মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে বিশ্বের কোন দেশের মানুষ কতটা সুখী সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ১৪৩টি দেশের মধ্যে ভারতের ১২৬তম স্থানে থাকা নিয়ে অনেক হইচই হয়েছিল। তার ঠিক আগের সপ্তাহেই প্রকাশিত হয় সম্মিলিত রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশ্ব মানবোন্নয়ন সূচকের সাম্প্রতিকতম নিরীক্ষা, যাতে পূর্বতন নিরীক্ষার তুলনায় ভারতের সূচক এক দাগ উঠেছে। উভয় সূচকেরই বিচার্য বিষয়গুলির মধ্যে আছে দেশের মাথাপিছু গড় আয়। ২০১০ সাল থেকে মানবোন্নয়ন সূচকের দুটি করে রূপ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপুঞ্জ – একটি আর্থিক বৈষম্যকে হিসাবের মধ্যে ধরে, অন্যটি ধরে না। আর্থিক বৈষম্যকে হিসাবে ধরলে মানবোন্নয়ন সূচক সব দেশেই নেমে যায়, কিন্তু অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এই দুই মানের তারতম্য হয় অনেক বেশি। ভারতের ক্ষেত্রে এই ফারাকটা ৩১%।
মার্চ মাসেই প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে প্যারিসের ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব নামক গবেষণা সংস্থার কয়েকজন গবেষক দেখিয়েছেন যে ভারতের ধনীতম ১% ব্যক্তির হাতে কুক্ষিগত রয়েছে দেশের মোট সম্পদের ৪০%। ওই গবেষণাপত্রে তাঁরা আরও দেখিয়েছেন যে দেশের মোট আয়ের ২২.৬% যাচ্ছে ধনীতম এক শতাংশের কাছেই আর ধনীতম ব্যক্তিদের আয়ের অনুপাতের হিসাবে পৃথিবীর সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দেশগুলির মধ্যে অন্যতম ভারত। প্রশ্নটা অবশ্যই – এগিয়ে? না পিছিয়ে?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ভারতের সামগ্রিক আয়ে ধনীতম এক শতাংশের আয়ের অনুপাত ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ইউরোপের সব দেশের তুলনায় বেশি। বস্তুত পেরু, ইয়েমেন ইত্যাদি কয়েকটি ছোট ছোট দেশ বাদে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় ধনীতম এক শতাংশের হাতে কুক্ষিগত সম্পদের অনুপাত ভারতে বেশি।
বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ৬.৫ শতাংশের বেশি এবং মোট জাতীয় উৎপাদনের নিরিখে আমরা পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি। ১৯৯১ সালে সদ্যমুক্ত অর্থনীতির ভারতে আমেরিকান ডলারে একশো কোটির বেশি আয়সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন মাত্র একজন। ২০০৫ সালের ভারতে এমন ‘বিলিয়নেয়ার’ ছিলেন পাঁচজন, ২০১২ সালে ৪৬ জন। ২০২২ সালে সেই সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬২, ২০২৪ সালে ২৭১ জন। এই বিলিয়নেয়ারদের হাতে থাকা সম্পদের পরিমাণ ২০০২ সালে ছিল জাতীয় সম্পদের ৩.২%, ২০১২ সালে ১২%, এবং ২০২২ সালে ২৪.৬%। এখানে ছোট্ট করে ঝালিয়ে নিতেই হয়, কে ছিলেন ১৯৯১ সালের ভারতে সেই সবেধন নীলমণি একশো কোটি ডলারের বেশি আয়ের লোক? নাম শুনলেই লোকটিকে মনে পড়বে – হর্ষদ মেহতা।
ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাবের অন্যতম অধিকর্তা এবং উল্লিখিত গবেষণাপত্রের অন্যতম লেখক থমাস পিকেটি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ক্যাপিটাল ইন টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি-তে দেখিয়েছেন, কীভাবে একুশ শতকের পৃথিবীতে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ আর্থিক বৈষম্যকে তীব্র করে তুলবে। এর কারণ পুঁজির পরিমাণ যত বাড়ে, তা থেকে লাভের পরিমাণ বাড়ে তার গুণিতক হারে। শ্রমদানের মাধ্যমে শ্রমিক যে আয় করেন সেই আয়ের পরিমাণে কিন্তু তেমন তারতম্য হয় না। সে তুলনায় পুঁজি থেকে প্রাপ্ত লাভের পরিমাণে তারতম্য অনেক বেশি। এই কারণে অর্থনীতিতে শ্রমের তুলনায় পুঁজির অনুপাত বাড়লে আর্থিক বৈষম্যও বাড়বে।
