এককথায় বলতে গেলে সিপিএমের যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআইয়ের ব্রিগেড সমাবেশ সফল। তৃণমূল বা বামফ্রন্টের ডাকে ব্রিগেডে যেমন জমায়েত হয়, হয়ত তার তুলনায় খানিকটা কম ছিল জমায়েত। ব্রিগেড উপচে পড়েনি। কিন্তু রীতিমত ভাল জনসমাগম হয়েছে। রাজ্য সিপিএম এই সমাবেশ সফল করতে সাহায্য করেছে ঠিকই, কিন্তু লোক নিয়ে আসার ভার ছিল যুব সংগঠনের কাঁধেই। ষোল বছর পর একক শক্তিতে ব্রিগেডে সমাবেশ করে ডিওয়াইএফআই প্রমাণ করল, নির্বাচনী ফলাফলের ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গের বামশক্তিকে মাপা পুরোপুরি ঠিক হবে না। এই রাজ্যে বামপন্থার শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত।
২০০৮ সালে শেষবার যখন ব্রিগেডে সমাবেশ করেছিল ডিওয়াইএফআই, রাজ্যে তখন বামফ্রন্ট সরকার। তারপর গঙ্গা দিয়ে বহু জল গড়িয়ে গিয়েছে। রাজ্য বিধানসভা বামশূন্য হয়ে গিয়েছে, সংসদীয় রাজনীতির পাটিগণিতে বামেদের গুরুত্ব কমতে কমতে তলানিতে। এতকিছুর পরেও একটি বামপন্থী গণসংগঠন এখনো একক উদ্যোগে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নজরকাড়া সমাবেশ করতে পারে – এ বড় কম কথা নয়। বঙ্গীয় বামপন্থীদের সম্বন্ধে সহস্র সমালোচনা থাকলেও তাঁদের নতুন প্রজন্মের নাছোড় মনোভাবের প্রশংসা না করে থাকা যায় না।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এই ব্রিগেড সমাবেশ নিঃসন্দেহে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের সাংগঠনিক দক্ষতা প্রমাণ করল। মীনাক্ষী ক্রমশ এই রাজ্যের বামপন্থীদের মুখ হয়ে উঠছিলেন। ব্রিগেডের মঞ্চ সেই প্রক্রিয়ায় সিলমোহর দিল। এর আগে কি এমন কোনও মুখ বঙ্গের বামপন্থীরা সামনে এনেছেন? এমন কেউ, যিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক পিরামিডে তখনো শীর্ষস্থানীয় নন? মনে পড়ছে না। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বহু দশক জ্যোতি বসু ছিলেন বামপন্থীদের সংসদীয় মুখ। একইসঙ্গে প্রবল ছিল প্রমোদ দাশগুপ্তের সাংগঠনিক উপস্থিতি। তাঁরা দুজনেই ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অংশ। প্রমোদবাবুর প্রয়াণের পর আট এবং নয়ের দশকে পলিট ব্যুরোর সদস্য জ্যোতিবাবু ছিলেন প্রায় একক মুখ। তারপর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তিনিও দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অংশ। রাজ্যে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কখনো সূর্যকান্ত মিশ্র, কখনো মহম্মদ সেলিমের নেতৃত্বে সিপিএম নির্বাচনী লড়াই করেছে। তাঁরাও তখন দলের পলিট ব্যুরোর সদস্য। কিন্তু মীনাক্ষী তো তা নন। যুব সংগঠনের একজন নেতা, যিনি কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ স্তরের সংগঠনের অংশ নন, তিনি অন্তত সাধারণ বাম সমর্থকদের কাছে দলের মুখ হয়ে উঠছেন – এমন ঘটনা আগে হয়নি। অবশ্য এর আগে কোন তরুণ বামপন্থী নেতাকে দেখেই বা সাধারণ বাম সমর্থক এগিয়ে এসে বলেছেন, “তুমি একদিন মুখ্যমন্ত্রী হবে”?
পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ বাম সমর্থকদের মধ্যে বছর তিনেক আগেও মীনাক্ষী তেমন পরিচিত নাম ছিলেন না। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে দলীয় নেতৃত্ব তাঁকে কার্যত বাঘ ও সিংহের মাঝখানে লড়তে পাঠান। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম শুভেন্দু অধিকারীর হাই প্রোফাইল নির্বাচনী যুদ্ধে প্রচারে ঝড় তোলা ছাড়া মীনাক্ষী তেমন কিছু করতে পারেননি। নন্দীগ্রামে তাঁর প্রাপ্ত ভোট ছিল তিন শতাংশেরও কিছু কম। বস্তুত বামেদের তরুণ ব্রিগেডের অনেকেই মীনাক্ষীর চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু মীনাক্ষী যা করতে পেরেছিলেন,তা হল, রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসনে বামপন্থীদের দৃশ্যমান রাখা। এই কাজটি তিনি করে গিয়েছেন নির্বাচনের পরেও। যুব সংগঠনের কাজে আক্ষরিক অর্থেই গোটা রাজ্য চষে বেড়িয়েছেন, নিরলস পরিশ্রম করেছেন। কলকাতায় বসে রাজনীতি করেননি। টেলিভিশনের পর্দাতেও তাঁকে খুব বেশি দেখা যায়নি। রাজ্যের জেলায় জেলায় বামপন্থী সমর্থকরা তাঁকে দেখে উৎসাহিত হয়েছেন। সম্ভবত তাঁর সাদামাটা চালচলন, মাটি ঘেঁষা কথাবার্তা, আটপৌরে উচ্চারণ মীনাক্ষীকে সাহায্য করেছে। কিন্তু সেটাই সব নয়। মীনাক্ষী পরিশ্রমী, মাটি কামড়ে নিজের কাজ করতে জানেন, ঠান্ডা ঘরে বা টেলিভিশন চ্যানেলের স্টুডিওতে বসে থাকেন না। প্রচারের জন্য টিভি চ্যানেলের পরিবর্তে ভরসা করেন সংগঠনের উপরেই। তাই তিন শতাংশ ভোট পাওয়া এই মহিলাকে দেখেই আশায় বুক বাঁধছেন বামপন্থী সমর্থকরা।
