কোথায় যাচ্ছি আমরা? কোন পথে এগোচ্ছে ভারত রাষ্ট্র? এই নির্বাচনে যদি বিজেপি বিপুল শক্তি নিয়ে ফিরে আসে, তবে কি একটি পূর্ণ বিকশিত ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের অভ্যুদয় শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা? নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ভোটের হিসাবে যে বিপুল পরিমাণ গরমিল দেখা দিয়েছে তা নিয়ে শুনানি করল না সুপ্রিম কোর্ট। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনের হিসাব যে এক কোটিরও বেশি সংখ্যক ভোট বাড়তি দেখাচ্ছে তা বহাল তবিয়তে রয়ে গেল। আমরা জানি, নির্বাচন কমিশনকে ইতিমধ্যেই নরেন্দ্র মোদী নিজের পকেটে পুরে ফেলতে পেরেছেন। আর এবছর প্রতি দফায় ভোটের পর যে তাৎক্ষণিক হিসাব দেওয়া হয় আর সেদিন পরের পরের দিন যে চূড়ান্ত হিসাব দেওয়া হয় তার মধ্যে পার্থক্য মাত্রাছাড়া হয়ে উঠেছে। তদুপরি কেন এই পার্থক্য হল তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এর সঙ্গে তাৎক্ষণিক তালিকা এবং চূড়ান্ত তালিকা পেশ করার মধ্যবর্তী সময়টাও ব্যাখ্যাহীনভাবে বেড়েছে কমেছে চারদিন থেকে ১২-১৩ দিন পর্যন্ত। এই নিয়ে অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্ম এন্ড কমন কজেস নামক সংস্থার পক্ষ থেকে যে মামলা করা হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত শুনল না সুপ্রিম কোর্ট। ফলে এক কোটিরও বেশি, অর্থাৎ কেন্দ্র পিছু যে ২৮,০০০ ভোট বেশি দেখানো হচ্ছে তার কোনো পরিবর্তন হল না, তার কোনো ব্যাখ্যাও নেই। এই ঘটনা সামগ্রিকভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়েই গুরুতর সন্দেহ ও আশঙ্কা তৈরি করে দিল।

বিজেপি তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এলে ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা কেমন হতে পারে তার একটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে। অনভিজ্ঞতার কারণে আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই ফ্যাসিবাদ ঠিক কী জিনিস তা বোঝেন না। আরও মুশকিল হল, শুধু যে সাধারণ মানুষ বোঝেন না তা নয়। চিন্তাশীল মানুষ, রাজনৈতিক মানুষ, রাজনৈতিক কর্মী, কমিউনিস্ট রাজনৈতিক মানসিকতাসম্পন্ন মানুষ অথবা কমিউনিস্ট রাজনৈতিক কর্মী – কোনো গোত্রের মানুষেরই একটা বড় অংশ জানেন না, বোঝেন না, অনুভব করেন না ফ্যাসিবাদ কী জিনিস। তবে এবারে বিজেপি যথেষ্ট শক্তি নিয়ে ফিরতে পারলে সকলে হাত পুড়িয়ে বুঝতে পারবেন ফ্যাসিবাদ আসলে কী বস্তু।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন ব্যবস্থা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ একটি ব্যবস্থা। এর একটা বড় কারণ ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞায় নিহিত আছে। তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং বুলগেরিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির নেতা জর্জি দিমিত্রভই ফ্যাসিবাদকে সর্বাপেক্ষা সুসংহতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর কাছ থেকে আমরা শিখেছি যে ফ্যাসিবাদ হল লগ্নি পুঁজির সর্বাপেক্ষা প্রতিক্রিয়াশীল অংশের শাসন। সুতরাং ফ্যাসিবাদ সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণির শাসন নয়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময় অন্তর বুর্জোয়াদের কোন দল শাসন করবে এটা ঠিক করা, অর্থাৎ বুর্জোয়া পার্টিগুলোর নিজেদের মধ্যেকার প্রতিযোগিতার আর কোনো প্রয়োজন থাকে না। বহু মানুষই সংসদীয় গণতন্ত্র ও সর্বজনীন নির্বাচনের ব্যবস্থাকে জনগণকে রাজনৈতিক অধিকার প্রদান হিসাবে দেখেন। সেটা ঠিকই, তবে তা সত্যের একটা দিক। অন্য দিকটা হল সর্বজনীন ভোটাধিকারের মাধ্যমে বুর্জোয়া দলগুলো নিজেদের মধ্যেকার প্রতিযোগিতা বজায় রাখে এবং তার মধ্য দিয়ে পরবর্তী পাঁচ বছরে কে শাসক হবে তা স্থির করে। কিন্তু ফ্যাসিবাদ মানেই হল বুর্জোয়াদের মধ্যেকার প্রতিযোগিতার অবসান। বুর্জোয়াদের একটা ছোট অংশের (লগ্নি পুঁজির সর্বাপেক্ষা প্রতিক্রিয়াশীল অংশ) শাসকশ্রেণি হিসাবে উত্থান। ফলত, নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং সংসদীয় ব্যবস্থা ফ্যাসিবাদী শাসনে বাহুল্য ছাড়া আর কিছু নয়। সুতরাং বিজেপি বিপুলসংখ্যক আসন নিয়ে ফেরত এলে আমাদের দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা যে চেহারা নেবে তার যে আর কোনো কার্যকারিতা থাকবে না তা বলাই বাহুল্য।

