উত্তেজনা টানটান। প্রায় ৩৫ বছরের সুপরিকল্পিত প্রচার ও আক্রমণাত্মক অভিযানের ফলে অবশেষে অযোধ্যায় এক বিশাল মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হবে ভগবান শ্রীরামের প্রতিমা। আর সেই বিশেষ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হাতে।

উত্তেজনা টানটান। ২২ জানুয়ারির অনুষ্ঠানে যাঁরা আমন্ত্রণ পাননি তাঁদের জন্য রামলালা দর্শনের র্বিশেষ ব্যবস্থা করা হচ্ছে ২৫ জানুয়ারি থেকে টানা ২৫ মার্চ পর্যন্ত। খবর আছে যে বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব রেল মন্ত্রককে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অযোধ্যা নগরী পৌঁছবার যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। দল নাকি তাদের বুথস্তরের কর্মী পর্যন্ত সবাইকে রামমন্দির দর্শন করানো নিশ্চিত করতে চায়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ঝাঁ চকচকে করে তোলা হয়েছে রেল স্টেশন। ইতিমধ্যে আকাশপথে জুড়ে দেওয়া হয়েছে অযোধ্যাকে। মহর্ষি বাল্মীকি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রতি উদ্বোধন করে এলেন প্রধানমন্ত্রী।

উত্তেজনা টানটান। ‘যো কহা সো কিয়া মোদী নে’। অথাৎ কথা রাখেন মোদী। রামমন্দিরও শেষ পর্যন্ত বানানো হল। মসজিদ ভাঙা থেকে মন্দির গঠনের সে বিস্তৃত ইতিহাস। তার মাঝে আবার মামলা মোকদ্দমা – সে অনেক ঘটনা। এ সবের ফলে হিন্দি বলয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠল বিজেপি। তার জয়যাত্রা এবার কে রোখে?

এই হিন্দি বলয়ে বিজেপি কিন্তু আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে এই অঞ্চলের ২২৫টি আসনের মধ্যে ১৭৬টিতে জয়ী হয় বিজেপি প্রার্থীরা। এছাড়া গুজরাতে ২৬-এ ২৬ যায় বিজেপির ঝুলিতে। ওদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল প্রায় দখলে, অন্ধ্রপ্রদেশ আর ওড়িশাতে বিজেপি ক্ষমতাসীন না হলেও বলা যায় তাদের বন্ধু সরকার রয়েছে। সবমিলিয়ে কিন্তু বেশ ভাল অবস্থা উত্তর ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে। বাদ সাধতে পারে পাঞ্জাব।

যা-ই হোক, এত ভাল অবস্থা সত্ত্বেও কিন্তু বিজেপি কোথাও আপস করতে রাজি নয়। তাই উঠেপড়ে লেগেছে বিরোধীদের হাত থেকে এমন আসনগুলো ছিনিয়ে নিতে, যেখানে দল দুর্বল। এ হুঙ্কার যেন ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিবো সূচ্যগ্র মেদিনী’-র প্রতিধ্বনি। বিরোধীদের হাতে কোনো আসনই সহজে তুলে দিতে নারাজ বিজেপি। যেমন পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি লোকসভা আসনের ১৮টি জিতেও বিজেপির ‘দিল মাঙ্গে মোর’। দলের প্রধান কৌশলী অমিত শাহ এবং সর্বভারতীয় সভাপতি জগৎ প্রকাশ নাড্ডার তাই অহরহ আসা যাওয়া। কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলো চেপে ধরেছে রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও কর্মীদের। আর তৃণমূল পরপর নিচ্ছে ভুল পদক্ষেপ, যেন কর্মীদের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে বা নেতৃত্ব যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। দাঙ্গাহাঙ্গামা যেমন রোজকার ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তেমনি বাড়ছে নৈতিক অবনতি। ক্ষয়িষ্ণু বাম ও কংগ্রেসের মাঝে ধীরেধীরে প্রতিপত্তি বাড়াচ্ছে বিজেপি। তার গতিবেগ যাতে বাড়ে সেদিকেই নজর বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের।

