২১ নভেম্বর থেকে কার্যকরী হল কেন্দ্রের শ্রম কোড। ট্রেড ইউনিয়ন ও বিভিন্ন রাজ্য সরকারের প্রবল আপত্তিকে উপেক্ষা করেই কেন্দ্র চারটি শ্রম কোড চালু করল। অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের আমলে গঠিত দ্বিতীয় জাতীয় শ্রম কমিশন ২০০২ সালে দেশের সব শ্রম আইনকে কোডে রূপান্তরিত করার প্রস্তাব দিয়েছিল। নরেন্দ্র মোদী সরকার কেন্দ্রে ক্ষমতায় এসে সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়। উনত্রিশটি শ্রম আইনকে চারটি শ্রম কোডে রূপান্তরিত করা হয়। এই চারটি কোড হল – ১) দ্য কোড অন ওয়েজেস, ২০১৯, ২) দি ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশনস কোড (আই আর), ২০২০, ৩) দ্য কোড অন সোশাল সিকিউরিটি (এস এস), ২০২০ এবং ৪) দি অকুপেশনাল সেফটি, হেলথ অ্যান্ড ওয়ার্কিং কন্ডিশনস কোড (ও এস এইচ ডব্লিউ), ২০২০।

সরকারের দাবি – স্বাধীন ভারতে এতবড় শ্রম সংস্কার আগে হয়নি। দাবিটা ঠিক, কিন্তু সেই শ্রম সংস্কার শ্রমিকদের অধিকার বাড়ালো না কমালো? কোডগুলিতে শ্রমিকদের নতুন অধিকার ও সুরক্ষা প্রকল্পের সুযোগ থাকলে, আরও বেশি সংখ্যক শ্রমিককে নানা অধিকার ও সুযোগসুবিধার আওতায় নিয়ে এলে, সেটা শ্রমিক স্বার্থে করা হয়েছে বলা যায়। কিন্তু শ্রম কোডগুলিতে শ্রমিকদের অধিকার দেওয়ার বদলে তা সংকুচিত করা হয়েছে। বিশাল সংখ্যক শ্রমিককে বিভিন্ন অধিকার ও সুযোগসুবিধার আওতা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সরকার যেসব অধিকার দেওয়ার দাবি করছে, তার অনেকগুলি থেকেই নানা কায়দায় বিশাল সংখ্যক শ্রমিককে বাদ দেওয়া হয়েছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

১৯৪৬ সালের ইন্ডাস্ট্রিয়াল এমপ্লয়মেন্ট স্ট্যান্ডিং অর্ডারস অ্যাক্ট অনুযায়ী, ১০০ জন বা তার বেশি সংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারী আছে, এমন শিল্প প্রতিষ্ঠানে স্ট্যান্ডিং অর্ডার কার্যকরী ছিল। যার ফলে বেতন, ছুটি, হাজিরা, কাজের শর্তাবলী ইত্যাদি নির্ধারণে শ্রমিকদের দর কষাকষির ক্ষমতা ছিল। নতুন আই আর কোডের ২৮(১) নম্বর ধারা অনুযায়ী, ৩০০ জনের কম শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন এমন শিল্প সংস্থায় স্ট্যান্ডিং অর্ডার কার্যকরী থাকবে না। ফলে ৭৪ শতাংশের বেশি শিল্প সংস্থার শ্রমিক মালিকের সঙ্গে দর কষাকষির অধিকার হারাবেন।

একইভাবে এই শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তাও মালিকের উপর নির্ভরশীল হয়ে যাবে। আই আর কোডের ৭৭(১) নম্বর ধারা অনুযায়ী ৩০০ জনের কম শ্রমিক কাজ করেন এমন শিল্প সংস্থায় শ্রমিক ছাঁটাই, লক আউট, লেঅফ, ক্লোজারের জন্য মালিকের সরকারের থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন থাকবে না। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউটস অ্যাক্ট অনুসারে কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানে ১০০ জন বা তার বেশি শ্রমিক থাকলেই মালিককে এসব ক্ষেত্রে সরকারের অনুমতি নিতে হত। অর্থাৎ আই আর কোডের মাধ্যমে সিংহভাগ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকই শ্রমিকদের ছাঁটাই করা, সংস্থা যখন তখন বন্ধ করে দেওয়ার অবাধ স্বাধীনতা লাভ করলেন। শ্রমিকের প্রতিবাদ বা দর কষাকষির অধিকারই থাকছে না। সরকারও কোনো পদক্ষেপ নেবে না।