ইতিমধ্যে আরও একটা ঘটনা ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী নিজেকে ঈশ্বরপ্রেরিত বলে অভিহিত করেছেন। সম্প্রতি তিনি দাবি করেছেন, তাঁর জন্ম শারীরবৃত্তীয় পথে হয়নি। ঈশ্বরের দূত হিসাবে তিনি সরাসরি ঈশ্বরপ্রেরিত। মানবেতিহাসে এই দাবি নতুন নয়। এর আগে আব্রাহামিয় ধর্মে এরকম দাবি কেউ কেউ করেছিলেন। যিশু নিজেই দাবি করেছিলেন, তিনি ঈশ্বরের সন্তান। কিন্তু পৌরাণিক ধর্মানুসারী একজন ব্যক্তির পক্ষে এমন দাবি এতই উদ্ভট যে তা খোদ পৌরাণিক ধর্মকেই বাতিল করে দেয়। উত্তর ভারতে ভগবান হিসাবে যাঁকে সবথেকে বেশি মানা হয়, সেই রামেরও পিতামাতার কথা পুরাণে আছে। বিশ্বাসীদের কাছে সিদ্ধিদাতা গণেশের স্থান বোধহয় তাঁর পরেই। তাঁরও পিতামাতা আছেন। ‘হিন্দু হৃদয়সম্রাট’ মোদী নিজেকে অযোনিজাত ঘোষণা করে সম্ভবত দেবতাদেরও দেবতা হয়ে উঠতে চাইছেন। সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন কোনো ব্যক্তি যে তাঁর এই দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন না, সেকথা বলাই বাহুল্য। হাসাহাসি চলবে এবং চলছেও বিস্তর। কিন্তু মোদীর এই বক্তব্য খুবই ঠান্ডা মাথার অঙ্ক কষা পদক্ষেপ। অযোনিজাত ভগবানের দূতের বিরুদ্ধে যোনিজাত মানুষ লড়াই করতে পারে না, এমনকি বিরুদ্ধাচরণও করতে পারে না। বাস্তবত পারে কিনা সে প্রশ্নের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল, সে অধিকারই তাদের থাকে না। এহেন ব্যক্তি যদি দেশের প্রধানমন্ত্রী হন, শাসক হন, তাহলে সেখানে নির্বাচনের কোনো প্রশ্নই থাকতে পারে না। থাকতে পারে না তাঁকে প্রশ্ন করার ক্ষমতাও। তাই নির্বাচন, সংসদ, বুর্জোয়া গণতন্ত্র – সব প্রতিষ্ঠানেরই ঝাঁপ ফেলে দেওয়া হবে। ফ্যাসিবাদ তার পূর্ণ বিকশিত চেহারায় আত্মপ্রকাশ করবে তাতে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না।

