সায়নী ব্যানার্জি

পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) হবে – এ ঘোষণা যেদিন হল, ঠিক সেদিন থেকেই এই রাজ্যের কিছু রাজনৈতিক সংগঠন রাস্তায় নেমে এর বিরোধিতা করেছে। আজকের পরিস্থিতি আলাদা হলেও, এসআইআর বাতিল করতে হবে – একথা গুটিকয়েক ব্যক্তি, গুটিকয়েক সংগঠনই তখন বলতে পেরেছিল। নির্বাচন কমিশনারের কুশপুতুল পোড়ানো, প্রতিদিন রাস্তায় এসআইআর-বিরোধী প্রচার, এই প্রতিবাদে বিএলও-দের অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক, এ বিষয়ে সরব মানুষগুলোর ফেসবুক পেজ ব্লক করে দেওয়া – এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই নদিয়া-মুর্শিদাবাদ জুড়ে একটা ঐক্য যাত্রার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সংগঠকদের মধ্যে ছিল সংগ্রামী কৃষক মঞ্চ, শান্তিপুর জন উদ্যোগ, মজদুর ক্রান্তি পরিষদ, অল ইন্ডিয়া সেন্ট্রাল কাউন্সিল অফ ট্রেড ইউনিয়নস (এআইসিসিটিইউ), অল ইন্ডিয়া কিষাণ মহাসভা (এআইকেএম), গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি (এপিডিআর কৃষ্ণনগর), গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি (এপিডিআর কল্যাণী), রেভলিউশনারি স্টুডেন্টস ফ্রন্ট (আরএসএফ), গণ সংগ্রাম মঞ্চ। এসআইআরের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের বিভাজনের রাজনীতি আর রাজ্য সরকারের দুর্নীতি-হুমকিতন্ত্রের বিরোধিতায়, নদিয়া-মুর্শিদাবাদে কাজ করা বেশ কিছু বামপন্থী সংগঠন – মূলত শ্রমিক, কৃষক ও মানবাধিকার সংগঠন – একযোগে ডাক দিয়েছিল এই ঐক্য যাত্রার। গত ১৩ জানুয়ারি, নদিয়ার কল্যাণী থেকে শুরু হয়ে এই ঐক্য যাত্রা শেষ হল ১৭ জানুয়ারি, মুর্শিদাবাদের কান্দিতে।

১৩ তারিখ কল্যাণী রেলস্টেশন থেকে যাত্রা শুরু হয়। ‘পশ্চিমবঙ্গের রূপকার’ বিধানচন্দ্র রায়ের সাধের ‘প্ল্যানড সিটি’ কল্যাণী। গাছ-গাছালিতে ঘেরা, ব্লকে ব্লকে বিভক্ত। বাগানঘেরা বাড়িতে সচ্ছল পরিবারগুলোর আরামের বসবাস। কিন্তু শহরের সীমার ঠিক বাইরেই ছবিটা হুশ করে পাল্টে যায়। চাঁদামারী, মাঝেরচর, বারোহাত, মুরাতিপুরের মত গ্রামগুলো বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী পরিবারের ঠিকানা। মুসলমান, হিন্দু, মতুয়া ছাড়াও রয়েছেন বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে এপারে চলে আসা মানুষজন। এসব এলাকায় আগে থেকেই আমরা এসআইআর-বিরোধী প্রচার করেছি। জানতাম, বিরাট অংশের মানুষ শুনানির ডাক পেয়েছেন, দৈনিক মজুরির কাজ থেকে ছুটি নিয়ে তাঁদের ছুটতে হয়েছে অফিসে অফিসে। যাত্রা শুরুর পর তাই এই গ্রামগুলো দিয়েই এগিয়ে চলল আমাদের মিছিল। কল্যাণী সংলগ্ন এলাকায় সংক্ষিপ্ত পথসভা সেরে মদনপুর, সিমুরালি, রসুল্যাপুর, চাকদা হয়ে প্রথমদিনের যাত্রা পৌঁছল শান্তিপুর।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

