সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার ৪.১% এবং বেকারের সংখ্যা ৬.৮ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। এই হার গত বছরের সেপ্টেম্বরের চেয়ে বেশি। তখন প্রথমটা ছিল ৩.৮% আর পরেরটা ৬.৩ মিলিয়ন। মার্কিন শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর অক্টোবর মাসে প্রকাশিত রিপোর্টে একথা জানিয়ে আরও বলা হয়েছে যে ৮০ লাখেরও বেশি (মোট কর্মরত জনসংখ্যার পাঁচ শতাংশেরও বেশি) কর্মচারী আবার একাধিক চাকরির উপর নির্ভরশীল। আমি এখন যে গল্প হলেও সত্যি ঘটনার কথা বলব, তার নায়ক, ধরা যাক তাঁর নাম হুগো, সেও এই পাঁচ শতাংশের অন্তর্ভুক্ত। তিনটে কাজ করেন তিনি – সপ্তাহে সাতদিন ভোরবেলা ডলারের বিনিময়ে অন্যদের কুকুরকে হাঁটাতে নিয়ে যাওয়া, পাঁচদিন দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত একটি ছোট রেস্তোরাঁয় ওয়েটারের কাজ, আর বাকি দুদিন টুকটাক মেরামতি বা ঝাড়পোঁছের কাজ। তাঁর বয়স এখন ২৩।
আমাদের গল্পের নায়কের জন্ম মার্কিন দেশেই, কিন্তু তার মা-বাবার আদি বাড়ি মেক্সিকোয়। বছর পঁচিশেক আগে সচ্ছল জীবনযাপনের স্বপ্ন নিয়ে তাঁরা সীমানার এপারে চলে আসেন। নানা রাজ্য ঘুরে শেষে বাসা বাঁধেন নিউ ইয়র্ক শহরে। বলা হয় যে এই শহর ঘুমোয় না। এখানে মানুষ সারাক্ষণ ডলার, আরও ডলার কামাতে ব্যস্ত। সেই ব্যস্ত শহরে আরও অনেকের মত বেঁচে থাকার জন্য লড়ছেন হুগো। না, তবু তিনি মেক্সিকোয় ফিরবেন না। সে দেশ তাঁর কাছে অচেনা, আলাদা জগৎ। থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা করতে গিয়ে বেশিরভাগ দিনই তাঁর ঘুম হয় ৪-৫ ঘন্টা। তাও হুগো নিউ ইয়র্ককেই ভালবাসেন, ভালবাসবেন।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
এই হুগোর পরিবারের মত ল্যাটিনো ভোটারদের উপর ভরসা করে আছেন রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট পার্টির দুই রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী – ডোনাল্ড ট্রাম্প আর কমলা হ্যারিস। সাধারণত এই ভোটারদের ডেমোক্র্যাট সমর্থক বলেই ভাবা হয়। কিন্তু এবারে বিভিন্ন ওপিনিয়ন পোল অন্য কথা বলছে।
২৬ অগাস্ট – ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একটা জনমত সমীক্ষা চালায় পিউ রিসার্চ সেন্টার। এতে দেখা যাচ্ছে যে বেশিরভাগ ল্যাটিনো ভোটার (৫৭%) ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এবং বর্তমান উপরাষ্ট্রপতি কমলার দিকেই ঝুঁকে। অন্যদিকে ৩৯% নাকি রিপাবলিকান ট্রাম্পকে ভোট দেবেন। এর কদিন পরেই, মানে ২৯ সেপ্টেম্বর, এনবিসি নিউজ/তেলেমুন্দো/সিএনবিসি রিপোর্টে জানা গেল, যদিও কমলা ল্যাটিনো ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়, ল্যাটিনোদের মধ্যে ডেমোক্র্যাট সমর্থকের সংখ্যা নাকি গত কয়েক বছরের মধ্যে এবার সর্বনিম্ন। সেই জনমত সমীক্ষায় দেখা গেল, কমলাকে ৫৪% ল্যাটিনো সমর্থন জানিয়েছেন, আর ট্রাম্পের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন ৪০%। বাকিরা এখনো ঠিক করে উঠতে পারেননি কাকে ভোট দেবেন, বা ভোট দেবেনই না। এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, এই হিসাবের ৩.১% এদিক ওদিক হতে পারে।
