নিত্য নন্দ

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে ভারত অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যে মিশ্র অর্থনীতিকেই সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে করেছিল। ১৯৯১ সালে তার অভিমুখ কিছুটা বদলে গিয়ে বেসরকারি অর্থব্যবস্থার দিকে কিছুটা বেশি ঝুঁকে গেলেও, আজও মিশ্র অর্থনীতির কাঠামোটা রয়ে গিয়েছে। যা-ই হোক, সেই অভিমুখ না বদলালেও কোনো বিশেষ সরকারি সংস্থার বেসরকারিকরণ হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। কারণ এমন তো হতেই পারত যে সরকার একটা সংস্থার বেসরকারিকরণ করে অন্য একটা নতুন সংস্থা তৈরি করল, যা সময়ের নিরিখে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে যে প্রশ্ন দুটো সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো হল, সরকার বেসরকারিকরণ বাবদ পাওয়া অর্থ কীভাবে ব্যয় করল এবং বেসরকারিকরণটা ঠিক কী পদ্ধতিতে করল।

আরও একটা প্রশ্ন এসে যায়, তা হল সরকারের অনেকগুলো সংস্থা খোলার পিছনে কোনো না কোনো সামাজিক বা কৌশলগত কারণ ছিল। তাহলে সেই কৌশলগত কারণ বা সামাজিক কারণ কি আজকের দিনে আর সেভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কিন্তু সহজ নয়। তবে গণতান্ত্রিক দেশে যদি মোটামুটি সবাই মেনে নেয় যে সেগুলো আর গুরুত্বপূর্ণ নয়, তাহলে প্রশ্নটা সেখানেই থেমে যায়। কিন্তু যদি তা না হয়, তাহলে একটু অন্যভাবে ভাবার অবকাশ থাকে। ভারতের ক্ষেত্রে এর সমাধান হিসাবে একটা মধ্যপন্থা গৃহীত হয়েছে। অর্থাৎ মালিকানা বা কর্তৃত্ব সরকারের হাতে রেখেই সেই সংস্থার কিছুটা অংশ বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া। এই পদ্ধতিকে এখন বলা হয় বিলগ্নিকরণ। তবে এটা সম্ভব সেইসব সংস্থার ক্ষেত্রে, যেখানে পরিচালন ব্যবস্থা মোটামুটি ঠিক আছে এবং সংস্থায় নিয়মিত লোকসান হয় না। যেমন এয়ার ইন্ডিয়ার ক্ষেত্রে বিলগ্নিকরণের পথে হাঁটা কার্যত অসম্ভব ছিল। তবে বিলগ্নিকরণের ক্ষেত্রেও প্রথম দুটো প্রশ্ন, অর্থাৎ বিলগ্নিকরণের ফলে প্রাপ্ত অর্থের ব্যবহার এবং বিলগ্নিকরণের পদ্ধতি, একইরকম প্রাসঙ্গিক।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

সম্প্রতি যে সংস্থার বিলগ্নিকরণ হয়ে গেল, সেটা হল লাইফ ইনশিওরেন্স কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া বা এলআইসি। মাত্র ৩.৫ শতাংশ মূলধনাংশ (শেয়ার) বিক্রি করা হয়েছে। তাই কৌশলগত দিকে থেকে এর ফলে বিরাট কিছু পরিবর্তন আসবে এরকম মনে করার কোনো কারণ নেই। তবে এটাও ঠিক যে সরকার এখানেই থেমে থাকবে না। ১৯৯১ সাল থেকে যে দল বা গোষ্ঠীই সরকার চালাক না কেন, সবাই এভাবেই চলেছে। তাই সরকার কোথায় গিয়ে থামবে এবং তার ফলে কৌশলগত দিক থেকে কীরকম পরিবর্তন আসবে, তা এখনো ভবিষ্যতের গর্ভে।

