আগামী ১ অগাস্ট থেকে একশো দিনের কাজ রাজ্যে আবার চালু করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। আদালতের নির্দেশ সরকার মানলে তিন বছরেরও বেশি সময় পরে এই রাজ্যে আবার একশো দিনের কাজ শুরু হবে। রাজ্য সরকারের অনিয়ম, হিসাব ঠিকমত দিতে না পারা এবং দুর্নীতির অভিযোগে এই প্রকল্প বাবদ রাজ্যকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিল কেন্দ্র। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে শ্রমিকদের মজুরির টাকা দেওয়া বন্ধ করে দেয় নরেন্দ্র মোদীর সরকার। ২০২২ সালের মার্চ থেকে কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। কেন্দ্রের এই পদক্ষেপে রাজ্যের প্রায় আড়াই কোটি গ্রামীণ শ্রমিক কাজের আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

পশ্চিমবঙ্গ ক্ষেতমজুর সমিতি এই নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করে। গত ১৮ জুন সেই মামলায় প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম ও বিচারপতি চৈতালি চট্টোপাধ্যায় দাসকে নিয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ উপর্যুক্ত নির্দেশ দেয়। এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে অগাস্ট মাসে। আদালতের নির্দেশ অনুসারে, কেন্দ্র দুর্নীতি বন্ধ করতে ইচ্ছে মত পদক্ষেপ নিতে পারে, রাজ্যের উপর শর্ত আরোপ করতে পারে। কেন্দ্রের নির্দেশিকা মানতে রাজ্য সরকার বাধ্য। কিন্তু আদালত এও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তার জন্য এই প্রকল্প স্থগিত রাখা যায় না।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

রাজ্যে একশো দিনের কাজ বন্ধকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপান উতোর কম হয়নি। ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এটি অন্যতম ইস্যু হয়েছিল। তৃণমূল কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ তোলে, বিজেপি তোলে তৃণমূলের দুর্নীতির অভিযোগ। অপরদিকে বাম দল ও বিভিন্ন বামপন্থী গণসংগঠন পুনরায় কাজ চালু এবং দুর্নীতি রোধের দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি নিয়ে চলেছে। বেশ কিছু সামাজিক, ট্রেড ইউনিয়ন, কৃষক সংগঠনও কাজ আবার চালু করার দাবিতে সোচ্চার হয়। পাশাপাশি একাধিক মামলাও দায়ের করা হয়। বলা যেতে পারে বাম দল ও বিভিন্ন সংগঠনের সেই দাবিই আদালতের নির্দেশে স্বীকৃতি পেল।

একশো দিনের কাজের আইন তৈরির পিছনে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অবদান রয়েছে। বামেরা দীর্ঘকাল কাজের অধিকারকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। নানা সরকারি প্রকল্প থাকলেও, কাজের নিশ্চয়তা নিয়ে দেশে কোনো আইন ছিল না। গত শতকের নয়ের দশক থেকে নয়া উদারনীতির সৌজন্যে দেশের আর্থসামাজিক সংকট আরও বাড়ে। কাজের নিশ্চয়তার আইনি অধিকার নিয়ে বামেদের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও আন্দোলনে নামে। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ইশতেহারে কংগ্রেস কাজের নিশ্চয়তা সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করার প্রতিশ্রুতি দেয়।

সেই নির্বাচনে অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকারকে হারিয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে। বামেরা অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে ইউপিএ সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন করে। সেই অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচিতে গ্রামে পরিবার পিছু বছরে একশো দিনের কাজের নিশ্চয়তা প্রদান স্থান পেয়েছিল। যদিও বামেরা আরও বেশিদিন কাজের নিশ্চয়তার দাবি তুলেছিল।

সেইসময় কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর সভাপতিত্বে গঠিত হয় জাতীয় উপদেষ্টা পর্ষদ। তার লক্ষ্য সরকারি নীতি প্রণয়নে পরামর্শ ও প্রস্তাব প্রদান। দেশের বেশ কয়েকজন বিখ্যাত সমাজকর্মী এই পর্ষদের সদস্য হন। পর্ষদ গ্রামীণ কর্মনিশ্চয়তা নিয়ে একটি আইনের খসড়া প্রস্তুত করে। অবশেষে ২০০৫ সালে জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন সংসদে অনুমোদিত হয়। যদিও ইউপিএ-র অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি ও জাতীয় উপদেষ্টা পর্ষদের খসড়া আইনের থেকে চূড়ান্ত আইন অনেকখানি সরে যায়। বিশেষত ন্যূনতম মজুরি প্রদানের নিশ্চয়তা না দিয়ে মজুরির হার নির্ধারণের বিষয়টি সরকারের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও নিঃসন্দেহে এই আইন কাজের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। বলা যেতে পারে, আইনটি রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের মিলিত প্রচেষ্টার ফসল।

