উত্তরপ্রদেশ সদা উত্তপ্ত। সাম্প্রদায়িক মারপিট, ঝঞ্ঝাট, দাঙ্গা ইত্যাদি সেখানকার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তারই অনুষঙ্গ হিসাবে ইদানীং চলছে ব্যাপকভাবে সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণ। আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হবার পর থেকেই যে এই প্রক্রিয়া বিরাট গতি লাভ করেছে তা বোঝার জন্যে বিজ্ঞানী হবার দরকার পড়ে না। হপ্তা দুয়েক আগে বাহরাইচ জেলার মহারাজগঞ্জ শহরে ঘটে গেছে এমনই এক কুৎসিত কাণ্ড।
গত ১৩ অক্টোবর আমরা যখন একদিকে দুর্গাপুজোর শেষ প্রহরের উৎসব নিয়ে মশগুল আর অন্যদিকে জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন মধ্যগগনে, বাংলার সংবাদমাধ্যমে আর জি কর নিয়ে তুমুল ঝগড়ার আসর বসা ছাড়া আর কিছু হচ্ছে না, তখন বাহরাইচে দশেরার মিছিল থেকে ছড়াল বিদ্বেষের আগুন। দুর্গাপুজোর ভাসান ইচ্ছাকৃতভাবে মুসলমান অঞ্চল দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময়ে উত্তেজক স্লোগান দেওয়া হল, মসজিদের সামনে উত্তেজক গান চালানো হল। কোনো কোনো বাড়ির ছাদে লাগানো সবুজ রঙের ইসলামী পতাকা জবরদস্তি টেনে নামিয়ে গেরুয়া পতাকা লাগানোর চেষ্টা হল। এসবের ফলে যা হওয়ার তাই হল। পুরোদস্তুর মারপিট, সংঘর্ষ বেঁধে গেল মহল্লায়। গোপাল মিশ্র বলে এক ২২ বছরের তরুণ, যাকে সবুজ পতাকা নামিয়ে গেরুয়া পতাকা লাগানোর চেষ্টা করতে দেখা গিয়েছিল, গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। যাদের লক্ষ্য ছিল গণ্ডগোল পাকানো, তারা এরপর এলাকায় ব্যাপক হামলা চালাতে শুরু করে। দোকান, বাড়িঘর, রাস্তার পাশে থাকা গাড়িতে ভাংচুর চালানো হয়। আগুন লাগানো হয়। এরপরেই সম্পূর্ণত হিন্দুদের পক্ষ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিস।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ঘরে ঘরে তল্লাশি শুরু হয়। প্রায় ১০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়। অভিযুক্ত প্রায় ৮০ জনকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে। কয়েকজনের বাড়ি ভাঙতে পৌঁছে যায় বুলডোজার। আদিত্যনাথের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার ঘোষণা করে – মৃতদের সঠিক বিচার দেওয়াই রাজ্য সরকারের প্রধান লক্ষ্য। ইচ্ছাকৃতভাবে সংখ্যালঘু অঞ্চলে দুর্গাপুজোর ভাসানের মিছিল নিয়ে গিয়ে গণ্ডগোল পাকানো নিয়ে কোনো কথা নেই রাজ্য সরকারের। মসজিদের সামনে তারস্বরে ডিজে বাজিয়ে গান চালানো, উত্তেজক স্লোগান দেওয়া নিয়েও কোনো কথা নেই, পদক্ষেপ নেই। ঘরবাড়ির ছাদ থেকে ভিন্ন মতাবলম্বী পতাকা টেনে নামিয়ে নিজেদের ধর্মীয় পতাকা লাগানোর অপচেষ্টা নিয়েও নীরব। সরকার শুধুমাত্র একটা জিনিসই দেখতে পেয়েছে। সেটা হল একজন হিন্দুর হত্যা। উত্তরপ্রদেশের গণতান্ত্রিক মানুষ এবং সংখ্যালঘু অংশের প্রতিনিধিরা সকলেই বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের অবশ্যই বিচার হওয়া দরকার এবং দোষীদের শাস্তি হওয়া দরকার। কিন্তু সরকার যেভাবে উৎসব উপলক্ষ করে ঘটা এই ঘটনাকে ব্যবহার করে সংখ্যালঘু মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাতে একথাই মনে হয়, যে সরকার এই ঘটনার আশাতেই বসেছিল, সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। হয়ত বা এই ধরনের ঘটনায় সরকারের বা সরকারি দলের মদতও আছে।
ঘটনার পাঁচ দিনের মধ্যেই উত্তরপ্রদেশ সরকার পি ডব্লিউ ডি-র মাধ্যমে বাহরাইচের ঘটনায় অভিযুক্ত তিনজনের বাড়ি ভাঙার নোটিস দেয়। সব ক্ষেত্রেই যে যুক্তি দেওয়া হয় এক্ষেত্রেও সেই একই যুক্তি দেওয়া হয় – নির্মাণ অবৈধ। ওই নোটিসের বিরুদ্ধে অভিযুক্তরা সুপ্রিম কোর্টে মামলা রুজু করেন। সুপ্রিম কোর্ট উত্তরপ্রদেশ সরকারকে বুলডোজার ব্যবহার করতে নিষেধ করে।
গত লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশে বিজেপি বড় রকমের ধাক্কা খাওয়ার পর অনেকেই মনে করেছিলেন, আদিত্যনাথের সরকার বোধহয় এবার কিছুটা সংযত হয়ে চলবে। সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেসের প্রভাব খর্ব করার জন্যে মেরুকরণের রাস্তা ছেড়ে সুশাসনের পথে আসবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো। বিজেপি যত কোণঠাসা হচ্ছে ততই সে আগের চেয়েও বেপরোয়া, আরও মরিয়া হয়ে উঠছে। মোদির সঙ্গে আদিত্যনাথের যতই দ্বন্দ্ব থাকুক না কেন, উত্তরপ্রদেশ সরকারের সমস্ত কুকীর্তিতে কেন্দ্রীয় সরকারের মদত আছে এবং থাকবে – ‘বুলডোজার বাবা’ তা বিলক্ষণ জানেন।
যদিও কেবল আদিত্যনাথের নামই বুলডোজার বাবা হয়েছে, কিন্তু ওটা শুধু উত্তরপ্রদেশ সরকারের কৌশল নয়। দেশের সমস্ত বিজেপি সরকারই আজকাল সংখ্যালঘু মানুষের বাড়িঘর ভাঙার জন্যে বুলডোজার ব্যবহার করছে। এমনকি রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করার জন্যেও একই কাজ করা শুরু হয়েছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে সারা ভারতে ১,৫৩,৮২০ খানা বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তাতে ৭,৩৮,৪৩৮ জন মানুষ বেঘর হয়ে পড়ে। ব্যাপারটা অবশ্য শুরু হয়েছিল উত্তরপ্রদেশেই। ২০২০ সালে বিখ্যাত বিকাশ দুবে ঘটনায় অভিযুক্তের ঘরবাড়ি ভাঙা হয়। আতিক আহমেদ, মুখতার আনসারি প্রমুখ অভিযুক্তের ক্ষেত্রেও একই কাজ করা হয়। ক্রমে এই বুলডোজার ব্যবহার উল্কার গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এবছরের সেপ্টেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় – সর্বোচ্চ আদালতের অনুমতি ছাড়া দেশের কোথাও বুলডোজার ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু এই রায়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই উত্তরপ্রদেশ সরকার বাহরাইচের ঘটনায় অভিযুক্তদের ঘরবাড়ি ভাঙার নোটিস ইস্যু করে।
আরো পড়ুন পরিকল্পিত দাঙ্গা: কীভাবে এবং কেন?