দ্বিমেরু বিশ্বের অবসান হওয়ার পর থেকে পৃথিবীর অনেকগুলি দেশেই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য। অর্থনৈতিক বৈষম্য বলতে মূলত বোঝায় আয়ের বৈষম্য এবং সম্পদের মালিকানায় বৈষম্য। ব্যয় বৈষম্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই পরিসংখ্যান পাওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন হতে পারে। বৈষম্যের সূচকও একাধিক। সবচেয়ে সহজবোধ্য যে সূচক, তা হল দেশের মোট আয়ের বা সম্পদের কত শতাংশ রয়েছে জনসংখ্যার ধনীতম অংশের কাছে, আর কত শতাংশ দরিদ্রতম অংশের কাছে। যেমন পালমা অনুপাত থেকে বোঝা যায় জনসংখ্যার ধনীতম দশ শতাংশের আয় দরিদ্রতম ৪০ শতাংশের আয়ের কতগুণ। এছাড়া আছে গিনি সূচক, যার মান থাকে শূন্য থেকে একের মধ্যে। সূচকের মান যত বেশি, বৈষম্যও তত বেশি। সোভিয়েত আমলে রাশিয়ার আর্থিক বৈষম্য ন্যূনতম ছিল তো বটেই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পৃথিবীর নানা দেশেই আর্থিক বৈষম্যের পরিমাণ কমে আসছিল। কিন্তু সোভিয়েতের পতনের পর শুধু যে রাশিয়ায় আর্থিক বৈষম্য নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায় তা নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইউরোপ – সর্বত্রই বৈষম্য বাড়তে থাকে। ভারতেও ১৯৮০-র দশক থেকেই বৈষম্য ছিল ঊর্ধ্বমুখী। বিশ্বায়নের পর তা নিরবচ্ছিন্নভাবে বাড়তে থাকে। ২০০৭-২০০৯ ভারতে বৈষম্যের হার রাশিয়া, চীন এবং আমেরিকার বৈষম্যকে ছাপিয়ে যায়।

পূর্বোল্লিখিত গবেষণাপত্রটিতে ভারতের জাতীয় আয়, আয়কর, ব্যয় সমীক্ষা, মূল্য সূচক এবং আরও কয়েকটি সমীক্ষালব্ধ পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে আয় বন্টনের ছবিটি বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখিয়েছেন, সাম্প্রতিক ভারতে আয়ের বৈষম্য ব্রিটিশ আমলের বৈষম্যকেও অতিক্রম করে গিয়েছে। এই মুহূর্তে দেশের মোট আয়ে ও সম্পদে জনসংখ্যার ধনীতম অংশের অংশীদারিত্ব শুধু যে ভারতে গত দুই শতকের মধ্যে সর্বোচ্চ তা নয়, সারা পৃথিবীর মধ্যেই অন্যতম সর্বোচ্চ।
ভারত স্বাধীন হবার পরে জাতীয় আয়ে সর্বোচ্চ এক শতাংশের আয়ের অনুপাত কিন্তু উল্লেখযোগ্যভাবে কমছিল। একইসঙ্গে বাড়ছিল দরিদ্রতম ৫০ শতাংশের আয়ের অনুপাত। স্বাধীনতা ও বিশ্বায়নের মধ্যবর্তী প্রায় চার দশক সময় ধরে কেন কমেছিল আয় বৈষম্য? সংক্ষেপে বলতে গেলে তার অন্যতম কারণ ছিল দেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবাগুলির জাতীয়করণ, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং আয়ের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান আয়করের হার।
