রামনবমীর দিনে কলকেতায় ভারী মোচ্ছব হবে শুনচি। কারা সব অস্তর টস্তর হাতে প্রোসেশন বার করবে। ছোট গবর্নমেন্ট মানা করচেন না বলে অনেকে বেজায় চটেছেন। তা দেকে মনে পল্ল, ক বচ্ছর আগে এম্নি দিনের কাণ্ড দেকে নকশা লিকেছিলেম। সে কতা সম্পাদককে বলতে সে বল্লে, এবারে তবে সে নকশাটিই ফের পোস্টানো হোক। পাবলিক সিনেমায় রিমেক খাচ্চে, সাইটে খাবে না এ বা কি কতা?

একেলে বাবু-বিবিদের রঙ্গ দেখব আর নকশা লিকে নিজের ও পরের মনোরঞ্জন করব বলে দেড় শতক পরে মর্ত্যে এসে গা ঢাকা দিয়েচি। তা যে নকশাখানা লিকলেম সেটি তেমন কল্কে পেলে না, কোনো বাবু বিবি রিটুইট কল্লেন না। কী করি? মনের দুখখে বাংলা খাচ্চিলেম খালাসীটোলায়। অমন দিশি মদ জীবন থাকতে কখনো খাইনি, মরণদশাতেও খেতেম না ঘটক চাপাচাপি না কল্লে। ছোঁড়ার এ জিনিস অ্যামন মনে ধরেচে যে যমদূতগুলিকে উৎকোচ দিয়ে বোতল আনায় আমাদের নরকে। তা যেই শুনেচে আমি ইদানীং ভূত হয়ে মর্ত্যে এসে রয়েচি, আমায় থেকে ফোন করে বল্লে (আমাদের হ্যান্ডসেট লাগে না। মগজে টাওয়ার আচে, নাম ধরে ডাকলেই মাতার ভেতরে ট্রিং ট্রিং) একদিনের জন্যে আসতে চায়। ক্যানো? না মানবদেহ ধারণ করে খালাসিটোলায় যাবে, আমার সঙ্গে দু পাত্তর খাবে। বল্লে, তোমার বাবুগিরির দিন গিয়েছে, হুতোমবাবু। তাছাড়া তুমি যে কোয়ালিটির মাল খেতে ওসব আর পাওয়াও যাবে না এখন। আজকাল সব ভেজাল, শুধু বাংলাটাই খাঁটি। তোমাকে খাইয়েই ছাড়ব, শালা বুর্জোয়া।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সেই ১৯৭৬ হতে দেকচি ঘটক বুর্জোয়াদের দুচক্ষে দেকতে পারে না কিন্তু আমার বেলায় ওটি অ্যাফেকশনের হাঁক। তবে ভাবনা হচ্চিলো। মানুষের মদ্যে যাব, কেউ চিনে ফেলে ভির্মি খেলে কী উপায় হবে? খামোকা হার্টফেল করে অক্কা পেলে যম ব্যাটা বেজায় ঘ্যানঘ্যান করবে। ঘটক বল্লে, ধুর! বাঙালি চিনবে তার ইন্টেলেকচুয়াল আইকনদের? ওদের ইন্টেলেক্ট কবে হাওয়া হয়ে গেছে। বিশেষ করে পশ্চিমবাংলার মালগুলোর। শালারা নিজেদের ইতিহাস ফিতিহাস কিস্যু জানে না। কেউ চিনবে না আমাদের। তাছাড়া কোনও মিডলক্লাস প্রিটেন্ডার খালাসিটোলায় যায় না। ওটা খাঁটি প্রোলেতারিয়েতদের জায়গা, হুতোমবাবু। অতেব আসতে হলো। ঘটককে না বলার এলেম নরকে কারো নেই, যমেরও না।

