কলকাতায় সব হোর্ডিংয়ে বাংলা থাকা বাধ্যতামূলক করতে চলেছে কলকাতা পুর নিগম। সম্প্রতি কলকাতা পুর নিগম জানিয়েছে যে মহানগরীর সব বেসরকারি সংস্থার বিজ্ঞাপন, দফতর, দোকান, বহুতল আবাসনের হোর্ডিং, গ্লোসাইন বোর্ড, ব্যানার প্রভৃতিতেও বাংলা ভাষায় লেখা বাধ্যতামূলক করতে নির্দেশিকা জারি হবে। কিছুদিন আগেই বাংলাকে ধ্রুপদী ভাষা বলে ঘোষণা করা হয়েছে। দ্বিতীয় নরেন্দ্র মোদী সরকারের আমলে জাতীয় শিক্ষানীতিতে ধ্রুপদী ভাষার তালিকায় বাংলা না থাকায় বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও বাংলা ভাষা কি তার হারানো মর্যাদা ফিরে পাবে? বাংলাভাষীরা পশ্চিমবঙ্গেই বাংলা ভাষা ব্যবহার করতে গিয়ে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়বেন না তো? সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

বেসরকারি ক্ষেত্রে তো বটেই, সরকারি ক্ষেত্রেও বাংলা ভাষার প্রচলন আশানুরূপ নয়। এখনও সরকারি নানা কাজে ইংরিজি ভাষার দাপট অনেককেই সমস্যায় ফেলে। সরকারি দফতরের কাজের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব থেকে যায়। দরখাস্ত লেখা থেকে শুরু করে সরকারি বিজ্ঞপ্তি – নানা কাজে আমাদের ইংরিজি নির্ভরতা কমেনি। এর ফল ভোগ করেন প্রান্তিক মানুষ, যাঁরা বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখেন নিজেদের তাগিদেই। এখনো গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে বাংলা ক্যালেন্ডারের চল, বাংলার পালাপার্বণের চর্চা রয়েছে। ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতি, ব্যবহারিক উপযোগিতার সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। বাংলা ভাষার বিপন্নতা নিয়ে আলোচনায় এইসব দিক বিবেচনা না করলে চলে না। হিন্দি ভাষার দাপটে বাংলার বিপন্নতা নিয়ে মধ্যবিত্ত যত বিচলিত, ইংরিজি আগ্রাসন নিয়ে ততটা নয়। বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোর দুরবস্থা দেখলেই বিষয়টা বোঝা যায়। শহর, আধা শহরে তো বটেই, গ্রামেও এখন ইংরিজি মাধ্যম স্কুল ভালমতই ডালপালা মেলছে। বহু ঐতিহ্যশালী স্কুল ছাত্রছাত্রীর অভাবে বন্ধ হওয়ার মুখে। নিম্নবিত্তরাও এখন ইংরিজি মাধ্যম স্কুলে না পড়া পিছিয়ে থাকার লক্ষণ বলে ভাবতে শিখেছেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অবশ্য সরকারি শিক্ষানীতির দায়ও এর জন্য কম নয়; যে নীতির প্রধান লক্ষ্য শিক্ষার বেসরকারিকরণ। পরিকল্পনামাফিক সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। অভিভাবকদের বেসরকারি ইংরিজি মাধ্যম স্কুলগুলোর উপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। সরকারি স্কুলে এখন যারা পড়তে যায় তাদের অধিকাংশই গরিব ঘরের ছেলেমেয়ে, হাতে গোনা নাম করা সরকারি স্কুল ব্যতিক্রম হিসাবে টিকে আছে। শৈশব থেকেই একদল ছেলেমেয়ে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষালাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অভিভাবকদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সরকারি শিক্ষানীতির বদান্যতায়। স্বাভাবিকভাবেই বাংলা ভাষার উপযোগিতা তাদের কাছে কম। বরং বাংলা ভাষা ভালভাবে লিখতে, পড়তে না পারা অনেকের কাছে গর্বের বিষয়। ইংরিজিতে সড়গড় না হলে, ভুল বানান লিখলে যতটা সংকোচ বোধহয়, বাংলার ক্ষেত্রে অক্ষমতায় তা হয় না। স্বাধীনতার এত বছর পরেও ঔপনিবেশিক ঘোর কাটেনি। হিন্দি ভাষার দাপট নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও, তার মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি ভালবাসা কতখানি? সত্যিকারের ভালবাসা থাকলে আমাদের ইংরিজি ভাষার প্রতি এত প্রীতি থাকত না।