২০০৯ সালে আইনটির নাম বদলে করা হয় মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন বা মনরেগা। ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের ২০০ জেলায় এই আইন অনুসারে কাজ শুরু হয়, ধীরে ধীরে তা বিস্তার লাভ করে। কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যান অনুসারে বর্তমানে দেশের ৭৪১ জেলার ৭,১৯৭ ব্লকের প্রায় ২,৭০,০০০ গ্রাম পঞ্চায়েতে এই আইন অনুসারে গ্রামীণ জব কার্ড হোল্ডার পরিবারগুলিকে কাজ দেওয়া হচ্ছে। আইন অনুসারে জব কার্ড পাওয়া প্রত্যেক পরিবার বছরে অন্তত একশো দিন এই প্রকল্পে কাজ পাবে। কাজের জন্য আবেদন করার ১৫ দিনের মধ্যে কাজ না পেলে বেকার ভাতা পাবে, মজুরিও বকেয়া রাখা যাবে না। বকেয়া থাকলে নির্দিষ্ট হারে তার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

আইনে প্রকল্প রূপায়ণে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সামাজিক নিরীক্ষা, গ্রাম সংসদ, গ্রামসভার মাধ্যমে কাজের হিসাব, কোন কাজ কীভাবে হবে, কাদের মধ্যে কোন কাজ বন্টিত হবে, কাজের অগ্রগতি, ফলাফল – এসব নিয়ে প্রত্যেক গ্রামবাসীর জানা, মতামত দেওয়ার, প্রয়োজনে অভিযোগ করার অধিকার রয়েছে।

২০১৪ সালে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকে আইনটিকে কার্যত অকেজো করে দিতে একের পর এক কৌশল নিয়ে চলেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী মনরেগায় অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি। শুধু তাই নয়, কেন্দ্রীয় বাজেটে বরাদ্দ এক পয়সাও না বাড়ানো, এমনকি কমানোর নজিরও আছে। ২০২০-২১ কেন্দ্রীয় বাজেটে মনরেগার জন্য বরাদ্দ ছিল ৬১,৫০০ কোটি টাকা। লকডাউনের ফলে একশো দিনের কাজের চাহিদা বেড়ে যায়। সেবছর মাঝপথে বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হয়েছিল ১,১১,৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২১-২২ সালে মনরেগায় বাজেট বরাদ্দ করা হয় ৭৩,০০০ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ সালের বাজেটেও বরাদ্দ একই রাখা হয়েছিল। ২০২৩-২৪ সালে বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে ছাঁটাই করা হয় – ৬০,০০০ কোটি টাকা, অর্থাৎ ২০১৯-২০ সালের বাজেট বরাদ্দের সমান। লোকসভা ভোটের আগে ২০২৪-২৫ সালের অন্তর্বর্তী বাজেটে অবশ্য বরাদ্দ বেড়ে হয় ৮৬,০০০ কোটি টাকা। ভোটের আগে বরাদ্দ বাড়ানোর রাজনৈতিক তাগিদ ছিল। যদিও প্রসঙ্গক্রমে বলা ভাল যে, ২০২৩-২৪ সালে সংশোধিত বরাদ্দ বেড়ে ৮৬,০০০ কোটি টাকাই হয়েছিল। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী বাজেটে বরাদ্দ আগের বাজেটের তুলনায় বাড়লেও সংশোধিত বরাদ্দের থেকে কিন্তু বাড়েনি। এরপর মোদী সরকার তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এসে ২০২৪-২৫ সালের পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করে গত বছর জুলাই মাসে। ২০২৫-২৬ সালের বাজেট পেশ করা হয় এবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে। দুটি বাজেটেই মনরেগায় বরাদ্দ বাড়েনি, ৮৬,০০০ কোটি টাকাই রয়েছে।

