‘ফ্যাক্টরি নদী খেইয়ে নিলে’ বলে উঠলেন গ্রামের একজন মহিলা। কাঁখে বছরখানেক বয়সের পুত্র সন্তান। রাস্তার ধারে দাঁড়ানো জলের গাড়ি থেকে বাড়ির জন্য জল নিতে এসেছেন। আশপাশের গ্রামগুলোতে গাড়ি দিয়ে জল সরবরাহের ব্যবস্থা করেছে সরকার। সে জলও কালচে। দূষিত, অস্বাস্থ্যকর। আর নদীর জলের রং সিঁদুরের মত। সৌজন্যে স্পঞ্জ আয়রন কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য। ঘটনাস্থল পশ্চিম বর্ধমান জেলার জামুরিয়ার তপসী স্টেশনপাড়া। বড় বড় কোম্পানির এইসব কারখানাই নদী ‘খেইয়ে’ নিয়েছে। যাদের স্টিল দিয়ে শক্তপোক্ত বাড়ি বাড়ানোর বিজ্ঞাপন আমরা দেখি অহরহ। সেলিব্রিটিরা সেইসব বিজ্ঞাপনের নায়ক-নায়িকা। কিন্তু এইসব কোম্পানি কীভাবে লুঠ আর দূষণ ঘটাচ্ছে তা সচরাচর জানা যায় না। নদীর নাম সিঙ্গারন। পশ্চিম বর্ধমান জেলার এই নদী উন্নয়ন নামক ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী। আর সাক্ষী ইকড়া শিল্পতালুকের আশপাশের আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলির বাসিন্দারা।
নদীকে বাঁচাতে নদীর পাড়ের বাসিন্দারা ২০২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর গড়ে তুলেছেন সিঙ্গারন নদী বাঁচাও কমিটি। সরকারের নানা মহলে চিঠিচাপাটি, স্মারকলিপি প্রদান, মিছিল, রাস্তা অবরোধ – হয়ে চলেছে একের পর এক কর্মসূচি। কিন্তু সরকারের নানা দফতর, শাসক দলের কেষ্টবিষ্টুদের সঙ্গে কোম্পানিগুলোর সখ্যে জল, জমি, জঙ্গল লুঠের ‘উন্নয়ন’ চলেছে অবাধে। ২০২৬ সালের ১৭ ও ১৮ জানুয়ারি সিঙ্গারন নদী বাঁচাও কমিটি নদীর প্রবাহপথের পার্শ্ববর্তী জনপদ ধরে এক পদযাত্রার আয়োজন করেছিল। নদী বাঁচানোর ডাক দিয়ে এমন পদযাত্রায় নদী বাঁচাও জীবন বাঁচাও আন্দোলন সহ সামিল হয়েছিল বিভিন্ন বিজ্ঞান, আদিবাসী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
পদযাত্রা শুরু হয় নদীটির উৎসস্থলের নিকটবর্তী জামুরিয়ার ইকড়া শ্মশানধার থেকে। শ্মশানের কাছে যে ঝরনা একসময়ে নদীকে পুষ্ট করত, তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। শ্মশানের ধারে নদী এখন নালার মত। কারখানার রাস্তার জন্য হয়েছে ছোট সেতু। নাব্যতা হারিয়ে নদীর উচ্চতা বাড়ছে। সেতু নদীর প্রবাহপথে বাধা সৃষ্টি করছে। বর্ষায় জল বাড়লে নদী ছাপিয়ে যায় দুকুল, বন্ধ থাকে শ্মশান। দূষণের মাত্রা এমনই ভয়াবহ যে, শ্মশান চত্বরে বাঁধানো মেঝেতে পর্যন্ত ধুলোর কালো, পুরু আস্তরণ। চারিদিকে বড় বড় কোম্পানির স্পঞ্জ আয়রন কারখানা। পদযাত্রা এগিয়ে চলল নদীপাড়ের গ্রামগুলো দিয়ে। সঙ্গী রাসায়নিক বর্জ্যে ভরা