শুধু উত্তর বা পূর্বই নয়, গেরুয়াবাহিনীর নজর এবার দক্ষিণ ভারতেও। যেমন কেরালা। সেখানে বিজেপি কোনো আসন না পেলেও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস) কিন্তু তাদের কাজ করে যাচ্ছে এবং পায়ের তলায় জমিও খুঁজে পেয়েছে।

এখানে বলে রাখা ভাল, আরএসএস প্রচারকদের দৌলতে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি আদিবাসী এলাকাগুলোয় ভাল ফল করে। বাম দলগুলো আগে এদের মাঝে ভালো কাজ করত। কিন্তু তাদের পতনের ফলে এই এলাকাগুলোয় তৈরি হয় রাজনৈতিক শূন্যস্থান, যা পূরণ করেন স্বয়ংসেবকরা। ব্যাস, গেরুয়া দলের কেল্লা ফতে!

বিগত দশকে রাজনীতির আখড়ায় পরপর জয় পাওয়া সত্ত্বেও বিজেপি একদিকে যেমন আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে, তেমনি কর্মীদের চাপ দিতে থাকে হেরে যাওয়া আসনগুলো কেড়ে নেওয়ার জন্যে। এখন রামমন্দিরের উত্তেজনা তারা যেনতেনপ্রকারেন ছড়িয়ে দিতে চায় দক্ষিণে। মাধ্যম – মহাতারকা রজনীকান্ত।

যেমন বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে আমন্ত্রণ করা হচ্ছে প্রাণপ্রতিষ্ঠা দিবসে, তেমনই অনুরোধ করা হয়েছে রজনীকান্তকে। পাঁচ দশকেরও বেশি দীর্ঘ কেরিয়ারে তিনি তামিল, হিন্দি, তেলুগু, কন্নড়, বাংলা এবং মালয়ালম ভাষার প্রায় ১৭০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম সফল এবং জনপ্রিয় অভিনেতা হিসাবে বিবেচিত। তাঁর অনন্য স্টাইল তৈরি করেছে বিশাল আন্তর্জাতিক ভক্তকুল। তাঁকে ২০০০ সালে পদ্মভূষণ, ২০১৬ সালে পদ্মবিভূষণ প্রদান করে ভারত সরকার। আবার ২০১৯ সালে তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে দেওয়া হয়। দক্ষিণ ভারতে উত্তরের এই জানুয়ারির ঠান্ডায় প্রাণপ্রতিষ্ঠার উত্তেজনার উষ্ণতা ছড়াবার জন্য তিনিই তো আদর্শ মাধ্যম। তিনি ছাড়াও শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের তরফে ৩,০০০ ভিভিআইপি সহ ৭,০০০ ব্যক্তিকে এই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে।

অন্যদিকে একটা চাপা উৎকণ্ঠা দেখা যাচ্ছে। মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি ছাড়া তেমন পরিষ্কারভাবে কোনো দলের নেতা কিন্তু আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেননি। কারণ, যাওয়া মানে বিজেপির এই ব্যাপক কর্মযজ্ঞকে শুধু সমর্থন জানানো নয়, প্রায় তাদের নেতৃত্ব মেনে নেওয়া। আবার না গেলে বিজেপি নেতাদের খোঁচা খেতে হবে, হিন্দুবিদ্বেষী বলে চিহ্নিত হতে হবে। হয়ত রামনামকে বদনাম করা হবে। আর তার ফলে হয়ত কয়েকমাস পরে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের মহামূল্যবান ভোট কাটা পড়তে পারে।

যে বলয়ে বিজেপি এত জাঁকিয়ে বসে সেখানে এত বড় একটা ঝুঁকি নেওয়া যায়? তাই কী করি কী করি ভাব। বড্ড চাপের মুখে ধর্মনিরপেক্ষ, উদারপন্থী বলে পরিচিত দলগুলো। নির্বাচনই তো সংসদীয় গণতন্ত্রে রাজনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠি। সেখানে ঠিক-বেঠিকের তুলনার থেকে বেশি দরকার হয় জনপ্রিয়তা।

আরো পড়ুন কলকেতার নূতন রামনবমী ও নূতন রাম

একসময় জাতিভিত্তিক মণ্ডল কমিশনকে রাজনীতিতে হারিয়ে দিয়েছিল ‘কমণ্ডল’ (কমণ্ডলু) – অর্থাৎ ধর্ম। রামমন্দির থেকে ঈগলের চোখ সরানো যায়নি জাত বা বর্ণ দিয়ে। প্রাণপ্রতিষ্ঠার অনুষ্ঠানকে সঙ্ঘ পরিবারের দ্বিতীয় রামমন্দির আন্দোলন হিসাবে দেখা হচ্ছে। তারা এই সুযোগ ব্যবহার করে হিন্দু সমাজকে একত্রিত করার চেষ্টা করছে। সেখানে কি ঝুঁকি নেওয়া চলে?