আমাদের দেশের বহু মানুষের ধারণা, দেশে যদি গণতন্ত্র না থাকে তাতে সাধারণ মানুষের কোনো ক্ষতি নেই। যদি একটা স্বৈরতান্ত্রিক দল (এমনকি ফ্যাসিবাদী দল) লৌহমুষ্টিতে দেশ শাসন করে, যদি সে দলের নেতা আইন ও সংবিধানের ঊর্ধ্বেও হয়, যদি অন্য কোনো রাজনৈতিক দল না-ও থাকে, যদি নির্বাচন উঠেও যায়, তাতেই বা কী? ঝামেলা তাদের, অসুবিধা তাদের যারা অন্য রাজনৈতিক দল করেন, রাজনীতি করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ রাজনীতি করেন না। বছর বছর ভোট দেন মাত্র। তার বিনিময়ে তাঁদের যে খুব সুবিধা হয় এমনও তো নয়। যাদেরই ভোট দেন তারা হয়ত নির্বাচনের আগে হাত জোড় করে এক গাল হাসে, বাড়ি বাড়ি যায়, যেচে কথা বলে, কিছু প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু ভোটের পরেই তাদের অন্য রূপ জনগণের সামনে নগ্ন হয়ে পড়ে। তাঁরাই হয়ে ওঠেন অত্যাচারী, চুরি-ডাকাতি-লুঠপাটের অধিনায়ক। আত্মম্ভরিতা আর দাদাগিরির ঠেলায় সাধারণ মানুষ চোখে অন্ধকার দেখেন। গণতন্ত্র উঠে গেলে, নির্বাচন বন্ধ হয়ে গেলে, রাজনীতি করা বন্ধ হয়ে গেলে নাকি অসুবিধা হবে এদের। কোনো যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও করে কম্মে খাওয়া, বাড়ি গাড়ি হাঁকানো, চুরির টাকা ঘরে জমানো, গুন্ডা পোষা আর ফুর্তি করা বন্ধ হয়ে যাবে এদের। সুতরাং দেশে গণতন্ত্র থাকল কি থাকল না তাতে সাধারণ মানুষের কী-ই বা যায় আসে? তার চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হল, দেশের একনায়ক সাধারণ মানুষের ভাল করছে কিনা, তাঁদের উন্নতির জন্য ভাবছে কি না। যদি ভাবে, যদি তা করার কথা বলে, তাহলে বাকি সব চুলোয় গেলেও হবে।

এটা কিন্তু সাধারণ মানুষের মনের কথা – সব দেশে এবং সব কালে। একথা যে তাঁরা সর্বদা মুখ ফুটে বলেন তা নয়, কিন্তু মনের গভীরে এই মনোভাব বহন করেন। এর ফলেই অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত দেশে বামপন্থী তথা কমিউনিস্টরা যদি জনগণকে রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত করে তুলতে না পারে, তাহলে ফ্যাসিবাদের উত্থানের বিপদ ঘনিয়ে আসে। ফ্যাসিবাদীরা এই পরিস্থিতির পূর্ণ সুযোগ নেয়। তারা মানুষকে বোঝায় যে একমাত্র একটা অগণতান্ত্রিক কঠোর শাসনই সাধারণ মানুষের উন্নতি ঘটাতে সক্ষম। গত শতকের তিনের দশকে অর্থনৈতিক সংকটাপন্ন ইউরোপে এভাবেই ফ্যাসিবাদের উৎপত্তি হয়েছিল। জনগণের উন্নতির মোহ তারা তৈরি করেছিল যুদ্ধ-অর্থনীতির চরম বিকাশের মধ্যে দিয়ে, ইহুদী বিদ্বেষী জাতীয়তাবাদের মধ্য দিয়ে।

আর আজ ফ্যাসিবাদের দ্বিতীয় অভিযানের সময়ে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটছে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন ঘটানোর কোনো রাস্তাই আজ আর পুঁজিপতিদের হাতে অবশিষ্ট নেই। ২০০৮ সালের মহামন্দার পর অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে তোলার আর কোনো পথই তারা এখনো আবিষ্কার করতে পারেনি। বিশ্ব ইতিহাসে এ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এই ব্যাপারটা নিয়ে আমাদের স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা করতে পারা উচিত। ভবিষ্যতে সে চেষ্টা করা যাবে। কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে, উন্নতি নয় উন্নতির মোহ, বিকাশ নয় বিকাশের ভানই আজ সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণির সম্বল। ফ্যাসিবাদীদেরও সম্বল। সেক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ওই যে পিছিয়ে থাকা ভাবনা – গণতন্ত্র না থাকলেও তাঁদের রুটি রুজি অর্জনের লড়াইয়ের কিছু যায় আসে না, বরং একটা লৌহকঠোর শাসনই ভাল – এই মনোভাব ফ্যাসিবাদের অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। বামপন্থী কর্মীরা অধিকাংশ সময়েই জনগণের এই মনোভাবকে সঠিকভাবে খণ্ডন করতে পারেন না। তাই এই বিষয়ে কয়েকটা কথা বলে নেওয়া দরকার।