পাশাপাশি শ্রমিকদের ধর্মঘটের অধিকার অনেকখানি সংকুচিত হয়েছে। আই আর কোডের ৬২ নম্বর ধারা অনুসারে, ধর্মঘট করতে হলে অন্তত ১৪ দিন আগে মালিক পক্ষের কাছে আগাম নোটিস দিতে হবে। প্রচলিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডিসপিউটস অ্যাক্ট অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা ছাড়া কোনো ক্ষেত্রেই ধর্মঘটের আগাম নোটিস দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল না। এই নিয়ম না মানলে ৬৩ নম্বর ধারা অনুসারে সেই ধর্মঘটকে বেআইনি বলে গণ্য করা হবে।

এমন ‘বেআইনি’ ধর্মঘটের জন্য আই আর কোডে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। ৮৬(১৩) নম্বর ধারা অনুযায়ী, কেউ বেআইনি ধর্মঘটে সামিল হলে তাঁকে ২,০০০-১০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা দিতে অথবা এক মাস পর্যন্ত কারাবাসে থাকতে হতে পারে। আবার জরিমানা ও কারাবাস – উভয় শাস্তিও হতে পারে। ৮৬(১৫) নম্বর ধারা অনুসারে, কোনো ব্যক্তি বেআইনি ধর্মঘটে সামিল হতে কাউকে প্ররোচিত করলে বা উস্কানি দিলে তার ১০,০০০-৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা দিতে অথবা এক মাস পর্যন্ত কারাবাসে থাকতে হতে পারে। আবার জরিমানা ও কারাবাস উভয় শাস্তিও হতে পারে। অর্থাৎ ধর্মঘটের সংগঠক, ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের এই ধারা অনুসারে কঠোর শাস্তি দেওয়া যেতে পারে।

শ্রমিক ছাঁটাইয়ের সুযোগ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মালিকের চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের অধিকার বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তার জন্য আই আর কোডে ‘ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্ট’ নামের নতুন শব্দবন্ধ যুক্ত করা হয়েছে। নির্দিষ্ট মেয়াদে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে এই ধরনের কর্মীদের নিয়োগ করা যাবে। এক বছর কাজ করলে তাঁদের গ্র্যাচুইটি দিতে হবে। যাতে গ্র্যাচুইটি না দিতে হয়, তার জন্য এক বছরের কম মেয়াদে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক-কর্মচারি নিয়োগ বাড়বে। অর্থাৎ ভাড়া করো আর ছাঁটাই করো (‘হায়ার অ্যান্ড ফায়ার’) নীতিকেই কোড আরও উৎসাহিত করল। ২০২৪-২৫ সালের কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক সমীক্ষা অনুসারে, দেশে কর্মরত মোট শ্রমিক-কর্মচারির ২২ শতাংশও নিয়মিত মজুরি বা বেতন পান না। আই আর কোড অস্থায়ী মেয়াদি শ্রমিকের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে দেবে। স্থায়ী নিয়োগ আরও কমে যাবে।