তবে খালাসীটোলা স্থানটি যে অ্যামনধারা তা ভাবিনি। একানে যারা পান কত্তে এসেচে তাদের মাঝে আমি কালেভদ্রে গিয়েচি তবে অ্যামন কুজায়গায় বসে জম্মেও পান করিনি। শরীর থাকতে যদি আসতেম তবে আমার নকশা দু গুণ রঙ্গীন হত। শুনে ঘটক বল্লে, মানুষ নিজের পরিবেশ তৈরি করতে পারে না, বুঝলে? কিন্তু পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে এবং সেটা করার চেষ্টা করে যাওয়া উচিৎ অ্যাজ লং অ্যাজ হি লিভস। তুমি তোমার জীবনে সেইটে করেছ। তোমার লেখা তোমার সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে — আমি বলব প্রোগ্রেসিভ। নট রেভোলিউশনারি, বাট প্রোগ্রেসিভ।

বলে গলায় আরেক পাত্তর ঢাল্লে, আমিও ঢাল্লেম। দু-তিন পাত্তরের পর আমারও বাংলা বেশ লাগচিল। শুধোলেম, আমার লেকা যদি কালের চেয়ে এগিয়ে থাকে, তালে অ্যাকন কেউ পড়চে না ক্যানো?

বল্লে, স্কাউন্ড্রেল তাই। আমরা সবাই স্কাউন্ড্রেল। আমরা নিজের দিকে তাকাতে ভয় পাই, আমরা অস্বস্তিকর চিন্তাগুলো এড়িয়ে চলি। সেইজন্যেই তো কোনও শুয়োরের বাচ্চা আমার ছবি দেখতে চাইত না, কেউ আমার ছবির জন্যে টাকা দিত না। মানুষকে সময় দাও, একদিন পড়বে। শুধু লিখে যাও। তুমি থাকবে না, তোমার লেখাগুলো থাকবে।

বাংলার ঝাঁজে না ঘটকের কতার ঝাঁজে জানিনে, ভাবতে শুরু কল্লেম পরের নকশাটি কী নিয়ে লেকা হবে। ভেবে ওঠার আগেই ঘটক বল্লে, চল হুতোমবাবু, একটু হাওয়া খেতে খেতে হাঁটা যাক আর ভাবা প্র্যাকটিস করা যাক। দেখি কলকাতাটা কতটা ক্ষয়ে গেছে। দেখাই যাক বড়লোকগুলো কতটা অসভ্যের মত বড়লোক হয়েছে আর গরীবগুলো কতটা অমানুষের মত বেঁচে আছে।

হাঁটতে শুরু কল্লেম। ঘটক আমার চে ৮৫ বছরের কনিষ্ঠ হওয়ায় আজকের কলকেতা ভালো চেনে। এ সওয়ায় ওর পথ ও নিজেই ঠিক করে। তাই ঘটকের দ্যাকানো পথেই চল্লেম। সবে হিঁদু কালেজ পেরিয়েচি, দেকি অবাক কাণ্ড। হিঁদু কি হেয়ার সায়েবের ইস্কুলে পড়বার মতোন কচি কচি ছেলেরা হেঁটে আসচে। কপালে গেরুয়া পট্টি আর হাতে গুচ্ছের ধারালো অস্তর। মুকে আবার বাণী। কী বাণী? না জয় শ্রীরাম। কচিদের সঙ্গে ধেড়েও কম নেই।

আমি তো থ, ভাবলেম ঘটক বুজি বেত্তান্তটি জানে। কিন্তু দ্যাকা গেল সে হাবার মতোন চেয়ে চেয়ে দেকচে। ঝোলা থেকে বাংলার ছিপি হারানো বোতলটি বের করে খেলে অ্যাক ঢোঁক, তারপর আমায় শুধোলে, এই রামটা কি কোন নেতাটেতা নাকি? সামনে কোনও ইলেকশন আছে? বুজুন! নিজে সেদিনকার ছেলে, তবু জানে না। হুতোম জানবে কেমন করে? যা হোক, ততক্ষণে মোচ্ছবের লেজটি দ্যাকা গ্যাচে, ভাবচি এরা চলে গেলেই এগুবো। দেকি সেটি হবার জো নেই। লেজের দিক হতে আরেকটি মিছিল আরম্ভ হয়েচে — বীরাঙ্গনা বউ-ঝিদের মিছিল। তেম্নি সাজগোজ আর অস্তরের ঝিলিক। বল্লেম, এই রাম লোকটি যদি সত্যই নেতা হয়, তবে তো বেজায় পপুলার! নাকি সেনাবাহিনীর বড় কত্তা? এ তো ছোটখাটো মিলিটারিই দেখচি।”

