বেশ একটা লম্বা সময় ধরে, খুব নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে গত এক দশক ধরে, সরাসরি সরকারি প্রচেষ্টায় এদেশে সাম্প্রদায়িকতাকে উৎসাহ দেওয়া চলছে। প্রতিনিয়ত মুসলমান ‌জনগোষ্ঠীকে হেয় প্রতিপন্ন করা, তাদের জীবনযাপন অসুরক্ষিত করে তোলা, নানা পদ্ধতিতে দেশজুড়ে ঘৃণা ও বিদ্বেষের পরিবেশ তৈরি করা এবং পদে পদে একচোখো নীতি দিয়ে যাবতীয় সৌভ্রাতৃত্ব ধ্বংস করা চলছে। এ স্পষ্টতই একটি অলিখিত নীতি। যে দেশে বিলকিস বানোর গণধর্ষণকারী ও শিশু হত্যাকারী দণ্ডিত অপরাধীদের ‘সংস্কারি’ হওয়ার জন্য মুক্তি দেওয়া হয়, সেই দেশে সাধারণ মুসলমান সমাজের মনে কী বেদনা থাকতে পারে, কী আশঙ্কা থাকতে পারে – তা সহজেই অনুমেয়।

যে বাংলা একদা যুক্ত সাধনার কথা বলেছে, সেই বাংলায় রামনবমী ও হনুমান জয়ন্তীতে প্রকাশ্য শোভাযাত্রা আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করছে। ছোট ছোট ছেলেরা হাতে তরবারি নিয়ে ঘুরছে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এবং অমানবিক স্লোগানে চারিদিক মুখরিত। তারই মধ্যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধ্বজাধারী বিধায়ক ও সাংসদরা, এমনকি মন্ত্রীরাও, ‌‌সোশাল মিডিয়ায় খোলাখুলি ঘৃণার চাষ করে চলেছেন, হুমকি দিচ্ছেন কোনোরকম আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

এই পরিস্থিতিতে ওয়াকফ সংশোধনী আইন যে অগ্নিতে ঘৃতাহুতি করবে তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। রাতভর সংসদে বসে মাননীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যে সমস্ত যুক্তিতর্কের অবতারণা করলেন, তাতে দেশের মুসলমান সমাজের সম্পত্তি দখলে সব রাস্তা পরিষ্কার হল। ঠিক যেভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আদিবাসী মানুষের জল, জঙ্গল, জমির অধিকার প্রায় কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ‌ওয়াকফ সংশোধনী আইন নিয়ে চারিদিকে প্রতিবাদ শুরু হল। সেই প্রতিবাদের একটি উচ্চকিত রূপ দেখা গেল বাংলায় এবং ফলশ্রুতিতে প্রবল উত্তেজনায় মুর্শিদাবাদে প্রাণ গেল তিন নাগরিকের। ‌দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি হল, বহু মানুষ ভিটে ছাড়া, আশ্রয় নিয়েছেন পাশের জেলায়। এলাকায় মোতায়েন সেনা আর সেইসঙ্গে গোটা দেশ জুড়ে শুরু হয়েছে চাপান উতোর। উত্তরপ্রদেশ যেখানে এই সেদিনও একটি মসজিদ নিয়ে বিবাদে পাঁচজন মানুষ মারা গেল, সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলছেন, রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে আফস্পা (আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট) – সবরকম দাবিই নানা মহল থেকে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এ যে একটি রাজনৈতিক প্রকল্প তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ‌অন্যদিকে সংখ্যাগুরু, আপাত ধর্মনিরপেক্ষ মানুষও খানিকটা টলে যাচ্ছেন। এতদিন ধরে বুকের ভিতর যা চাপা দেওয়া ছিল, অর্থাৎ ‘ওরা তো এরকমই, কথায় কথায় মারতে ওঠে’, ‘মুর্শিদাবাদ তো আসলে পাকিস্তান’ – এইসব কথা খোলাখুলি বেরিয়ে আসছে।