ও এস এইচ ডব্লিউ কোডে বিশাল সংখ্যক শ্রমিকের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এঁদের স্বাস্থ্য, কাজের জায়গায় নিরাপত্তা, কাজের পরিবেশ ইত্যাদি সংক্রান্ত কোনো অধিকার বা সুরক্ষা প্রকল্পের সুযোগ থাকবে না। এই কোডের ২ নম্বর ধারায় কারখানার সংজ্ঞাই বদলে দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎচালিত উৎপাদন সংস্থায় অন্ততপক্ষে ২০ জন এবং বিদ্যুৎচালিত নয় এমন সংস্থায় অন্ততপক্ষে ৪০ জন শ্রমিক না থাকলে তাকে কারখানা বলা হবে না। অর্থাৎ এর কম শ্রমিক নিয়ে চলা উৎপাদন সংস্থাগুলির শ্রমিকরা এই কোডে থাকা অধিকার ও সুরক্ষা প্রকল্পগুলি থেকে বঞ্চিত হবেন। প্রচলিত আইনে বিদ্যুৎচালিত উৎপাদন সংস্থায় দশজন বা তার বেশি শ্রমিক এবং বিদ্যুৎচালিত নয় এমন সংস্থায় ২০ জন বা তার বেশি শ্রমিক থাকলেই সেগুলিকে কারখানা বলে গণ্য করা হত।

সিংহভাগ ঠিকে শ্রমিক ও এস এইচ ডব্লিউ কোডের সুযোগগুলি থেকে বাদ পড়ে যাবেন। কোডের ৪৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী যেসব সংস্থায় ৫০ জনের কম ঠিকে শ্রমিক রয়েছেন, সেসব সংস্থায় এই কোড ঠিকে শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য হবে না। যেসব প্রতিষ্ঠানের কাজ বছরে ১২০ দিনের কম এবং মরশুমি কাজের ক্ষেত্রে বছরে ৬০ দিনের কম হয়, সেইসব প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা এর আওতায় আসবেন না। ১৯৭০ সালের কন্ট্রাক্ট লেবার (রেগুলেশন অ্যান্ড অ্যাবলিশন) অ্যাক্ট অনুসারে কোনো সংস্থায় ২০ জন বা তার বেশি ঠিকে শ্রমিক থাকলেই তাঁরা সামাজিক সুরক্ষার আওতায় ছিলেন।

পাশাপাশি ঠিকে শ্রমিকের সংখ্যা বাড়াতে কোডের ২(পি) নম্বর ধারায় কোর সেক্টর থেকে সাফাই, নিরাপত্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্যুরিয়ার, নির্মাণ, পরিবহনের মতো মোট ১১টি ক্ষেত্রকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ আরও অবাধ হবে।

ও এস এইচ ডব্লিউ কোড অনুসারে, ৫০ জনের কম শ্রমিক সরবরাহকারী ঠিকেদারদের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক থাকবে না। প্রচলিত আইনে ২০ জন বা তার বেশি শ্রমিক সরবরাহ করলেই ঠিকেদারদের লাইসেন্স বাধ্যতামূলক ছিল। বাস্তবে ঠিকেদাররা খাতায় কলমে অনেক কিছু গোপন করেন। নতুন কোডে বেশিরভাগ ঠিকেদারই ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবেন। শ্রমিকের মজুরিতে ভাগ বসানো, মজুরি মেরে দেওয়ার সুযোগ আরও বাড়বে। মূল নিয়োগকর্তারও দায় থাকবে না।

ও এস এইচ ডব্লিউ কোডের একাদশ অধ্যায়ের দ্বিতীয় ভাগে অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের (আন্তঃরাজ্য প্রবাসী শ্রমিক) কথা বলা রয়েছে, যাঁদের বড় অংশই অসংগঠিত ক্ষেত্রের ঠিকে শ্রমিক। ঠিকে শ্রমিকদের প্রতি কোডের বঞ্চনা তাঁদের উপরেও প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে ঠিকেদারদের অধিকার বাড়ানোয় এইসব শ্রমিকদের প্রতি বঞ্চনা বাড়বে। কোডে তাঁদের ই এস আই, প্রভিডেন্ট ফান্ড সহ নানা সুযোগসুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কাজের জায়গায় অথবা নিজেদের বাড়িতে তাঁরা রেশনের মাধ্যমে খাদ্যশস্য পাবেন। কিন্তু ৫৯ নম্বর ধারা অনুসারে, কোনো সংস্থায় দশজনের কম আন্তঃরাজ্য প্রবাসী শ্রমিক থাকলে, তাঁদের বেলায় এই অধিকার ও সুযোগগুলি প্রযোজ্য হবে না। ১৯৭৯ সালের ইন্টার-স্টেট মাইগ্রান্ট ওয়ার্কমেন (রেগুলেশন অফ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড কন্ডিশনস অফ সার্ভিস) অ্যাক্ট অনুসারে পাঁচজন বা তার বেশি প্রবাসী শ্রমিক থাকলেই নানা সামাজিক প্রকল্পের সুযোগ ছিল। ২০১৩-১৪ সালের সেন্সাস রিপোর্ট জানাচ্ছে, ৭০% সংস্থাতেই ছজনের কম আন্তঃরাজ্য প্রবাসী শ্রমিক ছিলেন। অর্থাৎ কোডের মাধ্যমে সিংহভাগ প্রবাসী শ্রমিককে কোনোরকম অধিকার ও প্রকল্পের সুযোগ থেকে ছেঁটে দেওয়া হল।

