সম্প্রতি ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪এ ধারা, সহজ ভাষায় বললে দেশদ্রোহ-বিরোধী আইন সংক্রান্ত ধারাটি (সিডিশন ল) সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্ট যে নির্দেশ দিয়েছে তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে অনেকের মনে কিঞ্চিৎ আশার সঞ্চার হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন ইংরেজ আমলে তৈরি এই আইন সম্পর্কে সর্বোচ্চ আদালতের এই নির্দেশ ঐতিহাসিক, এর ফলে স্বাধীন দেশের পক্ষে বেমানান এই দমনমূলক আইন বাতিল হওয়ার পথ প্রশস্ত হল। অনেকে আবার এতটা উৎসাহী নন, তাঁরা জানতে আগ্রহী বর্তমান সরকারের আমলে সারা দেশে যে কয়েকশো মানুষকে বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে বন্দী করে রাখা হয়েছে, তাদের এই নির্দেশে কোনো সুবিধা হবে কিনা। এই লেখায় আমরা আইনের কষ্টিপাথরে মহামান্য আদালতের নির্দেশটাকে যাচাই করব।

 

তবে প্রথমেই বলে নেওয়ায় দরকার, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বেরোবার পর কেন্দ্রীয় আইন মন্ত্রী কিরেন রিজিজু যে আদালতকে লক্ষ্মণরেখার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন তার কোনো প্রয়োজন ছিল না। আদালত নিজের কাজের গণ্ডির মধ্যে থেকেই কাজ করেছে। আইন প্রণয়নের দায়িত্ব আইনসভার, আর সরকারের দায়িত্ব সেই আইন অনুসারে কাজ করা। সংবিধান অনুযায়ীই কোনো আইন ঠিক কি বেঠিক, তা বিবেচনা করার অধিকার এবং দায়িত্ব একমাত্র আদালতেরই। তবে আমাদের দেশের শাসনব্যবস্থায় যেহেতু বর্তমানে সরকার নির্ভরতা অনেক বেশি, সেই কারণেই হয়ত সরকার পুনর্বিবেচনার জন্য সময় চাওয়ায়, আদালত সময় দিতে রাজি হয়েছে।

 

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কিন্তু এতে অন্য একটা ব্যবহারিক সমস্যা হতে পারে। একদিকে এই নির্দেশের কারণে দেশদ্রোহ-বিরোধী আইনে অভিযুক্তদের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ থাকছে, অন্যদিকে বলা হয়েছে জামিনের ব্যাপারটা আদালত বিবেচনা করবে। পুলিশ কেস রেজিস্টার করতে পারবে না, বা জামিন হবেই, অথবা নিম্ন আদালত জামিন দিতে বাধ্য থাকবে, এমনটা কোথাও বলা হয়নি। এখন যদি সরকার এই পুনর্বিবেচনা করতে পাঁচ বছর সময় নেয়, আর আদালত জামিন না দেয় এবং ট্রায়ালও বন্ধ থাকে ততদিন পর্যন্ত, তাহলে অভিযুক্তরা জামিন বা মুক্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। এক্ষেত্রে, দ্রুত মীমাংসার পথে না হাঁটলে, সুপ্রিম কোর্টের উক্ত নির্দেশের প্রভাবও বিশেষ থাকবে না আর।

 

কেন্দ্রের বিজেপি সরকার অতীতে এই আইনের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছে, উত্তরপ্রদেশের মত রাজ্যে বিজেপি এই আইন যত্রতত্র ব্যবহার করেছে, এমনকি এই মামলার শুনানিতে ফাইল করা এফিডেভিটেও সরকারপক্ষ মহামান্য সুপ্রিম কোর্টকে এই মামলার বিচার বন্ধ রাখতেই অনুরোধ করেছিল। অতএব এখন সরকার যা-ই বলুক না কেন, অনেকেই সরকারের আসল উদ্দেশ্য কী তা নিয়ে চিন্তিত। সেই চিন্তা একেবারেই অমূলক নয়। আমার ধারণা সরকার আসলে এই আইনের কিছু সংস্কার করতে পারে। পুলিশকে আরও বিবেচনা করে অভিযোগ দায়ের করতে হবে – এরকম কোনো ভাষা ব্যবহার করা হতে পারে। আইনটা বাতিল করলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ এই আইন না থাকলে এই ধরনের মামলাগুলো ইউএপিএ (আনলফুল অ্যাক্টিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট) আইনে করার নির্দেশ দিতে পারবে সরকার। একথা অনস্বীকার্য যে এই ইউএপিএ, বা এনআইএ জাতীয় আইনগুলো পূর্বের কংগ্রেস সরকারের আমলে তৈরি, কিন্তু এগুলোর এরকম যত্রতত্র ব্যবহার বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগে দেখা যায়নি। বর্তমানে শুধু বিজেপি কেন, বিভিন্ন রাজ্য সরকারও এই আইনগুলোর অস্বাভাবিক প্রয়োগ আরম্ভ করেছে। বিজেপি বা এই অন্যান্য রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলগুলির যুক্তি হল, আমরা তো কেবল আইনগুলো রূপায়ণ করছি মাত্র। এখন, মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশকে সামনে রেখে আর সামনের নির্বাচনগুলোকে মাথায় রেখে কংগ্রেসের দেশদ্রোহ-বিরোধী আইন বাতিল করলাম – আসলে এরকম দেখানোর চেষ্টা করতে পারে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। তাতে অভিযুক্তদের কোনো সুবিধা হবে না। কিন্তু ভোটের আগে হাততালি কুড়োতে পারবে বিজেপি। হয়ত সেটা করার জন্যেই সরকার সময় চেয়ে নিয়েছে। ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ সরকারের চালু করা এই আইনটা ছাড়াও তো আমাদের দেশে দেশদ্রোহ-বিরোধী একাধিক আইন আছে। যদি সরকার বলত ইউএপিএ, এনআইএ (ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি), আফস্পা (আর্মড ফোর্সেজ স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট) আইনের মত আইনগুলোও পুনর্বিবেচনা করা হবে, তবে বোঝা যেত সরকারের সদিচ্ছা আছে।