মনে রাখা দরকার, এলআইসি একটা বিশাল আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তাই এর মালিকানা সরকার অনেকসময় নানা উপায়ে কৌশলগতভাবে কাজে লাগিয়েছে। সেটা কোনো বিপদে পড়া সংস্থাকে বাঁচাতেই হোক অথবা অন্য কোনো সংস্থা, যেখানে এলআইসির অনেকখানি বিনিয়োগ আছে, তার উপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেই হোক, বা মূলধনাংশের বাজারে স্থায়িত্ব বজায় রাখতেই হোক। শতকরা ১০০ ভাগ মালিকানা সরকারের হাতে থাকলেও এলআইসি এতদিন ধরে যেভাবে চলেছে তা কিন্তু অনন্য। এলআইসির মুনাফার মাত্র পাঁচ শতাংশ সরকারকে দেওয়া হয় লভ্যাংশ হিসাবে, বাকি ৯৫ শতাংশ দেওয়া হয় পলিসি হোল্ডারদের। সেই অর্থে এলআইসির গঠন ও পরিচালন যেন সরকারি সংস্থা ও সমবায় সংস্থার মাঝামাঝি একটা ব্যবস্থা। আর্থিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশের মানুষ সরকারি সংস্থাকে বেশি ভরসা করে সেটা যেমন ঠিক, তেমনি এই বিশেষ ব্যবস্থাও এত বছর ধরে এলআইসির বৃদ্ধিতে অনেকটাই সহায়ক হয়েছে। তাই এলআইসির এই বৃদ্ধিতে পলিসি হোল্ডারদের ভূমিকাকেও অস্বীকার করা যায় না। তাই এই বিশেষ ব্যবস্থার সমাপ্তি, যা বিলগ্নিকরণের কিছুদিন আগেই করা হয়েছে, তার যাথার্থ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিলগ্নিকরণ থেকে প্রাপ্ত অর্থের সদ্ব্যবহারের প্রশ্নে বলতে হয়, এই অর্থ কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করতে হবে – এমন কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। তাই ধরেই নেওয়া যায়, এই অর্থ মূলত সরকার আর্থিক ঘাটতি মেটাতেই ব্যবহার করবে। সরকার দৈনন্দিন কাজকর্ম করের টাকায় চালাতে না পেরে মানুষের বহুবছর ধরে গচ্ছিত সম্পদে হাত দিচ্ছে – এটা নিশ্চয়ই ভাল কথা নয়। তবে ১৯৯১ সাল থেকেই কিন্তু এ জিনিস চলছে।

বিলগ্নিকরণের পদ্ধতির দিক থেকে অবশ্য সরকার সঠিক পথেই এগিয়েছে। নিজেদের পছন্দমত বড় সংস্থার হাতে এলআইসির মূলধনাংশ তুলে না দিয়ে সরকার খুচরো বিক্রির মাধ্যমে ছোট বিনিয়োগকারীদের সুযোগ দিয়েছে এবং সেক্ষেত্রেও পলিসি হোল্ডার এবং কর্মচারিদের বিশেষ সুযোগ দিয়েছে। বিভিন্ন দেশে সরকারি সংস্থার বিলগ্নিকরণ, এমনকি বেসরকারিকরণের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতিই গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষত সেইসব দেশে, যেখানে সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বা উন্নয়ন তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। অন্যদিকে কোনো বিশেষ বেসরকারি সংস্থার হাতে সরকারি সংস্থাকে তুলে দিলে যেমন অর্থনীতিতে একচেটিয়া ঝোঁক বাড়ে, তেমনি দুর্নীতির সম্ভাবনাও বাড়ে। অবশ্য কোনো সরকারি সংস্থা যদি অনেকদিন ধরে লোকসানে চলে এবং পরিচালন ব্যবস্থায় সংকট থাকে তাহলে সেই পথ নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।

এলআইসিকে শুধুমাত্র একটা বিমা সংস্থা হিসাবে দেখলে মস্ত বড় ভুল হবে। মানুষ এলআইসিতে যেমন বিমায় বিনিয়োগ করে, তেমনি অনেকেই তাদের জীবনের সঞ্চয় এলআইসিতে রাখে অবসরের পর কিছুটা নিশ্চিন্ত জীবনযাপনের জন্য। তাই শুধুমাত্র কৌশলগত কারণই নয়, এর আর্থ-সামাজিক গুরুত্বও অপরিসীম। তাই বেশিরভাগ মানুষই হয়ত চাইবে কোনদিনই যেন এর বেসরকারিকরণ না হয় আর বিলগ্নিকরণের মাত্রাও যেন সীমা ছাড়িয়ে না যায়। অবশ্য কারো কারো মতে, সামান্য কিছুটা মূলধন বিক্রি হলেও এর ফলে এলআইসি বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসবে, তার ফলে এর পরিচালন ব্যবস্থায় কিছুটা হলেও স্বচ্ছতা বাড়বে। তাতে গ্রাহকরা কিছুটা হলেও লাভবান হবেন। যা-ই হোক, এলআইসি সম্পর্কে ভবিষ্যতে সরকারের নীতি কী হয় এবং বিলগ্নিরকরণ কোথায় গিয়ে থামে সেদিকে অবশ্যই সবার দৃষ্টি বা আগ্রহ থাকবে।

মতামত ব্যক্তিগত

আরো পড়ুন

‘১৯৯১ থেকে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের পথ ত্যাগ করার ফল গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে ১০১তম স্থান’

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.