শান্তিপুরের কাছে বাগআঁচড়ায় আমাদের সঙ্গে কিছুক্ষণের জন্য পা মেলালেন মিড ডে মিল কর্মীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর মিড ডে মিল অ্যাসিস্ট্যান্টসের (আম্মা) সদস্যরা। কথা হচ্ছিল এক নেত্রীর সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, যেখানে শুধু রান্নার কাজ করার কথা, সেখানে আমাদের বাথরুম পরিষ্কারের কাজও করতে হয়। মাস মাইনে নামমাত্র। তাঁর কাছে আরও জানলাম, এলাকাভিত্তিক সমীক্ষায় পরিষ্কার উঠে আসছে, শুরুতে নির্বাচন কমিশন যেসব নথি চেয়েছিল, এই সংগঠনের ৯৫% কর্মীর কাছে তার কোনোটাই নেই। বিপদের মাত্রা ওঁরা তখনই আঁচ করেছিলেন, তার উপর বিহারের দৃষ্টান্তও চোখের সামনে ছিল। তাই আর হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি। অনেক আগেই জেলাশাসকের কাছে এসআইআর-এর বিরোধিতা করে ডেপুটেশন জমা দিয়েছেন, এখনো সক্রিয় বিরোধিতায় রাস্তায় আছেন।

প্রথমদিনের শেষ গন্তব্য ছিল কৃষ্ণনগর। দ্বিতীয় দিনের যাত্রা বেথুয়াডহরির দিকে। নদী, মাঠ, চাষের ক্ষেত নিয়ে গ্রামীণ নদিয়া। ধুবুলিয়া, কালীনগর, সোনাতলা, গলায় দড়ি, পাটপুকুর, মিরাইপুর, বাদবিল্লো – অধিকাংশ গ্রামেই বাসিন্দা বলতে মুসলমান শ্রমজীবী পরিবার। গলায় দড়ি গ্রামে গিয়ে পৌঁছেছি, এক যুবতীর সঙ্গে দেখা। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আমার বাবাও কৃষক সংগঠন করতেন, ওটাই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। বাবা নেই এই কয়েকবছর হল, ওই সংগঠনও প্রায় নেই বললেই চলে।

নদিয়া জেলার এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে, বিশেষত নাকাশিপাড়া ব্লকে, একসময় নকশালপন্থীদের জোরালো সংগঠন ছিল। গ্রামীণ এলাকা, রাত যত বাড়ে, পাল্লা দিয়ে বাড়ে শীত। তারমধ্যেই আমাদের পথসভা হচ্ছে, মানুষজন বক্তব্য রাখছেন, পথনাটক হচ্ছে, আমরা গান গাইছি, ঠান্ডার কামড়ের তোয়াক্কা না করেই জড়ো হয়েছেন বাদবিল্লোর প্রায় ২০০ গ্রামবাসী। তাঁদের সঙ্গে যত কথা বলছি, লক্ষ করছি, পুরনো দিনের বিচিত্র সব অভিজ্ঞতায় ফিরে যাচ্ছেন তাঁরা। কারও কাছে শুনছি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাঝে পুলিশ এসে পড়ার গল্প, ঘুঙুর-পরা পায়েই দৌড় মারা নর্তকীর গল্প। কোনো নকশালপন্থী বলছেন, পুলিশের অত্যাচারে তৃণমূল করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। কত কত কথা ভাগ করে নিয়ে যেন হালকা হতে চাইছিলেন মানুষ। তবে একটা বিষয়ে সকলেই একমত – এসআইআর করে মুসলমান ভোটারদের বাদ দিয়ে আসলে বিজেপিরই সুবিধা করে দিতে চাওয়া হচ্ছে।

