঙ্গ হিসাবে। এই অবস্থায় সমগ্র দেশে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে এই দুটি পদক্ষেপই প্রতিরোধ করা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। আমরা তাই দেশের জনগণের কাছে আবেদন জানাচ্ছি কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের এই ঘৃণ্য নীতিকে সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করার জন্য।’
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এনআরসির যথার্থ চরিত্র কী?
এই সিএএ সামগ্রিকভাবে এনআরসির অংশ মাত্র। তাই সিএএর যথার্থ চরিত্র বুঝতে গেলে তাকে এনআরসির সাপেক্ষেই বুঝতে হবে। সেই চেষ্টাই আমরা করব।
এনআরসি যে কত ভয়ঙ্কর তা আসামের অভিজ্ঞতাই আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে। উনিশ লক্ষেরও বেশি ভারতীয় নাগরিক সেখানে এনআরসি তালিকা থেকে বাদ গিয়েছেন। মূলত বাদ গিয়েছেন ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের গরিব মানুষ। এছাড়াও বাদ গিয়েছেন আসামের জনজাতি, উপজাতিরা – বোড়ো, রাজবংশী, হাজং সহ গোর্খারা। এমনকি সমাজের নানা স্তরের বিশিষ্ট মানুষও রেহাই পাননি। এই প্রক্রিয়া যখন চালু করা হয়েছিল তখন অনেকে আতঙ্কে, হতাশায় উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন। মনোরোগীর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল ভীষণভাবে, অনেকেই আতঙ্কে আত্মহত্যা পর্যন্ত করেছিলেন। তালিকা প্রকাশের পর এইসব ঘটনা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সব মিলিয়ে আসামে ইতিমধ্যেই ৭২ জন নাগরিক আত্মহত্যা করেছেন।
অসহায় এই মানুষগুলো ভেবেই পাচ্ছেন না কেন এবং কী অপরাধে তাঁদের জীবনে এই চরম সর্বনাশ নেমে এল। এনআরসিতে নাম তোলার জন্য এঁরা সর্বস্ব বিক্রি করে শত শত কিলোমিটার দূরে দিনের পর দিন উপস্থিত থেকেছেন, নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে ঘোষিত শংসাপত্র পেশ করেছেন, কিন্তু কিছু লাভ হয়নি। একদিকে তাঁরা নিঃস্ব হয়েছেন, অন্যদিকে পরিণত হয়েছেন রাষ্ট্রহীন জনসমাজে।
মূলত বাদ গিয়েছেন ভাষিক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের গরিব মানুষ। এছাড়াও বাদ গিয়েছেন আসামের জনজাতি, উপজাতিরা – বোড়ো, রাজবংশী, হাজং সহ গোর্খারা। এমনকি সমাজের নানা স্তরের বিশিষ্ট মানুষও রেহাই পাননি।
এমন বহু পরিবার আছে যেখানে মায়ের নাম উঠেছে, সন্তানের নাম ওঠেনি। স্বামীর নাম উঠেছে, স্ত্রীর নাম ওঠেনি। এঁদের পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে অনেককেই ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশাল জেলখানার মত ডিটেনশন ক্যাম্প ইতিমধ্যেই আসামে চালু আছে এবং আরও নখানা তৈরি হচ্ছে। এই ডিটেনশন ক্যাম্পগুলো বাস্তবে হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের মতোই জঘন্য। ইতিমধ্যেই অসংখ্য মানুষ এইসব ক্যাম্পগুলোতে হয় মারা গেছেন, না হয় এই দুঃসহ জীবন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন। এইসব ক্যাম্পগুলোতে শৌচাগারের প্রায় কোনো ব্যবস্থাই নেই। চিকিৎসার বন্দোবস্ত নেই। অভিযোগ, পরিবার পরিজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন নারীদের উপর চলছে অবাধে যৌন নিপীড়ন। কোনো সভ্য দেশে ডিটেনশন ক্যাম্পের নামে এই ধরনের পাশবিক ব্যবস্থা চলতে পারে? পশ্চিমবঙ্গেও এনআরসি চালু হওয়ার আতঙ্কে ইতিমধ্যেই অনেকে আত্মহত্যার বেদনাদায়ক পথ গ্রহণ করেছেন। আরও কত মানুষ যে ভবিষ্যতে এই পথ গ্রহণ করবেন তা কে বলতে পারে? তাই এ রাজ্যেও দাবি উঠছে, এনআরসি করা চলবে না।