১৯৭৯ সালের আইন অনুযায়ী আন্তঃরাজ্য প্রবাসী শ্রমিকদের যথাযথ থাকার ব্যবস্থা ঠিকেদারদের করতে হত, ডিসপ্লেসমেন্ট ভাতাও ছিল। কোডে সেসব তুলে দেওয়া হয়েছে।

সরকারের দাবি – অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকের পাশাপাশি গিগ, প্ল্যাটফর্ম কর্মীদেরও নানা সুযোগসুবিধা দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত এস এস কোডে বলা হয়েছে যে, গিগ কর্মীরা চিরাচরিত মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের বাইরে রয়েছেন। কোম্পানিগুলি তাঁদের শ্রমিক বা কর্মচারীর স্বীকৃতি দেয় না। কোডে কোম্পানিগুলির ইচ্ছাকেই আইনসম্মত করা হয়েছে। আর দেওয়া হয়েছে নানা কল্যাণকর প্রকল্প গ্রহণের প্রতিশ্রুতি। তার জন্য এস এস কোডের ১১৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাঁদের নিজেদেরই নাম নথিভুক্ত করতে হবে।

সরকারের আরও দাবি – মহিলা শ্রমিকদের নানা অধিকার ও সুযোগ দেওয়া হয়েছে এই শ্রম কোডে। মজুরি কোডের ৩ নম্বর ধারা অনুসারে মজুরিতে কোনো লিঙ্গগত বৈষম্য থাকবে না। ১৯৭৬ সালের ইকুয়াল রেমুনারেশন অ্যাক্টেও তাই ছিল। অথচ কোডের ২(ওয়াই) নম্বর ধারা অনুসারে মজুরি থেকে বাড়ি ভাড়া বাবদ ভাতা, বোনাস, পেনশন, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ওভারটাইম ভাতা ইত্যাদিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এগুলিতে লিঙ্গগত বৈষম্য থাকলে তা দূর করার ব্যবস্থা কোডে নেই। ও এস এইচ ডব্লিউ কোডের ৪৩ নং ধারা অনুসারে মহিলারা সন্ধ্যা সাতটা থেকে ভোর ছটা অবধি কাজ করতে পারবেন। রাতের কাজের সুযোগ তাঁদের আগে ছিল না। বলা হচ্ছে, এর ফলে মহিলাদের স্বাধীনতা যেমন বাড়বে, কাজের সুযোগও বাড়বে। কিন্তু এর একটা উলটো দিক রয়েছে। মালিক কোনো মহিলা রাতে কাজ করতে অসম্মত হলে, আই আর কোডের সুযোগে তাঁকে ছাঁটাই করতেও পারবেন। কোডে মহিলা শ্রমিকের সম্মতির কথা বলা থাকলেও, কার্যত উলটো ফলের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অঙ্গনওয়াড়ি, মিড ডে মিল, আশা প্রভৃতি সরকারি প্রকল্পে মহিলা কর্মীরাই নিযুক্ত হন। তাঁদের কাজের চাপ দিনদিন বাড়ছে। তাঁদের কিন্তু শ্রম কোডে সরকারি কর্মী হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বহু মহিলা ঠিকেদার মারফত বাড়িতে বসে নানা কাজ করেন। বিশাল সংখ্যক মহিলা বিনা মজুরিতে নানা পারিবারিক আর্থিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। সরকারের ২০২৪-২৫ সালের আর্থিক সমীক্ষা জানাচ্ছে, গ্রামে কর্মরত মহিলাদের ৪২ শতাংশেরও বেশি নানা ধরনের বিনা মজুরির আর্থিক কাজে যুক্ত। সরকার এঁদের কর্মী হিসাবে গণ্য করছে। অথচ তাঁদের জন্য আলাদা করে কোনো প্রকল্পের কথা শ্রম কোডে নেই।

