অর্ক মুখার্জি

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা সেমিস্টার পদ্ধতিতে হবে। ২০২৫ সালেই শেষ গতানুগতিক উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা হবে। ২০২৪ সালে যারা একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হবে, তারা ২০২৫ সালে সেমিস্টার পদ্ধতিতেই একাদশ শ্রেণির পরীক্ষা দেবে এবং ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক প্রথমবার সেমিস্টার পদ্ধতিতে হবে। প্রতি শিক্ষাবর্ষে দুটি করে সেমিস্টার পরীক্ষা নেওয়া হবে। একাদশ ও দ্বাদশের প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষার সময় ধার্য করা হয়েছে নভেম্বর, দ্বিতীয় সেমিস্টারের সময় মার্চ। কেন এই সিদ্ধান্ত? উচ্চমাধ্যমিক সংসদের মতে, সেমিস্টার পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হলে ছাত্রছাত্রীরা পরবর্তীকালে বিভিন্ন প্রবেশিকা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ধাঁচে অভ্যস্ত হয়ে থাকবে। স্বাভাবিকভাবেই তারা বেশি আত্মবিশ্বাস নিয়ে ওই পরীক্ষাগুলিতে বসতে পারবে। সত্যিই কি তাই? আসুন একটু আলোচনা করা যাক।

সংসদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেমিস্টার পদ্ধতিতে ছাত্রছাত্রীরা একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা দিলেও উচ্চমাধ্যমিকে কেবল মাত্র তৃতীয় এবং চতুর্থ সেমিস্টারের নম্বরের গড় করে ফলাফল তৈরি করা হবে। সেক্ষেত্রে একাদশ শ্রেণিতে দেওয়া প্রথম এবং দ্বিতীয় সেমিস্টারের কোন নম্বরই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলের সঙ্গে যুক্ত হবে না। সংসদের লক্ষ্য যদি ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য আরও ভালভাবে প্রস্তুত করাই হ্য়, তাহলে একাদশ বাদ কেন? বিভিন্ন প্রতিযোগিতা এবং প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য একাদশ শ্রেণির বিভিন্ন পাঠ্য বিষয়বস্তু গুরুত্বপূর্ণ। তাই একাদশ যদি উচ্চমাধ্যমিক সেমিস্টারে যুক্ত হত তাহলে ছাত্রছাত্রীরা একাদশ আর দ্বাদশ, দুটি শ্রেণির পাঠই সচেতনভাবে এবং অধিকতর সতর্কভাবে নিত। অনেক ছাত্রছাত্রীই একাদশ শ্রেণির পড়াশোনাকে সেভাবে গুরুত্ব দেয় না এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রবেশিকা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এই ‘একাদশ গ্যাপ হোল’ অনেক ক্ষতি করে। আমরা অনেকে টুয়েলফথ ফেল ছবিটি দেখেছি এবং প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছি। কিন্তু বাস্তবে ‘ইলেভেনথ গ্যাপ হোল’ কীভাবে ছাত্রছাত্রীদের ক্ষতি করছে বা তাদের লড়াইয়ে পিছিয়ে দিচ্ছে তা বঙ্গের ছাত্রছাত্রীরা এবং পড়ানোর সঙ্গে যুক্ত অনেকেই জানেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

 

অনেক ছাত্রছাত্রীই একাদশ শ্রেণির পড়াশোনাকে সেভাবে গুরুত্ব দেয় না এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রবেশিকা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এই ‘একাদশ গ্যাপ হোল’ অনেক ক্ষতি করে।

 

আগেই বলেছি, সংসদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একাদশ এবং দ্বাদশের প্রথম পরীক্ষা নভেম্বরে এবং দ্বিতীয় পরীক্ষা মার্চে হবে। আমরা যদি শিক্ষাবর্ষের ধরন লক্ষ্য করি, প্রতিবছর মাধ্যমিকের ফল মোটামুটি মে মাসে বের হয়। ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং গরমের ছুটি – এই দুটি জিনিস মাথায় রাখলে দেখা যায়, ক্লাস শুরু হতে হতে জুনের শেষ বা জুলাই হয়ে যায়। মাঝে পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির ইউনিট টেস্ট এবং পুজোর লম্বা ছুটি। তাহলে জুলাই থেকে অক্টোবর – এর মধ্যে কতদিন পাওয়া যাবে পড়ানোর জন্য? সেই কটি দিন প্রথম সেমিস্টারের সিলেবাস শেষ করার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। এছাড়া মনে রাখতে হবে, প্রথম সেমিস্টার পুরোপুরি MCQ মডেলে হবে। অর্থাৎ পড়ানোর ক্ষেত্রে খুব সাবধানী হয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে সাধারণভাবে কোনো বিষয় পড়াতে যতগুলি ক্লাসের প্রয়োজন তার থেকে বেশি ক্লাস করানো দরকার। বিদ্যালয়গুলি পারবে তো? না ছাত্রছাত্রীদের ‘আউটসোর্সিং’, অর্থাৎ বাইরের কোচিং বা গৃহশিক্ষক বা অনলাইন ক্লাসের উপর ভরসা করতে হবে?