আরো পড়ুন সিএএ: উদ্বাস্তু ঐক্য ফের তৈরি না হলে আরও দেবাশিসকে হারাব
অনেক বছর ধরে ১,৬০০ কোটি টাকা খরচ করে ৫০,০০০ সরকারি কর্মচারি নিয়োগ করে এই যে অমানবিক এনআরসি প্রক্রিয়া আসামে সম্পন্ন হল, সেই এনআরসি এখন বিজেপি নেতারাই মানতে চাইছে না। তারা বলছে এই এনআরসি বাতিল করো, নতুন করে এনআরসি করো। কারণ আসামের এনআরসির ফল বিজেপির পরিকল্পনার সঙ্গে মেলেনি। ওরা প্রচার করেছিল, আসামে কমপক্ষে ৫০-৬০ লক্ষ মুসলমান অনুপ্রবেশকারী আছে। কিন্তু তালিকা প্রকাশের পর দেখা গেল এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়া মুসলমানের সংখ্যা ২,৮০,০০০। আর যাদের নাম বাদ গিয়েছে তারা হয় বাঙালি হিন্দু, না হয় আসামের বিভিন্ন জনজাতি, আদিবাসী। এই তালিকা বিজেপিকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। হিন্দু জনগণের কাছে বিজেপির বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। তাই নিজেদের মুখ ও ভোটব্যাঙ্ক রক্ষার তাগিদে ওরা এই দাবি তুলছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। জনগণের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ঘটানো, হিন্দু-মুসলমান বিদ্বেষ সৃষ্টি করাই ওদের রাজনীতির মর্মবস্তু। এর মধ্যেই আছে ওদের ক্ষমতায় টিকে থাকার রসদ। সে যা-ই হোক, বিজেপি তার দুষ্ট রাজনীতি চালিয়ে যাবে এ আমরা জানি। কিন্তু আসুন আমরা ঠান্ডা মাথায় বিচার করে দেখি, দেশব্যাপী যে এনআরসি চালু করার জন্য বিজেপি উঠে পড়ে লেগেছে – সেই এনআরসির সত্যকার চরিত্র কী, কী উদ্দেশ্যেই বা তা করা হচ্ছে।
এনআরসি শুধু অপ্রয়োজনীয় নয়, তা জনগণের নাগরিকত্বের অধিকার হরণের সুগভীর চক্রান্ত
এনআরসি পরিকল্পনার পিছনে যুক্তি দিতে গিয়ে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, দেশকে অনুপ্রবেশকারীদের হাত থেকে মুক্ত করাই এর উদ্দেশ্য। এমন কথাও তিনি বলেছেন যে ২০২৪ সালের পর দেশে আর কোনো অনুপ্রবেশকারী থাকবে না। কোনো কোনো বিজেপি নেতা গুণে গেঁথে সংখ্যাটাও বলে দিয়েছেন – দু কোটি এবং তারা ধর্মে মুসলমান। কোথা থেকে এই সংখ্যার জন্ম হল, এই সংখ্যা তাঁরা কোথায় পেলেন তার কোনো উল্লেখই করা হচ্ছে না। সে যা-ই হোক, দেশের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী থাকুক – একথা কেউই বলবেন না। সবাই বলবেন, অনুপ্রবেশকারী যদি থেকে থাকে তবে তাদের চিহ্নিত করা হোক, প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার করা হোক এবং সেই অনুপ্রবেশকারী যে দেশের নাগরিক সেই দেশের হাতে তাকে তুলে দেওয়া হোক। এটাই তো স্বাভাবিক পদ্ধতি। কেন্দ্রীয় সরকার এই স্বাভাবিক পদ্ধতি অনুসরণ করছে না কেন?
