এণাক্ষী রায়

শরীর থেকে বেরিয়ে হালকা হয়ে যাবার পর মধু দেখল, যে পৃথিবীটা উল্টো হয়ে গেছে। মধুর পা দুটো হেঁটে বেড়াচ্ছে আকাশের দিকে। শূন্য বাতাসে টলমল করছে পা দুটো, আর মাথাটা জমিতে। এইভাবে উল্টো হয়ে যাওয়াতে পুরো পৃথিবীটাই উল্টো লাগছে মধুর। নিজের পা দুটোকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না সে। কোত্থেকে যে বোম উড়ে এল, দুম করে একটা শব্দ হল, তারপর এখন চারদিকে টিয়ার গ্যাসের ধোঁয়া।  মধুর মাথা কয়েকটি লাশে গুঁতো খেয়ে একটু পাশ কেটে বেরিয়ে গেল সবেমাত্র। তখনই মধু দেখল ছত্রখান বদ্ধভূমির দিকে আলুথালু বেশে ছুটে আসছে মধুর বউ। বউকে দেখে মধুর মনে হল, বেশ লাগছে দেখতে। ভাল একটা শাড়ি পরেছে বউ, গালে বোধহয় পাউডার মেখেছিল খানিক আগে। পাউডারের ওপর দিয়ে চোখের জলের দুটি ধারা গড়িয়ে পড়ছে। ঠোঁটে লিপস্টিকও মেখেছে। বাড়িতে সর্বক্ষণ ছেঁড়া নাইটি পরা বউকে দেখতে দেখতে চোখ পচে গেছিল মধুর। আজ অনেকদিন পরে ভোট দিতে আসবে বলে বিয়েবাড়ি যাবার মত করে সেজেছে। বউয়ের এই সাজগোজের দেরির জন্যই রাগ করে আগেভাগে একাই ভোট দিতে চলে এসেছিল মধু। আর এসেই বিপত্তি। কিন্তু এখন বউকে দেখে দেবদাস সিনেমার পারোর মতো লাগছে। আঁচলটা পিন করা না থাকলে একেবারে ঐশ্বর্য রাইয়ের মত লুটিয়ে পড়ত, ওইটুকুই যা মিলছে না। বউয়ের ছুটে আসা, নিচে পড়ে থাকা লাশ, বউয়ের পেছন পেছন আসা চেনা লোক – সবই উল্টোভাবে দেখতে হচ্ছে মধুকে। বউ এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে একটা লাশের ওপর। ছি ছি! কার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে বউ! চোখ দুটো নিচে চলে যাওয়াতে সব কিছু ঠিকমত দেখতে পাচ্ছে না মধু। পা দুটো শূন্যে প্যাডেল চালানোর মতো করে একটু উঁচু হয়ে দেখে, ও মা! নিচে তো মধু নিজেই শুয়ে আছে। মধু না অবশ্য, মধুর লাশ শুয়ে আছে। আর বউ বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গিয়েও পড়ছে না, চারদিকে রক্ত। বেচারা বুকটাই খুঁজে পায়নি। দুবেলা ঝগড়া করা বউটা যে এখনো এত ভালবাসে মধুকে, তা দেখে চোখে জল চলে আসে মধুর।

উল্টো অবস্থায় দেখার অভ্যেস নেই বলে খুব অসুবিধে হচ্ছে মধুর। পুলিশ এসে লাঠি উঁচিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে লোকজন, বউটাকেও সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এক মেয়ে পুলিশ। বউয়ের পাশে হঠাৎ এসে পড়া চেনা চেনা একটা লোককে কিছুতেই ভাল করে চিনতে পারছে না মধু । সোজা হতে আপ্রাণ চেষ্টা করে মধু। মধুর সোজা হওয়ার চেষ্টা দেখে পাশে কে যেন খ্যা খ্যা করে হেসে উঠে বলে

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

—হাঁটি হাঁটি পা পা, মধু হাঁটে দেখে যা। উলটো হাঁটে দেখে যা। আর সোজা হতে পারবি না। পারবি না, পারবি না।

