বারাণসী লোকসভা কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদীর জয়ের ব্যবধান এক ধাক্কায় তিন লাখেরও বেশি কমে দাঁড়াল দেড় লাখে। উত্তরপ্রদেশেরই ফৈজাবাদে হারল বিজেপি। রাজস্থানের বনসোয়াড়ায় বিজেপি প্রার্থী হারলেন প্রায় আড়াই লাখ ভোটে। মণিপুরে একটি আসনও বিজেপি জিততে পারল না। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই চারটি ঘটনার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।

বারাণসীতে সাত লাখেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জেতার দাবি করেছিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। তিনি নিজেকে ঈশ্বরপ্রেরিত অবতার হিসাবে মানুষের সামনে হাজির করেছিলেন। অযোধ্যার রামমন্দির উদ্বোধন করে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্বপ্ন দেখেছিল বিজেপি। অযোধ্যা যে লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত, সেই ফৈজাবাদেই বিজেপি পরাজিত। রাজস্থানের বনসোয়াড়া কেন্দ্রের এক জনসভাতেই মোদী প্রথম কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মঙ্গলসূত্র কেড়ে নেওয়ার মিথ্যা ভয় দেখিয়েছিলেন। হিন্দি বলয়ের এই তিনটি আসন বিজেপির উগ্র সাম্প্রদায়িক, বিদ্বেষের রাজনীতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অপরদিকে একবছরেরও বেশি সময় ধরে চলা মণিপুরের দুই জনজাতির দাঙ্গায় বিজেপির ভূমিকা কম নয়। কেন্দ্র ও মণিপুরের ডবল ইঞ্জিনের বিজেপি সরকারের মদতেই মণিপুরে আজ এই পরিস্থিতি। একবারের জন্যও সেখানে যাননি প্রধানমন্ত্রী। তার বিপরীতে এবছরের গোড়ায় রাহুল গান্ধীর ন্যায় যাত্রা শুরুই হয়েছিল মণিপুর থেকে। ন্যায় যাত্রা এবং তার আগে ভারত জোড়ো যাত্রায় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বার্তাটা ছিল স্পষ্ট। ঘৃণার রাজনীতিতে দেশকে টুকরো টুকরো করে দেওয়ার বিজেপির রাজনীতির প্রতিস্পর্ধায় দেশের অখণ্ডতা রক্ষার ডাক। দেখা গেল, মণিপুরে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মেইতেই সম্প্রদায়ের ভোটও পড়ল কংগ্রেসের পক্ষে। মেইতেই-কুকি জাতিগোষ্ঠীর দাঙ্গাকে হিন্দু-খ্রিস্টান দাঙ্গা হিসাবে উপস্থাপন করার প্রকল্পও বড় ধাক্কা খেল।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এবারের সাধারণ নির্বাচনের মজা এখানেই, যে এনডিএ জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও, অনেকখানি ম্রিয়মান। আর শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেয়েও ইন্ডিয়া জোট উজ্জীবিত। অভূতপূর্ব এই প্রতিক্রিয়ার অবদান সম্পূর্ণ মোদীর বা মোদী-শাহ জুটির। প্রচারে তাঁরা নিজেদের অপ্রতিরোধ্য বলে জাহির করে প্রত্যাশার পারদটাকে এত উঁচুতে নিয়ে গিয়েছিলেন যে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো ছিল স্বপ্নের অতীত। জোট, এমনকি দলেরও ঊর্ধ্বে নিজেদের স্থাপন করেছিলেন। সেই প্রচার এমন এক মাত্রায় পৌঁছেছিল, যে নিজেকে অবতার বলতেও প্রধানমন্ত্রী লজ্জা পাননি। ফল বের হওয়ার পর সেই স্বঘোষিত অবতারের সঙ্গে কিছু শরিক দলের দর কষাকষি, তাঁর প্রতি সংঘ পরিবারের অসন্তোষ প্রকাশ্যে চলে আসা ভক্তদের কাছে যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব অবশ্যই দেশের নাগরিকদের।

নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আগামী দিনে কোন পথে চলতে পারে দেশ, নাগরিকদের সামনেই বা কোন সম্ভাবনা রয়েছে – তা নিয়ে কিছু আলোচনাই উদ্দেশ্য। এই যে মোদী ফের প্রধানমন্ত্রীও হবেন, আবার তাঁকে অনেকখানি নখদন্তহীন করাও গেল, এর কৃতিত্ব তো নাগরিকদের। এমন নয় যে দেশবাসী সবাই মিলে বসে এই ব্যবস্থা ঠিক করেছেন। কোনো রাজ্যে বিজেপি তথা এনডিএ জোট অপ্রত্যাশিত ধাক্কা খেয়েছে, কোনো রাজ্যে আবার অপ্রত্যাশিতভাবে সফল হয়েছে। এই যে একেকটা রাজ্যে একেকরকম জনমত, তার মধ্যে দিয়ে শেষ পর্যন্ত একনায়কতন্ত্রকে ধাক্কা দেওয়া – বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের এর থেকে বড় দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে? ভারতের এই চরিত্রই ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিলেন মোদী। সরকার হয়ে গিয়েছিল জোট বা দলের নয়, এক ব্যক্তির সরকার। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেন এক অঘোষিত রাজতন্ত্র।

এদেশে গণতন্ত্র তার নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে যতটুকু রয়েছে সেটুকুও থাকবে কিনা; নানা ধর্ম, জাত, ভাষা, সংস্কৃতির সম স্বীকৃতি অটুট থাকবে কিনা তা ছিল এবারের ভোটে বড় প্রশ্ন। এক দেশ এক ভোটের নাম করে বিভিন্ন রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ ও পরিস্থিতির বৈচিত্র্য নষ্ট করে; পঞ্চায়েত, পৌর ভোট থেকে লোকসভা নির্বাচনকে একই পংক্তিতে রেখে অতি কেন্দ্রীভূত এক ব্যবস্থা কায়েম করতে চাইছে মোদী সরকার। সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা,  সামাজিক ন্যায়ের অঙ্গীকার, সমানাধিকারের স্বীকৃতি ধ্বংস করার এজেন্ডা নিয়েই এবার নির্বাচনে নেমেছিল বিজেপি। নির্বাচন কমিশনের মত সংস্থায় সরকারি কর্তৃত্ব পাকাপোক্ত করাই শুধু নয়, বিচারক নিয়োগে নাক গলিয়ে বিচারব্যবস্থাকেও ধ্বংস করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো আরও দুর্বল করে অতি কেন্দ্রীকরণের প্রবণতাও আরও তীব্র হত বিজেপি আবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে।

পরিহাস এই, যে যারা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ধ্বংস করতে চায়, তাদের এখন সরকার গড়তে দুটি রাজ্যের জন্য বিশেষ প্যাকেজের দাবি গিলতে হচ্ছে। এনডিএর দুই শরিক দলের নেতা নীতীশ কুমার ও চন্দ্রবাবু নাইডু যথাক্রমে বিহার ও অন্ধ্রপ্রদেশের জন্য বিশেষ আর্থিক প্যাকেজের দাবি করেছেন। যে মোদী সরকারে প্রধানমন্ত্রীই সর্বেসর্বা ছিলেন, সেই সরকার তৃতীয়বারের জন্য গড়তে নানা গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে মন্ত্রিত্বের জন্য শরিকদের চাপ বিচার করতে হচ্ছে।