ক্যাম্পগুলোতে শৌচাগারের প্রায় কোনো ব্যবস্থাই নেই। চিকিৎসার বন্দোবস্ত নেই। অভিযোগ, পরিবার পরিজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন নারীদের উপর চলছে অবাধে যৌন নিপীড়ন।
কেন অনুসরণ করছে না তা জানা গেল কেন্দ্রীয় সরকারের এক কর্তাব্যক্তির ভাষ্যে। গত ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯ বাংলাদেশের বিদেশমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন জানিয়েছেন, ‘ভারতে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের তালিকা চেয়েছেন তাঁরা। ভারত সরকারের থেকে এই তালিকা পেলে তাঁরা ফিরিয়ে নেবেন নিজের দেশের নাগরিকদের।’ (এই সময়, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯) কিন্তু সেই তালিকা কোথায়? তালিকা হাতে থাকা দূরের কথা, তালিকা প্রস্তুত করার কাজেই হাত দেয়নি ভারত সরকার। বাংলাদেশ সরকারের এই অবস্থানের ফলে যথেষ্ট বিপাকে পড়া এক পদস্থ কেন্দ্রীয় আমলা ব্যাখ্যা করেন সরকারের জটিল অবস্থান। বলেন, ‘মুখে বলা আর কাগজে কলমে বাস্তবায়িত করা, দুটোর মধ্যে ফারাক অনেক। কেন্দ্রীয় সরকার যদি তালিকা তৈরির কাজে হাত দেয়, তাহলে তালিকা তৈরির পরে সেই তালিকায় থাকা প্রত্যেক ব্যক্তি যে বাংলাদেশি নাগরিক তা প্রমাণ করার দায়িত্বও বর্তায় সরকারের কাঁধেই। দীর্ঘ আইনি লড়াই পেরিয়ে করতে হবে এই কাজ। এর মধ্যে দেশের আদালতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আদালতে মামলার সম্ভাবনাও থাকছে। কাজটা খুবই কঠিন।’ (এই সময়, ১৭-১২-২০১৯)
তাহলে কী দেখা গেল? কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের হাতে বিদেশি অনুপ্রবেশকারীদের তালিকা নেই এবং এই তালিকা তৈরির কোনো চেষ্টাই তারা করেনি, করছে না। তাহলে কীসের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বিতাড়নের হুঙ্কার ছাড়ছেন? কিসের ভিত্তিতে তাঁরা বলছেন দু কোটি মুসলমান অনুপ্রবেশকারী আছে ভারতে? কেন এই মিথ্যাচার? আর একটা কথার জবাবও তো তাঁদের দিতে হবে। দেশের মধ্যে যদি অনুপ্রবেশকারী থেকেও থাকে, তারা ঢুকতে পারল কী করে? দেশে যাতে কোনো অনুপ্রবেশকারী না ঢুকতে পারে তা দেখার দায়িত্ব কার? এর সহজ উত্তর – কেন্দ্রীয় সরকারের। কেন্দ্রীয় সরকারের হাতেই তো সীমান্তরক্ষী বাহিনী, গোয়েন্দা বিভাগ। তাদেরই তো এ কাজ করার কথা। এর জন্যেই তো জনসাধারণের বিপুল পরিমাণ করের টাকা খরচ হয়। ফলে দেশে যদি কোনো অনুপ্রবেশকারী থেকে থাকে – তবে দায় কার? দায় পূর্বতন কংগ্রেস সরকারের, দায় বর্তমান বিজেপি সরকারের। নিজেদের এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে বিজেপি সরকার তার সমস্ত অপকর্মের বোঝা সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাইছে। তাদের বলছে, তোমরা যে নাগরিক তা তোমাদেরই প্রমাণ করতে হবে। যদি পারো, তবে নাগরিক হিসাবে থাকতে পারবে, আর যদি না পারো, তোমার সমস্ত নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে।
‘মুখে বলা আর কাগজে কলমে বাস্তবায়িত করা, দুটোর মধ্যে ফারাক অনেক। কেন্দ্রীয় সরকার যদি তালিকা তৈরির কাজে হাত দেয়, তাহলে তালিকা তৈরির পরে সেই তালিকায় থাকা প্রত্যেক ব্যক্তি যে বাংলাদেশি নাগরিক তা প্রমাণ করার দায়িত্বও বর্তায় সরকারের কাঁধেই। দীর্ঘ আইনি লড়াই পেরিয়ে করতে হবে এই কাজ। এর মধ্যে দেশের আদালতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আদালতে মামলার সম্ভাবনাও থাকছে। কাজটা খুবই কঠিন।’