এই প্রসঙ্গে আর একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তা হল অধিকাংশ স্কুলের পরিকাঠামো। এখন অধিকাংশ স্কুল পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে। অনেক স্কুলে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির বিষয় শিক্ষকের অভাব রয়েছে। এর মূল কারণ শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া অনিয়মিত হয়ে যাওয়া। সেমিস্টার পদ্ধতির সঠিক রূপায়ণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ শিক্ষক প্রয়োজন। নইলে যদি কেবলমাত্র সিলেবাস শেষ করার জন্য পড়ানো হয়, তাহলে ছেলেমেয়েরা কিছুই শিখতে পারবে না, নাম কা ওয়াস্তে সেমিস্টার পদ্ধতির অংশ হয়ে থাকবে।

একাদশের একটি এবং দ্বাদশের একটি সম্পূর্ণ সেমিস্টার কেবলমাত্র MCQ ভিত্তিক। আর একটি সেমিস্টারে উত্তর লেখার ব্যাপার থাকবে, যেখানে প্রশ্নের মান ২, ৫, ৬ বা তার বেশি হবে। এভাবে ভাগ না করে প্রতিটি সেমিস্টারে যদি MCQ, দীর্ঘ এবং নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নের মিশেল রাখা যেত তাহলে তা বৈচিত্র্যপূর্ণ হত এবং পাঠ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের নিজস্বতা দেখানোর সুযোগ থাকত। রচনাধর্মী প্রশ্নের উত্তর লেখার ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের মৌলিকত্ব প্রকাশ করতে পারে, MCQ পদ্ধতিতে সেই সুযোগ থাকে না। বিশেষ করে সাহিত্যনির্ভর বিষয়ে কেবলমাত্র MCQ প্রশ্নে পরীক্ষা হলে ছাত্রছাত্রীরা কতটা সাহিত্যরস আস্বাদন করে প্রস্তুতি নিচ্ছে তা বোঝার উপায় থাকে না।

স্কুলভিত্তিক পড়াশোনার আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত পাঠ্য বিষয়কে এমনভাবে উপস্থাপন করা যাতে ছাত্রছাত্রীদের বিষয় সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ে এবং তারা বিষয়কে কেন্দ্র করে মৌলিক চিন্তাভাবনা করতে সক্ষম হয়। সবচেয়ে বড় কথা, ছাত্রছাত্রীদের এমনভাবে প্রস্তুত করা উচিত যাতে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়। সেমিস্টার পদ্ধতির দুর্বলতম দিক হল, ছয় মাসের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট পাঠক্রম শেষ করে আবার অন্য বিষয়ভিত্তিক পাঠক্রমে ছাত্রছাত্রীদের মনোনিবেশ করতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই সময়ের অপ্রতুলতার কারণে ছাত্রছাত্রীদের কাছে বিস্তারিত এবং বিশদে জ্ঞানলাভ করার সুযোগ থাকে না। তারা অভ্যস্ত হয় অল্পসংখ্যক বিষয় পড়ে, মনে রেখে পরীক্ষা দিয়ে সাফল্য অর্জন করতে। কিন্তু তারাও যখন বিভিন্ন প্রবেশিকা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসে, সেইসব পরীক্ষার বিরাট পাঠক্রম তাদের বিভ্রান্ত করে। অনেকসময় তারা হতাশ হয়ে পড়ে। তাই সেমিস্টার পদ্ধতি চালু করতে হলে ছাত্রছাত্রী পরবর্তীকালের জন্য কতটা আত্মবিশ্বাস সঞ্চয় করছে তা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