তৃতীয় দিনেও নদিয়ার খানিকটা অংশ। পাটিকাবাড়ি, ধাপাড়িয়া, তেহট্ট। সন্ধেবেলায় পৌঁছলাম মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে। এরই মধ্যে আচমকা আমি মুখোমুখি হয়েছি এক মেয়ের। সে মেয়ে গণধর্ষণের শিকার। গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা যন্ত্রণায়, রাগে সেই মুহূর্তে বাকরুদ্ধ আমি বুঝতে পারি না কীভাবে ওর বিপন্নতা ভাগ করে নেব। শুধুই পিতৃতন্ত্র, নাকি পুঁজিবাদ, নাকি আরও কিছু নিপাত গেলে আর মেয়েদের সঙ্গে এমনটা হবে না? আসলে যতটা কান পাতলে ঘরে ঘরে এই কান্না শোনা যেত, ততটা কান তো কোনোদিন পাতেনি এই সমাজ। এই লড়াই সর্বতোভাবেই রাজনৈতিক লড়াই, তবু রাজনীতির ময়দানেই আজও মেয়েদের জোরালো অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মত কম। আমাদের এই ঐক্য যাত্রাই বা সেই চিত্র ছাপিয়ে উঠতে পারল কই? এই পাঁচদিনে এত গ্রামে গ্রামে ঘুরলাম, অথচ গ্রামের চায়ের দোকানে একজন স্থানীয় মেয়েকেও দাঁড়িয়ে চা খেতে বা আড্ডা দিতে দেখলাম না। এদিকে চায়ের দোকান নাকি এ রাজ্যের রাজনীতি চর্চার পীঠস্থান। এসআইআর, নতুন শ্রমবিধি বা নতুন বীজ আইন, রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন শ্রমজীবী শ্রেণি। কিন্তু ওই ছোট্ট মেয়েটাকে দেখলে সেই বিপন্নতা আরও অতলস্পর্শী মনে হয়। ভাবতে বসলে এই গোটা পিতৃতান্ত্রিক সমাজের জন্য ঘৃণা ছাড়া আর অন্য কোনো অনুভূতি খুঁজে পাই না।

অমন বিধ্বস্ত দিনেই আবার পাটপুকুর গ্রামে এক দিদির সঙ্গে দেখা। বেশ সাহসী গলায় তিনি বলে দিলেন, কেন ফর্ম জমা করেছ তোমরা? বর্ডার দিয়ে কি আমরা মানুষ ঢুকিয়েছি? মসজিদ করবে বললে যত লোক জড়ো হয়, এসব নিয়ম বাতিল করবে বললে এত লোক জড়ো হয় না কেন? তাঁকে বলা হল পথসভায় বক্তব্য রাখতে। সটান উত্তর, গ্রামের লোক তাহলে ‘খেপি’ বলবে। বাসাবাড়িতে কাজ করে, এতদিন দিব্যি একলাই বেঁচেছেন সেই দিদি। ঘরে সার্টিফিকেট কী আছে না আছে, তার খোঁজ রাখেননি কোনোদিন। ওই যে ‘যেখানে রুটি, যেখানে ভাত/সেখানে দিন, সেখানে রাত’। ওঁরা অমনটাই ভাবেন। তাই রাষ্ট্রের নজরদারি ব্যবস্থার কাছে তাঁরা বিপজ্জনক। একজন বিএলও বক্তব্য রাখতে গিয়ে সোজাসুজি বলেই দিলেন, এই প্রক্রিয়া আসলে ঘুরপথে এনআরসি-ই। সেকথা মাথায় রাখলে ওই পাটপুকুরের দিদির মত মানুষগুলোর প্রতি রাষ্ট্রীয় মানসিকতা জলের মত স্পষ্ট হয়।

শেষ দুদিনের যাত্রা মুর্শিদাবাদের গ্রামে গ্রামে। মহলান্দি, কুমারষণ্ড, গোকর্ণ, রণগ্রাম। সবই মুসলমান-প্রধান গ্রাম। এক জায়গায় দেখলাম, বাড়ির নাম রেখেছে ‘আল্লার দান’। গোকর্ণ নতুন বাজারে দেখা হল একজন সবজি বিক্রেতার সঙ্গে, দুর্নীতির কথা বলতে বলতে তিনি মিঠুন চক্রবর্তীর সিনেমার কথা পাড়লেন, যেসব ছবিতে প্রশাসনিক দুর্নীতির কথা উঠে আসত। কথায় কথায় অভয়া আন্দোলনের কথা বললেন। বেশ কয়েকটা জাস্টিস মিছিলে তিনি হেঁটেছেন, তাঁর ছেলে অভয়ার ছবি এঁকে চারটে পুরস্কার পেয়েছে। অভয়া আন্দোলনকে আমরা যারা কলকাতার বাইরে নিবিড়ভাবে দেখেছি, তারা জানি, কত দূরদূরান্তে তা ছড়িয়ে পড়েছিল। কত কত অন্দরের কথা তখন ঘর থেকে বাইরে রাস্তায় নেমে এসেছিল, সেসব আগে কখনো বলা যায়নি।