মোদী সরকার থেকে এনডিএ সরকারে এই রূপান্তর কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে বিজেপি রাষ্ট্রপতিনির্ভর কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়, তাকে নির্ভর করতে হবে অনেকগুলি আঞ্চলিক দলগুলির উপর। যারা কংগ্রেসমুক্ত বা বিরোধীশূন্য ভারত চায় তারা এবং তাদের জোটসঙ্গীরা তামিলনাড়ু, পাঞ্জাব, মণিপুর, মেঘালয়ে একটি আসনও পায়নি। মণিপুর, মেঘালয়ে তবুও লোকসভায় মাত্র দুটি করে আসন, কিন্তু তামিলনাড়ুর ৩৯ ও পাঞ্জাবের ১৩ আসনের একটিও বিজেপি পায়নি। এছাড়াও নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, সিকিম, দমন ও দিউ, পুদুরেরি, চণ্ডীগড়ের মত এক লোকসভা আসন বিশিষ্ট অনেক রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলেও বিজেপির আসন সংখ্যা শূন্য।

আবার যে উত্তরপ্রদেশের সিংহভাগ আসনে জিতে গত দুবার বিজেপি নিজেদের জয়ের পথ মসৃণ করেছিল, সেই রাজ্যেই এবার ইন্ডিয়া জোটের থেকে এনডিএর আসন সংখ্যা কম। বিজেপিকে টপকে বৃহত্তম দল হিসাবে উঠে এসেছে সমাজবাদী পার্টি। মহারাষ্ট্রে শিবসেনা, এনসিপির ঘর ভাঙার পরেও ইন্ডিয়া জোটের থেকে কম আসন পাওয়া, পশ্চিমবঙ্গে আসন সংখ্যা কমে যাওয়া, তামিলনাড়ুতে এত চেষ্টার পরেও শূন্যেই থাকা বিজেপির কাছে বড় ধাক্কা। প্রমাণিত হল, উগ্র হিন্দুত্ববাদ, ধর্মীয় উন্মাদনা, বিভিন্ন রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারে ভাঙন ধরিয়ে নিজেরা ক্ষমতায় বসার রাজনীতি আর অপ্রতিরোধ্য নয়। বরং এখন নিজেদের সরকারই যে কোনো সময়ে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে মোদীকে রাজত্ব চালাতে হবে।

এই রাজনীতি মোদী-অমিত শাহের সিলেবাসের বাইরে। তাঁদের জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিতিই হয়েছিল গুজরাট গণহত্যার পরে। তাঁদের না আছে রাজ্য বা কেন্দ্রে জোট সরকার চালানোর অভিজ্ঞতা, না আছে সবাইকে নিয়ে মানিয়ে চলার ধাত। গুজরাট গণহত্যার সময়ে কেন্দ্রে ছিল অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় বাজপেয়ীকে জোট ধর্ম মেনে চলতে হয়েছিল। হিন্দুরাষ্ট্রের এজেন্ডা অনেকখানি গোপন রেখে কাজ করতে হয়েছিল। ২০১৪ সালে মোদী সরকারের আমলে শরিকি নির্ভরতা না থাকায় হিন্দুত্ববাদী কাজের গতি অনেক বেড়েছিল। ২০১৯ সালে জেতার পর তা আরও অপ্রতিরোধ্য হয়। বাজপেয়ী যে ভারসাম্যের খেলা নিপুণভাবে খেলেছিলেন, তা মোদী পারবেন কিনা সন্দেহ।

কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক, জাতিভিত্তিক জনগণনা, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, অগ্নিবীর প্রকল্পের মত নানা প্রশ্নে শরিকদের মধ্যে মতানৈক্যের আশঙ্কা রয়েছে। বিগত লোকসভায় যেভাবে বিরোধী সাংসদদের বহিষ্কার করে বা তাঁদের অনুপস্থিতিতে একের পর এক বিল পাস করানো হয়েছে তাও এবারে করা যাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানার বুলডোজার রাজও আজ বড় প্রশ্নের মুখে। এনডিএ সরকার পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবে কিনা, সংকটে পড়লে মোদীকে সরিয়ে অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী করে বিজেপি অবস্থা সামাল দেবে কিনা – সেসব ভবিষ্যৎ বলবে। কিন্তু নাগরিকদের যে দমবন্ধ অবস্থা থেকে সাময়িক স্বস্তি মিলেছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তবে এই স্বস্তির মেয়াদ নির্ভর করছে বিরোধী জোট ও নাগরিকদের উপরেই।