এদিকে যারা মুসলমান মহল্লায় দুর্গাপুজোর ভাসানের মিছিল নিয়ে গিয়ে আগ্রাসী, অপমানসূচক গান বাজিয়ে এলাকা উত্তপ্ত করে এই আগুন জ্বালাল তারা কিন্তু বহাল তবিয়তেই রয়েছে। ইতিমধ্যে এক স্টিং অপারেশনে দেখা গেছে যে লুকনো ক্যামেরার সামনে কয়েকজন দাঙ্গাকারী দাবি করছে, এই ঘটনা পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছিল।
এর পর বাহরাইচের যেখানে এই ঘটনা ঘটেছিল সেই মহারাজগঞ্জের বিধানসভা আসন মহসির বিজেপি বিধায়ক সুরেশ্বর সিং নিজেদের পার্টির সদস্যদের বিরুদ্ধে এফআইআর করতে বাধ্য হন। এর মধ্যে বিজেপির যুব শাখার মহারাজগঞ্জ শহর সভাপতি অর্পিত শ্রীবাস্তবের নামও রয়েছে। পরে অবশ্য সুরেশ্বর নিজের এফআইআর সম্পর্কে গোলমেলে কথা বলেন। দাঙ্গায় নিজের পার্টির কোনো দোষ নেই বলেন।
এই হচ্ছে বিজেপির অবস্থা। কিন্তু তারপরেও উত্তরপ্রদেশ সরকার বদলায়নি। তারা ব্যস্ত মুসলমান এলাকার ঘরবাড়ি ভাঙা এবং তার মাধ্যমে নতুন করে মেরুকরণের জাল বুনতে। সুপ্রিম কোর্টে কিছুটা ধাক্কা খেয়ে তারা আপাতত ধীরে এগোচ্ছে বটে, কিন্তু থেমে নেই।
এর মধ্যেই আগামী ১৩ নভেম্বর উত্তরপ্রদেশের নটা বিধানসভা আসনের উপনির্বাচন হতে চলেছে। স্বাভাবিকভাবেই, এই উপনির্বাচনগুলো একটা মিনি বিধানসভা নির্বাচনের আবহ তৈরি করেছে। ঘটনাচক্রে এই আসনগুলোর অধিকাংশই সমাজবাদী পার্টির চিরাচরিত শক্ত ঘাঁটি। ফলে উপনির্বাচনে ভাল ফল করা এবার আদিত্যনাথের কাছে অগ্নিপরীক্ষা। বিশেষ করে আগামী ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের উপর এই উপনির্বাচনের ফলাফল ভালরকম প্রভাব বিস্তার করবে বলেই বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা। মজার ব্যাপার, প্রচারের কেন্দ্রে কোন বয়ানকে রাখবে, বিজেপি সেটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। যোগীবাবার উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়ে কয়েকদিন প্রচারের পরেই তারা আবার হিন্দু-মুসলমান তাস বের করে ফেলছে। ঋণ মেলা, রোজগার মেলা রাজ্য সরকার যতই করুক না কেন, তা নিয়ে নির্বাচনী বাগাড়ম্বর করলেও বিজেপি সর্বদাই যে আখ্যানে বিশ্বাসী তা সেই হিন্দু-মুসলমান মেরুকরণের আখ্যান। সেখানে বাহরাইচের মহারাজগঞ্জের ঘটনার উপর নির্ভর করেই তারা ভোট বৈতরণী পার হতে চাইছে। হয়ত নির্বাচনের ঠিক আগে এই একই ধরনের ঘটনা আবার ঘটবে। দিওয়ালীকে কেন্দ্র করেও এমন ঘটনা ঘটতেই পারে।
আজকাল পরিস্থিতি এমনই, যে হিন্দুদের বড় কোনো উৎসব, বিশেষ করে ধর্মীয় উৎসব এলেই সংখ্যালঘু মহল্লায় ত্রাস সৃষ্টি হয়। কয়েক হাজার বছর ধরে যেসব উৎসব ছিল জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষেরই আনন্দের উৎস, বর্তমানে উগ্র ফ্যাসিবাদী শক্তির ক্ষমতা বিস্তারের অন্ধ তাগিদে সাম্প্রদায়িক হাতিয়ার হয়ে উঠে সেগুলোই হয়ে দাঁড়াচ্ছে এক বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে আতঙ্কের বিষয়। ভারতবর্ষের বহু দিনকার সামাজিক বুনোটকে তছনছ করে দেওয়ার এই চক্রান্ত বোধহয় বুলডোজার দিয়ে ঘরবাড়ি ভাঙার এক সুদূরপ্রসারী ফলাফল। ভারতবর্ষের জনগণের কাছে বিজেপির সবথেকে বড় অপরাধ এটাই। আগামীদিনে এর জন্যে তাদের অবশ্যই বিচারের কাঠগড়ায় টেনে তোলা হবে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








