ত্রিয়াশা লাহিড়ী
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট গুলফিশা ফতিমা, মীরান হায়দার, শিফাউর রহমান, মহম্মদ শাকিল খান এবং শাদাব আহমেদের জামিন শর্ত সাপেক্ষে মঞ্জুর করেছে। একইসঙ্গে উমর খালিদ ও শার্জিল ইমামের জামিনের আবেদন খারিজ করেছে। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি এই রায়ে যারপরনাই খুশি। আপনি ভাবছেন, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় কেবল দুজন ব্যক্তিকে বিনা বিচারে আটকে রাখা। একেবারেই না। বরং এই রায় ভারতের সমস্ত সুনাগরিকের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে বিপজ্জনক। যে সংবিধান আমাদের সমতার অধিকার (অনুচ্ছেদ ১৪), মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (অনুচ্ছেদ ১৯), জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার (অনুচ্ছেদ ২১) দেয়, সেই সংবিধানেরই পরিপন্থী বলা যায়।
বিচারপতি অরবিন্দ কুমার ও এন ভি অঞ্জারিয়ার বেঞ্চ বাদী পক্ষের প্রাথমিক (prima facie) যুক্তি মেনে নিয়ে বলেছে, অন্য অভিযুক্তদের তুলনায় উমর ও শার্জিল ভিন্ন অবস্থানে রয়েছেন। তার কারণ সম্ভবত, দিল্লি দাঙ্গার সময়ে তাঁরা কেউই দিল্লিতে ছিলেন না। শার্জিল আগেই ‘উস্কানিমূলক বক্তৃতা করার ধৃষ্টতা’ দেখিয়ে গ্রেফতার হয়ে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে ছিলেন, উমরও ছিলেন অন্যত্র। সাধারণ বুদ্ধিতে যে তথ্যগুলো কোনো ষড়যন্ত্রে যুক্ত না থাকার ইঙ্গিত বহন করে, এক্ষেত্রে সেগুলোকেই উল্টো প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অকুস্থলে অনুপস্থিত থাকার জন্যই তাঁদের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার নামে ইউএপিএ-র মত আইনকে হাতিয়ার করে ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তিদের সন্ত্রাসবাদী আখ্যা দিয়ে কারাগারে বন্দি করে রাখাই যেন ভারতে স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠেছে।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
অর্থাৎ কোনো হিংসাত্মক কাজে যুক্ত না থেকে, এমন কোনো কাজে সরাসরি উস্কানি না দিয়েও এই দেশে আজ বাদে কাল আপনি সন্ত্রাসবাদী হয়ে যেতে পারেন। বিনা নোটিসে চাকরি থেকে ছাঁটাই হয়ে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া শ্রমিক, ফসলের ন্যায্য দাম চেয়ে মিছিলের ডাক দেওয়া কৃষক, কম খরচে পড়তে চেয়ে রাস্তায় নামা ছাত্র, জল-জঙ্গল-জমিন বাঁচানোর দাবিতে প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়া আদিবাসী, বৈষম্য ও বিভাজনের বিরুদ্ধে সুরক্ষার দাবিতে আন্দোলনে নামা দলিত-মুসলমান-মহিলা, বেআইনি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো বস্তিবাসী খেটে খাওয়া মানুষ – এখন আইনের চোখে রাতারাতি এরা সকলেই সন্ত্রাসবাদী হয়ে যেতে পারে।
সংশোধিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে আপামর জনগণ জাতি, ধর্ম, ভাষা ইত্যাদির উর্ধ্বে উঠে প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন। সিএএ-র মত সংবিধানবিরোধী আইনের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধে মহিলাদের ভূমিকা এককথায় অবিস্মরণীয়। নির্মম বাস্তবতা দেখুন – ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দিল্লিতে ছিল বিধানসভা নির্বাচন। সেই নির্বাচনের প্রচারে স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বাবরপুরের জনগণের উদ্দেশে বলেন ‘যখন ভোট দেবেন তখন এমন জোরে বোতাম টিপুন যাতে বাবরপুরে বোতাম টিপলে তার ধাক্কা গিয়ে লাগে শাহীনবাগে।’ সেবারের ভোটে বিজেপি হেরে যায়। কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর ভোটের প্রচারে বলেছিলেন ‘দেশ কে গদ্দারোঁ কো, গোলি মারো শালোঁ কো’। দিল্লি বিজেপির প্রথম সারির নেতা প্রবেশ বর্মা সিএএ-এনআরসি আন্দোলনের সময়ে এক ঘন্টায় শাহীনবাগ খালি করার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। এমনকি প্রবেশকে বলতে শোনা গিয়েছিল ‘শাহীনবাগের আন্দোলনকারীরা হিন্দুদের জন্য বিপদের কারণ। বাড়িতে ঢুকে ধর্ষণ করে যাবে।’ বিজেপির আরেক নেতা কপিল মিশ্র বলেছিলেন ‘শাহীনবাগের মাধ্যমে পাকিস্তান ভারতে ঢুকে পড়েছে। মিনি পাকিস্তান তৈরি হয়েছে দিল্লিতে। পাকিস্তানের দাঙ্গাবাজরা রাস্তা দখল করে বসে আছে।’ একাধিক বিজেপি নেতা মন্ত্রী কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী যেভাবে হিংসার ভাষায় কথা বলেন, বিদ্বেষ ছড়ান, দিল্লির ক্ষেত্রেও তার কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। অথচ তাঁরা সবাই খোলা হাওয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