তার মানে এই নয় যে, হিন্দি ভাষার দাপট সমর্থন করতে হবে। কিন্তু বাংলা ভাষার প্রতি দরদ না হিন্দি ভাষার প্রতি বিরাগ – কোনটা মধ্যবিত্তের একাংশকে উদ্বিগ্ন করছে সেটাও ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে। সংবিধান কোনো ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেয়নি। বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যই তার প্রেরণা। সংবিধান আমাদের ধর্ম, জাত, ভাষা, লিঙ্গগত সমানাধিকার দিয়েছে। রাজ্য গঠনের ক্ষেত্রেও ভাষা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তা সত্ত্বেও হিন্দি ভাষা গোটা ভারতের উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস বরাবরই ছিল। কিন্তু বর্তমানে তা আর নিছক প্রয়াসে সীমাবদ্ধ নেই। মোদী সরকারের অতি কেন্দ্রীকরণের অন্যতম হাতিয়ার হল ভাষা আগ্রাসন। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করে হিন্দি ভাষাকে সারা দেশের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এর জন্য অবশ্যই দায়ী বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান মতাদর্শ। সরকারি নানা কাজে হিন্দি ভাষা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা নিয়ে বারবার অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দক্ষিণ ভারতের বেশ কয়েকটা রাজ্যে হিন্দি ভাষা আগ্রাসন রাজনীতির বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। তবুও কেন্দ্রীয় সরকারের পিছু হঠার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ভাষাগত জাত্যভিমান আসলে দক্ষিণপন্থাকেই শক্ত করে। বিজেপি তথা হিন্দুত্ববাদীরা সেকথা ভালই জানেন।

পরিচয় সত্তার রাজনীতি যত বিস্তৃত হবে তত তাকে কৌশলে ধর্মীয় সম্প্রদায়গত রাজনীতিতে রূপান্তরিত করার সুবিধা। আসাম থেকে মহারাষ্ট্র – দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আসামে যেমন অসমিয়া জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে বিজেপি মুসলমানবিদ্বেষী রাজনীতিতে রূপান্তরিত করতে পেরেছে, তেমন মহারাষ্ট্রে মারাঠি জাত্যভিমান থেকে উত্থান হওয়া দল শিবসেনার সঙ্গেও তার দীর্ঘমেয়াদি জোট গড়ে উঠেছিল। সংসদীয় রাজনীতির পাটিগণিতে শিবসেনার সঙ্গে সেই সম্পর্ক ভাঙার পর, বিজেপি শিবসেনার মধ্যেই ভাঙন ধরিয়ে ওই রাজ্যে জোট সরকার গঠন করেছে। শিবসেনার এক গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের বর্তমান দ্বন্দ্বের মধ্যেও কোনো মতাদর্শগত বিরোধের উপাদান নেই। যে কোনোদিন এই বিরোধ মিটেও যেতে পারে।

 

এই নয় যে, হিন্দি ভাষার দাপট সমর্থন করতে হবে। কিন্তু বাংলা ভাষার প্রতি দরদ না হিন্দি ভাষার প্রতি বিরাগ – কোনটা মধ্যবিত্তের একাংশকে উদ্বিগ্ন করছে সেটাও ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে।

 