মধু তাকিয়ে দেখে তার মতই উল্টো করে পাশে দাঁড়িয়ে আছে কেষ্টকাকা। কেষ্টকাকাকে হাসতে দেখে খুব রাগ হয় মধুর। গত বছর থেকে নিরুদ্দেশ ছিল কেষ্টকাকা। পার্টি করত, কীভাবে কোথায় হারিয়ে গেল, কেউ জানে না। এই কেষ্টকাকার দলের লোকরাই একটু আগে ভোট কেন্দ্রে বোমাবাজি করছিল। একটা বোমার টুকরো সোজা লাইনের দাঁড়ানো মধুর গায়ে লাগতেই উল্টো হয়ে গেল মধু। এখন মধুর দুর্দশায় কেষ্টকাকাকে হাসতে দেখে টুঁটি চেপে ধরতে ইচ্ছে হল মধুর। তারপরেই মনে হল নিরুদ্দেশ কেষ্টকাকা ফিরে এল কবে জিজ্ঞেস করা দরকার। অত ক্ষমতাবান পার্টির লোক, পুলিশ কেউ খুঁজে পেল না, অথচ কেষ্টকাকা মধুর পাশে দাঁড়িয়ে হাসছে! আবার মধুর মতই উলটো হয়ে ঝুলে আছে! মধু রাগ চেপে জিজ্ঞেসই করে ফেলে — কেষ্ট কাকা! তুমি! তুমি তো নিরুদ্দেশ ছিলে! কবে ফিরলে?

—নিরুদ্দেশ! কে বলল নিরুদ্দেশ? আমি তো এক বছর ধরে ওই নারকেল গাছটায় থাকি। খুব কষ্ট হয় রে। তবু এ পাড়া থেকে অন্য কোথাও গিয়ে থাকার কথা ভাবতেই পারি না।

নারকেল গাছের মাথাটা নিচ থেকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে মধু। অবাক হয়ে নারকেল গাছটার দিকে তাকিয়ে আরেকবার আড়চোখে কেষ্টকাকাকে দেখে নেয়।

—নারকেল গাছে থাকো? এদিকে কাকি রোজ কান্নাকাটি করে। বাড়িতে যাও না কেন?

—তোর কাকির জন্যই তো এ পাড়া ছেড়ে যেতে পারি না। নইলে আরেকটু ভেতরে গ্রামের দিকে, ভাল ভাল ঝাঁকড়া গাছ আছে – বট, অশ্বত্থ, আম। এই শহরে তো না আছে গাছ, না আছে পুরনো বাড়ি। সব ঝকঝকে ফ্ল্যাট গজাচ্ছে। তাই কষ্টেসৃষ্টে ওই নারকেল গাছেই থাকতে হয়। ভূতদের খুব কষ্ট রে।

—ভূত! তুমি কি মরে গেছ কেষ্টকাকা? কীভাবে!

—আমিও মরে গেছি, তুইও এইমাত্র মরলি। শালা নিজের পার্টির লোকই খুন করল রে আমাকে। লাশটা এমনভাবে গায়েব করল যে পচে গলে একসা। এখন খুঁজে পেলেও কেউ চিনতে পারবে না। তাই আজ আমার ভোটটা ছাপ্পা দেওয়ার আগেই, অন্য পার্টিকে ভোটটা টুক করে দিয়ে এলাম। বুঝুক ওরা! বাদ দে, চল, ওই আমার নারকেল গাছেই একটা ডাল তোকে দিয়ে দেব। কাটমানি খুব কম নেব তোর কাছে।