ঘটক বেমক্কা ক্ষেপে গিয়ে বল্লে, দাঁড়াও, আজ ফিরি নরকে। ঐ ইস্ট বেঙ্গলের ছোঁড়াগুলোকে আমি দেখাব মজা। শালা জোয়ান ছেলেপুলে। এদিকে একটা যুদ্ধ লেগেছে ওরা জানেই না! একটিবারও বলেনি। আমি জানতাম বাংলায় শেষ যুদ্ধ হয়েছে সেই নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ানে।

কিন্তু এ ক্যামন যুদ্ধু? কে কার সনে লড়চে কিচুই তো টের পেলুম না। কোলকেতার পথে যুদ্ধুই বা কবে হয়েচে?

অদ্ভুত ঠিকই তবে আমার জীবনে যে এরকম দেখিনি তা বলব না। নাইন্টিন ফর্টি সিক্স। মুসলিম লিগের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস। পরিষ্কার মনে আছে আমার। আরে! দাঁড়াও, দাঁড়াও।

ঘটকের চোক দেকি সহসা জ্বলে উঠেচে।

আচ্ছা, এ সেই রাস্কেলগুলোই নয় তো? আমায় শুধিয়ে ফের নিজেই বল্লে, নাঃ। মুসলিম লিগ এরা নয়। কোন সবুজ পতাকা তো দেখলাম না! চাঁদ তারাও ছিল না। ছিল?”

আমিও দেকিনি। আজব ব্যাপার বটে! হুতোম ও ঘটকের দেড়শো বচ্ছরের মেমোরিতে কোলকাতায় জয় শ্রীরাম বলে অস্তর নিয়ে মিছিল নেই। হাঁটার সাধ মিটেচে। ঘটক বল্লে তকুনি নরকে গিয়ে অভিজিৎকে শুধোতে হবে, ছাতার কম্পিউটারটা দিয়ে করে কী, যদি মর্ত্যে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা-ই না জানে? বলতে যাচ্চিলেম অভিজিতের দোষ নেই, তার ল্যাপটপটি আমি বাগিয়ে এনেচি। তার আগেই মাতায় ট্রিং ট্রিং বাজলে। মধু কবির গলা, নরক থেকে ফোন করচেন।

হুতোম, তুমি তো আমার কলেজের সামনে?

আজ্ঞে।

কী ব্যাপার ওখানে? ঠিক গেটের সামনেটায় কারা সব সেই কাওয়ার্ডটার নাম করছে শুনতে পেলাম? এত জোরে চেঁচাচ্ছিল যে এখান থেকে পর্যন্ত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।

কাওয়ার্ড? ও! আপনি রামের কতা বলচেন? না, এ সে রাম বোধ হচ্চে না। ইনি তো কে এক অ্যাংগ্রি ওয়ারিয়র। এনার ভক্তদের বিলক্ষণ নখ দাঁত আচে। এইমাত্র আমি আর ঘটক স্বচক্ষে দেকলেম। কচি মেয়েরা অবধি তলোয়ার হাতে মার্চ করচে। এদের রাম আপনার রাম হবে ক্যামনে?

