নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
দক্ষিণপন্থার স্বাভাবিক কৌশলই হল রাজনীতিকে ক্রমাগত অপার, অসংখ্য সম্ভাবনাময় এক দ্যূতক্রীড়ার সমার্থক করে তোলা। আধুনিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে সেই রাজনীতির মুখোশ যখন যেভাবে খসে পড়েছে, তারা ততই নিত্যনতুন কায়দায় নিজেদের ঢেলে সাজিয়েছে। একসময় রাজনীতির প্রাথমিক পাঠ নিতে বসে শুনতে হত, রাজনীতি হল সম্ভাবনার বিজ্ঞানসম্মত প্রয়োগ। উচ্চতর গণিত ও ফলিত অর্থনীতিতে এমন সম্ভাবনাশাস্ত্রের কিছু বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। অর্থশাস্ত্রের কেতাবি পাঠক্রমে ইকোনোমেট্রিক্স নামের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগে যে ব্যাপারটা একেবারেই গণিতনির্ভর ছিল না এমন নয়। প্রখ্যাত গবেষক নিকোলাস টিনবার্গেন তত্ত্ব হাজির করলেন, চলতি সামাজিক বন্দোবস্তে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন আয়ের মধ্যে ব্যবধান যত উৎকট, যত ভয়ানক হয়ে উঠবে, সামাজিক সুস্থিতি ঠিক সেই অনুপাতে বিপদের দিকে এগোবে। অবশ্য বাংলায় লেখা লাইনটি আমার নিজস্ব অনুবাদ, ইংরেজিতে ওকথার মানে আরও স্পষ্ট – ‘A larger than five to one gap between the lowest income and the highest income will lead to serious social conflict.’
সুতরাং পুঁজিবাদ যত এগোবে, যত তীব্র হবে, তার অধস্তন সামাজিক বন্দোবস্তটিও ততখানি অসহ্য হতে থাকবে। এমন সিদ্ধান্তে আমাদের অস্বস্তি হতে পারে, কারোর মগজে ‘এখনো আছে সময়’ জাতীয় কিছুও আসতে পারে, কিন্তু সত্য এই, যে পুঁজিবাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক বিষয়আশয় যা রয়েছে তাতে জনসাধারণের সর্বনাশ আটকানো যায়নি, যাচ্ছে না এবং শেষ অবধি যাবেও না। তাই নির্বাচনী বন্ড নিয়ে যা চলছে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, বরং খানিকটা লজ্জা পাওয়াই শ্রেয়।
কী চলছে?
এক, নরেন্দ্র মোদী সরকারের আমলে রাজনৈতিক দলের তহবিলে (নির্বাচনী তহবিল হোক বা সাধারণ) অর্থসাহায্য করতে বড়লোকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আর যা-ই হোক, ভারতীয়দের এসবে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, কারণ ইতিপূর্বে তাদের ২,০০০ টাকার নতুন নোটে মাইক্রো চিপ না কীসব সেন্সর আছে এমন ‘খবর’ গিলতে হয়েছিল। এবারে নতুন কী? আমাদের দেশে সংবিধান বলে একটা ব্যাপার এখনো টিকে আছে। সেই সংবিধান দেশের নাগরিককে কিছু বুনিয়াদি অধিকার দিয়েছে। একজন নাগরিক যে কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক হতেই পারেন, কিন্তু প্রতিটি রাজনৈতিক দল যারা দেশের সংসদ আলো করে বসে, তারা কবে, কখন, কাদের সামনে হাত পেতেছে এবং সেই হাতে দক্ষিণাস্বরূপ ঠিক কতটা কী পড়েছে – সেটুকু জানার অধিকার প্রত্যেক ভারতীয়ের আছে। মুশকিল হল, সাবেক পুঁজিবাদের কিছু আত্মমর্যাদাবোধ ছিল। মুনাফা লুঠ সে চিরকাল করেছে। তবু লোকজনকে কাজ দিই, মজুরি দিই, দুবেলার খাওয়া, পরনের কাপড়, মাথার উপর ছাদ আমরা দিই – এমন একটি গোল গোল নীতিবোধ আগেকার পুঁজিবাদ ও পুঁজিবাদী, উভয়েরই ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন না থাকার সুবাদে সেটুকু চক্ষুলজ্জাও চলে গেছে। পোশাকের নামে উদোম হয়েই বেরিয়ে এসে তারা নিজেদের নয়া উদারবাদ বলে ঘোষণা করে। আজ যাকে ধান্দার পুঁজিবাদ (crony capitalism) বলা হচ্ছে তার সূত্রপাত তখন থেকেই। পুঁজি আর যা-ই হোক, কোনোদিনই উদার ছিল না, হতেও পারে না। লুঠের মাত্রা ছাড়াতে ছাড়াতে সেদিনের ইতর আপদ আজ বিরাট বিপদে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমান যুগে নীতি, নৈতিকতা থেকে শুরু করে মানবিক সমস্ত গুণাবলী স্রেফ একটি নিক্তিতেই মাপা হয়। তার নাম অর্থ, গোদা বাংলায় টাকা।