কিন্তু কেন? কেন দেশের নাগরিকদেরই প্রমাণ করতে হবে যে তাঁরা দেশের নাগরিক? পৃথিবীর কোনো দেশের সরকার কি তার দেশের সমস্ত নাগরিকের কাছে তাদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দাবি করেছে? তাহলে এদেশেই বা দাবি করা হবে কেন? কেন দেশের সমস্ত নাগরিককে সন্দেহের চোখে দেখা হবে? আমাদের এই প্রশ্নের উত্তরে বিজেপির বিজ্ঞজনেরা বলছেন – কেন, দেশে কত নাগরিক আছে তা জানবার অধিকার কি সরকারের নেই? আমরা বলি, আছে, নিশ্চয়ই আছে। তা জানবার সবচেয়ে সহজ উপায় কী? দেশে এই মুহূর্তে যত মানুষ বাস করে তার থেকে যদি বিদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বাদ দেওয়া যায় তাহলেই তো নাগরিকদের যথার্থ তালিকা সরকারের হাতে এসে যায়। আলাদা করে এনআরসি করার দরকার হয় না। আর দেশে কত মানুষ বাস করে, তাদের ধর্ম কী, তারা স্ত্রী না পুরুষ, তাদের পেশা কী, বয়স কত, সবই তো সরকারের জানা। দশবছর অন্তর জনগণনার মাধ্যমেই তো সরকার দেশের নাগরিকদের সম্পর্কে এইসব তথ্য সংগ্রহ করে। এছাড়াও ভারত সরকার ইতিমধ্যেই ১২৩ কোটি আধার কার্ড বণ্টন করেছে। এর মাধ্যমে সরকার দেশের ১২৩ কোটি নাগরিকদের বায়োমেট্রিক তথ্যও জোগাড় করেছে। তাই শুধু নাগরিকদের সংখ্যা নয়, তাদের সম্পর্কে সমস্ত তথ্যও সরকারের হাতে আছে। ফলে সরকারই বলুক অনাগরিক কারা, অনুপ্রবেশকারী কারা। কিন্তু মোদী-শাহ জুটি এই দায়িত্ব গ্রহণ করবে না। তাঁরা বলছেন, দেশের ১৪০ কোটি নাগরিককেই এক এক করে কাগজপত্র সহযোগে প্রমাণ করতে হবে তারা এদেশের নাগরিক। এই গা জোয়ারি বক্তব্য মানা যায়?
আরেকটা কথাও বলা দরকার। এতকাল যাঁরা ভোট দিয়ে দেশের সরকার গঠন করেছেন, তাঁরা দেশের নাগরিক নন? দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, না। ভোটারদের নাগরিক হিসাবে গণ্য করা যাবে না। তাঁর মতে, ‘পকেটে ভোটার কার্ড বা আধার যা-ই থাকুক তা প্রমাণ করবে না আপনি আমি এ দেশের নাগরিক।’ (আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৯)। কিন্তু শাহর এই বক্তব্য তো দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থী। কারণ, জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৬ নং ধারায় পরিষ্কার বলা হয়েছে ‘A person shall be disqualified for registration in an electoral roll if he is not a citizen of India.’ অর্থাৎ একজন ব্যক্তি যদি ভারতের নাগরিক না হন তাহলে তাঁর নাম ভোটার তালিকায় উঠবে না। এর অর্থ কী? এর অর্থ হল, ভোটার লিস্টে নাম তখনই থাকতে পারে যখন একজন ব্যক্তিকে ভারতীয় নাগরিক বলে গণ্য করা হবে। তাই ভোটার কার্ড নিঃসন্দেহে একজন ব্যক্তির নাগরিকত্বের প্রমাণ। দেশের প্রচলিত আইন তাই বলছে। শাহ একে গায়ের জোরে অস্বীকার করতে পারেন না।
এখন তর্কের খাতিরে যদি শাহর বক্তব্যকে সঠিক বলে ধরা হয়, তাহলে অবস্থা কী দাঁড়াবে? যাঁরা ভোটার তাঁরা নাগরিক নন, এই যদি মনে করা হয়, তাহলে তো বলতে হবে অনাগরিকদের ভোটে সরকার তৈরি হয়েছে। দেশের সব সরকারই অনাগরিকদের দ্বারা নির্বাচিত সরকার। এমনকি প্রধানমন্ত্রী মোদী বা শাহও সাংসদ হয়েছেন অনাগরিকদের ভোটে। তাহলে অনাগরিকদের দ্বারা নির্বাচিত একটা সরকার দেশের নাগরিকত্ব নির্ধারণের আইন তৈরি করছে কীভাবে? তাদের কি সেই অধিকার আছে? নিজেদের যুক্তির এই ছেলেমানুষি দিকটাও কি মোদী-শাহ দেখতে পান না? আসলে মুসলমানবিদ্বেষী মন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে স্বৈরাচারী মদমত্ততায় গোটা বিষয়টাকে দেখতে গিয়ে মোদী-শাহ জুটি সাধারণ বিচারবুদ্ধিও হারিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু এসব যুক্তি মোদী-শাহদের কানে ঢুকলেও হৃদয়ে প্রবেশ করবে না। ওঁরা এনআরসি করবেনই, আর আমাদেরও প্রমাণ দাখিল করতে হবে যে আমরা এদেশের নাগরিক।