মুর্শিদাবাদের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে শাসক দলের প্রধান যুক্তি – ঘটনা ঘটিয়েছে বাইরের লোক, ভাড়াটে লোক, হিন্দুত্ববাদী প্রদেশের লোক, মদত আছে কেন্দ্রীয় সরকারের। সে বিচার অবশ্যই হবে। তদন্ত হবে, মামলা হবে – এসব তো হয়েই চলেছে। সেনা মোতায়েন করে আপাতত শান্তিকল্যাণ হয়ে থাকবে। ক্ষতিপূরণও আসবে। কেউ কেউ ঘরে ফিরবেন, অনেকেই ভাববেন অন্যত্র প্রস্থান করার কথা। সেই জোড়াতালি দেওয়া ভাঙা কাচের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে রয়ে যাবে ফাটলের চিহ্ন। কে রাজা হবেন, কে কাকে তাড়াবেন, পাকিস্তানকে হিন্দুরাষ্ট্র বানাবেন কিনা তার চেয়েও বড় কথা কি এটা নয় যে প্রতিবেশীরা পাশাপাশি থাকতে পারবেন কিনা?

শাসন দিয়ে জীবন চলে না। ঠিক যেমন সিসিটিভির নজরদারিতে মানুষ শ্বাস নিতে পারে না। তেমনি লালন আর পড়শী একসাথে থেকেও মধ্যে লক্ষ যোজন ফাঁক থেকে যায়। জোড়ার কথা ছিল মন, ফিরিয়ে আনার কথা ছিল পারস্পরিক বিশ্বাস। আজকের ভারতে, আজকের বাংলায় সে কাজটি কেউ কি করতে পারে? যিনি হয়ত পারতেন, অন্তত জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন, তাঁর কথা মনে পড়ে যায়। শ্রদ্ধেয় কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ‘নির্বাসন’ কবিতায় লিখেছেন

ঝর্নার পাশেই নদী, নদীর শিয়রে
বাঁশের সাঁকোর অভিমান।
যেই দেখি, মনে হয়
নোয়াখালি, শীর্ণ সেতু, আর সে-নাছোড় ভগবান।

এই ‘নাছোড় ভগবান’-টি নিজেকে দাসানুদাসের চেয়েও নিচে রাখতেন, কিন্তু মানুষের মনকে জোড়ার ক্ষমতা রাখতেন। নোয়াখালি এবং কলকাতায় সাত দশক আগে তিনি তার পরিচয় দিয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় মুসলিম লিগের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশনে’-এর ফলস্বরূপ নোয়াখালিতে ভয়াবহ অত্যাচার শুরু হয়। হিন্দুদের হত্যা, লুণ্ঠন, ঘরবাড়ি জ্বালানো, জোর করে ধর্মান্তর – সবই চলতে থাকে। এরই মধ্যে মহাত্মা গান্ধী এসে উপস্থিত হন। দেশ তখন‌ প্রগাঢ় বেদনার মধ্য দিয়ে দুটি পৃথক রাষ্ট্রকে জন্ম দিতে চলেছে। নোয়াখালির ঘটনা ঘটার ১২ দিনের মধ্যে গান্ধী কলকাতায় এলেন। বাংলার ইংরেজ গভর্নর তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন – বাংলায় শান্তি স্থাপনের জন্য কি গভর্নর কিছু করতে পারেন? গান্ধী বললেন – কিছু না। শান্তি প্রতিষ্ঠা করার কাজ জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকারের।‌ কিন্তু বাংলায় ক্ষমতাসীন মুসলিম লিগের প্রধানমন্ত্রী (তখন পদটিকে এই নামেই ডাকা হত) ‌সুরাবর্দীর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা অবশিষ্ট ছিল না। এই হত্যাকাণ্ডের নায়ক হিসাবে চিহ্নিত এই ‌সুরাবর্দী এবং অন্যান্যদের আপত্তি সত্ত্বেও গান্ধী নোয়াখালি গেলেন। জীবনের দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যে অহিংসার প্রয়োগ তিনি করেছিলেন ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে, জীবনের শেষ প্রান্তে ভ্রাতৃহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হয়েছে তাঁকে।

