বিদ্যাভূষণ রাওয়াত
আদালতের ভিতরেই ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ভূষণ রামকৃষ্ণ গাওয়াইয়ের উপর শারীরিক আক্রমণের গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই ধরনের কাজ যে ‘সনাতন’ ধর্মের নাম করে করা যেতে পারে, তা প্রমাণ করে দিচ্ছে আজকের ভারতে কতখানি অনায়াসে ভয়ংকর সব কাণ্ড ঘটানো যায়। এই পরিবেশ খুবই উদ্বেগজনক। এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হতে পারে, কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই অত সরল নয়। যে আইনজীবী এই ঘটনা ঘটিয়েছেন, প্রধান বিচারপতি গাওয়াই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত আইনব্যবস্থায় তথা সমাজে ঘটে চলা গভীর পচনের সমাধান নয়। যেভাবে ঘৃণাকে স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে, তাতে ঘৃণাজীবীরা এখন হাতে দারুণ শক্তিশালী এবং ক্ষতিকর একটা অস্ত্র পেয়ে গেছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
প্রধানমন্ত্রীসহ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব এই আক্রমণের নিন্দা করেছেন ঠিকই, কিন্তু যেভাবে ঘৃণাজীবী সোশাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা এই নিয়ে মিম বানানোর উৎসব শুরু করে দিয়েছে, তা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার। এই পোস্টগুলো কেবল এই আক্রমণকে যুক্তিযুক্ত বলে প্রমাণ করছে না, গৌরবান্বিতও করছে। এই বয়ানগুলোকে যারা আরও বাড়িয়ে-চারিয়ে প্রচার করছে, দেশের আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলো, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক, কি তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে? সেই সাহস আছে? এই ইনফ্লুয়েন্সাররা তো প্রকৃতপক্ষে অপরাধী। সরকারের এদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে আটকাচ্ছে কোথায়?
একদা আইন ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি – অবিচারের বিরুদ্ধে আমাদের ঢাল। আজ আইন হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের হাতের পুতুল, স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য এবং প্রান্তিক মানুষকে দমন করার জন্য আধিপত্যশালীর হাতিয়ার। সাধারণ নাগরিকের কাছে ন্যায়বিচার এখন দূরের স্বপ্ন মনে হয়। প্রধান বিচারপতি যে অবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন তা সাধারণ রাগ নয় – স্পষ্টতই বর্ণবাদী ঘৃণা। সোশাল মিডিয়ায় অনেকে যে এই ঘটনায় উল্লসিত তা দেশের অবস্থা সম্পর্কে অনেককিছু প্রমাণ করে দেয়। যে ঘৃণাজীবীরা দলিত, আদিবাসী ও মুসলমানদের দিনরাত গালাগালি দেয় তারাই দেশের বিচারব্যবস্থার প্রধানের উপর এই আক্রমণকে গৌরবান্বিত করছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এরা ভালোই জানে যে ‘সনাতন’-এর নাম করে যা খুশি বলা যাবে বা করা যাবে, কোনো অসুবিধায় পড়তে হবে না।
আরো পড়ুন শুধু অপমান নয়, আম্বেদকর সম্পর্কে মিথ্যাভাষণও চালিয়েছেন শাহ
এই কারণেই সুপ্রিম কোর্টের উচিত উত্তরপ্রদেশের রায়বেরিলিতে হরি ওম বাল্মীকিকে পিটিয়ে মারার ঘটনার বিচার নিজের হাতে নেওয়া। আদালতের যাবতীয় বর্ণবাদী অপরাধ এবং ঘৃণাভিত্তিক অপরাধের সার্বিক তদন্তের নির্দেশ দেওয়া উচিত। সর্বোচ্চ আদালত ঘটনাগুলোর শিকড়ে যাক, রায় দিক এবং রায়ের প্রয়োগ নিশ্চিত করুক।
দুঃখের বিষয়, হরি ওমের হত্যা রাজনৈতিক দলগুলোর এবং বহু ব্রাহ্মণ তথাকথিত বুদ্ধিজীবীর ভণ্ডামিও দেখিয়ে দিয়েছে। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, যিনি কখনো একটা পরিত্যক্ত গরু নিয়েও মন্তব্য করতে ছাড়েন না, তিনি এই ঘটনায় লজ্জাজনকভাবে নিশ্চুপ। মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টিও দলগতভাবে মুখ খোলেনি, যদিও তাদের কোনো কোনো সমর্থক অনলাইনে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছেন। কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়াও দ্বিধান্বিত এবং আন্তরিক নয়। এরা সকলেই কি হরি ওমের হত্যায় দোষী বর্ণগুলোকে চটিয়ে দিতে ভয় পাচ্ছে? এই মৌনতার চেয়ে বেশি নিন্দাযোগ্য কিছু নেই।
প্রধান বিচারপতির উপর আক্রমণ আর সনাতন ধর্মের নামে স্লোগান দিতে দিতে হরি ওমের গণপিটুনিতে হত্যা – দুটোই বর্ণবাদী অপরাধ। এই বাস্তুতন্ত্রই এই ঘটনাগুলো নিয়ে উৎসব করে ঘৃণাকে গৌরবান্বিত করে।
দেখুন পডকাস্ট
আমি সেইসব রাজনৈতিক দলের থেকে বেশিকিছু আশা করি না, যারা কেবল ভোটের হিসাবে চলে। কিন্তু যেসব বুদ্ধিজীবী এবং সমাজকর্মী ন্যায়বিচার ও সমানাধিকারের পক্ষে লড়াই করেন বলে দাবি করে থাকেন, তাঁদের নীরবতার ব্যাখ্যা কী? সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতেই হবে। পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিতে হবে এবং এই ধরনের বর্ণবাদী অপরাধ যেন অগ্রাহ্য না করা হয় এবং এর পুনরাবৃত্তি না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।
ইনিউজরুম থেকে মূল নিবন্ধের ভাষান্তরিত রূপ প্রকাশিত হল। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