সিঁদুরে রঙের নদী, ধুলোর আস্তরণে ভরা বাতাস। গাছপালার রং এখানে কালচে। মাঠঘাট ধূসর, বিবর্ণ। গ্রামের ভিতর দিয়ে কারখানার কাঁচামাল নিয়ে ধুলো উড়িয়ে চলেছে ডাম্পার। দেখা গেল, জায়গায় জায়গায় কারখানাগুলো নদীকে দখল করে পাঁচিল দিয়ে ঘিরেছে। নদী পথ আটকিয়ে খেয়ালখুশি মত রাস্তা বানিয়েছে, নদীর গতিপথ বদলে দিয়েছে। নদীকে যে এভাবে দখল করা যায়, না দেখলে বিশ্বাস হত না। একসময় গ্রামবাসীরা নদীর জল ব্যবহার করতেন। নদী দূষণ, দখলে এখন আর সেই উপায় নেই। গাড়িতে জল সরবরাহের সরকারি ব্যবস্থাই এখন অগতির গতি। গবাদি পশুদেরও অবস্থা সঙ্গীন। নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কত স্মৃতিকথা। পথে নদী সভা, গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে জানা হল সেইসব কথা। দুদিন আগেই আদিবাসীদের পরব গেছে। মাটির বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে সদ্য করা রঙিন কারুকার্য। আদিবাসী গ্রামের পরিচয় বহন করে এইসব শিল্পকর্ম। নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠে বহু শতকের জীবনযাত্রা, জীবিকা, সংস্কৃতি। প্রকৃতির দান নদী সকলের সম্ভার, এজমালি সম্পদ। সেই সামাজিক সম্পদকে কোম্পানির সম্পত্তিতে রূপান্তরিত করে মেরে ফেলার তোড়জোড়ে সর্বনাশকে সেধে ডেকে আনা হচ্ছে।
শুধু কি নদী? রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড (ইসিএল)-এর জমি, খাস জমি, আদিবাসীদের জঙ্গল, পবিত্র স্থান – সব দখল হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন, কীভাবে জমি মাফিয়া, সরকারি দফতরগুলোর যোগসাজশে কোম্পানিগুলো লুঠ করছে। বলাই বাহুল্য, শাসক দলের অনুপ্রেরণা ছাড়া এই লুঠের কারবার সম্ভব হত না। কোম্পানিগুলির মাফিয়ারাজে মনে হবে, সরকারের পরিবেশ দফতর, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ, ভূমি রাজস্ব দফতর, পঞ্চায়েত, গ্রামসভা – কোনোকিছুরই যেন এখানে অস্তিত্ব নেই। গণতন্ত্র নয়, পুঁজি দেবতা ও কোম্পানিতন্ত্রই সারসত্য। সবাই সব জানে, কিন্তু কাটমানির কল্যাণে ধ্বংসলীলা চলছে নিয়ম মেনে।
তপসীতে নদীকে সরু করে তৈরি হয়েছে জাতীয় সড়কের সেতু। খোদ সরকারই উন্নয়নের নামে নদীর দখল নিয়েছে। সেই জাতীয় সড়ক দিয়ে রাতভর ছোটে পাথর বোঝাই ডাম্পার। মনে পড়ে গেল ঠিক একবছর আগের কথা। ২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি ‘ছোট নদীর দিকে নজর দিন, প্রজন্মের যত্ন নিন’ – এই বার্তা নিয়ে বীরভূম জেলার তিলপাড়া ব্যারেজ থেকে কলকাতা অভিমুখে শুরু হয়েছিল ১২ দিনের এক সাইকেল যাত্রা। নদী বাঁচাও জীবন বাঁচাও আন্দোলন সহ বিভিন্ন সংগঠনের আহ্বানে অনুষ্ঠিত সেই অভিযান ১৯ জানুয়ারি পৌঁছেছিল তপসীতে। সাইকেল অভিযাত্রী হিসাবে সেই আমার প্রথম সিঙ্গারন দর্শন। এবারে দেখলাম, এক বছরের মধ্যে অবস্থার উন্নতি হয়নি, বরং আরও অবনতি হয়েছে।