আরো পড়ুন গিলি গিলি গে: মোদী ম্যাজিক বলতে যা বোঝায়

চারজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদের এক সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রের সাহায্য নেব এটা দেখানোর জন্যে, যে দেশে গণতন্ত্র থাকা বা না থাকার সঙ্গে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতির সরাসরি সম্পর্ক আছে। থমাস পিকেটি, নীতিন কুমার ভারতী, লুকাস চ্যান্সেল এবং আনমোল সোমাঞ্চির গবেষণাপত্র Income and Wealth Inequality in India 1922-2023: The Rise of Billionaire Raj (ভারতে আয় এবং সম্পদ বৈষম্য, ১৯২২-২০২৩: বিলিয়নেয়ার রাজের উত্থান) ভারতের অর্থনীতিকে বোঝার জন্য এক অমূল্য দলিল হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। খেয়াল করবেন, এখানে গবেষণাপত্রের রচয়িতারা ভারতে ১০০ বছরের আয় ও সম্পদ বৈষম্যের পর্যালোচনা করেছেন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। এই রকম গবেষণাপত্র কিন্তু চট করে পাওয়া যায় না। তাই এটা অমূল্য। যা-ই হোক, এখানে তাঁরা দেখাচ্ছেন, ভারতের গত একশো বছরের ইতিহাসে আয় ও সম্পদ বৈষম্য সর্বাপেক্ষা বেশি হয়ে দেখা দিয়েছে ১৯৯১ সালে নয়া উদারবাদ চালু হওয়ার পর, যা আজ, অর্থাৎ গত দশবছরে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম হওয়ার পর অত্যন্ত গতিশীল হয়ে উঠেছে।

ভারতের বড়লোকেরা সত্যিকারের বড়লোক হয়ে উঠতে শুরু করে ১৯৯১ সালের পর থেকে। আগে বড়লোকেরাও ভাবতে পারত না যে তারা এক বিলিয়ন (১০০ কোটি) আমেরিকান ডলারের মালিক হতে পারে। ১৯৯১ সালে দেশে এমন ব্যক্তি ছিল একজন। ২০১১ সালে হল ৫২ জন, আর ২০২২ সালে ১৬২ জন। ১৯৯১ সালে যখন নয়া উদারবাদ শুরু হতে যাচ্ছে, তখন দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের ১% ছিল এদের হাতে। আর আজ তিন দশক পরে এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের এক দশক পরে এদের সম্পত্তি দাঁড়িয়েছে দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের ২২%। ভাবুন, ১৬২টা লোকের হাতে যা সম্পত্তি আছে তার পরিমাণ দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের ২২%। এই ১৬২ জনের থেকে একটু এগিয়ে যদি দেশের ১% লোকের কথা একটু ভাবি তাহলে দেখব, এদের হাতে থাকা সম্পদের পরিমাণ হল দেশের মোট জাতীয় সম্পদের ৪০.১%। ভাবা যায়?

গত দশ বছরে (২০১৪-২৩) মোদীর শাসনে এই ১৬২ জন (বিলিয়নেয়ার) লোকের আয় প্রচণ্ড দ্রুত বেড়েছে। কত দ্রুত? এই সময়ে দেশের মোট জাতীয় আয় যেখানে বেড়েছে ২৭.৮%, এদের আয় বেড়েছে ২৮০%। অর্থাৎ, দেশের মোট আয়ের থেকে দশ গুণ দ্রুত।

খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছে, সমাজের অতিরিক্ত সম্পদ উৎপাদনের বিপুল অংশ এই হাতে গোনা কয়েকজন লোক বিপুলভাবে শুষে নিচ্ছে। তাই গবেষণাপত্রে মন্তব্য করা হয়েছে, “In other words, the ‘Billionaire Raj’ headed by India’s modern bourgeoisie is now more unequal than the British Raj, headed by the colonial force.” (ভারতের আধুনিক বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে তৈরি হওয়া ‘বিলিয়নেয়ার রাজ’ ঔপনিবেশিক শক্তি পরিচালিত ব্রিটিশ রাজের থেকেও বর্তমানে বেশি অসাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত)।