আমেন, মধু কবি নিশ্চিন্দি হলেন।

আমার কলেজের সামনে রামনাম হচ্ছে শুনলেই গা ঘিনঘিন করে। কখনো যদি এ জিনিস হয় না, আমি ভ্যাম্পায়ার হয়ে মর্ত্যে যাওয়ার জন্যে অ্যাপ্লাই করব, এই বলে দিলাম।

ঘটক সবই শুনতে পাচ্চিল। বল্লে, আরে দাঁড়ান, মধুদা। আপনি বড্ড তাড়াতাড়ি রেগে যান। এইজন্যেই বলি মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে খালাসীটোলা আসুন, খাঁটি বাংলা খান। মাথা ঠাণ্ডা হবে। যা-ই হোক, আমরা এক্ষুণি আসছি। অভিজিৎ এন্ড কোম্পানীকে জিজ্ঞেস করতে হবে ব্যাপারটা সম্পর্কে ওরা কী জানে।

নরকে পৌঁছিয়ে দেকি অভিজিৎ আর তার স্যাঙাতরা নেই, ব্যাটা যম কিচুতেই বলে না তারা গ্যাচে কোতায়। শেষে ঘটক ব্যাটার ধুতির কাছা ধরে এক টান মেরে বল্লে, মুখ খোল শালা, নইলে পুরো বাংলার বোতল তোর মুখে খালি করব। এমন কড়া যে অনন্তকালের বাকিটাতেও হজম করে উঠতে পারবি না। কাজ হল। শুনলেম অভিজিৎরা গ্যাচে কোন বাঙালী কবির বাড়ি ভূত হয়ে পাহারা দিতে। সে বেচারাকে নাকি কোন ভণ্ড সাধুর দল মার্ডার করবে হুমকি দিচ্চে। আমাদের এরা কবে ফিরবে তার ঠিক নেই।

ঘটক রেগে আগুন হলে। শালা, তুমি তোমার লোকেদের কাজগুলো ঐ ব্রাইট ছেলেগুলোকে দিয়ে করাচ্ছ? যম দুধে মুক দিয়ে গেরেফতার হওয়া পোষ্য বিড়ালের মতন নত হয়ে বল্লে কাউকে খুনীর হাত থেকে রক্ষা করে মোটেও তার দলবলের কাজ নয়, মার্ডারটি হয়ে গেলে বডি নিয়ে আসাই কাজ। অভিজিৎ এ কাজটি কত্তে নিজেই যমকে সাধাসাধি করেচে।

মহা ফাঁপরে পল্লেম। শেষে মনে পল্ল কবি কৃত্তিবাসের কতা। তেনার রামের নাম কচ্চিল না তো বানরগুলো? একবার খোঁজ কল্লে হয়। তেনার সাথে সগগে গিয়ে দেখা কত্তে হবে। যম অথোরাইজ না কল্লে সগগে এন্ট্রি পাওয়া হয় না। ঘটকের চোকরাঙানির চোটে যম দু মিনিটেই বেওস্তা করে দিলে। সেকানে ভিজিটর্স রুমে বসেচি, দরোয়ানটি এসে জানালে হাপিত্যেশ করে বসে থাকতে হবে। কৃত্তিবাস, তুলসীদাস ও বাল্মীকি একত্র পুজো কচ্ছেন।

শুধোলেম, তিন রামায়ণের কবি মিলে কী পুজো, বাবা?

দরোয়ানজি বেজায় রেগে বল্লেন, আপনারা কি মেলেচ্ছ না নাস্তিক? আজ রামনবমী জানেন না?

হুতোমবাবুর কথা জানি না, তবে হ্যাঁ, আমি পাক্কা নাস্তিক। আর আমরা তো নরকের কীট। আমাদের ভগবানের খবর নিয়ে হবেটা কী? ঘটক একেবারে হাঁকড়ে দিলে বেচারিকে।

কতখন এম্নি কেটেচে জানিনে, শেষে কৃত্তিবাস এলেন। যা দেকেচি সব বল্লেম। যেই না শুধিয়েচি সেই বানরগুলো ওনার রামেরই নাম কচ্ছিল কিনা, অমন ঠাণ্ডা লোক আমাদের মাত্তে বাকি রাখলেন। শোন, আমার রাম নরম মনের মানুষ। বউকে, ভাইকে ভালবাসেন। সীতার দুঃখে কাঁদেন। তিনি কখনো বানরসেনাকে বলতেন না এইভাবে রাস্তাঘাটে নিরীহ লোকেদের ঢাল তরোয়াল দেখাতে। ছোঃ! আর শিশুদের হাতে ওসব? কখনও না। ছি ছি ছি। তাঁকে তোরা এইসব বদনাম দিচ্ছিস। পাপের ভয় নেই রে?