কিন্তু কেন? এদেশের শ্রমিক কলে কারখানায় কাজ করেছেন। কৃষক, ক্ষেতমজুর মাঠে ফসল ফলিয়েছেন, দেশের সম্পদ উৎপাদন করেছেন। শিক্ষক শিক্ষাদান করেছেন, চিকিৎসক অসুস্থকে সুস্থ করার মহান ব্রত পালন করেছেন। এককথায় এদেশের সমস্ত নাগরিকই সম্মিলিতভাবে ক্ষমতা অনুযায়ী সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করেছেন, নাগরিকের কর্তব্য সম্পাদন করেছেন। তাঁদের এবার চূড়ান্ত পক্ষপাতদুষ্ট এনআরসি কর্তৃপক্ষের কাছে প্রমাণপত্র নিয়ে হাজির হতে হবে। কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হলে তাঁরা নাগরিকত্ব পাবেন, না হলে পাবেন না। কিন্তু যেসব কাগজপত্র দরকার তা কজনের আছে? চোখ বুজে বলে দেওয়া যায় – অধিকাংশ গরিব মানুষেরই নেই। যাঁরা জনজাতি-আদিবাসী, যাঁরা ভূমিহীন ক্ষেতমজুর, যাঁরা নিরক্ষর, যাঁরা পেটের দায়ে প্রবাসী শ্রমিক হিসাবে এখানে ওখানে কাজ করতে বাধ্য হন, তাঁরা এসব কাগজপত্র পাবেন কোথায়? তাঁদের পক্ষে তো এসব শংসাপত্র জোগাড় করা সম্ভব নয়। তাঁদের অবস্থা কী হবে? শত শত বছর ধরে তাঁদের পূর্বপুরুষ এদেশে বাস করলেও কাগজপত্র না থাকার ফলে তাঁরা পরিণত হবেন রাষ্ট্রহীন নাগরিকে। এই জুলুম সহ্য করা যায়? তাই আমরা মনে করি, কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের এই এনআরসি পরিকল্পনা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ও জনস্বার্থবিরোধী। এটা জনগণের বিরুদ্ধে এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র। একে অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
এখন দেশের জনগণের এই অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত দাবিকে অগ্রাহ্য করে যদি কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সারা দেশে এনআরসি চালু করে, তাহলে বিষয়টা কী দাঁড়াবে তা একবার বিচার করে দেখা যাক। আর এটা বিচার করতে গেলে দেশের নাগরিকত্ব আইন সম্পর্কে খানিকটা ধারণা থাকা দরকার। সেদিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক।
ভারতের নাগরিকত্ব
১৮৫৮ সালের ভারত সরকার আইনের মধ্য দিয়ে ভারতে ব্রিটিশ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ব্রিটিশ ভারতে যাঁরা বাস করতেন তাঁরা ব্রিটিশ প্রজায় পরিণত হন। তারপর ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ‘ইন্ডিয়া ইন্ডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট, ১৯৪৭’ চালু হওয়া পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনাধীনে দুই ধরনের ভারতীয় প্রজা ছিল – সরাসরি ব্রিটিশ প্রজা এবং করদ রাজ্যগুলিতে ব্রিটিশ রক্ষণাধীন প্রজা।
স্বাধীনতার পর ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের সংবিধান গৃহীত হল, ভারত পরিণত হল প্রজাতন্ত্রে। গৃহীত সংবিধানে বলা হল, তাঁরাই ভারতের নাগরিক যাঁরা ভারতে বাস করেন এবং ক) যাঁদের জন্ম ভারতে, খ) যাঁদের পিতা-মাতার একজনের জন্ম ভারতে। (ধারা ৫)