আরো পড়ুন এবারের বাজেট: লক্ষ্য আমজনতার বিনাশ, পুঁজির বিকাশ

মনরেগার কাজ যে দেশে ঠিকমত হচ্ছে না, সরকারি পরিসংখ্যানই তা প্রমাণ করছে। ২০২৪-২৫ সালের সরকারি আর্থিক সমীক্ষায় একশো দিনের কাজ (মনরেগা) দরিদ্র এলাকায় কম হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। বলা হয়, কাজের চাহিদার সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতির দুর্দশার কোনো সম্পর্ক নেই। উত্তরপ্রদেশ ও বিহার মিলিয়ে বাস করেন দেশের দরিদ্র মানুষের ৪৫% (উত্তরপ্রদেশে ২৫%, বিহারে ২০%)। অথচ ওই দুই রাজ্যে একশো দিনের কাজে ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের মাত্র ১৭% টাকা। এর মানে অবশ্য এই নয়, যে ওই রাজ্যদুটিতে কাজের চাহিদা কম। এর মানে হল রাজ্য সরকারের ব্যর্থতায় কাজ হয়নি। পাশাপাশি তামিলনাড়ুতে দেশের মোট গরিব মানুষের মাত্র ১% বাস করলেও ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের ১৫% অর্থ। কেন্দ্রের আর্থিক সমীক্ষা অবশ্য স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যের ঘাড়ে দোষ চাপাবে। কিন্তু দায় কেন্দ্র অস্বীকার করতে পারে না। তাছাড়া উত্তরপ্রদেশে এককভাবে এবং বিহারে জেডিইউ-র সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপিই।

কেন্দ্রের গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের চলতি বছরের ২২ জুনের হিসাব অনুযায়ী দেশে ১৫.৩৪ কোটি পরিবারের কাছে জব কার্ড থাকলেও, এর মধ্যে সক্রিয় মাত্র ৮.৪৩ কোটি জব কার্ড। বিগত তিন বছর বা চলতি বছরের মধ্যে একদিনও কাজ পেলে সেই জব কার্ডকে সক্রিয় বলা হয়। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক পরিবারের জব কার্ড থাকলেও তাদের কেউ তিন বছরে একদিনও কাজ পায়নি বা করতে চায়নি। গ্রামীণ ভারতের আর্থিক পরিস্থিতি বিচার করলেই বোঝা যায়, কাজ না করতে চাওয়া নয়, এর মধ্যে কাজের সুযোগ না পাওয়া পরিবারের সংখ্যাই বেশি।

অতি অল্প পরিবারই আইন অনুযায়ী বছরে একশো দিন কাজের সুযোগ পায়। গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের হিসাব অনুযায়ী, গত আর্থিক বছরে (২০২৪-২৫) ৫,৭৯,০০,০০০ পরিবার কাজের সুযোগ পেয়েছিল। তার মধ্যে মাত্র ৪০,৭৪,১৩৭টি পরিবার একশো দিন কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। সেবছর পরিবার পিছু গড়ে কাজ ছিল মাত্র ৫০.২৩ দিন। তার আগের বছর ছিল গড়ে ৫২.০৮ দিন। অর্থাৎ কাজ পাওয়া দিনের সংখ্যা আইনি অধিকারের প্রায় অর্ধেক এবং ক্রমশ তা কমছে। কাজ না পেলে বেকার ভাতাও কম মানুষই পান।

আসলে কেন্দ্র প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না করে এই আইনি অধিকারকে ধীরে ধীরে সংকুচিত করতে চায়। নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতিতে অধিকার কেড়ে নিয়ে সরকারি অনুদানের উপর নির্ভরশীল হতে গরিব মানুষকে বাধ্য করা হচ্ছে। অধিকার পরিণত হচ্ছে শাসকের অনুগ্রহে। এই কারণেই কেন্দ্র এই আইনকে অকেজো করে দিতে চায়। পশ্চিমবঙ্গে একশো দিনের কাজ বন্ধ করার পিছনেও সেই মতলব কাজ করছে। দুর্নীতিগ্রস্তদের শাস্তি না দিয়ে কাজ বন্ধ করে রাজ্যবাসীকেই তাই বঞ্চিত করা হচ্ছে। রাজ্যের তৃণমূল সরকারেরও একই মানসিকতা। দুর্নীতি, অবৈধ রোজগারই তৃণমূল দলটির ভিত্তি। তৃণমূল স্তর থেকে উপর পর্যন্ত দলটির সংগঠনই দাঁড়িয়ে রয়েছে এইসব অপকম্মের উপর ভর করে। ফলে মনরেগা প্রকল্প রূপায়ণে আইন অনুযায়ী কাজ করতে তাদের আগ্রহ নেই। কাজের অধিকারের বদলে তারা গ্রামবাংলার মানুষকে নিজেদের দয়ার উপর নির্ভরশীল রাখতে চায়। গ্রামে গ্রামে শাসক দলের নেতা আর পঞ্চায়েতের মাতব্বররা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। মনরেগা প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থ অনেকের আয়ের বড় উৎস। ভুয়ো জব কার্ড, মাস্টার রোলে অনিয়ম, কাজ না করিয়ে খরচ দেখিয়ে দেওয়া, পছন্দের পরিবার বা লোকেদের কাজ দেওয়া সমেত নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে তৃণমূল মনরেগার আসল উদ্দেশ্যই বানচাল করে দিয়েছে। সামাজিক নিরীক্ষা, গ্রামসভায় সাধারণ মানুষের মতামত জানানো, অভিযোগ করার বিশেষ সুযোগ বাস্তবে নেই। কাজ পাওয়া নির্ভর করে মাতব্বরদের উপর। অনেক পরিবারের জব কার্ড পর্যন্ত এইসব মাতব্বরদের কাছেই থাকে।