নতুন বাজারেই দেখা হল আরেকজন প্রবীণের সঙ্গে। তাঁর ভয় – তাঁর নথিপত্র সবই আছে, তাঁর স্ত্রীর নেই। তবে কি স্ত্রী এদেশে থাকতে পারবেন না? এ ভাবনা যে তাঁদের ভাবতে হয়, এটা গণতান্ত্রিক দেশের লজ্জা।

ডেলি বাজার গ্রামের এক বৃদ্ধ আবার অন্য এক আকুতি নিয়ে ছুটে এলেন। অন্যান্য রাজ্যে যারা কাজ করতে যাচ্ছে, তাদের তোমরা বাঁচাও। তখনো আমরা জানি না, ওই একই সময়ে পাশের রাজ্যে বাঙালি হওয়ার ‘অপরাধে’ প্রাণ হারাচ্ছেন বেলডাঙার শ্রমিক। এসআইআর তো আছেই, পরিযায়ী শ্রমিক-নিগ্রহ নিয়েও যে শ্রমজীবী শ্রেণি কতখানি ক্ষুব্ধ, তা খানিক কান পাতলেই স্পষ্ট হচ্ছে। আর তেমনই ক্ষোভ রাজ্যের শাসক দলকে নিয়েও। রণগ্রাম ব্রিজে চতুর্থ দিনের শেষ পথসভা যখন হচ্ছে, চায়ের দোকানের আড্ডায় স্থানীয় একজন তো বলেই দিলেন, অন্যান্য রাজ্যে যারা মার খাচ্ছে, তারা এ রাজ্যে বহাল তবিয়তে আছে। অনেকে এ-ও বললেন, তৃণমূল দারুণ কাজ করে দিয়েছে মুসলমানদের জন্য, এমনটা মোটেই মনে করেন না এ রাজ্যের বেশিরভাগ সংখ্যালঘু।

শেষদিনের যাত্রায় এসে জুড়ল সদ্যযুবা কমরেডদের তৈরি মিষ্টি, নতুন স্লোগান। ‘এসেছে ভাই এসেছে, তোমার গ্রামে এসেছে/এসেছে ভাই এসেছে, ঐক্যযাত্রা এসেছে।’ স্লোগান দিতে দিতে, ধান আর সর্ষেক্ষেতের মধ্যে দিয়ে আমাদের যাত্রা এগিয়ে চলল কান্দি বাজারের দিকে। পথিমধ্যে পুরন্দরপুর, ঘনশ্যামপুর, আদিরাপাড়া। গানে, পথসভার বক্তৃতায় বারবার উঠে আসছে অপরিহার্য দাবিদাওয়া – এসআইআর বাতিল হোক, বন্ধ হোক ধর্ম নিয়ে রাজনীতি, খুলে দেওয়া হোক বন্ধ কারখানা, বাতিল হোক নতুন শ্রম বিধি, ওয়াকফ বিল। কান্দির পাখমারা ডোবে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন সাগরদীঘির (এই সাগরদীঘি মুর্শিদাবাদে) শ্রমজীবী নারী সংগঠনের কর্মীরা। তাঁরা ধানজমিতে কাজ করেন, সঙ্গে নারী সংগঠন আর সাংস্কৃতিক সংগঠন। করেন কারণ তাঁদের ভালো লাগে, কারণ তাঁরা মনে করেন – এগুলো করা দরকার।

পাখমারা ডোব থেকে বিশাল মিছিল পৌঁছল বিশ্রামতলা মোড়ে। বহু মানুষের জমায়েত সেখানে। আমাদের শেষ পথসভা। কোরাসে বেজে উঠল ‘শালবৃক্ষের মত শিনা টান করে সে/মানুষ হয়ে বাঁচতে পীরেন জান দিয়েছে!’ সবশেষে সাঁওতালি গান। দিয়ারা গ্রামের নাচন দিদি আর ওঁর সঙ্গীরা। সরকার তাঁদের ছেলেমেয়েদের পড়াবে না কেন, টিউশনের মাইনে দিতে পারে না বলে ছেলেমেয়েদের পড়ার অধিকারও কি নেই, শিক্ষকই বা হবে না কেন তারা? এমন নানা প্রশ্নে জর্জরিত করে নাচন দিদিদের গান। শুধু গান গাওয়াই নয়, অনেক অনুষ্ঠানে গিয়েও যে গান গাওয়ার সুযোগ হয় না, মাইকের সামনে এসে সেই অভিযোগও করেন তিনি। অভিযোগ আরও কত! তবু দিনের শেষে কানোরিয়া জুটমিল আন্দোলনের নারী কমরেডরা যখন যাদবপুর ছাত্রফ্রন্টের ছেলেমেয়েদের সমবেত গানে নেচে ওঠেন, অপূর্ব ঐক্য রচনা হয় বইকি।