আমি হাতজোড় করে বল্লেম, কবির দয়ার শরীর। ক্ষমা কত্তে আজ্ঞা হোক। আমরা কেবল মিছিলের আরাধ্য রামকে খুঁজচি। আর কিচু নয়। রামকে খুঁজলে কি পুণ্যি হয় না?

তা কল্লেন ক্ষমা। তকন সাহস করে বল্লেম, একবার তুলসীদাসজি আর আদিকবি বাল্মীকির সনে দ্যাকা হয় না? উনি সে বন্দোবস্তও করে দিলেন।

তুলসীদাসজিকে শুধোতে তিনিও খাপ্পা।

তোরা রামচরিতমানস পড়িসনি, হতভাগা? ভগবান রাম একজন বিরাট বীর। তাঁর শিশু আর মহিলাদের যুদ্ধে নামাতে লাগে না। বরং তাঁকে যারা ভালোবাসে তাদের জন্যে তিনি সব করতে পারেন। জানিস না তিনি চারটে হাত আর আরো সব দৈবশক্তি নিয়ে জন্মেছিলেন কিন্তু মা কৌশল্যার স্নেহ চরিতার্থ করতে সেসব ছেড়ে সামান্য শিশুর রূপ ধারণ করেন? তার নামে বলছিস তিনি শিশুদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছেন! তোদের সর্বনাশ হবে।

আমাদের ক্ষমা ভিক্ষা করার অবসরও দিলেন না, প্রস্থান কল্লেন। ঘটক অবশ্যি ক্ষমা টমা চাইত না। তকন তার কেটে পড়ার তারা। বলচে একানে সুবিধে হবে না। আমি অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে বাল্মীকির জন্যে বসিয়ে রাখলেম।

মহর্ষি আমাদের কতায় চটলেন কম, দুখখু পেলেন বেশী। বল্লেন, তোরা অবিশ্বাসীরা বড় প্যাঁচালো মনের লোক। আমি প্রথম জীবনে দস্যু ছিলাম বলেই তোরা এসব বলছিস আমায়। বলতে গেলেম আমরা তেম্নি পাষাণ নই, কিন্তু কিচুতেই মানবেন না। চোকের জল ফেলতে ফেলতে বল্লেন, বোকা বানানোর চেষ্টা করিস না, বাপ। আমি জানি, তোরা বিশ্বাসই করিস না যে ভগবত প্রেমে মানুষ বদলাতে পারে। শোন, আমি শুধু বসে বসে বানিয়ে বানিয়ে রামায়ণ লিখিনি রে। আমি তাঁকে নিজের মধ্যে অনুভব করেছি। অযোধ্যা কোথায় জানিস? আমার বুকের ভেতরে। রাম ছিলেন শ্রেষ্ঠ নরপতি। যাকে বলে রাজার রাজা। তেমন রাজা কখনো শ্যাম, যদু, মধুকে অস্ত্র নিয়ে রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াতে দেন না। তোদের ও খুনেগুলো কখনো আমার রামের ভক্ত হতে পারে না।

কেউ রামের হদিশ দিতে পাল্লে না দেকে ঘটক এম্নি হতাশ হলে যে নরকে ফেরার পথেই ঝোলায় যে বোতলটি ছিল সেটি খতম করে ফেল্লে। আমিও চিন্তায় পল্লেম। আমায় কিনা লোকে বলত ক্ষণজন্মা, বিদ্যেসাগরমশায়ের মতোন পণ্ডিতের আমার জ্ঞানে বিশ্বাস ছিল, মাত্তর তিরিশ বচ্ছরের জীবনে মহাভারত অনুবাদ করেচি বাংলায় — সেই আমি কিনা জানতেমই না বাংলায় অমন এক জঙ্গি দেবতা আচেন! যদি সে দেবতার জন্ম আমার বিদেয় হওয়ার পরেও হয়, মধু কবি জানেন না এ বা কি কতা? নিদেন ঘটক তো জানবে? সগগের বাঙালীরাও জানে না কী হেতু? জানলে কৃত্তিবাস জানতেন। অমন পপুলার জঙ্গি দেবতা বাঙালীর সেঞ্চুরির অধিক বচ্ছরের মেমোরিকে ফাঁকি দিলেন কোন ফিকিরে?