আরো পড়ুন মোদী রাজত্বে শ্রমিক অধিকার স্রেফ জুমলা

মজুরি কোডের ৫ নম্বর ধারায় ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। মিনিমাম ওয়েজেস অ্যাক্টেও তা ছিল। কিন্তু দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে জীবনধারণের খরচ যে হারে বেড়ে গেছে, সেই অনুপাতে ন্যূনতম মজুরি বাড়ছে না। তার ব্যবস্থা না করে এই কোডের ৯ নম্বর ধারায় ফ্লোর ওয়েজের কথা বলা হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান ভেদে কেন্দ্রীয় সরকার এটি নির্ধারণ করবে। তা কখনোই ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম হবে না। ন্যূনতম মজুরি না বাড়িয়ে নতুন এক ধরনের মজুরির কথা বলে মজুরির হার কম রাখার বন্দোবস্ত করা হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

প্রভিডেন্ট ফান্ডে মালিক ও শ্রমিক, উভয় পক্ষের প্রদেয় অর্থ ১২% থেকে কমিয়ে ১০% করায় তহবিলে অর্থ কমবে। ও এস এইচ ডব্লিউ কোডের ২৫ নং ধারায় দৈনিক আট ঘন্টা কাজের কথা বলা হলেও, সরকার কাজের সময় যাতে ইচ্ছে করলে বাড়াতে পারে তার সংস্থানও রাখা হয়েছে।

দেখা যাচ্ছে, শ্রম কোডগুলি মালিককে অবাধে শ্রমিক ছাঁটাই করা, কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার অধিকার দিয়েছে। শ্রমিকের দর কষাকষির ক্ষমতা কমিয়েছে। শ্রমিকদের ধর্মঘট করার, সংগঠিত হওয়ার অধিকারও অনেকখানি সংকুচিত করেছে। পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক অস্থায়ী কর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর এবং তাঁদের অধিকার সঙ্কোচনের ব্যবস্থা করেছে। প্রবাসী শ্রমিক, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য যত না অধিকার বা কল্যাণমূলক প্রকল্পের ব্যবস্থা করেছে, তার থেকে বেশি এসবের থেকে বিশাল সংখ্যক শ্রমিককে বঞ্চিত করেছে। কাজের সময় বৃদ্ধির সংস্থানও রাখা হয়েছে। সরকারের আসল লক্ষ্য নমনীয় ও সস্তা শ্রমের বাজার তৈরি করা। যেখানে মেয়াদি অস্থায়ী শ্রমিকরা কাজের নিশ্চয়তা সহ নানা অধিকারে বঞ্চিত থেকে কম মজুরিতে কাজ করবেন।

নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতি এই ধরনের শ্রমের বাজারই চায়। সেই কারণেই নয়া উদারনীতি শ্রম আইন সংস্কারের দাবি তোলে। শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্বে রাষ্ট্র নগ্নভাবে পুঁজির পক্ষে দাঁড়ায়। শ্রমিকের অর্জিত অধিকার সংকোচনের পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষমতাও কমিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৯১ সালে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতি গ্রহণ করার পর থেকেই শিল্পপতিরা শ্রম আইন সংস্কারের দাবি তুলে আসছিল। শ্রম কোড তৈরি হয়েছে সেই লক্ষ্যেই। আগামীদিনে শ্রমিকের উপর আক্রমণ আরও তীব্র হবে। শ্রমের উপর পুঁজির আধিপত্যের লক্ষ্যে আনা শ্রম কোডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী আন্দোলন গড়ে না উঠলে সেই আক্রমণ রোখা যাবে না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.