আবার নারকেল গাছটার দিকে তাকায় মধু, গাছটা কেমন যেন ডানাছাঁটা পাখির মত দেখতে। পাতাগুলো আর ঝাঁকড়া নেই। লম্বা গাছটার মাঝখানে বিরাট খোদল। যে কোনো ঝড়ে ভেঙে পড়বে গাছটা। বিনে পয়সায় দিলেও মধু থাকতে পারবে না ওই গাছে। এর জন্যও কাটমানি! কেষ্ট কাকার কাটমানি খাওয়ার স্বভাবটা এখনো যায়নি। মধু মরে গেছে ঠিকই, তবু বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা এখনো যায়নি। নিজের শরীরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে, ওতে আর ঢোকা যাবে না। বরং অন্য কোনো তাগড়া শরীরে যদি বাসা বাঁধা যায় তার খোঁজ করে মধু। মধুর মনের ইচ্ছেটা ওর শরীরের মতই স্বচ্ছ হয়ে ভেসে ওঠে বাতাসে। পাশে উল্টো দাঁড়ানো কেষ্টকাকার ওর ইচ্ছেটাকে খপ করে ধরে ফেলতে বেশি বেগ পেতে হয় না। মধু দেখে ওর ইচ্ছেটা কেষ্টকাকার মুঠোর ভেতর ছটফট করছে। যেন দম বন্ধ হয়ে মরে যাবে এখনই। কেষ্টকাকার মুঠো আলগা করার জন্য মধু এক ঘুষি মারে কেষ্টর মুঠিতে। ঘুষিটা হাওয়ার মধ্যে দিয়ে সুড়ুৎ করে বেরিয়ে যায়। মধুর গা জ্বালিয়ে দিয়ে কেষ্ট আবার খ্যা খ্যা করে হাসে। মুঠো খুলে হুশ করে একটা শব্দ করে বলে — নে যা ছেড়ে দিলাম। তোর ইচ্ছে নিয়ে তুই ঘুরে বেড়া। তবে একটা নিয়ম মনে রাখিস, এক ঘন্টার মধ্যে কারো শরীরে ঢুকতে পারলে তবেই বেঁচে যাবি। আমি শালা এক ঘন্টার মধ্যে আশেপাশে কোনো শরীরই পাইনি।

মাত্র এক ঘন্টা! মধু আশেপাশে দেখে, সে একেবারেই মরে গেছে, আর দু-তিনজন প্রায় মরবে মরবে অবস্থা। পুলিশ এসে তাদের অ্যাম্বুলেন্সে ঢোকাচ্ছে। এগুলো যদি মরেও, এদের হাত নেই পা নেই, শরীরে ঢুকে লাভ নেই মধুর। তাই অ্যাম্বুলেন্সের পিছু সে করে না। মনের দুঃখে কেষ্টকাকারই পিছু পিছু নারকেল গাছটার দিকে হাঁটা দেয় মধু। ভাবে একটু জিরিয়ে নিয়ে নিজের নতুন ঠিকানা পাকা পোক্ত করে আসবে। নারকেল গাছের একেবারে মাথায় উঠে পুরো পাড়াটা একেবারে পরিষ্কার দেখতে পায় মধু। চেনা পাড়াটা অচেনা মনে হয়। ওই তো মধুর বাড়ির দিকে একটা ভিড় পিলপিল করে ছুটে চলেছে। পিঁপড়ের সারির মত মানুষগুলো যেন রগড় দেখছে। কতকগুলো রিপোর্টার মধুর ছেলেকে পাকড়াও করে ফেলেছে এর মধ্যেই। ছেলের দুপাশে দাঁড়িয়ে ওরা কারা! আরে! এরা তো দুই পার্টির দুই নেতা। মধুর ছেলের দুই হাত ধরে দুজন টানাটানি করছে। মধুর মনে হচ্ছে হাত দুটো এখনই ছিঁড়ে দেবে বেটারা। রিপোর্টারদের সামনে কেঁদে ফেলছে মধুর ছেলে। দুই দলের দুই নেতা ছেলের দুই হাত ধরে টানাটানি করতে করতে রিপোর্টাদের সঙ্গে কথা বলছে। তাদের মধ্যে একজন তো স্যাটা, গোবিন্দ ধরের চ্যালা। আরেকজনকেও চেনে। দুবছর হল রামনবমীর মিছিল বের করে এখানে। সে বলছে — মধু আমাদের দলের লোক ছিল, আমরা এর বিহিত চাই। মধু, অমর রহে, অমর রহে। অন্য দলের নেতা বলছে — মধু আমাদের দলের হয়ে কাজ করত, আমরা পার্টির তরফ থেকে মধুর ফ্যামিলিকে সব রকম সাহায্য করব। মারা গেছে যখন, দুই লাখ টাকা পাবে।