এই প্রবণতা উল্টে যায় আটের দশকের গোড়ার দিকে। ২০০২ সাল নাগাদ জাতীয় আয়ে দেশের ধনীতম এক শতাংশ এবং দরিদ্রতম ৫০ শতাংশের অংশীদারি হয়ে যায় সমান। তারপর থেকে ওই মুষ্টিমেয় ধনী ব্যক্তির আয় অর্ধশত কোটি ভারতবাসীর সম্মিলিত আয়কে বহু গুণ ছাপিয়ে যেতে থাকে। শুধু তাই নয়, গত দুই দশকব্যাপী সময়ে ধনীতম এক শতাংশের আয়ের অনুপাত যে হারে বেড়েছে, দরিদ্রতম ৫০ শতাংশের আয়ের অনুপাত তার চেয়েও সামান্য বেশি হারে কমেছে। এখানে উল্লেখ্য, এই দুই অংশের আয়ের অনুপাতে ব্যবধান ২০০২-২০১৩ একটানা বাড়ার পরে গত দশ বছরে আর খুব একটা বাড়েনি। সম্পদের অনুপাতে ব্যবধানের ক্ষেত্রে ছবিটা কিন্তু আলাদা।

মুক্ত অর্থনীতির ভারতে আয় বন্টনে দরিদ্রতম ৫০ শতাংশের উপরে থাকা ৪০% মধ্যবিত্তের সম্পদের পরিমাণও কিন্তু ক্রমশ কমেছে। বস্তুত, এই ৪০% মধ্যবিত্তের সম্পদ যে হারে কমেছে, ধনীতম ১০ শতাংশের সম্পদের পরিমাণও ঠিক সেই হারেই ফুলে ফেঁপে উঠেছে।
পিকেটির তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বিশ্বায়ন পরবর্তী ভারতে সম্পদের মালিকানায় বৈষম্য আয় বৈষম্যকে ছাপিয়ে গিয়েছে। পিকেটির তত্ত্বের আরও সমর্থন পাওয়া যায় গত দুই দশকে জনসংখ্যার সর্বোচ্চ ১% এবং সর্বোচ্চ ১০% ধনী মানুষের আয় ও সম্পদের তুলনা করলে। দুই গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই জাতীয় সম্পদে অংশীদারিত্ব জাতীয় আয়ে অংশীদারিত্বের থেকে বেশি। সর্বাপেক্ষা ধনী এক শতাংশের আয় ও সম্পদের অনুপাতে তারতম্য সর্বাপেক্ষা ধনী ১০ শতাংশের আয় ও সম্পদের অনুপাতের তারতম্যের চেয়ে বেশি। উপরন্তু দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সর্বাপেক্ষা ধনী ১০ শতাংশের আয় ও সম্পদের অনুপাতের পার্থক্য কিছুটা হলেও কমেছে। কিন্তু সর্বাপেক্ষা ধনী এক শতাংশের ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে।

পিকেটি প্রমুখের গবেষণার বিবিধ ফলাফলের মধ্যে আরও যে বিষয় লক্ষণীয় তা হল, নরেন্দ্র মোদীর আমলেই কোভিড অতিমারীর আগে ও পরে সম্পদ বন্টনে তারতম্য। ২০১৫ সাল থেকে ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির বার্ষিক হার ক্রমশ কমতে কমতে ২০১৯ সালে হয় ১.৬%। এরপর কোভিডের ধাক্কায় ২০২০ সালে তা এক লাফে নেমে যায় বার্ষিক -৯ শতাংশে। ২০২১ ও ২০২২ সালে বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ৮.২% ও ৪.৭%।
দেশের মোট সম্পদে দরিদ্রতম ৫০ শতাংশের ভাগীদারি ১৯৯১-২০১১ একটানা কমার পরে ২০১১-২০১৪ সামান্য বাড়ে, ২০১৪-২০১৭ সামান্য কমে, ২০১৭-২০২০ বেশকিছুটা বাড়ে, এবং ২০২০ পরবর্তী তিন বছরে আবার কমে যায়। খানিকটা একইরকম প্রবণতা দেখা যায় ৪০ শতাংশ মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রেও। সহজ অঙ্কের হিসাবেই ধনীতম ১০ শতাংশের ক্ষেত্রে ঘটে ঠিক উল্টো। তাদের সম্পদের ভাগীদারি ১৯৯১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত একটানা বাড়ার পরে ২০১১-২০১৪ একটু কমে, ২০১৪-২০১৭ সামান্য বাড়ে, ২০১৭-২০২০ বেশকিছুটা কমে এবং ২০২০ সালের পরে আবার বেশ বেড়ে যায়। এই ওঠানামার ফলে সম্পদ বন্টনের সর্বনিম্ন ৫০%, মধ্যবর্তী ৪০% বা সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ – কারোরই ২০১৪ আর ২০২৩ সালের সম্পদের অংশীদারির মধ্যে বিরাট তফাত নেই।
আরো পড়ুন মধ্যবিত্তকে ভুল বুঝিয়ে গরিবকে ভুলে থাকা বাজেট
