১৯৪৮ সালের মার্চ মাসের ৮ তারিখ। এমনই এক বসন্তের দিনে সন্দেশখালির দোর্দণ্ডপ্রতাপ জোতদার দেবেন্দ্রনাথ সর্দারের কাছারি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন কৃষকরা। তেভাগা আন্দোলন তখন তুঙ্গে। সন্দেশখালিতে তেভাগার পতাকা হাতে কৃষক সভাকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন হেমন্ত ঘোষাল। তাঁর সঙ্গেই আরও একঝাঁক ডাকাবুকো চাষি – রতিরাম সর্দার, চামু বিশাল, পারুল সর্দার, বাতাসি সর্দার, থুপা সর্দার। প্রতিটি কৃষক পরিবার থেকে একজন করে যুবক, একটি লাঠি, এক টাকা – এই নিয়ে গড়ে উঠেছিল দুর্বার সংগঠন।

দেবেন্দ্রনাথের কাছারি বাড়ি যেমন পুড়েছিল, তেমনই পাল্টা আঘাত হেনেছিল জোতদারের বাহিনীও। রক্তাক্ত হয়েছিলেন বহু আন্দোলনকারী। সন্দেশখালির বুকে আজও তেভাগা আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রেখেছে একটি সুউচ্চ স্তম্ভ। মুষ্টিবদ্ধ হাতের ভাস্কর্যটি জরাজীর্ণ। তার গায়ে সময়ের পলি পড়েছে। গাছ গজিয়ে গিয়েছে সর্বাঙ্গে। দেখে বোঝা যায়, যত্ন করার কেউ নেই।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

আজ দেবেন্দ্রনাথের মত কোনও জোতদার নেই সন্দেশখালিতে। কিন্তু গ্রামবাসীদের অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেসের হাত ধরে কায়েম হয়েছে নয়া সামন্ততন্ত্র, জমি হাঙরদের মুক্তাঞ্চল। শেখ শাহজাহান এই গ্রামীণ শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রে। তাঁর চারপাশ আলো করে আছেন সিরাজউদ্দীন, শিবপ্রসাদ (শিবু) হাজরা, উত্তম সর্দার, অজিত মাইতির মত লোকজন। অভিযোগ, তেভাগার স্মৃতিতে রাখা উদ্যান নিজের স্ত্রীর নামে দখল করে নিয়েছেন শাহজাহানের ভাই সিরাজউদ্দীন। সন্দেশখালির আন্দোলনে প্রায় আট দশক আগের তেভাগা আন্দোলনের ছায়া। সে আমলের জোতদার দেবেন্দ্রনাথের কাছারি বাড়ির মতোই বেড়মজুরের কাছারি গ্রামে তৃণমূল নেতা অজিত মাইতির আলাঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন গ্রামবাসীরা। শিবু হাজরার মুরগির খামারের একাংশ গুঁড়িয়ে গিয়েছে জনরোষে।

তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রবল ক্রোধে ফুটছে সন্দেশখালি। মহিলারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। ভয় কেটে গিয়েছে তাঁদের। গ্রামবাসীদের বিস্তর অভিযোগ ‘সন্দেশখালির বাঘ’ শাহজাহানের বিরুদ্ধে। গায়ের জোরে অন্যের জমি দখল, সেই জমিতে মাছের ভেড়ি তৈরি করা, চাষের জমিতে নোনা জল ঢুকিয়ে দেওয়া, মহিলাদের শ্লীলতাহানি, রাতের বেলা পার্টি অফিসে ডেকে পাঠানো, বীভৎস অত্যাচার, নৃশংস মারধর, প্রায় ভূমিদাস প্রথার মত দিনভর কাজ করিয়ে টাকা না দেওয়া, টাকা চাইলে কোদালের হাতল দিয়ে মার, মারতে মারতে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া চাষির মুখে জল দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আবার মার, টানা ১৬ ঘন্টা বিনা মজুরিতে কাজ করিয়ে টাকা চাওয়ার অপরাধে বিরাট মাঠে দশ পাক দৌড় করানো – শুনতে শুনতে শিউরে উঠতে হয়। সব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব নয়। কিন্তু অনেকখানিই যে সত্য, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

গ্রামবাসীরাই বলছেন, বাম আমলে সিপিএমের ছত্রছায়ায় ছিলেন শাহজাহান। যদিও বড় নেতা ছিলেন না তিনি। সেই সময়ে দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা ছিলেন তাঁর দাদু মোসলেম সেখ। সিপিএমের পঞ্চায়েত প্রধান ছিলেন তিনি। শাহজাহানের হাত ধরে এখন তিনিও তৃণমূলে। রাজ্যে পালাবদলের পর তৃণমূলের ছায়ায় বিপুল উত্থান ঘটে শাহজাহানের। কার্যত নিজের রাজত্ব কায়েম করেন তিনি।