মীনাক্ষী একার হাতে ইনসাফ যাত্রা সংগঠিত করেছেন – বিষয়টা এমন নয়। বামপন্থী রাজনীতিতে এমন না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। তবে নিঃসন্দেহে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। ইনসাফ যাত্রার সবচেয়ে বড় সাফল্য হল, মীনাক্ষী এবং তাঁর সহকর্মীরা পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তিকতম বামপন্থী সমর্থকের কাছেও পৌঁছতে পেরেছেন। এই মানুষগুলো গত দেড় দশক ধরে নানাবিধ সংকটের মধ্যেও বামপন্থীদের সঙ্গে আছেন। বহু সন্ত্রাস ও প্রলোভন উপেক্ষা করেই আছেন। মীনাক্ষী তাঁদের কাছে পৌঁছে বার্তা দিতে পেরেছেন, দল তাঁদের সঙ্গেই আছে। এই বার্তা বড় প্রয়োজন ছিল। মীনাক্ষী মুখ হয়ে উঠতে পারলেন, কারণ তিনি এখনো পর্যন্ত দূরের গ্রহ নন। প্রান্তিক বাম সমর্থকও তাঁকে স্পর্শ করতে পারেন। বহু সর্বোচ্চ স্তরের বাম নেতার হয়ত এই ক্ষেত্রে ঘাটতি আছে।
আরো পড়ুন দ্যাট লিডার, দিস ম্যান: মহাশূন্যের দুটি বিন্দু
এখানেই আসে আরেকটা অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ। মীনাক্ষী দলীয় রাজনীতির সর্বোচ্চ স্তরে না থেকেও ক্রমশ যে বামেদের মুখ হয়ে উঠছেন, এর আরেকটা কারণ, যাঁদের মুখ হওয়ার কথা ছিল তাঁদের গ্রহণযোগ্যতায় ঘাটতি রয়েছে। তাঁরা নিশ্চয় চাইছেন মীনাক্ষী সামনে আসুন, কিন্তু তাঁদের চাওয়া বা না চাওয়া নিরপেক্ষভাবেই মীনাক্ষী সামনে আসছেন।
কিন্তু মীনাক্ষী বাম বৃত্তে কতবড় নেতা হলেন তা কি রাজ্যের মানুষের জন্য আদৌ খুব গুরুত্বপূর্ণ? কয়েকমাস বাদে লোকসভা নির্বাচন। সেই নির্বাচনের পর ভারতীয় রাজনীতি সম্ভবত অনেকখানি বদলে যাবে। ২০১৪ সালে যখন নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখনো অনেকেই ভাবেননি এক দশকের মধ্যেই সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ সত্যিই বিলুপ্ত হবে, ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের বহু গুরুত্বপূর্ণ অর্জনকে ধূলিসাৎ করে অযোধ্যায় তৈরি হবে রামমন্দির।
২০২৫ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (কানপুর থেকে ধরলে) শতবর্ষ, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘেরও শতবর্ষ। সঙ্ঘ পরিবারের ঘোষিত লক্ষ্য হিন্দুরাষ্ট্র কায়েম করা। গত দশ বছরে সেই লক্ষ্যে তারা অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর নিঃসন্দেহে সেই যাত্রার গতি বাড়বে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিও ২০১৮-১৯ সালে যা ছিল, এখন আর নেই। মাত্র ৪-৫ বছরেই আমূল বদলে গিয়েছে। হিন্দুদের স্রেফ হিন্দু হিসাবে ভোট দেওয়ানোর প্রকল্প ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রবল গণরোষে ভর করে বাড়ছে বিজেপি। সবচেয়ে দুঃখজনকভাবে বদলে গিয়েছে বাংলার সমাজ। খোলাখুলি মুসলমান বিদ্বেষের বাজার দর বাড়ছে। কয়েকবছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। বাম ও ডানের লড়াই ক্রমশ ডান বনাম অতি ডানের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে সামাজিক অঙ্গনেও। এমন পরিস্থিতি বামপন্থীদের জন্য নতুন এবং অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের। এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজন নতুন রাজনৈতিক বয়ান। বামপন্থীরা তা সামনে আনতে পারবে কিনা তার উপরেই নির্ভর করছে রাজ্যের ভবিষ্যৎ। সংসদীয় পরিসরে রাজনৈতিক নক্ষত্রের উত্থান হয় নির্বাচনের ময়দানে, ব্রিগেডের ময়দানে নয়। ব্রিগেড প্রমাণ করল মীনাক্ষীই বামেদের মুখ, তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা চমৎকার। কিন্তু তিনি বামেদের নেত্রী থেকে জননেত্রী হয়ে উঠতে পারবেন কিনা সেই পরীক্ষা আর কয়েকমাস পরে। এই রাজ্যে বামেরা কোনো আসনেই জেতার জায়গায় হয়ত নেই, কিন্তু মীনাক্ষী কি প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিজের আসনে ২০% বা তার কাছাকাছি ভোট টানতে পারবেন? এই প্রশ্নের উত্তরের উপরে নির্ভর করছে অনেককিছু।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