সংবাদসংস্থা জানায়, সামগ্রিকভাবে এই হিসাবে দেখা যাচ্ছে যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা ল্যাটিনোদের মধ্যে কিছুটা জমি হারিয়েছেন। এর কারণ হয়তো অনেক ভোটার এই মুহূর্তের অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মাথায় রেখে ভরসা রাখছেন যে ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি হলে দেশের হাল ফিরিয়ে আনতে পারবেন। কিন্তু তাও ল্যাটিনোদের অনেকেই হ্যারিসকে তাঁর স্বভাব, চিন্তাধারা, উদারপন্থা ইত্যাদির জন্য বেশি পছন্দ করেন।
সম্প্রতি, ইউএসএ টুডে/সাফোক ইউনিভার্সিটি ফোনে ১,০০০ সম্ভাব্য ভোটারের সঙ্গে কথা বলে একটা সমীক্ষা করে। ১৪-১৮ অক্টোবর করা এই সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে যে ল্যাটিনো ভোটাররা এবার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির দিকেই বেশি ঝুঁকে আছেন। এই ওপিনিয়ন পোল অনুযায়ী যেখানে ৪৯% ট্রাম্পকে সমর্থন করেছেন, সোখানে ৩৮% হ্যারিসের দিকে। এর আগে অগাস্টে অনুষ্ঠিত ইউএসএ টুডে/সাফোক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষায় ল্যাটিনো ভোটারদের মধ্যে কমলার চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন ট্রাম্প। তখন ল্যাটিনো ভোটারদের মধ্যে কমলার সমর্থনে ছিলেন ৫৩% আর ট্রাম্পের পক্ষে ছিলেন ৩৭%। এই সমীক্ষার ফলাফলেও ত্রুটির মার্জিন ছিল প্লাস বা মাইনাস ৩.১% পয়েন্ট।
এই যে অল্প হলেও ক্রমশ পাল্টে যাওয়া ফলাফল – এর কারণ কি ডেমোক্র্যাট সরকারের অর্থনৈতিক নীতি, নাকি সমীক্ষার ত্রুটি? তা নিয়ে মতবিরোধ থাকতেই পারে। কিন্তু ওই যে বলে না, যা রটে তার কিছুটা তো বটে? তেমনও হতে পারে। কাজেই, খেলা হবে। তবে সামগ্রিকভাবে কমলা এখনো একটু এগিয়ে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শুধু জনমতের জোরে রাষ্ট্রপতি হওয়া তো যায় না, সেখানে প্রত্যেক রাজ্যের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মতামতও গোনা হয়। তাই জল্পনা কল্পনা এখন তুঙ্গে।
হুগোর বক্তব্য – ট্রাম্প মাঝেমধ্যে অভিবাসীদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করলেও আগের মত আর মেক্সিকোর সীমান্ত বরাবর পাঁচিল তোলা বা অনুপ্রবেশকারীদের গণনির্বাসনের কথা খুব একটা বলছেন না। ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রচারে ট্রাম্প মেক্সিকো-মার্কিন সীমায় অনুপ্রবেশকারীদের সামলাতে এক বিশাল পাঁচিল তোলার পরিকল্পনার কথা বলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে নির্মাণের জন্য ব্যয়ের কিছু অংশ মেক্সিকোর থেকে আদায় করবেন। ট্রাম্পের দাবি ছিল, মেক্সিকো থেকে আসা পণ্যের উপর ২০% শুল্ক আরোপ করা হবে। তবে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন মেক্সিকোর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এনরিক পেনা নিয়েতো।
ল্যাটিনো অভিবাসীদের নিয়ে এক সাম্প্রতিক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প কিন্তু তাঁর সেই প্রতিশ্রুতির কথা আর তোলেননি, যে তিনি মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নির্বাসন পরিচালনা করবেন। ১৬ অক্টোবর ইউনিভিশনে প্রচারিত ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে কমপক্ষে ১০০ জন ল্যাটিনো ভোটার ছিলেন। তাঁদের প্রশ্নগুলোর ট্রাম্প সরাসরি জবাব দেন এবং খুব অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যান। যদিও ট্রাম্প ফের রাষ্ট্রপতি হলে কিছু বন্ধুবান্ধব আর পরিবারের সদস্যের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস সম্পর্কে হুগো অনিশ্চিত, তাও তাঁর মতে এই প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির নীতিগুলো হ্যারিসের চেয়ে স্পষ্ট।