মধুর মনে হচ্ছে গুঁতিয়ে লাশ ফেলে দেয় এদের। নারকেল গাছে উল্টো ঝুলে ঝুলে এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে মন খারাপ হয় মধুর। যদি এক ঘন্টার মধ্যে কারো শরীরে ঢুকে যাওয়া যেত, এর একটা বিহিত করতে পারত মধু। আসলে এই দুদলের মধ্যে একটা দলও কোনোদিন করেনি মধু। দল করা তো দূরের ব্যাপার, এদের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে বরাবর। মধু দেখতে পাচ্ছে তার ছেলে এই দুই দলের নেতাদের সামনে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে মধুর দেহটা মর্গে নিয়ে যেতে তাড়া লাগাচ্ছে পুলিশ। কাউকে ছুঁতে দিচ্ছে না বডি। বডির পা দুটো বেশ আস্তই আছে মনে হচ্ছে। মধুর বউ আস্ত পা দুটোর দিকে যেতে চাইছে। পারছে না। বউয়ের কান্না দেখে কান্না পেয়ে যাচ্ছে মধুরও। গলা শুকিয়ে খাঁ খাঁ করছে। নারকেল গাছটায় বেশ কটা নধর ডাব ঝুলছে মধুর হাঁটুর কাছে। হালকা শরীরে মাথাটা নিচের দিকে ঝুলিয়ে হাঁটু ভাঁজ করে একটা নারকেল পাতার মধ্যে মধু ঝুলে আছে। ডাব একটা খেতেই পারে সে। কিন্তু ভূতেরা কীভাবে ডাব খায় এখনো সে ট্রেনিং নেওয়া হয়নি তার। আদৌ ভূতেরা কিছু খায় কিনা কে জানে! কেষ্টকাকা আবার ওকে এখানে ঝুলিয়ে দিয়ে পাড়া বেড়াতে চলে গেছে। ট্রেনিংটা নেবেই বা কার কাছে!

আরো পড়ুন পঞ্চায়েত নির্বাচন: আমাকে ভাবায় শাহরুখ আর সুকুমার রায়

মধু দেখতে পেল কেষ্টকাকা মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে দু পাঁই পাঁই করে বাতাসে চালাতে চালাতে ছুটে আসছে। নারকেল গাছের কাণ্ডটা বেয়ে একই গতিতে মধুর কাছে এসে পড়ে কেষ্টকাকা — তাড়াতাড়ি চ’ মধু। তোর একটা হিল্লে করেছি।

—কী হিল্লে কেষ্টকাকা!

—চ’ না! ভাল একটা জোয়ান শরীরে তোকে ঢুকিয়ে দেব। তুই শুধু জীবন পেয়ে গেলে আমার ছেলেটার একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিবি। ঘুষ ছাড়া চাকরি দিবি কিন্তু।

—চাকরি দেব আমি! আমার নিজের ছেলেটাই ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছে।

—এবার তোর ছেলে, আমার ছেলে সবাইকে চাকরি দিতে পারবি তুই। দেখ না আমি কেমন হুশ করে ভাল খবরটা নিয়ে এলাম। ও পাড়ার নেতা গোবিন্দ ধর বুকের বাঁ দিক চেপে ধরে অজ্ঞান হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে এক্ষুনি পটল তুলবে। তুলবে কী, তুলেই ফেলেছে হয়ত এতক্ষণে। আর কেউ ঢুকে যাওয়ার আগে তুই ঢুকে যা ওর শরীরে। অনেক পাওয়ার লোকটার। এই সুযোগটা পেলে তোর ছেলে, আমার ছেলে দুজনেরই হিল্লে হয়ে যাবে।

—অন্য কেউ ঢুকে যাবে মানে! লাইনে অনেকে আছে নাকি!