এককালে কংগ্রেসেও এমন নেতা ছিলেন যাঁদের দক্ষিণপন্থী বলে ধরা হত। যেমন গোবিন্দবল্লভ পন্থকে অনেকে দক্ষিণপন্থী, বিতর্কবাদী বলে চিহ্নিত করে থাকেন। আবার সঞ্জয় গান্ধীকেও সেই শ্রেণিতে ধরা হয়ে থাকে। পরবর্তীকালে কংগ্রেসের একটা গোষ্ঠী নাকি অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির বানাবার কথা তুলেছিল। বলা হয়, তাতে নাকি রাজীব গান্ধী বাদ সাধেন। আবার ১৯৯২ সালে যখন করসেবকরা অযোধ্যায় জমায়েত শুরু করেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও কিন্তু টুঁ শব্দ করেননি। তাঁর মন্ত্রিসভার এক প্রতিমন্ত্রী আমায় অনেক পরে বলেছিলেন যে ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রচেষ্টা চলাকালীন নাকি অনেকেই নরসিমাকে ‘কিছু’ করতে অনুরোধ করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নীরব ছিলেন।

অনেকেই মনে করেন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ নরসিমা জানতেন যে অতি দমনকারী নীতি রাজনৈতিক বুমেরাং হয়ে যেতে পারে। তার দুবছর আগেই করসেবকদের অযোধ্যায় রুখতে উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মুলায়ম সিং যাদব গুলি চালাবার হুকুম দেন। তার ফলে আরও জোরদার হয় মন্দিরের দাবি। আবার অনেকে বলেন, নরসিমা নিজেও সেখানে মন্দির চাইতেন। কোনটা সত্যি তা তাঁর মতো নেতা এবং চাপা মানুষের কাছ থেকে হয়ত কেউই জানতে পারেননি। তাই হয়ত কংগ্রেসের অনেকে এখনো ভাবেন – আহা, তখনই যদি সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সমঝোতা করে মন্দিরটা আমরাই বানাতাম…

মনে পড়ে, সেদিন আমরা কজন মার খেয়ে গা বাঁচাতে ‘সীতা কি রসোই’-এর দোতলায় একটা ছোট্ট ঘরে আশ্রয় নিয়েছি আর ঘুলঘুলি দিয়ে বাইরের দৃশ্যটা দেখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। যখন বিকট শব্দে বাবরি মসজিদ মুখ থুবড়ে পড়ল, আমার পাশে এক বর্ষীয়ান সাংবাদিক বললেন, “আর কেউ বিজেপির দিল্লির মসনদে বসা রুখতে পারবে না।” ঠিক তাই ঘটল।

এবার শুরু দ্বিতীয় পর্ব – যেখানে কেন্দ্রে ও রাজ্যে বিজেপি সরকার, যেখানে কংগ্রেস ও মুলায়ম-পুত্র অখিলেশ কিংকর্তব্যবিমূঢ়, যেখানে বিজেপির বিজয়রথ অশ্বমেধের ঘোড়ার মতো ছুটে চলেছে, রাজ্যের পর রাজ্যে জয়ের পর অযোধ্যায় আসন্ন রামমন্দির উদ্বোধনের জাঁকজমক দেখে দলটাকে অপ্রতিরোধ্য বলে মনে হচ্ছে। এমনকি সংবাদমাধ্যমও ঘোষণা করতে শুরু করেছে, মোদীর তৃতীয় মেয়াদ নাকি অনিবার্য।

উত্তেজনা টানটান। পরের অধ্যায় কী? সত্যিই কি ‘অযোধ্যা কি তৈয়ারি হ্যায়। কাশী, মথুরা বাকি হ্যায়’?

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.