অতএব গোটা বিষয়টা ঘুরেফিরে সেই সম্পদ, সম্পত্তির উপরে ভোগদখল কায়েম রাখার ব্যাপার। ব্যাক্তি মালিকানার অধীনস্থ বলেই সম্পত্তির পবিত্র অধিকার আজ সম্পত্তি গোপন রাখার অধিকারে পর্যবসিত। আর কে না জানে, ঘোষিত হোক বা লুকিয়ে রাখা, সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণে আধুনিক ব্যাঙ্কের জুড়ি নেই। তাই স্টেট ব্যাঙ্ক।
দুই, অর্থ আইন, ২০১৭-তে মোট চারটি সংশোধন করা হয়। তাছাড়াও ভারতের নির্বাচনী আইন, কোম্পানি আইন এবং আয়কর আইন বদল করে নির্বাচনী বন্ডের পথ তৈরি করা হয়েছিল। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক পরিচালনার ৩১ ধারা, জনপ্রতিনিধিত্বমূলক আইনের ২৯(গ) ধারা, আয়কর আইনের ১৩(৪) ধারা এবং ২০১৩ সালের কোম্পানি আইনের ১৮২ ধারার সংশোধন করা হয়। এর জোরে নির্বাচনী বন্ড নামের এক নতুন পদ্ধতিতে রাজনৈতিক দলগুলির আর্থিক চাঁদা/অনুদান গ্রহণের রাস্তা খুলে দেওয়া হয়। দু হাজার বা তার বেশি অঙ্কের টাকা এমন অনুদান হিসাবে গ্রহণ সম্ভব হল, যার বিশদ তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করার দায় রাজনৈতিক দলের আর থাকল না। যারা তহবিলে এই অর্থ যোগাচ্ছে, তাদের তরফেও এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রকাশের দায়িত্ব রইল না। কর্পোরেট অনুদান সংক্রান্ত বিষয়ে আগেকার সমস্ত আইনেই এমন অনুদানের যে ঊর্ধ্বসীমা ছিল, তা তুলে দিয়ে যথেচ্ছ কর্পোরেট অনুদান গিলে নেওয়া শুরু হল। দাতা কোম্পানি বা সংস্থার নিজের ব্যবসায় আদৌ কোনো লভ্যাংশ থাকুক আর নাই থাকুক, সেই কোম্পানি বা সংস্থা যদি হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনো ভুঁইফোড় কোম্পানিও হয়, তাতেও কুছ পরোয়া নেই।
তিন, আমাদের দেশে সরকারের খাতায় নাম রয়েছে (রেজিস্টার্ড) এমন যে কোনো সংস্থা এই স্কিমের আওতায় নির্বাচনী বন্ড কিনতে পারে, নিজেদের পছন্দের রাজনৈতিক দলকে অনুদান দিতে পারে। সেই কোম্পানির মালিকানা ভারতীয় নাগরিকদের হাতে আছে কিনা তা বিচার্য বিষয়ই নয়। আর্থিক অনুদান মারফত এদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এবং নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের নীতিসমূহ – সবকিছুতেই দেশি ও বিদেশি কর্পোরেটের সরাসরি হস্তক্ষেপ করার সুযোগ করে দেওয়া হয় এই বন্ডের বন্দোবস্তে।
এই বন্ড চালু হওয়ার পর থেকে যত অনুদান জমা হয়েছে তার ৯৪ শতাংশই এক কোটি বা তার চেয়ে বেশি অর্থমূল্যের। সমাজের সবচেয়ে ধনী অংশ (কর্পোরেটরা) কাদের সাহায্য করবে এটুকু বুঝতে খুব বেশি পরিশ্রম করতে হয় না।

স্টেট ব্যাঙ্ক ব্যাপারটা ধামাচাপা দেওয়ার শেষ চেষ্টা করতে গিয়ে যা করল, আইনজীবী মারফত আদালতে বলল, তা এইরকম
- এই কাজ করতে হলে গোটা প্রক্রিয়াটি পুনরায় মেলাতে (reverse the process) হবে।
- ওসব তথ্য ডিজিটাল অবস্থায় নেই।
- কাজ শেষ করতে তাদের অন্তত জুন মাস অবধি সময় দেওয়া হোক।
এত কিছু বলার পর সুপ্রিম কোর্টের ধমক খেয়ে ১২ মার্চ তারা নির্বাচনী বন্ড সংক্রান্ত আদালত নির্দেশিত তথ্য নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে।
