ডিসেম্বরের ৩ তারিখ এলে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে নানা সরকারি অনুষ্ঠানের খবর শোনা যায়। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ নির্ধারিত প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষদের জন্য এই বিশেষ দিনে দেশজুড়ে নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা এই প্রান্তিক গোষ্ঠীর জন্য তাঁরা কতটা বিচলিত তা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন, এই গোষ্ঠীর নানাভাবে পুনর্বাসন সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন। অথচ আর পাঁচজন নাগরিকের মতই পুনর্বাসনের প্যাকেজের খোঁজ না করে জীবিকা নির্বাহের মাধ্যমে স্বনির্ভর হওয়ার ইচ্ছা সব প্রতিবন্ধী মানুষেরই থাকে।

তথ্য অনুসারে ভারতে প্রায় তিন কোটি প্রতিবন্ধী মানুষ আছেন। এঁদের মধ্যে প্রায় ১.৩ কোটি কর্মসংস্থানযোগ্য। কিন্তু মাত্র ৩৪ লক্ষ কর্মসংস্থান পেয়েছেন। এঁদের অনেকেই অসংগঠিত ক্ষেত্রে বা সরকার পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পে নিযুক্ত আছেন। আবার কেউ কেউ নিজেরা ছোট ব্যবসা শুরু করেছেন।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

২০১৬ সালে পাশ হওয়া প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার আইন অনুসারে সবরকম সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য ৪% সংরক্ষণ নির্ধারণ করা আছে। এক্ষেত্রে মূল সমস্যা হল, দেশজুড়ে বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়া বেশ কয়েক বছর ধরে চলছে। ফলত সরকারি চাকরির সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। এতদিন আমরা জানতাম, ভারতীয় রেল সবথেকে বেশি প্রতিবন্ধী মানুষের কর্মসংস্থান করেছে। এই কারণে আলাদা করে রেলওয়ে ডিসএবলড এমপ্লয়িজ ইউনিয়নও গড়ে উঠেছে। অথচ এখন রেলেরও বহু শাখার কাজ বেসরকারি সংস্থাকে দিয়ে করানো হচ্ছে। ফলে সেই কাজগুলোর ক্ষেত্রে সংরক্ষণের সুবিধা প্রতিবন্ধী মানুষ আর পাচ্ছেন না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য তৈরি আইনে কিন্তু বলা ছিল, বেসরকারি সংস্থাগুলোকে সমান সুযোগ দেওয়ার নীতি প্রণয়ন করতে হবে। যেসব বেসরকারি সংস্থায় ২০ জনের বেশি কর্মী আছেন, তাদের এই নীতি তৈরি করে প্রতিবন্ধকতা বিষয়ক সবরকম বৈষম্য দূরীকরণ করার নির্দেশ সেই আইনে দেওয়া আছে। প্রতিবন্ধী কর্মীদের কী কী সুবিধা তারা দিচ্ছে, তাদের কতজন প্রতিবন্ধী কর্মী আছেন – সেই তালিকা তৈরি করে এই বেসরকারি সংস্থাগুলোকে বলা হয়েছিল চিফ কমিশনারের কাছে জমা দিতে। ২০১৬-২০২৫ ডিসেম্বরে এসেও কতগুলো বেসরকারি সংস্থা এই নীতি গ্রহণ করেছে, সে তথ্য আমাদের কাছে নেই। যে যে তথ্য তাদের প্রতিবন্ধী কমিশনার অফিসে জমা দেওয়ার কথা, তা কতগুলো সংস্থা দিয়ে উঠতে পেরেছে? বোঝাই যাচ্ছে, বেসরকারি সংস্থা দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য দায়বদ্ধতা প্রকাশ না করলে সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনোরকম পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছে না।

অবশ্য এরই মধ্যে কর্ণাটক সরকার একখানা ইতিবাচক বিলের খসড়া করেছে বলে আমরা খবর পেয়েছি। সেই বিলে বলা হয়েছে, ওই রাজ্যের বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও কর্মীদের মধ্যে ৫% প্রতিবন্ধী মানুষ রাখতে হবে। সংস্থাগুলো এই নিয়ম লঙ্ঘন করলে শাস্তি পেতে পারে। এই আইন এখনো খসড়ার স্তরে আছে, তবে শেষপর্যন্ত পাশ হয়ে বলবৎ হলে তার প্রভাব সদর্থক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এখানে মনে রাখা দরকার, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এবং ব্রাজিলের মত দেশে বেসরকারি সংস্থায় প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষণ ইতিমধ্যেই প্রচলিত।

আরো পড়ুন স্বাধীনতার অমৃত মহোৎসবে ব্রাত্য প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষ

আমরা পশ্চিমবঙ্গের মানুষেরা অবশ্য আশাহীন। রাজ্যের স্কুল সার্ভিস কমিশনের বিরুদ্ধে কেস হওয়ার পর সাধারণ শিক্ষকদের মত চাকরি হারিয়েছেন অনেক সংখ্যক দৃষ্টিহীন শিক্ষকও। পশ্চিমবঙ্গ স্কুল সার্ভিস কমিশনের বিরুদ্ধে যত মামলা চলছে, তার মধ্যে এঁদের আলাদা করে দায়ের করা মামলাও আছে। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় কবে আবার নতুন করে চাকরির ব্যবস্থা হবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। তার উপর কিছু চাকরির ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ সরকার অদ্ভুত সংরক্ষণ নীতি নিয়েছে। বিশেষ বিশেষ জায়গায় তফসিলি জাতির প্রতিবন্ধী হলে তবেই সংরক্ষণের সুবিধা দেওয়া হবে বলে স্থির করা হয়েছে। ফলে সাধারণভাবে সরকারি কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের জন্য যে সংরক্ষণ থাকার কথা, সেই সংরক্ষণের সুবিধা প্রতিবন্ধী মানুষ পাচ্ছেন না এই রাজ্যে।

বেসরকারি সংস্থাকে তাদের দায়বদ্ধতা মনে করিয়ে দিয়ে নতুন বিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার আনবে – এমন আশা করতেও প্রতিবন্ধী মানুষ ভয় পাচ্ছেন। তাহলে কি মানবিকতার দোহাই দিয়ে সরকার যে ১,০০০ টাকার ভাতা দেয়, তা দিয়েই প্রতিবন্ধীদের জীবন কেটে যাবে? এবছরের পশ্চিমবঙ্গে প্রতিবন্ধী দিবসের অন্যতম দাবি মানবিক ভাতা বৃদ্ধি করা। মাসে এক হাজার টাকায় যে দিন চলে না, সেই জ্ঞান সরকারেরও আছে।

দেশজুড়ে দাবি উঠেছে, কর্ণাটক সরকারের মত কেন্দ্রীয় সরকারকেও বেসরকারি চাকরি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রতিবন্ধীদের ‘দিব্যাঙ্গ’ বলে ডাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন তাঁর ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে। ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর এদেশের প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য কোন নতুন বার্তা আনে তার অপেক্ষায় প্রতিবন্ধী আন্দোলনের কর্মীরা।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.