কথাটা যে মোটেই অতিরঞ্জিত নয় তা আয় ও সম্পদ বৈষম্যের ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। এখন যেখানে দেশের ১% লোকের হাতে ৪০.১% সম্পদ রয়েছে, ১৯২২ সালে ১% লোকের আয় জাতীয় আয়ের ১৩% ছিল। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী পর্যায়ে কিন্তু ঔপনিবেশিক এবং দেশের নব্য বুর্জোয়া শ্রেণির লুঠপাট ও শোষণ মাত্রাছাড়া হয়ে ওঠে। বিংশ শতাব্দীর সব থেকে বড় দুর্ভিক্ষ এই সময়েই (১৯৪৩) হয়েছিল বাংলায়, যা ‘দ্য গ্রেট বেঙ্গল ফেমিন’ নামে কুখ্যাত। কিন্তু এই সময়েও (১৯২২-৪৫) উচ্চতম ১% লোকের আয় জাতীয় আয়ের ২০ শতাংশের বেশি হয়নি। যুদ্ধের পর এবং স্বাধীনতার প্রথম দশকে এই আয় আবার নেমে ১৩-১৪ শতাংশের মধ্যে চলে আসে। এই সময়ে, অর্থাৎ গত শতকের পাঁচের এবং ছয়ের দশকে, আমাদের দেশে বিরাট বিরাট গণসংগ্রাম ঘটে। সংগ্রামী তথা গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী শক্তি অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এর ধাক্কায় দেশে গণতন্ত্র প্রসারিত হয়। শাসকশ্রেণি গণতন্ত্রকে সম্প্রসারিত করতে বাধ্য হয়। তাই ১৯৮২ সালে এই উচ্চতম ১% লোকের আয় হু হু করে নেমে এসে জাতীয় আয়ের মাত্র ৬.১ শতাংশে দাঁড়ায়। ফলে আয়ের বৈষম্য অনেকটাই কমে যায়। তাই উল্লিখিত গবেষণাপত্রে মন্তব্য করা হয়েছে, “After briefly rising during the 1950s, top 1% shares consistently fell over the next two decades and reached 6.1% by 1982. This was likely the consequence of the broadly socialist policy agenda pursued by the Indian government till the 1980s.” (১৯৫০-এর দশকে সামান্য বাড়ার পর উচ্চতম এক শতাংশের আয়ের ভাগ ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে এবং ১৯৮২ সালে ৬.১%-এ পৌঁছে যায়। এটা খুব সম্ভবত সেই সময়ে ভারতীয় সরকার যে একটা মোটা দাগের সমাজতান্ত্রিক নীতি নিয়ে চলছিল তার ফলেই হয়েছিল)।

কিন্তু ১৯৮০-র দশকের শেষের দিক থেকে খেলা ফের ঘুরে যায়। বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পশ্চাদপসরণ, আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক ও বিপ্লবী শক্তিগুলোর শক্তিক্ষয় ও পরাজয় সাম্রাজ্যবাদী এবং বুর্জোয়া শক্তিকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে। তারপর নয়া উদারবাদের সূচনা, ২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী মন্দা এবং তার ফলশ্রুতিতে সারা বিশ্বে এবং আমাদের দেশে নয়া ফ্যাসিবাদের উত্থান সাধারণ মানুষের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙেচুরে তছনছ করে দিয়ে একটা লুঠের অর্থনীতি গড়ে তুলেছে। দেশে যদি গণতন্ত্র না থাকে, যদি ফ্যাসিবাদ আরও দৃঢ় হয়, যদি গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী শক্তি শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ না পায় তাহলে যে কোটি কোটি মানুষ অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাবে, বিপর্যস্ত হয়ে যাবে সেটাই স্বাভাবিক।

সুতরাং বিজেপি যদি এবারেও বড় ব্যবধানে জিতে ফিরে আসে, তাহলে দেশের শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত মানুষের অবস্থা যে আরও খারাপ হবে তাতে সন্দেহের কোনো কারণ নেই। সাধু সাবধান!

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.