১৫ই জুন ১৯৪৭। গান্ধী বলছেন – ধৈর্য ধরতে হবে। এই দুঃখী জগতের বেদনা দূর করা কঠিন হলেও, অহিংসা ছাড়া কোনো সোজা এবং শুদ্ধ রাস্তা নেই। যদি তা প্রতিষ্ঠিত না হয় তবে তা ব্যক্তির দুর্বলতা, অহিংসার নয়। একমাত্র উপায় নতুন করে অহিংসার সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস। নির্দিষ্ট কিছু সহযোগীকে নিয়ে গান্ধী নোয়াখালিতে গিয়েছিলেন। সবচেয়ে বিপন্ন অঞ্চলে থেকেছেন এবং দুই সম্প্রদায়ের মধ্যেই ঘুরেছেন অবিরাম। বলেছেন – সব দায় গুন্ডাদের বললে অসত্য বলা হবে। দায় নিজেদের নিতে হবে। প্রায় একই সময়ে বিহারে মুসলমানদের উপর ভয়াবহ আক্রমণ শুরু হয়। গান্ধী তখন প্রশ্ন তোলেন – মুসলিম লিগকে যে সাম্প্রদায়িকতার জন্য আমরা অভিযুক্ত করি, তার জবাব কি পাল্টা সাম্প্রদায়িকতা?

গান্ধীজি ৭ নভেম্বর ১৯৪৬-২ মার্চ ১৯৪৭ পর্যন্ত প্রায় চার মাস নোয়াখালি কাজ করেছিলেন। হাওর-বাঁওড়-নদী-নালা, জমির আল ধরে তাঁকে হাঁটতে হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। অতি সাধারণ তাঁর চলাফেরা, গ্রামের সর্বজনের সঙ্গে দেখা করা – এসবই তাঁকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।‌ বাঁশের সাঁকো পারাপার থেকে শুরু করে দগ্ধ বাড়িতে থাকার দৃষ্টান্ত মানুষকে নাড়া দিয়েছিল।

সাত সপ্তাহে গান্ধী ৪৭টি গ্রাম এবং ১১৬ মাইল হেঁটেছিলেন। মানুষের কাছে গান্ধীর মূল বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। তিনি বলেছেন তিনি রাজনীতির কথা বলতে আসেননি, মুসলিম লিগের প্রভাব কমানো বা কংগ্রেসের প্রভাব বাড়ানো তাঁর উদ্দেশ্য নয়। তিনি ৩০ বছর ধরে মানুষের সঙ্গে তাদের দৈনন্দিন যাপন নিয়ে কথা বলছেন, যেখানকার সমস্যাগুলি ঠিক করা গেলে এই শোচনীয় অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। প্রথমদিকে মুসলমানরা তাঁকে বয়কট করতেন, অর্থাৎ তাঁর সর্বধর্ম প্রার্থনাসভায় আসতেন না। কারণ এখানে তাঁরাই অভিযুক্ত। কিন্তু ধীরে ধীরে যুক্ত হতে শুরু করেন। ১৮ নভেম্বর ১৯৪৬ তারিখে নোয়াখালিতে প্রার্থনাসভায় গান্ধী বলেছিলেন – আমি যা দেখছি তা এই যে সবচেয়ে ভয়ংকর শত্রু হল ভয়।‌ দুপক্ষই তার শিকার। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ভয় করে হয়ত ধর্মের কারণে অথবা অন্য কোনো ক্ষমতার কারণে। ভয়মুক্ত না হলে কিছুতেই শান্তি আসবে না।