শাহজাহানের ‘সন্দেশখালির বাঘ’ হয়ে ওঠার জন্যে অনেকেই দায়ী করছেন অধুনা মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়া তৃণমূলের নেতা জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে। সন্দেশখালির এক আদি তৃণমূল নেতার বক্তব্য, শাহজাহান, শিবু, উত্তম, সিরাজদের গুরু ছিলেন জ্যোতিপ্রিয়ই। এই নব্য তৃণমূলীরা কেউই ২০১১ সালের আগে জোড়াফুলের পতাকা ধরেননি। হাসনাবাদের বাবু মাস্টারের মতই শাহজাহানদেরও তৃণমূলে উল্কার গতিতে উত্থান হয় বালুর প্রশ্রয়ে। মাছের ভেড়ি এবং চিংড়ি ব্যবসার অর্থনীতির সুবাদে বিপুল অর্থের মালিক হন শাহজাহানরা। সেই জোর খাটিয়ে জমি দখল, নোনা জল ঢুকিয়ে জমির চরিত্র বদলের মত কাজ করা হয়। বস্তুত শাহজাহানদের দাপট যে কতখানি তা তাঁদের জমির পরিমাণ দেখলেই মালুম হয়। সরবেড়িয়ায় নিজের নামে একটি আস্ত বাজার আছে শাহজাহানের। শিবু হাজরার গ্রামে বিরাট অঞ্চল জুড়ে বিঘার পর বিঘা জমিতে পোলট্রি ফার্ম। গ্রামবাসীরা দেখাচ্ছিলেন, শাহজাহান ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের ভেড়ি যেন শেষই হচ্ছে না। অভিযোগ, এই বিপুল সম্পত্তির প্রায় পুরোটাই গায়ের জোরে দখল করা।

অভিযোগের অন্ত নেই। বেড়মজুরে দেখা হয় এক বৃদ্ধের সঙ্গে, নাম অনন্ত ঢালি। পা টেনে হাঁটছেন, মলিন পোশাক। প্রশ্ন করতেই গলগল করে বেরিয়ে এল ক্ষোভ- ‘১০০ দিনের কাজ করলাম উদয়াস্ত খেটে। একটা টাকা দিল না। উল্টে পিটিয়ে পা খোঁড়া করে দিল।’ পাত্রপাড়া, বেড়মজুর, কর্ণখালি, পুকুরপাড়া, হালদারপাড়া – সব জায়গা থেকেই এইভাবে বেরিয়ে আসছে ঘৃণার বাষ্প। হালদারপাড়ার শ্রীকান্ত মাহাতো হাত ধরে নিয়ে গেলেন বাড়ির দাওয়ায়, ডেকে আনলেন মহিলাদের। স্কুলবাড়িতে নিয়ে গিয়ে মারধরের অভিযোগ, জব কার্ডের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ। এই মানুষজনের দাবি, তাঁরা সকলেই তৃণমূল করেন, আগেও তৃণমূলই করতেন। কিন্তু শাহজাহানের অত্যাচার নেমে এসেছে তাঁদের উপরেও।

উত্তপ্ত সন্দেশখালিতেই দেখা হল সুজয় মণ্ডলের সঙ্গে। শাহজাহান চক্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মুখ এই প্যারাটিচার। তিনি কিন্তু তৃণমূলের লোক। ২০০৯-১৩ পর্যন্ত পঞ্চায়েতের প্রধান থাকা সঞ্জিত দাস জানালেন, শাহজাহানদের নেতৃত্বে জমি কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেছিলেন সুজয়। তৃণমূলের কর্মী হয়েও রেহাই পাননি, জেলে যেতে হয়েছিল। পরে জামিন পেয়ে আর এলাকায় ঢুকতে পারেননি। ‘মাস্টার’ সুজয় এখনো তৃণমূল করেন। শাহজাহান গ্রেফতার হওয়ার পর এখন তৃণমূল নেতৃত্বের সুনজর পড়েছে তাঁর দিকে। পার্থ ভৌমিকরা এলাকায় গিয়েই প্রথমে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন। সুজয় এখনো ভরসা রাখছেন মুখ্যমন্ত্রীর উপরেই। তাঁর কথায়, ‘শাহজাহানদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আক্রান্ত হয়েছি, জেলে গিয়েছি। আশা করি নেতৃত্ব এখন সঠিক ব্যবস্থা নেবেন।’

সন্দেশখালির রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, ঠিক যেন বেশ কয়েক দশক আগের বাংলায় ফিরে গিয়েছি। যে জমি এলাকার বেতাজ বাদশা এবং তাঁর অনুগামীদের পছন্দ, সেটিই তাঁরা নিয়ে নেবেন। মৌসুমি হালদার নামে এক মহিলা যেমন বলছিলেন, তাঁর স্বামীর মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সিরাজের বাহিনী। স্বামী এবং সন্তানদের প্রাণরক্ষার বিনিময়ে জমি তুলে দিতে হয়েছিল তাদের হাতে। রেজিস্ট্রি অফিসেই গায়ের জোরে জমি দখল হয়েছিল। তার আগে বাড়িতে হামলা, ধর্ষণের হুমকি, ভাতের হাঁড়িতে লাথি – কী হয়নি? পুলিসের কাছে গিয়েছিলেন মৌসুমি। পুলিস বলেছিল সিরাজের কাছেই বিচার চাইতে যেতে। এই সিরাজ এলাকায় পরিচিত সিরাজ ডাক্তার নামে, সম্পর্কে শাহজাহানের ভাই। এমন অভিযোগ অজস্র। মোদ্দা কথা, গোটা সরবেড়িয়া শাহজাহান এবং তাঁর অনুগামীদের জমিদারি। অন্তত এতদিন তাই ছিল। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গাছের পাতাটিও তাঁদের অঙ্গুলিহেলন ছাড়া নড়ে না।

কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি শাহজাহানকে গ্রেফতার করতে আসার পর থেকেই তিনি পলাতক। এই সুযোগে বহু বছরের জমানো ক্ষোভ আগ্নেয়গিরির লাভা উদ্গিরণের মতো ফেটে পড়ে। বহু বছরের অত্যাচারের বিরুদ্ধে স্রোতের মত বেরিয়ে আসেন সাধারণ মানুষ। বিপুল সংখ্যক গ্রামীণ মহিলা চলে আসেন আন্দোলনের পুরোভাগে। সিপিএম, আইএসএফ এবং বিজেপির স্থানীয় নেতারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেন ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত অর্থেই এই বিক্ষোভ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত গণপ্রতিরোধ। কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচালনায় তা হয়নি।

সন্দেশখালিতে কার্যত কোনো বিরোধী দল নেই। হালদারপাড়ার মানুষজন বলছিলেন, বহুবছর তাঁরা ভোটই দিতে পারেননি। এমনকি লোকসভা ভোটেও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ‘ম্যানেজ করে’ নির্বিঘ্নে ভোট করাত শাহজাহানের দলবল। ২০১১ সালে পরিবর্তনের ঝড়ের মধ্যেও সন্দেশখালিতে জিতেছিলেন সিপিএমের নিরাপদ সর্দার। বিধানসভায় শাহজাহান সহ তৃণমূলের নেতাদের বিরুদ্ধে সরবও হয়েছিলেন তিনি। ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটে তিনি হেরে যান। ২০২১ সালে এই আসনে লড়ে তৃতীয় হন আইএসএফের প্রার্থী। যেসব অঞ্চলে ভোট হয়েছিল, তার ভিত্তিতে দ্বিতীয় হয় বিজেপি।

আরো পড়ুন কালিয়াগঞ্জ: সংবেদনহীন প্রশাসন, সুযোগসন্ধানী বিজেপি

নিরাপদবাবু এলাকার মানুষজনের বিশেষ শ্রদ্ধাভাজন। বিশেষ করে আদিবাসী/দলিত এলাকায়। তবে সেই মানুষজনই কথা বলছেন বিজেপির সুরে। স্পষ্ট বলছেন, ‘রাম আমাদের দেবতা। কিন্তু শাহজাহান, শিবুদের রাজত্বে আমরা রামের নাম করতে পারি না। রামের নাম নিলেই মারধর।’ শুভেন্দু অধিকারী আসার আগেই গোটা এলাকা ছয়লাপ হয়ে গিয়েছে গেরুয়া পতাকায়। বিজেপির পতাকা কম, হিন্দু ধর্মীয় পতাকাই সর্বত্র। সিপিএমও নতুন করে সক্রিয় হয়েছে। বহু বছর পর এলাকায় লাল পতাকাও উড়ছে। শাহজাহান গ্রেফতার হওয়ার পর লাল আবিরও উড়েছে। তবে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানের তীব্রতা অনেক বেশি। মুসলিম শাহজাহান বাহিনীর হাতে হিন্দু আক্রান্ত – এই বয়ানের জোর বাড়ছে। শিবু, উত্তমের ধর্মীয় পরিচয় কিন্তু গৌণ হয়ে যাচ্ছে। সরবেড়িয়ায় অবশ্য এখনো জনপ্রিয় শাহজাহান, আন্দোলনের তীব্রতাও অন্য এলাকার তুলনায় কম। বস্তুত, ইডি আধিকারিকরা আক্রান্ত হয়েছিলেন এই এলাকাতেই। মূলধারার সংবাদমাধ্যম যতই সেই আক্রমণকারীদের শাহজাহান বাহিনী বলে দাগিয়ে দিক, আসলে তাঁরাও সাধারণ মানুষই।

শিয়রে লোকসভা নির্বাচন। তাই খানিকটা বাধ্য হয়েই সন্দেশখালিতে ক্ষতি যতটা সম্ভব কমানোর চেষ্টা শুরু করেছে শাসক দল। সন্দেশখালির কয়েক হাজার মানুষকে ১০০ দিনের কাজের বকেয়া টাকা দেওয়া হবে। শাজাহানের গ্রেফতারিও নিঃসন্দেহে বড় পদক্ষেপ। তবে এক দশকের নয়া সামন্ততন্ত্র যে বিপুল ক্ষত তৈরি করেছে, তার নিরাময় বেশ কঠিন।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.