মোহিত যাদব নামটা শুনলে সবাই না-ও চিনতে পারেন, কারণ একে সবাই অন্য একটা নামে চেনে।

গুরগাঁওয়ের উপকণ্ঠে একটা ছোট্ট শহর মানেসর, যার সারা ভারতে পরিচিতি অন্য একটা কারণে। মারুতি উদ্যোগ, বা মারুতি-সুজুকি গাড়ির মূল কারখানা এই শহরেই। এই শহরেই মোহিতের উত্থান। স্থানীয় বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, আশপাশের গ্রামের খাপ পঞ্চায়েত, ক্রমশ আরএসএসের স্থানীয় সংগঠন, বিজেপির নেতা-মন্ত্রী এঁদের স্নেহধন্য হতে হতে মোহিতের পসার ছড়িয়ে পড়ে কাছাকাছি হরিয়ানা এবং রাজস্থানের অন্যান্য জেলাতেও। পসার হওয়ার কারণ হল জাতীয় সড়কের প্রতিটা টোল বুথে, টোল বুথের আশপাশের গ্রামে হিন্দুত্ববাদী মারকুটে ছেলেপুলেদের নিয়ে দল পাকিয়ে গোরক্ষা সমিতি স্থাপন করা। মোহিত যাদব গুরগাঁও, নুহ, ঝাজ্ঝর ইত্যাদি জেলায় পরিচিত হয়ে যায় মনু মানেসর নামে। গোরক্ষা সমিতির মূল উদ্দেশ্য হল, রাস্তায় কোথাও কোনো কন্টেনার ট্রাকে গরু নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কিনা তার ওপর লক্ষ্য রাখা। স্থানীয় পুলিস, প্রশাসনের সম্পূর্ণ সহায়তায় এই কাজ দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে আসছে মনু আর তার দলবল।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

গত জুলাই-অগাস্টে হরিয়ানার নুহ এবং গুরগাঁওতে হওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মূল উস্কানিদাতা হিসাবে হরিয়ানা আর রাজস্থানের পুলিস একে খুঁজতে শুরু করে। তবে তার আগেও গোরক্ষার নামে মনুর একাধিক কীর্তি আছে, যার মধ্যে সাম্প্রতিকতম কীর্তিটা এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে – ভিওয়াড়ি জেলায় নাসির আর জুনেদ নামে দুজন মুসলমান পশু ব্যবসায়ীকে অকথ্য অত্যাচার করে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা।

মনু ধরা পড়ে স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত এবং কৃষক সংগঠনগুলো লাগাতার চাপ সৃষ্টি করার ফলে। রাজস্থানেও তার নামে কেস রয়েছে, যেমন জুনেদ-নাসিরের হত্যাকাণ্ডের কেস। হরিয়ানা পুলিস তাকে গত ১৩ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করে এবং রাজস্থান পুলিসের হাতে তুলে দেয়। গোরক্ষার নামে একাধিক খুনের কেস রাজস্থান পুলিসের হাতে, আর নুহ হিংসায় প্ররোচনার কেস হরিয়ানা পুলিসের হাতে। এই অবস্থায় মনু মানেসরের ঠাঁই হয় রাজস্থানের জেলে।

হরিয়ানা আর রাজস্থান দুটো পাশাপাশি রাজ্য। এই মুহূর্তে একটা বিজেপিশাসিত, অন্যটা কংগ্রেসশাসিত। মনু বিজেপি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল আশ্রিত একজন দুষ্কৃতী, যার দুষ্কর্মের মূল লক্ষ্য মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষজন। অনুমান করতে কষ্ট হয় না, দুই রাজ্যে তার বিচার প্রক্রিয়া দুভাবে হবে। হয়ও তাই। গত ৭ অক্টোবর ট্রানজিট রিম্যান্ডে মনুকে হরিয়ানার পতৌদি কোর্টে নিয়ে আসা হয়, এবং গতকাল, ১৬ অক্টোবর, হরিয়ানায় তার বিরুদ্ধে ফাইল হওয়া মামলায় (নুহ হিংসা সংক্রান্ত) মনু এক লক্ষ টাকার জামিনে বাইরে আসার অধিকার পায়

অবশ্য এখনই সে জেলের বাইরে পা রাখতে পারছে না, তাকে রাজস্থানের জেলে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে জুনেদ-নাসিরের হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়া বাকি আছে। সে বিচার প্রক্রিয়া কংগ্রেসশাসিত রাজস্থানের প্রশাসন কীভাবে চালাবে, তা আগামীদিনে আমরা দেখতে পাব।