—নেই? কী বলিস! আজ ভোটের দিন কত লাশ পড়বে। তাদের যে কেউ ঢুকে যেতে পারে। চটপট চ’। দেখবি তোর আশেপাশে জীবন্ত মানুষগুলোর বেশিরভাগই আসলে ভূত। কার খোলসে কে ঢুকে বসে আছে মালুম পাবি না।

মাটির দিকে মাথা রেখে দু পা সাঁই সাঁই চালাতে কেষ্টকাকার মত এক্সপার্ট হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। নতুন করে মানুষের দেহ পাওয়ার আশায় মধুও ছুটতে চাইছে কেষ্টকাকার মত। কিন্তু সবেমাত্র উল্টো হাঁটা শিখেছে বলে টলমল হয়ে পড়ছে। মধু খালি পিছিয়ে পড়ছে দৌড়ে, ফলে কেষ্টকাকাকেও দাঁড়াতে হচ্ছে মধুর জন্য। গোবিন্দ ধরের বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বুক দুরুদুরু করছে মধুর। যদি এতক্ষণে মরে গিয়ে থাকে তবেই হয়েছে। অন্য কেউ সুড়ুৎ করে মধুর আগে ঢুকে গেলেই মুশকিল হয়ে যাবে। গোবিন্দ ধরের বাড়ি এসে গেল বলে। মধু আড়চোখে দেখে নেয়, আর কোনো উল্টো হাঁটা মানুষ, থুড়ি ভূত, আশেপাশে আছে কিনা। নাঃ, নেই। এমন সময় গলায় স্টেথো দিয়ে এক ডাক্তারকে গম্ভীর মুখে বের হতে দেখল মধু। কেষ্টকাকা মধুর কানে কানে ফিসফিস করে বলল — গোবিন্দর আর বাঁচার চান্স নেই, তক্কে তক্কে থাক।  প্রাণটা বেরোলেই ঢুকে পড়বি। না হলে নিজেই নিজের দেহে আবার ঢুকে পড়তে পারে।

—তুমি কী করে জানলে বাঁচার চান্স নেই! ডাক্তারটা তো কিছু বলেনি।

—ওই ডাক্তারের হাতে পড়েছে যখন যেটুকু চান্স ছিল তাও নেই। কনফার্ম।

—কী বলো! এ তো শহরের ডাক্তার বঙ্কিম মণ্ডল। খুব ভাল ডাক্তার। ধন্বন্তরি বলে লোকে।

—ধুস, সে আর আছে নাকি? দুবছর আগেই মারা গেছে। তার শরীরে হাতকাটা কালু গুণ্ডা ঢুকে আছে দুবছর ধরে। কালু গুণ্ডা চিকিৎসার কী জানে! গোবিন্দকে নির্ঘাত ভুল ওষুধ দিয়েছে দেখ গে।

কেষ্টকাকা প্রায় ঠেলা দিয়েই মধুকে ঢুকিয়ে দেয় গোবিন্দর বাড়িতে। মধুর খালি মনে হচ্ছে ও যেমন সবাইকে দেখতে পাচ্ছে, বাকিরাও ওকে দেখে ফেলছে যেন। ওই যে গোবিন্দর দ্বিতীয় পক্ষের বউটা একেবারে সোজাসুজি চোখের দিকেই তাকাল যেন। কী সুন্দর বউটা! গোবিন্দ নাকি ওকে টিভি সিরিয়ালে কাজ পাইয়ে দেবে বলে লোভ দেখিয়ে বিয়ে করেছে। মনে মনে গোবিন্দর বউয়ের বয়স আন্দাজ করার চেষ্টা করে মধু। পঁয়ত্রিশের বেশি এক মাসও হতে পারে না। কিন্তু সেজে থাকে যেন পঁচিশ। আশেপাশে অনেক লোক, গোবিন্দর পার্টির লোক সব। তারা ফিসফিস করে কথা বলছে। মধু কান পাতে। একজন বলছে — গোবিন্দদার হার্ট এত দুর্বল ছিল জানতিস!