আরো পড়ুন বাঃ! এসআইআর নিয়ে সংবাদমাধ্যমের মিথ্যাচার আমাদের বিনোদন

পাঁচদিনের এই যাত্রায় আমাদের সঙ্গে ছিল মরুজ নাট্যদল। তারা এই আবহে একটা পথনাটক বেঁধে ফেলেছে, নাম দিয়েছে বোকারাম। ‘ঘুসপেটিয়া’ ধরার হাড়-জ্বালানো পদ্ধতিকে ব্যঙ্গ করে এই নাটক, জানতে চায় – মানুষের জন্য রাষ্ট্র, নাকি রাষ্ট্রের জন্য মানুষ? এমন আরও কত প্রশ্ন, প্রতিপ্রশ্ন উঠে এল পাঁচদিনের যাত্রাপথে। প্রথম দিনের শেষ গন্তব্য যেখানে ছিল, সেই কৃষ্ণনগরের পোস্ট অফিস মোড়ে দীর্ঘ পথসভায় বারবার বক্তারা বললেন, মন্দির-মসজিদ নয়, নাগরিক-বেনাগরিক নয়, রাজনৈতিক লড়াই এখনও রুজিরুটির, সকলের জন্য শিক্ষা আর স্বাস্থ্যের অধিকারের।

খেটে খাওয়া, প্রান্তিক মানুষ ক্ষোভে ফুঁসছেন। ঘরের কোণে বসে থাকা ওই ছোট্ট মেয়েটার কথা ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ছে, এ দেশে একটা ক্ষমতাধর দল আছে যারা ধর্ষককে মালা পরিয়ে বরণ করে নেয়। ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছা’-র দেশে গরিব মানুষকে কেবল অপারেশন থিয়েটারের লাইনেই নয়, নাগরিকত্বের লাইনেও দাঁড়াতে হয়। এ রাজ্যে বিরোধী বামপন্থী রাজনীতিও কেমন ম্রিয়মাণ। তবু এই পরিস্থিতিতে ছোট পরিসরের এতগুলো বামপন্থী সংগঠন তাদের সীমাবদ্ধতা, বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে একটা ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচির ডাক দিলেন, সেও তো খানিক স্বস্তির! এক দশকের বেশি জেল খাটা সংগঠকের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা দেখে ভরসা জাগে, দিনমজুরের কাজ করে, টোটো চালিয়ে আমাদের যে কমরেডরা একনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মীর ভূমিকা পালন করেন, পথে নামেন, পোস্টার মারেন, স্লোগান তোলেন, গান করেন, তাঁদের দেখে বিশ্বাস রাখি রোজকার যাপনের ওই বামপন্থার প্রতিই।

এই লেখা যখন শেষ করে ফেলেছি, ‘এসআইআর বাতিল করো’ স্লোগান দিতে দিতে গলার অবস্থাও বেহাল, সেইসময়েই আমার ওয়ার্ডের বিএলও এসে ধরিয়ে গেলেন শুনানির নোটিস। আমাকেও এবার সেই কাগজ দেখাতে হবে। ফাইল-ফোল্ডার খুঁজে, গাদাগুচ্ছের ফোটোকপি জোগাড় করে, পিতৃপুরুষের ঠিকুজি-কুষ্ঠি বার করে যথাসাধ্য প্রমাণ করার চেষ্টা করতে হবে – আমি এদেশেরই নাগরিক।

তবু আমি অপেক্ষায় থাকব সেদিনের, যেদিন আমার দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ একসঙ্গে গর্জে উঠবে। সেই সমবেত চিৎকারে বাতিল হবে এসআইআর, নতুন শ্রম বিধি, নতুন বীজ আইন।

নিবন্ধকার পেশায় গবেষক। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.