বিজেপি যেমন মতাদর্শগতভাবেই সংবিধানের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরোধী, তেমন বহুমাত্রিকতারও বিরোধী। অতি কেন্দ্রীকরণ করতে হলে ভাষার বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়া চলে না। কেন্দ্রীয় সরকারের নানা দফতরে কোনো কাজে গেলে সাধারণ নাগরিক এটা ভালভাবে টের পাচ্ছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে বাংলা বললে সমস্যা হচ্ছে। কারণ কর্মচারী হয়ত বাংলা বোঝেনই না। রেল পরিষেবাতেও একই অবস্থা। ঘোষণায় হিন্দি, বাংলা মিশিয়ে জগাখিচুড়ি উচ্চারণে যাত্রীরা অনেক সময়েই বিভ্রান্ত হন। ব্যাকরণগত ভুলের কথা না হয় বাদই দেওয়া গেল। কর্মচারী বাংলাভাষী না-ই হতে পারেন। কিন্তু পরিষেবা ক্ষেত্রে জনসংযোগ খুব গুরুত্বপূর্ণ, ভাষা যার অঙ্গ। কর্তৃপক্ষ যেন জেনে বুঝেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। এমনকি বেশকিছু বেসরকারি সংস্থার বিভিন্ন পরিষেবা পেতেও এখন বাংলা বললে অসুবিধা হচ্ছে। অথচ পরিষেবায় গ্রাহক অসন্তুষ্ট হলে তাদের ব্যবসার ক্ষতির আশঙ্কা থাকার কথা। কিন্তু সেই আশঙ্কা গ্রাহ্য করা হচ্ছে না, কারণ গ্রাহকরা নিজেদের অধিকারের বিষয়ে সচেতন নন। বরং ইংরিজি বা হিন্দি ভালভাবে বুঝতে বা বলতে না পারায় তাঁদের অধিকাংশ সংকোচ বোধ করেন। তাঁদের মনে এই ধারণা বাসা বেঁধেছে যে, মাতৃভাষা ছাড়া অন্য ভাষা না বোঝা লজ্জার। প্রান্তিক মানুষের ইংরিজির প্রতি ভীতি, সংকোচ বেশি। তাই হিন্দি বুঝতে বা বলতে শেখার প্রতি তাঁদের ঝোঁক থাকে। এখন হিন্দি আগ্রাসনে আতঙ্কিত হয়ে গেল গেল রব তুললে তাঁরা তাতে কতটা সাড়া দেবেন? ইংরিজি না জানায় প্রতি পদে তাঁদের সমস্যা, হয়রানির জন্য তো শিক্ষিত শ্রেণি গেল গেল রব তোলেনি। বরং বাংলাভাষীদের অভিজাত অংশ তাঁদের এই অক্ষমতাকে সরাসরি বা হাবেভাবে বিদ্রূপ করতেই অভ্যস্ত।

 

প্রান্তিক মানুষের ইংরিজির প্রতি ভীতি, সংকোচ বেশি। তাই হিন্দি বুঝতে বা বলতে শেখার প্রতি তাঁদের ঝোঁক থাকে। এখন হিন্দি আগ্রাসনে আতঙ্কিত হয়ে গেল গেল রব তুললে তাঁরা তাতে কতটা সাড়া দেবেন? ইংরিজি না জানায় প্রতি পদে তাঁদের সমস্যা, হয়রানির জন্য তো শিক্ষিত শ্রেণি গেল গেল রব তোলেনি। বরং বাংলাভাষীদের অভিজাত অংশ তাঁদের এই অক্ষমতাকে সরাসরি বা হাবেভাবে বিদ্রূপ করতেই অভ্যস্ত।

 

শহর ও গ্রামের প্রান্তিক মানুষের একটা বড় অংশ আজ কাজের সন্ধানে অন্য রাজ্য বা দেশে যাচ্ছেন। রাজ্যে শ্রমনিবিড় শিল্প নেই। জুটমিল, চা বাগানে বহু লোকের কর্মসংস্থান হত। সেগুলো আজ ধুঁকছে। কটন মিলসহ অন্য শ্রমনিবিড় শিল্পেরও একই দশা। একসময় এইসব কারখানায় কাজ করতে অন্য রাজ্য থেকে মানুষ পশ্চিমবঙ্গে আসতেন, আজ উল্টো স্রোত। কৃষিক্ষেত্রও সংকটে। ফসল ফলিয়ে কৃষকের লাভ বিশেষ হচ্ছে না, উলটে লোকসান হচ্ছে। তাই গ্রামবাংলার মানুষ আজ কাজের সন্ধানে প্রবাসী হচ্ছেন। নানা অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকে পরিণত হচ্ছেন। আবার তথ্যপ্রযুক্তি সমেত নানা শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রে কাজ করতেও আজ অনেকে পাড়ি জমাচ্ছেন অন্য রাজ্যে। মোটা বেতনের শ্রমিক থেকে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক – সকলকেই আজ অন্যত্র ইংরিজি বা হিন্দি ভাষার উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। তাই দারিদ্র্যের কারণে অল্প বয়সে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে প্রবাসী হয়ে যাওয়া শ্রমিকের কাছে বাংলার চেয়ে হিন্দির উপযোগিতা বেশি। এই রাজ্যে যাঁর রুজির সুযোগ নেই, বাংলা ভাষা বিপন্ন হলে তাঁর কি খুব কিছু যায় আসে? বরং বেঁচে থাকার জন্যই তাঁকে অন্য ভাষাটা শিখতে হয়। এঁদের সন্তানরা অন্য রাজ্যে বড় হলে সেই রাজ্যের ভাষা বা হিন্দিটাই ভালভাবে শিখবে। শুনতে খারাপ লাগলেও, প্রান্তিক মানুষের একটা বড় অংশ, যাঁরা অন্য রাজ্যে যেতে বাধ্য হচ্ছেন বা এই রাজ্যেও কাজের ক্ষেত্রে হিন্দি বুঝতে এবং বলতে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁদের কাছে বাংলা ভাষা বাঁচানোর ডাক বিলাসিতা মাত্র। কারণ ভাত জোগাড় করতেই দিন কেটে যাওয়া এই মানুষগুলোর এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই।

হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থানের উগ্র রাজনীতি আজ আবার বাংলাভাষী প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য আরেক বিপদ ডেকে এনেছে। দিল্লি, কর্ণাটক থেকে শুরু করে পাশের রাজ্য ওড়িশাতেও তাঁদের হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে, বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাংলাভাষীদের জন্য এ এক বড় ট্র্যাজেডি। দেশভাগের অভিশাপ আজও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যে বিদ্বেষের শিকার তাঁরা আজও হয়ে চলেছেন, তা ছড়িয়ে পড়ছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে। কারণ বাংলাভাষী যেমন ভারতে রয়েছে, তেমন বাংলাদেশেও আছে। এই আন্তর্জাতিকতাই অনেকের কাছে অভিশাপ। তার উপর বাংলাভাষী মুসলমান হলে তো কথাই নেই। সহজেই অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। রুটিরুজির তাগিদে যাঁরা ভিনরাজ্যে যেতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা টিকে থাকার জন্যই সেই রাজ্যের ভাষা, সংস্কৃতির সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলতে বাধ্য হন। আর সেই সংস্কৃতিই তাঁদের মাধ্যমে চলে আসছে তাঁদের গ্রামে বা শহরে। আসছে সেখানকার রাজনৈতিক সংস্কৃতিও। গ্রামবাংলার সমাজজীবন, রাজনীতি, অর্থনীতি বদলে যাচ্ছে প্রবাসী শ্রমিকদের হাত ধরে। অনেকের মতে, গ্রামবাংলায় ধর্মীয় রাজনৈতিক মেরুকরণের অন্যতম কারণ প্রবাসী শ্রমিকরা। যদিও এটাই একমাত্র কারণ নয়।

 

শুনতে খারাপ লাগলেও, প্রান্তিক মানুষের একটা বড় অংশ, যাঁরা অন্য রাজ্যে যেতে বাধ্য হচ্ছেন বা এই রাজ্যেও কাজের ক্ষেত্রে হিন্দি বুঝতে এবং বলতে বাধ্য হচ্ছেন, তাঁদের কাছে বাংলা ভাষা বাঁচানোর ডাক বিলাসিতা মাত্র।

 

আর্থিক সংকট, প্রান্তিক মানুষের রুটিরুজির সমস্যা থেকে বিচ্ছিন্ন করে বাংলা ভাষার এই বিপন্নতাকে বিচার করে লাভ নেই। অন্য রাজ্য থেকে লোক আসছে বলে বেকার সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে – এমন বিদ্বেষের রাজনীতি দিয়ে এর মোকাবিলা করা যাবে না। বেকার সমস্যা, আর্থিক সংকট যত বাড়ে, তত অপরের প্রতি ঘৃণার রাজনীতি বাড়ে। আমেরিকা থেকে শুরু ভারতের যে কোনো তথাকথিত উন্নত রাজ্য বা বাংলা – কোথাও এর অন্যথা হয় না। অন্য রাজ্যে বাংলাভাষীদের বিদ্বেষের শিকার হওয়ার বড় কারণ কিন্তু সেই রাজ্যগুলোয় কাজের অনিশ্চয়তা। পালটা বিদ্বেষের রাজনীতি দিয়ে এর মোকাবিলা করা যায় না। হিন্দি ভাষা আগ্রাসনের বিরোধিতা আর হিন্দি ভাষা বা সেই ভাষাগোষ্ঠীর প্রতি ঘৃণা সমার্থক নয়। ভোট রাজনীতিতে বাংলা ভাষার বিপন্নতাকে মূলধন করে বাংলা জাত্যভিমানের রাজনীতিকে ইদানীং মদত দেওয়া হচ্ছে। রাজ্যে কাজের সুযোগ যত কমবে, তত এই রাজনীতিকে মদত দেওয়া বাড়বে।

বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার উৎসব বলতে যা বোঝানো, শেখানো হয়ে চলেছে তার মধ্যেও একমাত্রিকতা রয়েছে। যেমন ধরা যাক, দুর্গাপুজোর কথা। আমরা পাঠ্যবইতে পড়ে আসছি, এটা বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। এই রাজ্যের অধিকাংশ বাঙালির ক্ষেত্রে কথাটা সত্য হলেও, সকলের কাছে নয়। অহিন্দুদেরই কেবল নয়, এই রাজ্যের নানা জনজাতির সঙ্গেও কিন্তু দুর্গাপুজোর সম্পর্ক নেই। বরং পৌরাণিক কাহিনির বিপরীত আখ্যানকে কেন্দ্র করে দুর্গাপুজোর সময়ে এই রাজ্যের বহু জায়গায় বিভিন্ন উৎসব পালিত হয়। দাঁশাই নাচ, কাঠি নাচ প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে প্রচলিত আখ্যান এর প্রমাণ। সেইসব নিয়ে চর্চা বাংলাভাষীদের মধ্যে কতজন করেন? বরং এখন জনজাতিগুলোর মধ্যেও সেসবের চর্চা হারিয়ে যাচ্ছে। সরকারি অনুষ্ঠানে লোক সংস্কৃতির আড়ম্বরে না আছে প্রাণ, না আছে শিকড়ের টান। তাই সরকারি অনুদানে দুর্গাপুজো আর প্রাণহীন লোকসংস্কৃতি চর্চা চলছে সমান তালে। আপাতভাবে মনে হতে পারে বাংলার সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হচ্ছে। কিন্তু আসলে বহুমাত্রিকতা, বৈচিত্র্য হারিয়ে তার আর্যায়ন ঘটছে। দুর্গাপুজোকে শ্রেষ্ঠ উৎসব বলতে গিয়ে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আর্য-অনার্যের দ্বন্দ্ব, হুদুড় দুর্গার আখ্যানকে ভুলিয়ে দিলে কিন্তু হিন্দুত্ববাদেরই জমি তৈরি হয়। দুর্গাপুজোর সময়ে নবরাত্রি মেনে নিরামিষ খাওয়া, রামনবমীকে কেন্দ্র করে উগ্রতার বাতাবরণ তৈরি করা সহজ হয়।

আরো পড়ুন বাংলা মাধ্যম ও বাংলা বিপন্ন, কিন্তু রেডিও জকির হাতে নয়

বাংলা ভাষা উচ্চারণ বা চর্চা করতে গিয়ে কি বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়? রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের বাংলা উচ্চারণে, প্রয়োগে বৈচিত্র্য রয়েছে। আঞ্চলিক এই বৈচিত্র্যকে কিন্তু স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। লেখাপড়া বা চাকরি করতে কলকাতা বা তার উপকণ্ঠে এসে উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল, এমনকি সুন্দরবনের মানুষকে আঞ্চলিক উচ্চারণে বাংলা বলতে গেলে অনেকসময় ঠাট্টা বা বিদ্রুপের শিকার হতে হয়। অথচ আমরা ভুলে যাই মানভূম, পূর্ব পাকিস্তান বা শিলচরের ভাষা আন্দোলনের শহিদদের কথা। যেখানকার বাংলা উচ্চারণ এই নগরকেন্দ্রিক ভদ্দরলোকি বাংলা উচ্চারণের থেকে আলাদা। রাজ্যের প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ, তাঁদের সংস্কৃতির প্রতি উদাসীনতা, অবজ্ঞা ভদ্দরলোক হওয়ার লক্ষণ। ভদ্দরলোকি বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি চর্চার এক অঘোষিত আগ্রাসন আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে বিপন্ন করে চলেছে বহুকাল ধরে। এখন সেই বাংলা সংস্কৃতির উপর আগ্রাসী হচ্ছে হিন্দি ভাষা, তার সংস্কৃতি। অনেকটা মাৎস্যন্যায়ের মত। বাংলা বা যে কোনো প্রাদেশিক, আঞ্চলিক ভাষাকে রক্ষা করতে গেলে বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে হবে। বাংলা ভাষা, সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিলে তবেই হিন্দি ভাষা আগ্রাসন রোখা যাবে। হিন্দিভাষীদের প্রতি বিদ্বেষ, ইংরিজি ভাষা প্রীতি, আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করে তথাকথিত ভদ্দরলোকি ভাষা আন্দোলনে এই আক্রমণ রোখা যাবে না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.