ইন্ডিয়া জোটের মধ্যেও অস্বস্তি আছে। ইতিমধ্যেই আঞ্চলিক দলগুলি জোটের ভিতরে জোট করার চেষ্টা শুরু করেছে। ইন্ডিয়া জোট যেমন চাইবে এনডিএতে ভাঙন ধরুক, তেমন বিজেপিও চাইবে ইন্ডিয়া জোটে ভাঙন ধরাতে। প্রাথমিক পর্বে বিরোধী আসনে বসার সিদ্ধান্ত নিয়ে ইন্ডিয়া পরিণতমনস্কতার পরিচয় দিয়েছে। তারই সঙ্গে বুথফেরত সমীক্ষার ও শেয়ার বাজারের ফাটকার সম্পর্ক, শাহের শেয়ার বাজার চাঙ্গা হওয়ার মিথ্যা পূর্বাভাস নিয়ে তদন্তের দাবি তুলে রাহুল গান্ধী বিজেপিকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছেন। এই শেয়ার কেলেঙ্কারিতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ৩০ লক্ষ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। বিজেপি রাহুলের দাবির জবাবে পালটা সাংবাদিক সম্মেলন করতে বাধ্য হয়েছে। গতবার সংসদে আদানি-আম্বানির সঙ্গে মোদী সরকারের সখ্যের তথ্যসমৃদ্ধ অভিযোগ তুলে রাহুল জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছেন। শেয়ার কেলেঙ্কারির অভিযোগ তুলে তিনি আশ্বস্ত করলেন, যে মোদীর কর্পোরেট প্রীতির বিরুদ্ধে সেই লড়াই জারি থাকবে। বামেদের ফল আশানুরূপ না হলেও এবারে সাংসদ বেড়ে নয় হয়েছে। এই সংসদে তাঁদের মাধ্যমে রুটিরুজির প্রসঙ্গ উত্থাপিত হবে।

সংসদের ভিতরে লড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে বাইরের লড়াইটা কম জরুরি নয়। বিগত দশবছরে সেই লড়াই ছিল বলেই আজ মোদীকে ধাক্কা দেওয়া গেছে। সেই লড়াইয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মীদের ভূমিকাও কম নয়। মোদী তাঁদের আন্দোলনজীবী বলে কেবল কটাক্ষই করেননি, নানাভাবে তাঁদের উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালানো হয়েছে। দশবছরে মোদী সরকারের আমলে একের পর এক আইনি অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। হয় আইন সংশোধন করে, নয়ত আইনকে অকেজো করে দিয়ে এই কাজ করা হয়েছে।

শ্রম আইনগুলি তুলে দিয়ে শ্রম কোডের নামে কেড়ে নেওয়া হয়েছে বহুদিন লড়াইয়ের মাধ্যমে শ্রমিকদের অর্জিত বিভিন্ন অধিকার। ন্যূনতম মজুরির গ্যারান্টি, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের কাজ ও সামাজিক সুরক্ষার গ্যারান্টি, প্রকল্প কর্মীদের অধিকার প্রদান, সম কাজে সম বেতনের দাবি নিয়ে আশা করা যায় সংসদের ভিতরে ও বাইরে এবার লড়াই আরও জোরদার হবে। কৃষকদের তোলা ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যকে আইনে পরিণত করার দাবি মানা হয়নি। এখন কৃষক আন্দোলন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ত্যাগ করার দাবি জানাচ্ছে। একার্থে যার অর্থ পুঁজি নির্দেশিত কৃষি নীতির আমূল বদল। নিঃসন্দেহে কৃষক আন্দোলন এবারের ভোটে গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক হয়েছে। পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ বা মহারাষ্ট্রের ফল তাই প্রমাণ করে। আগামীদিনে এই আন্দোলন আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা।