—কী করে জানব! এই তো সেদিন স্যাটাদাকে টাইট দেওয়ার জন্য আমাদের পাঠাল। কী বুদ্ধি করেছিল মাইরি৷ হার্ট দুর্বল হলে কেউ স্যাটাদার মত মানুষকে টাইট দেওয়ার সাহস পায়!

—স্যাটাদাকে বাদ দিয়ে অখিলকে ভোটে দাঁড় করিয়েছে বলে, স্যাটাদা যে গোবিন্দদাকে ডোবানোর জন্য বোমাবাজি করে যাবে এতটা হজম করতে পারেনি গোবিন্দদা। হাজার হোক স্যাটাদাকে তৈরি করেছিল তো গোবিন্দদাই।

—হুম, স্যাটাদাই যে বাঁশটা দিল, সেটাই সহ্য করতে পারল না মানুষটা।

—অ্যাম্বুলেন্স কি এল? দেখ তো বাইরে গিয়ে। ডাক্তারটা তো হাসপাতালে নিয়ে যান বলে একটা ইনজেকশন দিয়ে কেটে পড়ল।

কেষ্টকাকা এতক্ষণে মধুর কানে কানে বলে — কালু গুণ্ডা ইনজেকশন দিয়েছে মানে এখনই মরবে, মধু রেডি থাক।

মধু দেখতে পাচ্ছে গোবিন্দর বুকে এখনো অনেকটা বাতাস জমে আছে। বাতাসটা বের হলেই মরবে লোকটা। হঠাৎ খুব জোরে নাক ডেকে উঠল গোবিন্দ। স্থির হয়ে যাওয়া লোকটা ঝাঁকুনি দিয়ে নাক ডেকে ওঠাতে সবাই হইহই করে উঠেছে। মধু দেখতে পাচ্ছে জমা বাতাসের কিছুটা নাক দিয়ে বেরিয়ে গেল। গালটা ফুলে উঠে আরও কিছু জমানো বাতাস ফুস করে ছেড়ে দিল মুখ দিয়ে। কেষ্টকাকা ছাড়া আরও একটি লোককে আকাশের দিকে পা তুলে কচি বাচ্চার মত নড়বড় করে হাঁটতে দেখল মধু। আরে ওই তো গোবিন্দ। শরীর থেকে বেরিয়ে এসে অবাক হয়ে চারদিকে তাকাচ্ছে। আকাশে ওঠা পা দুটো মাটিতে নামানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে সমানে। গোবিন্দর থতমত অবস্থা দেখে হাসি পাচ্ছে মধুর। কিন্তু এখন হাসলে হবে না। কেষ্টকাকা কুনুই দিয়ে গুঁতোচ্ছে মধুকে। কানে কানে আরেকবার মনে করিয়ে দিল — ঢুকে যা মধু, তাড়াতাড়ি। আমার ছেলের চাকরিটা যেন ভুলিস না।

গোবিন্দর নাক মুখ দিয়ে এতক্ষণে সমস্ত বাতাস বেরিয়ে গেছে, রাস্তা ফর্সা। গোবিন্দর নাকের ফুটোটা দিয়ে সড়াৎ করে ভেতরে ঢুকে যায় মধু। ভেতরে ঢুকে প্রথমে কেমন একটা অস্বস্তি হয় মধুর। বুকে এক ফোঁটাও বাতাস নেই মনে হয়। দম বন্ধ লাগে। জোরে একটা শ্বাস টেনে একটু আরাম করে ধীরে ধীরে শ্বাসটা ছাড়ে। এইবার হাত-পাগুলো ঠিকমত কাজ করছে কিনা দেখার জন্য, চোখ বন্ধ অবস্থাতেই প্রথমে ডান হাত, তারপর ডান পাটা নেড়ে নেয়। ঘরে একটা কোলাহল ওঠে, “নড়ছে, নড়ছে”। কে যেন গা ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে সুমধুর কণ্ঠে ডেকে কানের কাছে বলে ওঠে — চোখ খোলো! শুনতে পাচ্ছ! চোখ খোলো, দেখো সবাই এসেছে।