উল্টোদিকে সর্বোচ্চ ১% বা সর্বোচ্চ ০.১ শতাংশের সম্পদের ভাগীদারি বিশ্বায়নের পর থেকে টানা বাড়তে বাড়তে ২০১১-২০১৪ সামান্য কমার পর ২০১৪-২০২৩ আবার একটানা বেড়েছে। ফলত, সর্বোচ্চ এক শতাংশের সঙ্গে জনসংখ্যার বাকি অংশগুলির তুলনা করলে মোদী শাসনের দশ বছরে সম্পদ বন্টনের বৈষম্য আরও প্রকট হয়েছে। দেশের বিভিন্ন রাজ্য, শহর এবং গ্রাম, এমনকি একেকটি শহরের বিভিন্ন অংশের বাসিন্দাদের মধ্যে বৈষম্যও ক্রমশ বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক উপদেষ্টা পরিষদের ২০২২ রিপোর্টেও স্বীকার করা হয়েছে যে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সুফল মূলত ধনিক শ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, গরিব মানুষের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।

ভারতে ক্রমবর্ধমান বৈষম্যে দেশের ধনীতম কয়েকজনের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত হওয়ার ছবিটা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, মোদী আমলে আদানি-আম্বানির হাতে দেশের সব সম্পদ চলে যাওয়ার যে অভিযোগ করে করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির নেতৃত্ব গলা চিরে ফেলছে, তা একটুও মিথ্যা নয়। এ থেকে মুক্তির উপায় তাহলে কী? পিকেটির কাছে ফিরে গেলে দেখি, পূর্বে উল্লিখিত বইতে তিনি বলছেন, ধনিক শ্রেণির উপর উচ্চ হারে আয়কর এবং অন্তত ২% হারে সম্পদ কর চাপানোই ক্রমবর্ধমান আর্থিক বৈষম্য কিছুটা কমাতে পারে।
২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের প্রথম দফার আর এক সপ্তাহও বাকি নেই। কংগ্রেস এবং সিপিএম তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ইতিমধ্যেই প্রকাশ করেছে। ভারতীয় জনতা পার্টিও তাদের ইশতেহার শিগগির প্রকাশ করবে বলে শোনা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের নির্বাচনী প্রচারে স্পষ্টই বলছে যে তারা নির্বাচন লড়ছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী ইত্যাদি প্রকল্পগুলিকে সামনে রেখে এবং কেন্দ্রের কথা দিয়ে কথা না রাখা আর কেন্দ্রের বকেয়া টাকা রাজ্য সরকার নিজ উদ্যোগে কীভাবে মিটিয়ে দিচ্ছে সেই ছবি তুলে ধরে। তবে তাদের ইশতেহারও এখনো প্রকাশিত হয়নি। তাহলে দেখে নেওয়া যাক, ক্রমবর্ধমান আর্থিক বৈষম্যের বিষয়ে কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলি?
কংগ্রেস তাদের ইশতেহারে আর্থিক বৈষম্যের কথা উল্লেখ করে বলেছে ‘মোদী সরকারের আমলে গত পাঁচ বছরে দেশে মজুরি বা বেতন সেভাবে বাড়েনি। দেশের দরিদ্রতম পঞ্চাশ শতাংশের গড় আয় হয় থমকে রয়েছে বা আরও কমেছে। আমাদের সম্পদ উৎপাদন করতে হবে এবং তা সম্ভব কেবলমাত্র অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মাধ্যমে। … মোদী সরকার হল ধনীদের সরকার, ধনীদের দ্বারা তৈরী সরকার, এবং ধনীদের জন্য সরকার। দেশের ধনীতম এক শতাংশের স্বার্থে এই সরকার পরিচালিত। … দেশের আনুমানিক ২৩ কোটি মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নীচে রয়েছেন। ইউপিএ সরকার ২৪ কোটি মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করেছিল এবং আমরা কথা দিচ্ছি যে কংগ্রেস বা কংগ্রেস পরিচালিত সরকার ক্ষমতায় এলে আগামী দশ বছরে বাকি ২৩ কোটি মানুষকে আমরা দারিদ্র্যমুক্ত করব।’