ভয় কাটাতে আজও আমরা উপদ্রুত অঞ্চলে সবার আগে সেনা মোতায়েন করার দাবি তুলি। কিন্তু গান্ধী বলেছিলেন ভয়হীনতার অর্থ হল আতঙ্কগ্রস্ত পথে একলা চলো রে। গান্ধী সহকর্মীদের সেই কাজই দিয়েছিলেন। বললেন গ্রামে গ্রামে গিয়ে থাকো এবং যারা পালিয়ে গেছে তাদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করো। তাদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনে প্রাণ দিতে হবে। গান্ধীর নিজের মৃত্যুর আশঙ্কা তো ছিলই। কিন্তু তিনি সরকারকে বলেছিলেন তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কিছু করলেও কাউকে যেন গ্রেফতার না করা হয়। ‌একদিন প্রার্থনাসভা চলাকালীন একজন তাঁর গলা টিপে ধরে, মুখ চোখ নীল হয়ে যায়, তবু তিনি হাসতে থাকেন। পরে সেই ব্যক্তি তাঁর পায়ে পড়ে যায়।‌

দেশভাগ পূর্ববর্তী হিংসার সমীক্ষায় বিচারপতি জি ডি খোসলা বলেছিলেন – গান্ধী উন্মত্ত নোয়াখালিতে যুক্তি ও সুস্থ মানসিকতার আলো নিয়ে আসেন, বিশ্বাস বাড়ে। বিহারে ঠিক বিপরীতমুখী হিংসার মধ্যেও গান্ধী একইভাবে অবিচল। সেখানে তিনি বলেন ‘আমরা কি মানবতা ভুলে আঘাতের বদলে আঘাত দেব? যদি কোনো পথভ্রষ্ট ব্যক্তি একটি মন্দিরকে অপবিত্র করে বা মূর্তি ভাঙে, একজন হিন্দু কি তাহলে মসজিদ অপবিত্র করবে! তাতে কি মন্দির রক্ষার কোনো সাহায্য হবে নাকি হিন্দুর উপকার হবে?’

আজকের তারিখে গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে হিন্দুত্ববাদী শক্তি তাদের উন্মত্ত ভক্তদের দিয়ে প্রত্যেকটি উৎসবে মসজিদের সামনে গিয়ে কুৎসিততম ভাষায় নাচানাচি করায়, প্রত্যেক মসজিদের নিচে মন্দিরের খোঁজ করে এবং প্রাচীন স্মারক ও সৌধগুলোকে ধ্বংস করার উদ্যোগ নিয়ে থাকে। তাতে কোন ধর্মের লাভ – এ প্রশ্ন কে করবে?

নোয়াখালিতে যাওয়ার সময়ে সুরাবর্দী ও অন্যান্যরা তাঁকে বারবার বলছিলেন – তিনি কেন বিহারে মুসলমানদের অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে যান না? স্বাধীনতার প্রাক্কালে কলকাতায় মুসলমানরা আক্রান্ত হলে গান্ধী আবার ছুটে আসেন। এবার সুরাবর্দী গান্ধীকে থাকতে বলেন। তিনি শর্ত দিলেন – সুরাবর্দীকেও তাঁর সঙ্গে থাকতে হবে, তাঁরা সব জায়গায় একসঙ্গে যাবেন। সব ধরনের কথা, অভিযোগ সাহসের সঙ্গে শুনতে হবে। কোনো পুলিস প্রশাসন থাকবে না। তাঁরা থাকবেন আক্রান্ত এলাকা বেলেঘাটার ভাঙাচোরা হায়দারী মঞ্জিলে। সেইসময় হিন্দুরা উদ্বিগ্ন, কারণ সুরাবর্দী তাঁদের কাছে ঘাতক। অন্যদিকে মুসলমানরা গান্ধীকে বিশ্বাসঘাতক ভাবছে।‌ এ সময় সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল গান্ধীকে লিখছেন, আপনি কলকাতায় আটকে গেলেন, তাও আবার এমন জায়গায় যা গুন্ডা বদমাইশে ভর্তি, তার উপর এমন অদ্ভুত সঙ্গী।