কে যেন চোখে জলের ছিটে দেয়। চোখ পিটপিট করতে করতে চোখটা খুলেই ফেলে মধু। সামনে গোবিন্দর সুন্দরী বউয়ের মুখ। গোবিন্দর বউয়ের উদ্বিগ্ন মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে মধু, এখন থেকে এটা ওর বউ! কল্পনা করে শরীরটা যেন হঠাৎ করেই ভাল হয়ে যায়। বেশ তরতাজা লাগে। একটু একটু লজ্জাও। একঘর লোকের সামনে এই অপরিচিত যুবতীর বুকটা প্রায় মুখের কাছে ঠেকে যাওয়াতে অস্বস্তি হয়। কেষ্টকাকাকে আর দেখতে পাচ্ছে না মধু, কিন্তু সে তো এখন জানে কেষ্টকাকা এই ঘরেই আছে আর নিশ্চয় এখন মধুর অস্বস্তি দেখে খ্যা খ্যা করে হাসছে। আর কেউ না জানুক, মধু তো জানে কেষ্টকাকা সব দেখতে পায়।

উঠে বসতে চেষ্টা করে মধু, মধুকে উঠতে দেখে দলের ছেলেরা সব খুশিতে হইহই করে ওঠে। একজন বলে — দাদা এইবার স্যাটাদা টের পাবে, গোবিন্দ ধরকে চমকানো অত সোজা না। আপনিও দেখিয়ে দেন এইবার। আরেকজন বলে ওঠে — স্যাটাদার থোতা মুখ এইবার ভোঁতা হবে। আমি ফোন করে দিয়েছি পার্টি অফিসে, আমাদের দাদা একেবারে চাঙ্গা আছে।

এতক্ষণে মধুর মনে হয় ব্যাপারটা অত সোজা না। এদের ভেতরের ব্যাপারস্যাপার ও কিছুই জানে না। আস্তে আস্তে বুঝে নিতে হবে সব। প্রথম প্রথম কথা কম বলে শুনতে হবে বেশি। এতকিছুর মধ্যেও মধুর খুব খুশি খুশি লাগে, গোবিন্দর সিনেমার নায়িকার মত দ্বিতীয় পক্ষের বউটাকে দেখে। গোবিন্দর বউটা এখন ওর বউ! বিশ্বাসই হচ্ছে না মধুর। কিন্তু তাকে ঘিরে থাকা লোকগুলোকে না তাড়ালে বউটার সঙ্গে দুটো কথাও বলা যাচ্ছে না। খুব গম্ভীর গলায় ছেলেগুলোকে ধমকে ওঠে মধু।

—অ্যাই তোরা এখন যা। আমি ভাল আছি। আর হ্যাঁ আজ বোমাবাজিতে যে লাশ পড়ল ওদের মধ্যে একজনের নাম মধু না? ওর ছেলেটাকে ডেকে পাঠাবি কাল। দুই লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আর ছেলেটার একটা চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে।

—মধুর ছেলেকে ডাকব স্যার? মধু তো আমাদের পার্টির না।

—তাই জন্যই তো ডাকবি। এইবেলা কব্জা করতে হবে। এখন যা তোরা। আর হ্যাঁ শোন, গতবছর আমাদের এক কর্মী লা-পাতা হয়েছিল না? ওই মধুদের পাড়ারই, কেষ্ট। কেষ্টর ছেলেকেও আসতে বলিস। আমাদের কর্মী, লা-পাতা। ওর ছেলেরও একটা ব্যবস্থা করে দিতে হয়।