আরো পড়ুন বারোটা বাজতে দেড় মিনিট: ২০২৪ সালে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে
হুগোর বক্তব্য হল, মার্কিন অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হবে। সেটা করতে গেলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা খুব জরুরি। ভবিষ্যতে সম্ভাব্য ডি-ডলারাইজেশনের প্রভাব নিয়েও হুগো উদ্বিগ্ন। তার কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আগামীদিনে মার্কিন ব্যাংকগুলোর সম্পৃক্ততা ছাড়া অন্যান্য মুদ্রায় লেনদেন করা হলে ডলারের প্রভাব কমে যেতে পারে। তার জের তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির উপর পড়বেই। অর্থনীতি নিয়ে কথাবার্তার পরে আমাদের নায়ক কথা বললেন তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহ-অনাগ্রহের বিষয়ে।
‘এই দেখুন না, টিপিং নিয়েও কেমন অনিশ্চয়তা ছড়িয়েছে,’ হুগো বিরক্তি প্রকাশ করলেন। তাঁর ইশারা এমন একটা ব্যাপারে, যা নিয়ে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাকবিতণ্ডা চলছে। যদিও টিপিং ব্যাপারটা প্রাপ্ত পরিষেবায় প্রশংসা বা কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করার একটা উপায়, যা পুরোপুরি ক্রেতার নিজস্ব সিদ্ধান্ত, তাহলেও মার্কিন মুলুকে কিন্তু অনেক জায়গায় সেটা প্রায় বাধ্যতামূলক বলে ধরে নেওয়া হয়। ওয়েটার থেকে ড্রাইভার, সবাই – বিলের মূল্য যা-ই হোক না কেন – উপরি ডলার আশা করে থাকেন। কাজেই খুচরো ফেরত পাওয়া তো দূরের কথা, বিলের উপর আরও প্রায় ২০% চুপচাপ দেওয়াই যেন নিয়ম।
আবার বৈদ্যুতিন লেনদেনের ক্ষেত্রে মেশিন নিজেই আপনাকে টিপিং বিকল্পগুলো দেখাবে। টিপ না দেওয়া কৃপণতা, এমনকি অভদ্রতা বলে মনে করা হয়। এমনকি যদি পরিষেবা দাতা ‘সার্ভিস চার্জ’ বলে একটা পৃথক ফি চার্জ করে – যা সাধারণত ১০% – বকশিশ দেবেন বলেই আশা করা হয়। এখন আবার আওয়াজ উঠছে যে শ্রমিকদের উপযুক্ত বেতন নিশ্চিত করা নিয়োগকর্তাদের উপর নির্ভর করে, যাতে কর্মচারীরা সর্বদা অতিরিক্ত প্রত্যাশা না করে, বিশেষত যেখানে এই জাতীয় চার্জ পৃথক রাখা হয়। টিপিং হবে স্বেচ্ছায়, জোরজবরদস্তি কখনোই নয়, এই যুক্তি এখন শোনা যাচ্ছে।
কিন্তু হুগো সে যুক্তি মানতে নারাজ। তার প্রতিযুক্তি, ‘আমরা গ্রাহকদের সন্তুষ্ট করতে অতিরিক্ত প্রচেষ্টা করি। আমরা নিশ্চিত করি যে তারা শুধু খাওয়ার আনন্দ নয়, যেন আরামদায়ক পরিবেশও পায়। আমাদের জন্য টিপস বেতনের একটা উল্লেখযোগ্য টপ-আপ।’
দেশের অর্থনীতির বিশালকায় চাকার মধ্যে যে অনেক ছোট ছোট চাকা থাকে, তাদের আকার আলাদা আলাদা। কিন্তু অতগুলো চাকা মিলেই বিশ্বের প্রাচীনতম গণতন্ত্রকে সফল করে তুলেছে। হুগোর মতো ভোটারদের চোখ থাকবে নির্দিষ্ট কিছু চাকার দিকে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৩,৬২,০০,০০০ ল্যাটিনো ভোট দেওয়ার যোগ্য। অর্থাৎ জাতিগতভাবে সংখ্যায় তারা দু নম্বরে। তাই তো হোয়াইট হাউস দখলের লড়াইয়ে তারা দুই প্রতিযোগীর নয়নের মণি। কী হবে নভেম্বরে?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