কাজ, সম্পদ, এবং জনকল্যাণ – এই তিনটি শব্দেই কংগ্রেসের ইশতেহারকে বর্ণনা করেছেন প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরম। রাহুল গান্ধীও তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে বারবার আর্থিক বৈষম্যের বিষয়টি টেনে এনেছেন। কেন্দ্রে ক্ষমতায় এলে কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে দৈনিক ৪০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি, ২৫ বছরের কমবয়সী সমস্ত স্নাতক ছাত্রছাত্রীর জন্য একবছরের শিক্ষানবিশি, কর্মক্ষেত্রে সংরক্ষণের ঊর্ধ্বসীমা বাড়ানো, রাজস্থান মডেলে দেশের সর্বত্র ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সর্বজনীন নগদবিহীন স্বাস্থ্য বিমা, প্রতিটি দরিদ্র পরিবারের জন্য বার্ষিক এক লক্ষ টাকা অনুদান, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে পূর্বানুমোদিত ৩০ লক্ষ শূন্য পদে নিয়োগ এবং প্রশাসনিক বা বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগের অধীনস্থ চুক্তিভিত্তিক পদগুলির স্থায়ীকরণ।
সিপিএমের ইশতেহারে ‘বৈষম্য’, ‘দরিদ্র’ বা ‘দারিদ্র্য’ শব্দগুলি অনুপস্থিত থাকলেও দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রয়োজনে সম্পদ এবং সম্পদের উত্তরাধিকারের উপর কর বসানোর কথা রয়েছে। এছাড়াও আছে কাজের অধিকারকে সংবিধানের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করা, প্রশাসন এবং সরকারি উদ্যোগগুলিতে যাবতীয় শূন্য পদে নিয়োগ, মনরেগায় বরাদ্দ বাড়ানো এবং ৭০০ টাকা দৈনিক মজুরি, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জাতীয় আয়ের ৬% করা এবং উচ্চশিক্ষার বেসরকারিকরণ বন্ধ করার দাবি। সরকারি কোম্পানির বেসরকারিকরণ বন্ধ করা এবং বেসরকারি কোম্পানিতে সংরক্ষণ করার কথাও রয়েছে সিপিএমের ইশতেহারে।
প্রসঙ্গত, সম্পদ এবং সম্পদের উত্তরাধিকার – এই উপরে রাজস্বই একসময় ভারতে চালু ছিল। ১৯৮৫ সালে রাজীব গান্ধী সরকারের আমলে সম্পদের উত্তরাধিকার সংক্রান্ত রাজস্ব তুলে দেওয়া হয়। কারণ হিসাবে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ভিপি সিং বলেছিলেন, উত্তরাধিকারের উপর কর চাপিয়ে দেশের আর্থিক বৈষম্য কমানো যায়নি। সম্পদ কর তুলে দেওয়া হয় ২০১৫ সালে প্রথম মোদী সরকারের আমলে। কারণ হিসাবে বলা হয়, কর আদায়ের প্রশাসনিক খরচ করের পরিমাণকে ছাপিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ভারতে যখন বাস করছেন পৃথিবীর ৭% ধনীতম ব্যক্তি, সংখ্যায় যাঁরা মাত্র ২৭১ জন কিন্তু যাঁদের প্রত্যেকের সম্পদের পরিমাণ অন্ততপক্ষে ৮,০০০-৯,০০০ কোটি টাকা, তখন সম্পদ এবং সম্পদের উত্তরাধিকারের উপর কর আদায় অবশ্যই নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
আয় ও সম্পদের হিসাবনিকাশের পরে, এমনকি শিক্ষা, কাজের সুযোগ, নিয়োগ, মজুরি, জনকল্যাণ প্রকল্পের পরেও কিন্তু বাকি থেকে যায় আরও অনেককিছু। বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের উষ্ণ দেশগুলিতে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের দুর্দশা দ্রুত বাড়তে চলেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় একেবারে উপরের দিকে রয়েছে ভারতের একাধিক বড় শহর। ক্রমশ বাড়ছে জলকষ্ট, কমছে সবুজের পরিমাণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন গরিব মানুষ। অতিরিক্ত দূষণ এবং গরমে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও অসুস্থতা বাড়ছে এবং কর্মক্ষমতা কমছে। তা সত্ত্বেও নির্বাচনী প্রচারে গলদঘর্ম রাজনীতিবিদদের প্রচারে জায়গা করে নিতে পারছে না পরিবেশ, জনসংখ্যা, অরণ্য বা জলসম্পদের মত বিষয়। যদিও এর প্রত্যেকটি আগামীদিনে অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করে তুলবে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