গত শতকের নয়ের দশকে আমাদের সরকার বলেছিল, বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার প্রায় শেষ। আমাদের রফতানি যত কম, আমদানি ততাই বেশি। অথচ আমদানির মূল অংশ ভোগ্যপণ্যের, বড়লোকরাই মূলত সেসবের খরিদ্দার। কিছুতেই বলা হল না, আমদানি নিয়ন্ত্রণ করেই সরকার বাজারে চাহিদা বাড়াতে পারে, নিজেদের উদ্যোগে কারখানা বানিয়ে কর্মসংস্থান ও যোগান – দুটোই সামাল দেওয়া যায়। ওসব বললে লগ্নি পুঁজি চটে যাবে, এদেশের পুঁজিপতিরাও কাজের কাজ কিছু করবেন না। অতএব বাজার খুলে দাও। ভিক্ষাপাত্র হাতে নিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার (আইএমএফ)-এর সামনে দাঁড়াতে হল। তারা শর্ত দিল, যত খুশি ধার নাও, কিন্তু নিজেদের মুদ্রার দাম কমাও। ভারতীয় মুদ্রার সেই অবনমন আজও চলছে। এই প্রবন্ধ লেখার সময়েও এক ডলার কিনতে ৮২.৭৭ টাকা খরচ হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া নাকি গতি নেই। এরই জোরেই লগ্নি পুঁজি আমাদের দেশে ব্যাঙ্কে সুদের হার বাড়তে দিতে চায় না। উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষকে ব্যাঙ্কে টাকা না রেখে বিভিন্নভাবে সরাসরি বাজারে টাকা খাটাতে বাধ্য করা, যাতে তাকে তার টাকা সুদসমেত ফিরিয়ে দেওয়ার আইনি বিধিনিষেধ এড়িয়ে যাওয়া যায়। লগ্নি পুঁজির স্পর্ধা এতদূর বেড়েছে যে তারা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আওতা থেকে নগদ অর্থ সম্পর্কিত যাবতীয় ক্ষমতা সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছিল।
অতঃ কিম?
এক, যাঁরা রাজনীতি সচেতন এবং ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি এখনো আস্থাশীল, তাঁরা একে সাময়িক বিপর্যয় বলে প্রমাণ করতে (আসলে এড়িয়ে যেতে) চাইবেন। তা করতেই পারেন, তবে তাতে আপাতত মুক্তি পেলেও পরে আবার নতুন চেহারায় বিপদ সামনে আসবে। আসবেই।
দুই, যাঁরা কিছুতেই কিছু এসে যায় না ভাবেন অথচ এখনো এই লেখা পড়ছেন, তাঁদের বলার দরকার – কিছুই যদি না আসত যেত তাহলে এমন বন্দোবস্ত করাই হত না। মানুষের মগজকে সরাসরি দখল করতে না পারার ভয় থেকেই এমন পিছনের দরজা দিয়ে চোর ঢোকার পথ কেটে রাখা হয়েছে।
আরো পড়ুন বেহাল গণতন্ত্র বেহাত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে নির্বাচনী বন্ড
তিন, যাঁরা আগে ব্যাপারটাকে তত পাত্তা দেননি, এখন খবরের চাপে কোথা থেকে কী হয়ে গেল মনে করছেন, তাঁরা আরও কিছুদিন সংশ্লিষ্ট খবরে নজর রাখুন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়েছে ঠিকই, স্টেট ব্যাঙ্ক সেই রায় মেনে তথ্য জমা দিয়েছে তাও সঠিক, কিন্তু এসবের প্রভাব কীভাবে কতটা পড়বে তা আসলে রাজনীতির ফলিত চর্চার বিষয়। প্রভাব ফেলতে আমার, আপনার সকলের সক্রিয় ভূমিকা দরকার। নিজে থেকে কিছু হবে না।
নির্বাচনী বন্ড সংক্রান্ত এই ঘটনাবলী থেকে আমরা কী শিখলাম?
বিজেপি যা করতে চেয়েছে, চাইছে সেসবের মূল কারণ খুবই সহজ। যেনতেনপ্রকারেণ ক্ষমতায় টিকে থাকা। অর্থের বেলাগাম ব্যবহার, সংসদীয় রীতিনীতির অভূতপূর্ব অমর্যাদার একটাই উদ্দেশ্য। ওরা জানে নীতি, রাজনীতি, অর্থনীতি; এমনকি স্রেফ কী ছিল কী হল গোছের তথ্য মাথায় রেখেও মানুষ যদি নির্বাচকের ভূমিকায় নামেন, ওরা হালে পানি পাবে না। তাই মগজ দখলের লড়াইয়ের অশ্বত্থামার মত রাতের অন্ধকারে মাথা কেটে এনে যুদ্ধজয়ের উল্লাস করতে চাইছে। অমন আঁধারের যুদ্ধে অসহায় মানুষ যেমন প্রাণ হারায়, বীরের অহংকারও চূর্ণ-বিচূর্ণই হয়, হবে।
যারা অন্তত মুখে দুর্নীতি ইত্যাদির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলছে, তাদেরও মনে রাখার মত একটা কথা আছে বইকি। ঘৃণা, হিংসায় অন্ধ অশ্বত্থামাদের অমন জঘন্য কৌশলের কথা জানা থাকা সত্ত্বেও সবাইকে উপযুক্ত মাত্রায় সচেতন করতে আমরা কিন্তু এখনো সক্রিয় হইনি। কেন? ভয়? নাকি অন্য কিছু?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