 

বস্তুত, এই আইন বাতিল হল কি হল না তা নিয়ে খুব বেশি ভেবে লাভ নেই। সব দেশেই রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য কোনো না কোনো আইন আছে। খোদ ইংল্যান্ডেও আছে। কিন্তু সেখানে ১২৪এ ধারার মত আইন তুলে দেওয়া হয়েছে কারণ বিকল্প আইন হয়েছে। আমাদের দেশেও এই মুহূর্তে এই আইনের বিকল্প হিসাবে ইউএপিএ, এনআইএর মত আইন রয়েছে। ফলে ১২৪এ না থাকলেও রাজ্য বা কেন্দ্র কোনো সরকারেরই কিছু এসে যায় না, আর উল্টো দিকে নাগরিক অধিকারের দিক থেকেও, বাড়তি কোনো সুবিধা হবে না। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এমনও বলা হয়নি যে আপাতত ১২৪এ অনুযায়ী কাউকে অভিযুক্ত করা যাবে না। এটুকুই বলা আছে, যে নতুন মামলা দায়ের হলে আদালত সেটাকে বর্তমান নির্দেশিকা আর সরকারের পুনর্বিবেচনার বিষয়টা মাথায় রেখে বিচার করবে। সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী নির্দেশ পর্যন্ত নতুন করে ট্রায়াল শুরু করা যাবে না।

 

একথা ঠিক যে এই নির্দেশের ফলে দেশদ্রোহ-বিরোধী আইনে বন্দী অভিযুক্তরা অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের আবেদন করতে পারবে। কিন্তু বর্তমান সময়ে, আমার স্বল্প অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে, রাজ্য সরকারের পুলিশ বা কেন্দ্র সরকারের এজেন্সিগুলো কাউকে কেবল এই একটা আইনের ধারায় অভিযুক্ত করে না, সাথে সাথে ইউএপিএ জাতীয় আইনেও অভিযুক্ত করে। ফলে ভীমা কোরেগাঁও মামলার অভিযুক্তদের মত, এরকম একইসঙ্গে যারা পেনাল কোডের সেকশন ১২৪এ ধারার সাথে সাথে ইউএপিএ-তে অভিযুক্ত, তাদের কোনো সুবিধা হল না। আর ইউএপিএ ধারায় অভিযোগ করার ক্ষেত্রে যদি কোনো সরকারি অনুমোদন না থাকে, একমাত্র তবেই অভিযুক্তের কিছুটা সুবিধা হবে। আসলে ইউএপিএ-তে অভিযুক্ত হলে জামিন পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ২০১৯ সালে এরকম একটা মামলা বাতিল করে দিয়ে মহামান্য সর্বোচ্চ আদালত বলেছিল, এই আইনে মামলা হলে সরকারপক্ষের অভিযোগই শেষ কথা।

 

সুতরাং, ওই ইউএপিএ জাতীয় আইন, এবং সেই আইনের যত্রতত্র ব্যবহারের ব্যাপারে যতদিন অব্দি মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট বা কেন্দ্রীয় সরকার একই রকম কোনো নির্দেশিকা প্রণয়ন বা ইচ্ছা প্রদর্শন না করছে, ততদিন এই পেনাল কোডের ১২৪এ ধারা সম্পূর্ণ উঠে গেলেও দেশদ্রোহে অভিযুক্ত মানুষেরা যে তিমিরে ছিলেন সেই তিমিরেই থাকবেন।

 

মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.