তপসী থেকে সিঙ্গারন নদী বাঁচানোর এই পদযাত্রায় যোগ দিলেন আদিবাসী শিল্পীরা। মাদলের সুর, স্লোগানে মুখরিত পদযাত্রা কখনো জাতীয় সড়ক ছুঁয়ে, কখনো বা গ্রামের ভিতর দিয়ে এসে পৌঁছল কুনুস্তোরিয়া। উনবিংশ শতাব্দীতে রানিগঞ্জ কয়লা ক্ষেত্রে বেঙ্গল কোল কোম্পানি প্রায় ৫০টা কয়লাখনির মালিকানা পেয়েছিল। তার মধ্যে একটা ছিল কুনুস্তোরিয়া গ্রামে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই কোল কোম্পানির অংশীদার ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর। রাজ্যের কয়লাখনির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এসব স্থান। কয়লা শ্রমিকদের জীবন সংগ্রাম, দুর্ঘটনায় মৃত্যু, খোলামুখ কয়লাখনির জন্য বদলে যাওয়া ভূমিরূপ, ধ্বংস হওয়া জলাভূমি, পরিবেশের ইতিহাসকে বয়ে নিয়ে চলা সিঙ্গারন আজ স্পঞ্জ আয়রন শিল্পের বলি। কুনুস্তোরিয়া থেকে জাতীয় সড়ক ধরে পদযাত্রা এসে পৌঁছয় জি টি রোডে, রানিগঞ্জের পাঞ্জাবি মোড়ে। সেখানে নদীসভা, আদিবাসী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের সমাপ্তি।
দ্বিতীয় দিন রানিগঞ্জের হরিশপুর টপ লাইনে সিঙ্গারন পাড় থেকে পদযাত্রা শুরু হয়। দেখলাম গ্রামবাসীরা সেই নদীর জলে চান করছেন, কাপড় কাচছেন। ইকড়া শিল্পতালুকে নদী দূষণের কথা সকলে জানেন না। কারণ সেটা জাতীয় সড়ক থেকে ভিতরে। সেই দূষিত জলই এখানকার বাসিন্দাদের নিত্যসঙ্গী। এখানে দেখা গেল, নানা কোম্পানি পাম্পের সাহায্যে কারখানার জন্য নদীর জল তুলছে। আশপাশে রয়েছে নির্মাণ কাজের কাঁচামাল উৎপাদন সহ নানা কারখানা। দেখলেই বোঝা যায় পরিবেশ সংক্রান্ত আইন, বিধি এরা খুব একটা মানে না। হরিশপুর থেকে জি টি রোড ধরে পদযাত্রা এগিয়ে চলল অণ্ডালের দিকে। জিটি রোড কাজোড়ার কাছে সিঙ্গারন পেরিয়েছে। সেতুর উপর থেকে শীর্ণকায়া কালচে নদীকে দেখা গেল। এখানেও অনেকে দেখলাম নদীর জলে চান করছেন।
কাজোড়ায় নদীসভা করে অণ্ডাল মোড় থেকে বেঁকে পদযাত্রা এগিয়ে চলল অণ্ডাল রেল স্টেশন অভিমুখে। দীর্ঘ নালায় আবার সিঙ্গারনের দেখা পেলাম। এখানে সে আবর্জনায় ভরা নালা। হল নদীসভা। এরপর অণ্ডাল স্টেশনের কাছে নদীসভা করে পদযাত্রা শেষ হল শ্রীরামপুর অঞ্চলে। দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের নিকটবর্তী এই অঞ্চলেই সিঙ্গারন মিশেছে দামোদর