পাকিস্তান থেকে যাঁরা ভারতে এসেছেন তাঁদের সম্পর্কে সংবিধানের ৬ নং ধারায় বলা হল, যাঁদের পিতা-মাতা বা ঠাকুরদা-ঠাকুরমার জন্ম অবিভক্ত ভারতে, তাঁরা যদি কেউ ক) ১৯৪৮ সালের ১৯ জুলাইয়ের আগে ভারতে আসেন তবে তাঁরা ভারতের নাগরিক হবেন, খ) ১৯৪৮ সালের ১৯ জুলাইয়ের পর যদি কেউ ভারতে আসেন তবে তাঁকে ভারত সরকার নির্ধারিত অফিসারের কাছে নাগরিকতার জন্য আবেদন করে নাম রেজিস্ট্রি করতে হবে। ভারত সরকার এই প্রসঙ্গে নিয়মনীতি নির্ধারণ করে দেবে।
সংবিধানে এইভাবে নাগরিকত্ব সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর ১৯৫৫ সালে ভারতের নাগরিকত্ব আইন সংসদে পেশ ও পাশ হয়েছিল। ১৯৫৫ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোবিন্দবল্লভ পন্থ নাগরিকত্ব বিল লোকসভায় পেশ করার সময়ে বলেছিলেন ‘ভারতে যাঁর জন্ম সেই ভারতের নাগরিকত্ব পাবে। … এটাই যুগের দাবি। সভ্য জগতে আমরা এই মানসিকতা ও পরিবেশই উপহার দিতে চাই। অর্থাৎ ১৯৫৫ সালের ভারতের নাগরিকত্ব আইনে বলা হয়েছিল এ দেশে জন্মালেই এ দেশের নাগরিক হওয়া যাবে। কিন্তু তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে। নাগরিকত্বের অধিকারকে মারাত্মকভাবে সঙ্কুচিত করার জন্য বারবার তাকে সংশোধন করা হয়েছে এবং এই কাজটা বিশেষভাবে করেছে কংগ্রেস। ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর তৎকালীন কংগ্রেস সরকার এই মর্মে আইন পাশ করিয়েছিল এবং তারপর ২০০৩ সালে বিজেপি সরকার এই অধিকারকে আরও সংকুচিত করে। ফলে ১৯৫৫ সালে জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি কংগ্রেস ও বিজেপির যৌথ প্রচেষ্টায় মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। শেষপর্যন্ত জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিকত্বের বিষয়টি যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে তা এইরকম
ক) ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি বা তার পরে এবং ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের আগে যাঁদের ভারতে জন্ম তাঁরা ভারতের নাগরিক।
খ) ১৯৮৭ সালের ১ জুলাই বা তার পরে এবং ২০০৪ সালের ৩ ডিসেম্বরের আগে যাঁদের জন্ম ভারতে তাঁরা জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিকত্ব পাবেন না, পেতে হলে তাঁদের পিতা-মাতার যে কোনও একজনকে সন্তানের জন্মের সময় ভারতের নাগরিক হতেই হবে।
গ) ২০০৪ সালের ৩ ডিসেম্বর বা তারপর যাঁদের ভারতে জন্ম তাঁদের পিতা-মাতা দুজনকেই সন্তানের জন্মের সময়ে ভারতীয় নাগরিক হতে হবে অথবা সন্তানের জন্মের সময় একজন যদি ভারতীয় নাগরিক হন তা হলে অন্যজনের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হওয়া চলবে না।
তা হলে বিষয়টা কী দাঁড়াল? জন্মসূত্রে ভারতীয় নাগরিক হিসাবে দাবি করতে গেলে পিতা-মাতার বা কমবয়সীদের ক্ষেত্রে ঠাকুরদা-ঠাকুমার নাগরিকত্বের প্রমাণ অত্যন্ত জরুরি। না হলে ভারতীয় নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী কেউ নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসাবে দাবি করতে পারবেন না। আইনের চোখে এঁরা সবাই অনাগরিক। এই অর্থে এদেশে অনাগরিকের সংখ্যা বিরাট। এই অবস্থায় সিএএ চালু করে দেওয়া হল।
এর ফলে কী পরিস্থিতি হবে তা আমরা পরবর্তী পর্বে আলোচনা করব।
নিবন্ধকার এনআরসি-সিএএ বিরোধী নাগরিক কমিটির সদস্য। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