দিল্লির জামিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে সিএএবিরোধী আন্দোলনরত পড়ুয়াদের লক্ষ করে গুলি চালায় এক যুবক। শাহীনবাগের ধর্নায় ঢুকে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতে দিতে শূন্যে গুলি ছোড়ে কপিল গুর্জর নামে আরেকজন। এরপর কপিল মিশ্র হুমকি দেন, তিনদিনের মধ্যে জাফরাবাদ এবং চাঁদবাগ থেকে বিক্ষোভ না উঠলে কারও কথা শুনবেন না, রাস্তা ‘খালি’ করতে তাঁরাই রাস্তায় নামবেন। এই কথার সূত্র ধরেই সংঘর্ষ বাড়ে। দেদার গোলাগুলি, ইটবৃষ্টি, লুঠপাট চলতে থাকে। সাধারণ বাসিন্দাদের বাড়ি, দোকান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। গোটা সময়টা দিল্লি পুলিস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এমনকি দমকলের গাড়িও সঠিক সময়ে পৌঁছয়নি। উপরন্তু দাঙ্গাকারীরা নির্বিঘ্নে তাণ্ডব চালিয়ে গেছে। এতকিছুর পরেও আমাদের বিশ্বাস করতে বলা হবে যে, এই ভয়াবহ সংঘর্ষের পেছনে রয়েছে ১৮ জন সাধারণ পড়ুয়ার গোষ্ঠী! এই তরুণ ছাত্রদের ছোট্ট একটা গোষ্ঠী এত বড় কাণ্ডের পরিকল্পনা করেছে এবং পরিচালনা করেছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ীই, দিল্লির ঘটনাবলীতে নিহত ৫৩ জনের মধ্যে ৪১ জন ছিলেন মুসলমান। যাঁদের ঘরবাড়ি, দোকান, ধর্মীয় উপাসনালয় ধ্বংস হয়েছে, তাঁদের অধিকাংশই মুসলমান। আবার যে ১৮ জন প্রতিবাদী পড়ুয়ার বিরুদ্ধে ইউএপিএ-র আওতায় অভিযোগ আনা হয়েছে, তাঁদেরও ১৬ জন মুসলমান।
আরো পড়ুন উমর, শার্জিল, গুলফিশা প্রমুখ: জামিনের অযোগ্য গণশত্রু?
যে দেশে জনবিরোধী আইনের বিরুদ্ধে কথা বললে, সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষার দাবিতে সরব হলে উমর, শার্জিলদের ছ বছর ধরে জেলে থাকতে হয়; গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও স্ট্যান স্বামীর জামিন হয় না, পারকিনসন্স ডিজিজে ভোগা বৃদ্ধ মানুষটাকে জল খাওয়ার স্ট্র পেতেও আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়, সেই দেশেই বিজেপি সরকার অতি সহজে ধর্ষক-দাঙ্গাবাজদের জামিনে ছাড়িয়ে নেয়। ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট যখন চারদিকে স্বাধীনতার ৭৫ বছর ধুমধাম করে উদযাপিত হচ্ছিল, ঠিক তখনই গুজরাট সরকার বিলকিস বানোর ধর্ষকদের মুক্তি দেয়। সেই ঘটনার বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা লড়েন সমাজকর্মী তিস্তা শেতলবাদ। তাঁর বিরুদ্ধেও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অভিযোগ আনে গুজরাট সরকার। তার আগে জম্মুতে কাঠুয়ার আট বছরের শিশুর ধর্ষকদের মুক্তির দাবিতে জাতীয় পতাকা হাতে মিছিল করার ইতিহাসও আছে বিজেপির দুজন মন্ত্রীর।
উত্তরপ্রদেশের উন্নাওয়ের ঘটনাই বা হাড় হিম করা হিন্দি সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম কী? ধর্ষক জেলে থাকলেও ধর্ষিতার বাবার জেল হেফাজতে মৃত্যু থেকে শুরু করে নির্যাতিতাকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার চেষ্টা চালিয়ে গেছে কুলদীপ সিং সেংগারের লোকেরা। হাথরাসের দলিত নাবালিকার ধর্ষণের ঘটনায় রাতারাতি ধর্ষিতার দেহ পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেয় পুলিস। সেই ঘটনার সত্য উদ্ঘাটন করতে যাওয়ার পথেই কেরালার সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পানকে গ্রেফতার করা হয়, ইউএপিএ সহ একাধিক আইনে মামলা দায়ের করা হয়। আদালতে ধর্ষক বলে প্রমাণিত গুরু গুরমীত রাম রহিম সিং কতবার প্যারোলে বাইরে আসেন তাও আমাদের অজানা নয়।
তাহলে কী বুঝলেন? প্রতিবাদীরা জেলে, ধর্ষকরা বেলে। সুতরাং উমর, শার্জিলদের লড়াই কেবল তাদের ব্যক্তিগত লড়াই নয়।
নিবন্ধকার বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