মোদী ৮০ কোটি মানুষকে বিনা পয়সায় খাদ্যশস্য দেওয়ার কথা বললেও, বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারতের অবস্থান ক্রমশ সঙ্গিন হচ্ছে। খাদ্যে, মিড ডে মিল, আইসিডিএস প্রকল্পে সরকারের ব্যয় বরাদ্দ কমছে বা বাজার দর বৃদ্ধির তুলনায় বাড়ানো হচ্ছে না। খাদ্য নিরাপত্তা আইনও মানছে না সরকার। গ্রামীণ কর্মনিশ্চয়তা আইনে কাজের দিন ও মজুরি বৃদ্ধির দাবি উঠলেও, সরকার একশো দিনের কাজের আইনি অধিকারই কেড়ে নিতে চাইছে। বনাধিকার আইন লঘু করে বন আইন সহ বিভিন্ন পরিবেশ সংক্রান্ত আইন ও নীতি বদলানো হচ্ছে। লক্ষ্য প্রাকৃতিক সম্পদে কর্পোরেটের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা। বিনিময়ে বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ, কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ও বাসস্থান। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চলের মানুষদের উচ্ছেদ করতে নেমে আসছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। শিশুদের শিক্ষার অধিকার, তথ্য জানার অধিকার প্রভৃতি আইনগুলিকে গুরুত্বহীন করা হচ্ছে। অধিকার সংক্রান্ত আইনগুলি রক্ষা ও অধিকার প্রসারিত করতে নতুন নির্বাচিত সংসদের ভিতরে এবং রাজপথে লড়াই জোরদার হওয়া দরকার। দরকার পরিবেশ আন্দোলন, নানা সামাজিক আন্দোলনে রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মীদের ঐক্য। সংসদের ভিতর ও বাইরের লড়াইয়ের মেলবন্ধনে আমরা এই ফ্যাসিবাদী শক্তি পতন ঘটাতে পারব।

আরো পড়ুন পূর্ণ বিকশিত ফ্যাসিবাদী ভারতে কেউ সুখে থাকতে পারবেন না

মোদী কিন্তু দুর্বল হলেও ক্ষমতা হারাননি। আবার মোদী যাদের সৈনিক, সেই কর্পোরেট দুনিয়া এবং ধর্মীয় রাষ্ট্রের কুশীলবরা আগামীদিনে মোদীর বিকল্প তৈরি করতে পারে। সেক্ষেত্রে আবার এনডিএ ও ইন্ডিয়া জোটের সমীকরণ বদলে যেতে পারে। এনডিএ সরকার জনবিরোধী ও সংবিধানবিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণে সাময়িকভাবে ধীরে চলো নীতি নিতে পারে। কিন্তু তাদের উদ্যোগ থেমে থাকবে না।

আগামী বছর আরএসএস প্রতিষ্ঠার একশো বছর। হিন্দু মহাসভার জন্ম তারও আগে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় রয়েছে তাদেরই উত্তরসূরী বিজেপি। এরা ইংরেজ আমল থেকে নয়, সুলতানি আমল থেকে ভারতের পরাধীনতা শুরু বলে মনে করে। গান্ধী হত্যাকারী নাথুরাম গডসেকে পূজা করে। গান্ধীকে নিয়ে ছবি তৈরি হওয়ার আগে তিনি দুনিয়ায় অপরিচিত ছিলেন – এমন মন্তব্যের মাধ্যমে গান্ধীকে অপমান করতেও দ্বিধা করে না। শক্তি খর্ব হলেও তাদের নেতৃত্বেই এনডিএ সরকার হতে চলেছে। এদের কীভাবে কোণঠাসা করা যায় তা ছাত্র আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন থেকে এবারের লোকসভা নির্বাচন দেখিয়েছে। এবার নিরন্তর লড়াইয়ের পথেই এদের পরাস্ত করতে হবে। সেই কাজ সকলের।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.