কেষ্টর ছেলে আর নিজের ছেলেকে চাকরি দিয়ে দিলেই ঝাড়া-হাত পা হয়ে যাবে মধু। তারপর গোবিন্দর বউকে নিয়ে একটু সমুদ্রের ধারে কোথাও ঘুরতে যাবে। মনে মনে এই পরিকল্পনাটা করে ফেলে খুব হালকা লাগে মধুর, থুড়ি গোবিন্দর। আর কোনো ঝুটঝামেলা নেই। টাকা পয়সার অভাব নেই। ইচ্ছেমত যা খুশি খাবে, মদ মাংস। এতদিন তো ভাল ভাল খাবার কালেভদ্রে জুটত। এখন চুটিয়ে খাবে মধু। একেবারে রাজার হালে থাকবে।

পরদিন কলকাতার নামকরা নার্সিংহোমে গিয়ে চেক আপ করানোর সময় দেখা গেল, গোবিন্দর হার্ট এক্কেবারে ঠিকঠাক। ডাক্তার ফিট সার্টিফিকেট দেওয়াতে গোবিন্দ, থুড়ি মধুর, ভালমন্দ খাওয়ার ইচ্ছেটা আবার চাগিয়ে উঠল। বিরিয়ানি, মাংস, কলকাতার মিষ্টি – যেটা দেখে, সেটাই খেতে ইচ্ছে করে মধুর। খেতে গিয়ে বুঝতে পারে, ব্যাটা গোবিন্দ বাইরে থেকে সুস্থ মনে হলেও লিভারের বারোটা বাজিয়ে রেখেছে। কিছুই হজম হয় না গোবিন্দর। মধুর মনে হয়, খেতেই যদি না পারল, এত পয়সা দিয়ে কী করে গোবিন্দ! এদিকে গোবিন্দর বউটাও যে ছুঁতে দেয় না গোবিন্দকে, সেটাই বা কে জানত! লোকের সামনে প্রেম দেখায় আর রাতে পাশের ঘরে গিয়ে শোয়। কাছে ডাকলেই বলে — আগে আমাকে সিনেমায় চান্স করে দাও, তারপর যা চাইবে তাই দেব।

—এর জন্য বিয়ে করেছিলাম তোমাকে?

—কেন বাজে কথা বলছ! বিয়ের আগে তো দিয়েছিলাম। তখন তো সবেতেই রাজি ছিলে।

এই ছিল গোবিন্দর পেটে পেটে! এদিকে স্যাটা যেভাবে প্যাঁচে খেলছে, গুণ্ডামি করে পার্টির জন্য গাদা গাদা টাকা তুলে দিচ্ছে, তাতে এবারে দল ওকেই জেলার প্রেসিডেন্ট করে দেবে মনে হচ্ছে। কিছুতেই পেরে ওঠা যাচ্ছে না ওর সঙ্গে। মধুর আর কেষ্টর ছেলের চাকরিও কাঁচিয়ে দিয়েছে স্যাটা। জীবনটা জুতের হচ্ছে না মধুর। কেষ্টকাকা আশেপাশেই কোথাও কখনো না কখনো ঘোরাফেরা করছে কল্পনা করে কেষ্টকাকাকেই বারবার অনুরোধ করে — আমাকে এই শরীর থেকে বের করে দাও কাকা। আমি ওই নারকেল গাছেই থাকব।

গোবিন্দ, থুড়ি মধুর, এই বিড়বিড় করার অভ্যেস একজন, দুইজন করে অনেকেরই চোখে পড়তে থাকে। লোকেরা বলাবলি করে, গোবিন্দ গদি হারানোর ভয়ে পাগল হয়ে গেছে। বউটাও এখন সেজেগুজে স্যাটার সঙ্গে দেখা করতে যায়। বলে দলের কাজ। ওদিকে কেষ্টকাকার কোনো পাত্তাই নেই আর। গোবিন্দর পচা লিভার আগলে বাঁচতে বাঁচতে মধু ভাবে গলায় দড়ি দিলে কি বোমার আঘাতের চেয়েও বেশি কষ্ট হয়?

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.