এই সেমিস্টার পদ্ধতি অনেক ফাঁকফোকরে ভরা। এর ফলে বিষয়ভিত্তিক গভীরতা কমবে, মধ্যমেধার বা খুব পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েরা হয়ত অনেক বেশি নম্বর পাবে। কিন্তু জ্ঞানচর্চা গুরুত্ব হারাবে। স্বাভাবিকভাবেই এই সেমিস্টার পদ্ধতি থেকে উঠে আসা বহু ছাত্রছাত্রী হয়ত নম্বরের জোরে উচ্চশিক্ষায় ভাল ভাল বিষয় নিয়ে পড়ার সুযোগ পাবে, কিন্তু কতজন তা শেষ করে উঠতে পারবে সে বিষয়ে সন্দেহ থেকে যায়। বিষয়ভিত্তিক গভীরতার অভাবের কারণে বহু ছাত্রছাত্রী কলেজে ভর্তি হলেও উচ্চশিক্ষা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়বে। স্বাভাবিকভাবেই কলেজছুটের সংখ্যা বাড়বে। আরও আশঙ্কার কথা, এই কারণে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে স্নাতক বা স্নাতকত্তর স্তর নিয়ে অনীহা তৈরি হবে। একাদশ এবং দ্বাদশ শ্রেণি বিষয়ের প্রতি ভালবাসা জন্মানোর সময়। কিন্তু সেমিস্টার পদ্ধতিতে বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রী নম্বরকেন্দ্রিক পড়াশোনাই করতে বাধ্য হবে। তাই বিষয়ের প্রতি ভালবাসা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। স্বাভাবিকভাবেই কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ছাত্রাভাবে ভুগবে এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারি কলেজের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার মত পরিস্থিতি যে তৈরি হবে না, তা কে বলতে পারে? অর্থাৎ এই একাদশ এবং দ্বাদশের দুর্বল সেমিস্টার ব্যবস্থা ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষার জন্যে অশনি সংকেত।

 

স্কুলভিত্তিক পড়াশোনার আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত পাঠ্য বিষয়কে এমনভাবে উপস্থাপন করা যাতে ছাত্রছাত্রীদের বিষয় সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ে এবং তারা বিষয়কে কেন্দ্র করে মৌলিক চিন্তাভাবনা করতে সক্ষম হয়।

 

আরো পড়ুন স্কুল বেহাল, শিগগির অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষের প্রয়োজন ফুরোবে

যাঁরা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত তাঁরা অনেকেই জানেন কীভাবে করোনা অতিমারীর সময়ে বা তার আগে নিয়মিতভাবে একাদশ শ্রেণির প্রশ্ন পরীক্ষার আগেই হোয়াটস্যাপ, টেলিগ্রাম ইত্যাদি বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছিল। বহু জায়গায় স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের পরোক্ষ সমর্থনে টোকাটুকির জোয়ার এসেছিল। স্বাভাবিকভাবেই সেমিস্টার পদ্ধতিতে পরীক্ষা, বিশেষ করে একাদশ শ্রেণির পরীক্ষা, কতটা নির্ভেজাল হবে তা নিয়ে সন্দেহ করার কারণ আছে। এমনিতেই এখন পঞ্চম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষা ইউনিটভিত্তিক হয়। তবে তৃতীয় তথা শেষ ইউনিটের পাঠক্রম এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি শেখার এবং জানার বৌদ্ধিক ক্ষমতা অনুযায়ী অধিকাংশের কাছে অতি উত্তম সময়কাল। সেখানে একেকটা সেমিস্টার কেবলমাত্র MCQ ভিত্তিক শিক্ষায় আবদ্ধ না রেখে আরও বৈচিত্র্যময় কিছু ভাবা যেতে পারত। এরকম ব্যবস্থার ফলে যারা উচ্চমাধ্যমিকের পর বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষা দেবে তারাও নানারকম সমস্যায় পড়বে।

 

এই সেমিস্টার পদ্ধতি অনেক ফাঁকফোকরে ভরা। এর ফলে বিষয়ভিত্তিক গভীরতা কমবে, মধ্যমেধার বা খুব পিছিয়ে পড়া ছেলেমেয়েরা হয়ত অনেক বেশি নম্বর পাবে। কিন্তু জ্ঞানচর্চা গুরুত্ব হারাবে।

 

স্যামুয়েল টেলর কোলরিজের বিখ্যাত কবিতা ‘দ্য রাইম অফ দি এনশেন্ট মেরিনার’-এর এক বিখ্যাত পংক্তি ‘Water, water every where,/ Nor any drop to drink.’ উচ্চমাধ্যমিকে সেমিস্টার পদ্ধতি আমাদের হয়ত প্রচুর নম্বর পাওয়া ছাত্রছাত্রী উপহার দেবে, কিন্তু তাদের বেশিরভাগ বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের অভাবে সবসময় তৃষ্ণার্ত থাকবে এবং শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে সাকার হওয়ার ব্যাপারে অনেক অনেক পিছিয়ে থাকবে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.