নরকে এসে রেস্ট নিয়ে সবে মর্ত্যে ফেরার উপক্রম কচ্ছি, হেনকালে ঘটক পিলে চমকে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলে, ইউরেকা। তারপর আমার হাত ধরে টানতে শুরু কল্লে। কিছু বোঝবার আগেই দেকি আমরা চুপচাপ বেহ্ম আর্টিস্টটির ঘরে। সুকুমার রায়। সে কী সব আঁকিবুকি কাটচিল, ঘটক সেসবের তোয়াক্কা না করে সোজা শুধোলে, আপনি রাম-রাবণের যুদ্ধ নিয়ে সেই কী নাটকটা লিখেছিলেন? আঃ! এত ভুলে যাই আজকাল। কী ছিল নামটা?

সুকুমার তার দুষ্টু হাসিটি হেসে বল্লে, তোকে কতবার বলেছি, তুই বড্ড বেশি খাচ্ছিস। অত খেলে কি আর মাথা কাজ করে রে? নাটকটার নাম লক্ষ্মণের শক্তিশেল।

ঠিক, ঠিক। ঘটক আমায় বল্লে, ওটা ওনার সেরা কাজগুলোর একটা। তুমি অবশ্যই পড়ো, হুতোম। ওখানে রামের সেনাবাহিনীটা হাস্যকর অ্যামেচারদের। আমরা যে আর্মিটা দেখলাম সেটাও তো তাই, কি বলো? তার মানে ওরা সুকুমারকাকুর রামের নামই করছিল।

কোন আর্মি?, সুকুমার জানতে চাইলে। আমাদের কলেজের সামনে দিয়ে আজ যারা গেছে? মাইকেল বলছিলেন। ঘটক, তুই ঠিক ধরতে পারিসনি। ওরা আমার রামের ভক্ত হতে পারে না। আমার রাম যুদ্ধ করতে একদম পছন্দ করত না। তোর বোধহয় মনে নেই, লক্ষ্মণের শক্তিশেলের রাম কিন্তু সারাক্ষণ রাবণের সাথে যুদ্ধটা এড়াতে চাইছিল। কিন্তু মাইকেল তো বললেন এই উল্লুকগুলো নাকি লড়াই করার জন্যে উসখুস করছিল। আর তাছাড়া অত লোক আমার নাটকটা পড়েছে এ তুই আমায় বিশ্বাস করতে বলিস? জানিস না আজকাল বাংলা না পড়া ফ্যাশন হয়েছে?

নাটকটি পড়া না থাকলেও মর্ত্যের হাল যা দেকেচি, বুজলেম সুকুমার যথার্থ বলেচে। ঘটকও বুঝল। সুকুমারের আঁকার খাতাটির উপরেই বডি ফেলে দিয়ে বল্লে, হুতোম, হাল ছেড়ে দিলাম।

আমিও দিলেম। অ্যাকন অভিজিৎ, নীলয়, অনন্ত ফেরা অবধি গালে হাত দিয়ে বসে থাকা ভিন্ন উপায় নেই। ইতোমধ্যে আপনারা কেউ এই অচেনা রামের আধার কার্ডটি যদি পান তো হুতোমকে জানাবেন।

 

এই নকশা অধুনালুপ্ত turiyam.live এ ২০১৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। ঈষৎ পরিমার্জন করে পুনঃপ্রকাশ করা হল

আরো পড়ুন

গান্ধারের বানর সেনা: আয়নায় উঁকি

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.