এর পাশাপাশি অন্য একটা মামলার আলোচনায় আসা যাক।

তিন বছর পেরিয়ে গেছে, দিল্লির জেলে বন্দি হয়ে আছেন উমর খালিদ। তাঁর বিরুদ্ধেও অভিযোগ, ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গায় উস্কানি দিয়েছিলেন। উমরকে অন্যান্য ধারার কেসের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে ইউএপিএ, যার জোরে ভারতের যে কোনো নাগরিককে বিনা বিচারে বছরের পর বছর বন্দি রাখা যায়। উমরের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তিন বছর হয়ে গেল, দিল্লি পুলিস দিল্লির দাঙ্গায় উমরের ভূমিকার কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি, চার্জশিট বানাতেও পারেনি। না, আমি অন্তত একে দিল্লি ‘দাঙ্গা’ বলব না। দাঙ্গা হয় দুটো গোষ্ঠীর মধ্যে, যেখানে দুপক্ষই প্রায় সমানভাবে মারামারি কাটাকাটি করে। দিল্লিতে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তা হয়নি। যা হয়েছিল, তা একতরফা।

নামকরা আইনজীবী কপিল সিব্বল এই মুহূর্তে উমরের কৌঁসুলি। দিল্লি পুলিসের তরফে বারবার সময় চাওয়ার পরেও কোনও চার্জশিট তৈরি হয়নি। এই কেস, সিব্বলের ভাষায়, ২০ মিনিটের বেশি সময় নেবে না বন্ধ হতে। সেই ২০ মিনিট সময়, গত মে মাস থেকে আজ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট দিয়ে উঠতে পারেনি। কখনো বিচারক সময় দিতে পারেননি, কখনো বিচারক অব্যাহতি চেয়েছেন এই কেসের শুনানি থেকে, কখনো বা দিল্লি পুলিস আরও সময় চেয়েছে চার্জশিট ফাইল করার জন্য। কখনো আবার বিচারক কেস ফাইল পড়ার জন্য বাড়তি সময় চেয়েছেন। এখন পর্যন্ত ছবার সুপ্রিম কোর্টে নতুন তারিখ পেয়ে ফিরতে হয়েছে উমরের নিকটজন আর আইনজীবীদের। তিন বছর এক মাস – বিনা বিচারে উমর জেলে বন্দী। বিচার আজও শুরু করা যায়নি।

মনুকে নুহ হিংসায় অভিযুক্ত হিসাবে ঠিক একমাস জেলে থাকতে হয়েছে – ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১৬ অক্টোবর। তার মধ্যেই জামিন হয়ে গেছে।

জেলের জীবন বড় দুর্বিষহ। শুধু যে জেল খাটছে তার জন্যেই নয়, তার নিকটজনদের জন্যেও। বিচারাধীন বন্দিদের সঙ্গে তাদের নিকটজনদের নির্দিষ্ট সময় অন্তর দেখা করার একটা প্রক্রিয়া আছে, সরকারি ভাষায় যাকে বলে ‘মুলাকাত’। সে বড় কষ্টদায়ক প্রক্রিয়া – সবরকম নিরাপত্তার বেড়াজাল পেরিয়ে তবে দেখা করা যায়। ইউএপিএ আইনে বন্দি মানুষের জন্য প্রক্রিয়াটা আরও বেশি কড়া। আমরা বনজ্যোৎস্না লাহিড়ী বা অপেক্ষা প্রিয়দর্শিনী – যাঁরা উমরের সঙ্গে নিয়মিত ‘মুলাকাত’ করতে যান তিহার জেলে, তাঁদের লেখা পড়েছি, টুইট দেখেছি। প্রতিবার সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করে কথা বলার অবস্থায় পৌঁছতেই দুই থেকে আড়াই ঘন্টা লেগে যায়। এ এক অনন্ত সুড়ঙ্গ, এর কোথায় শেষ, কোথায় কতদূর গেলে আলো দেখা যাবে, এখনো পর্যন্ত কেউ জানে না।

আরো পড়ুন আমরা মুক্ত থাকলে পরিচয় নির্বিশেষে আর্ত মানুষের কাছে ছুটে যেতাম

উমর একা নন। এই মুহূর্তে, রাজ্যসভায় সরকারে দেওয়া খতিয়ান অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে ইউএপিএ ধারায় বন্দি হয়ে বিচারের দিন গুনছেন ৩,০৪৭ জন; ২০১৭ থেকে ৪,০৯৮ জন; ২০১৯ সাল থেকে ৫,৬৪৫ জন এবং ২০২০ সাল থেকে ৬,৪৮২ জন। ২০২১, ২২ এবং ২৩ সালের হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। কয়েকজনের নাম আমরা শুনতে পাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে – শার্জিল ইমাম, গুলফিশা ফতিমা, উমর খালিদ, জি এন সাইবাবা ইত্যাদি। এর বাইরেও অসংখ্য নাম রয়েছে যাঁরা জানেন না কোনোদিন বাইরের আলো দেখতে পাবেন কিনা। এই তালিকায় শেষতম নাম প্রবীর পুরকায়স্থ এবং অমিত চক্রবর্তী।

এঁরা সবাই রাষ্ট্রের চোখে বিপজ্জনক। যে রাষ্ট্রের পরিচালক দল হরিয়ানা রাজ্যের শাসনক্ষমতায় রয়েছে, যে শাসক দল মনুকে অতটা বিপজ্জনক মনে করে না। এ এক চমৎকার ভারসাম্যের খেলা।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.