নদে। রেললাইনের ধারে দেখলাম সিঙ্গারন স্রোতহীন। অণ্ডাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্যে আরও দূষিত হয়েছে। গ্রামবাসীরা ডিভিসির তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে অভিযোগ জানালেন। তার সঙ্গে অভিযোগ করলেন অবাধে বালি লুঠের। সিঙ্গারনের মোহনায় দামোদরের বালি অবাধে লুঠ হচ্ছে। সিঙ্গারন নদীর পাড় ঘেঁষে হয়েছে রাস্তা। বর্ষায় দামোদরের জল বাড়লে বাড়তি জল ঠেলে ঢোকে সিঙ্গারনে। তখন রাস্তা ডুবে যায়। দেখেশুনে বোঝা গেল, আসলে রাস্তা হয়েছে নদীর প্রবাহপথেই। নদীর জল কমলে রাস্তা ব্যবহার করা যায়। বলবার অপেক্ষা রাখে না যে, নদীর জল সংকটে নদী প্রবাহপথেই পঞ্চায়েত বা পঞ্চায়েত সমিতি এসব নির্মাণ কাজ করছে। পরিণতি নদীর সংকট আরও বেড়ে যাওয়া। অভিযোগ শুনলাম, বালির গাড়ি নিয়ে যেতেই নাকি নতুন রাস্তা করা হয়েছে। লুটেরাদের জামাই আদর করাকেই বোধহয় উন্নয়ন বলে। যে উন্নয়নের পাঁচালি গানে মুখর এখন তামাম বাংলা। গ্রামের ভেতর নদীসভার মধ্য দিয়ে দুদিনের পদযাত্রা সমাপ্ত হল।
সিঙ্গারনের বয়ে নিয়ে যাওয়া স্পঞ্জ আয়রন কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাই মিশছে দামোদরের জলে। দামোদর আর তার শাখানদীর জলে পূর্ব বর্ধমান, হুগলী ও হাওড়া জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলেরও চাষবাস নির্ভরশীল। আবার এই দামোদর মিশছে গঙ্গায়। প্রকৃতি মানুষের তৈরি কোনো প্রশাসনিক সীমা মানে না। জীবজগতকে পরিপুষ্ট করাই তার কাজ। তাই সিঙ্গারনের মত ছোট নদীকেও এভাবে দূষিত করলে, তার প্রভাব শুধু পশ্চিম বর্ধমান জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
সিঙ্গারন আর তার পাড়ের জনপদের অবস্থা দেখে মনে পড়ছিল নবারুণ ভট্টাচার্যের খেলনা নগর উপন্যাসের কথা। পুতুল কারখানাকে কেন্দ্র করে একদা গড়ে ওঠা নগর পরিত্যক্ত। তেজস্ক্রিয় আর রাসায়নিকের আবর্জনায় বিষাক্ত নদীর জল। সেই বিষে নদীর মাছ, নদীপাড়ের ঝোপঝাড় – সব মরে গেছে। ধুঁকতে ধুঁকতে কোনোক্রমে বেঁচে থাকা হাতে গোনা কিছু মানুষ বাধ্য হয়ে নদীর সেই বিষাক্ত জল পান করে। উন্নয়নের মহাযজ্ঞ এমনভাবে চললে সব নদীই একদিন হয়ে যাবে বিষাক্ত আর সব জনপদ পরিত্যক্ত খেলনা নগর। পুঁজির স্বার্থে চলা এই মহাযজ্ঞ না থামালে, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা না করলে দ্রুত আমরা এগিয়ে যাব ধ্বংসের দিকে। সেই কারণেই পদযাত্রায় বারে বারে আওয়াজ উঠল ‘আমার নদী, আমার গাঁ/কর্পোরেটের হবে না’।
তথ্য নিবন্ধকারের। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