মাসের পর মাস মজুরি বকেয়া রাখা হয়। বেকার ভাতা তো দূরের কথা, কাজের আবেদন ইচ্ছে মত করার সুযোগ থেকেও অধিকাংশ গ্রামবাসী বঞ্চিত থাকেন। অনেকেই বেকার ভাতা বা মজুরি দেরি করে পেলে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার সম্পর্কে জানেন না। জানলেও জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াইয়ের সামর্থ্য কজন গরিবের আছে? এভাবেই তৃণমূল আইন, বিধি অমান্য করে চলছিল। সেই সুযোগে তাদের শাস্তি না দিয়ে অন্যায় ও অবৈধভাবে রাজ্যবাসীর আইনি অধিকারটাই কেন্দ্রীয় সরকার কেড়ে নিয়েছে।

২০২৩ সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরেই ২১ জুলাই দলীয় সমাবেশ থেকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নতুন এক প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেন। তিনি বলেছিলেন, ওই প্রকল্পে বছরে অন্তত ৪০-৫০ দিন কাজ পাওয়া যাবে। গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসের রাজ্য বাজেটে সেই অনুসারে কর্মশ্রী নামে নতুন প্রকল্প ঘোষণা করা হয়। বলা হয়, জব কার্ড হোল্ডাররা বছরে পঞ্চাশ দিন কাজ পাবে। বকেয়া মজুরিও মিটিয়ে দেওয়া হবে। এই প্রকল্প ঘোষণা করে কয়েক মাস পরের লোকসভা ভোটে তৃণমূলের লাভ হয়।

কর্মশ্রী প্রকল্পে তৃণমূলের রাজনৈতিক লাভ হলেও রাজ্যবাসীর আইনি অধিকার কিন্তু রাজ্য সরকারের অনুগ্রহে রূপান্তরিত হয়েছে। মনরেগার মত কর্মশ্রী আইনি অধিকার না হওয়ায়, সবটাই শাসকের অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল। কাজ না পেলে বেকার ভাতা, বকেয়া মজুরির জন্য ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন নেই। তৃণমূল দুর্নীতির জন্য শাস্তি তো পেলই না, উলটে নতুন করে দুর্নীতির পথ খুলে গেল। কেন্দ্রের কাছে জবাবদিহির দায় নেই বলে এখানে দুর্নীতির সুযোগ বেশি। কেন্দ্র-রাজ্য তরজায় এভাবেই বঞ্চিত হচ্ছেন রাজ্যবাসী। অপরদিকে বিজেপি আর তৃণমূল ভোটের আসর গরম করছে।

১৮ জুন মামলাকারী সংগঠন পশ্চিমবঙ্গ ক্ষেতমজুর সমিতি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে কলকাতা হাইকোর্টের এই নির্দেশকে ‘যুগান্তকারী রায়’ বলে স্বাগত জানিয়েছে। পাশাপাশি জানিয়েছে, আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে তারা নজরদারি বজায় রাখবে এবং শ্রমিকদের মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার লড়াইয়ের পাশে থাকবে। সন্দেহ নেই, ২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে একশো দিনের কাজ নিয়ে তৃণমূল ও বিজেপির তরজা বাড়বে। কিন্তু এই আইনি অধিকার যাতে রাজানুগ্রহে পরিণত না হয় তার উপর নিরবচ্ছিন্ন নজর রাখার কাজ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলিকে চালিয়ে যেতে হবে। মনরেগা রূপায়ণে মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ, বছরে একশো দিন কাজ না পেলে বেকার ভাতা, মজুরি বকেয়া থাকলে ক্ষতিপূরণ পাওয়া সমেত আইনি অধিকারগুলি প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই কিন্তু জারি রাখতে হবে। বাম দল ও গণসংগঠনগুলি আইন সংশোধন করে বছরে অন্তত ২০০ দিন কাজের নিশ্চয়তা, মজুরি বৃদ্ধি, শহরাঞ্চলে আইন সম্প্রসারণ সহ নানা দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন করছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের মেলবন্ধনেই এই রাজ্যে মনরেগার অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তা সম্প্রসারণ সম্ভব।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.