হায়দারী মনজিলে ঢোকার দিনেই গান্ধী রুষ্ট একদল রুষ্ট তরুণের সামনে পড়েছিলেন। তারা তাঁকে চায় না, কারণ তিনি ১৯৪৬ সালের প্রত্যক্ষ সংগ্রামের সময়ে আসেননি। গান্ধী জিজ্ঞেস করলেন ১৯৪৭ সালে ১৯৪৬ সালে বদলা নিয়ে কী পাওয়া যাবে?‌ বললেন – বুঝতে হবে, আমি শুধু মুসলমান নয়; হিন্দু, মুসলমান এবং বাকি সবার জন্য এসেছি। আপনাদের হাতেই নিজেকে ছেড়ে দিচ্ছি। আমার জীবনের এখন শেষ পর্ব। আর বেশিদূর যাওয়ার নেই।

কথোপকথনে বরফ গলতে থাকে। ১৪ আগস্ট ভয়ঙ্কর ক্রুদ্ধ জনতার সামনে সুরাবর্দীকে গান্ধী নিয়ে আসেন, তিনি সবার সামনে নিজের দায় স্বীকার করেন। পরদিন দেশের স্বাধীনতা দিবসে এমন এক অসম্ভব সম্ভব হয়েছিল, যার কথা গান্ধী নিজেই লিখেছেন। কী গভীর সখ্যে সেদিন হিন্দু, মুসলমান পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেছিল, ইতিহাস তার সাক্ষী।‌

তারপরেও অনেক পরীক্ষা বাকি ছিল।‌ স্বাধীন হওয়ার অল্পদিন পরে একদিন হায়দারী মঞ্জিল আক্রান্ত হল। চারিদিক থেকে পাথর বৃষ্টি। ‌গোটা শহর জুড়ে আবার দাঙ্গা। গান্ধী অনশনে বসলেন। তিয়াত্তর ঘন্টা অনশনের পর মুসলিম লিগ, হিন্দু মহাসভা এবং অন্যান্য নেতৃত্বের উপস্থিতিতে গোটা কলকাতায় শান্তি ফেরে। এরপরেও গান্ধীকে অহিংসার পরীক্ষা দিতে হবে দিল্লিতে, যেখানে হিন্দু, মুসলমান, শিখ প্রাণঘাতী দ্বন্দ্বে লিপ্ত। আবার অনশন, যা নিয়ে কংগ্রেস বিব্রত। কিন্তু সেখানেও সব ধর্মের মানুষ একত্রিত হয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনে। মহাত্মার এই যাত্রা শেষ হবে তিনটি বুলেটের মাধ্যমে তাঁরই প্রার্থনাসভায়, যারা তাঁর আলো আর সহ্য করতে পারছিল না তাদের দ্বারা।

দিল্লি অনশনের আগে গান্ধী বলেছিলেন – আমরা অপরাধ করেছি। কিন্তু কোনো একজনের অপরাধ নয়; হিন্দু, শিখ, মুসলমান – আমরা সবাই অপরাধী।‌। এই অপরাধীদের পরস্পরের বন্ধু হতে হবে। আমরা ধর্মের নামে অধর্মী হয়ে গিয়েছি। ‌গান্ধী জানতেন অন্য কোনো অসামাজিক তত্ত্বের উপর দায় চাপিয়ে দিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না। অন্যদিকে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার রাজনীতি, চোখের বদলে চোখ নীতি গোটা দুনিয়াকে অন্ধ করে দেয়।‌।

সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে গান্ধীর যুক্তি স্পষ্ট ও নৈতিক।‌ পুলিস বা সেনার দ্বারা কায়েম করা তলোয়ারের শান্তি আসলে আরও বড় সমস্যা তৈরি করে। গান্ধী বলেছেন – শান্তির জন্য পুলিস আসবে, সেও একদিন সাম্প্রদায়িক হবে। স্বাধীনোত্তর ভারতে বহু ভয়ঙ্কর দাঙ্গার ঘটনায় পুলিসকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে, কোথাও বা প্রত্যক্ষ মদত দিতেও দেখা গেছে। আজ মুর্শিদাবাদেও পুলিসি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ উঠছে। অগত্যা সেনাবাহিনী। কিছুদিনের জন্য সব ঠান্ডা। নিরাপদ দূরত্বে কাচের ঘরে বসে পর্যালোচনা চলবে। আমাদের যুক্তিগুলো ঘুরে বেড়াবে সেইসব ভাবনা নিয়ে, যে পুলিস বা সেনায় সব পক্ষের প্রতিনিধিত্ব আছে তো। শেষপর্যন্ত ভরসার জন্য, সুরক্ষার জন্য, ন্যায়ের জন্য ধর্ম, বর্ণভিত্তিক পরিচিতিতেই বাঁধা হবে মানুষকে। এখন সোশাল মিডিয়ার যুগ। নানা বিভ্রান্তিকর খবর ঝোড়ো হাওয়ায় উড়ে বেড়াবে আর ‌রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা নিজেদের ভোটের দিকটা দেখবেন।‌

১৯৮৯ সালে স্বাধীনোত্তর ভারতের অন্যতম সুপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল বিহারের ভাগলপুরে। সেখানে শান্তি, সম্প্রীতি স্থাপনের উদ্যোগে গিয়ে দেখেছি – যুযুধান দুই পক্ষই হাতিয়ার রাখার অধিকার চাইছে। কী মর্মান্তিক অবিশ্বাস, তীব্র বিদ্বেষ তৈরি হচ্ছে নিজেদের বংশপরম্পরায় পাশাপাশি বসবাস করা মানুষের মনে! এখানে উল্লেখ করি, ভাগলপুর দাঙ্গার পর খুব ছোট পরিসরে গান্ধীর পথকেই অবলম্বন করে প্রয়াত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক গৌরকিশোর ঘোষের উদ্যোগে আমরা কয়েকজন দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বারবার গিয়ে বসবাস করায় সম্প্রীতির কাজ খানিকটা হয়েছিল।‌ আজ সাম্প্রদায়িক হিংসা নাগরিক উন্মত্ততা থেকে নয়, সরকারের তত্ত্বাবধানেই তৈরি হচ্ছে। এই বিদ্বেষের রাজনীতিকেই বারবার ভোটের মালা পরানো চলছে।

সাম্প্রদায়িকতা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে সেই সম্প্রদায়ের, যারা তা ছড়ায়। তার মধ্যকার সমস্ত সত্যটুকু ধ্বংস হয়ে যায়, ধর্মের যাবতীয় পবিত্রতা অশুদ্ধ হয়ে যায়। এই উন্মাদনায় মন্দির মসজিদ হয়ত আগেও ভাঙা হয়েছে, কিন্তু মানুষ তাতে গর্ব বোধ করেনি, ঘোর কেটে গেলে লজ্জিত হয়েছে। কিন্তু আজ ধর্মস্থান ধ্বংস করা সাধারণের গর্ব থেকে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় পরিণত হয়েছে।

আরো পড়ুন গান্ধীর রাম পতিতপাবন, সংঘের রাম আসলে নাথুরাম

মুর্শিদাবাদের ঘটনার প্রতিক্রিয়া ভাবাচ্ছে, ঘাত-প্রতিঘাতের চক্রের বাইরে মানবিকতার কোনো পরিসর থাকে কি? তা যদি অসম্ভব হয়, তাহলে সেনাই থাকবে। ‘বাঙালি হিন্দু বাঁচাও’ বলে মহামিছিল চলবে। আমরা ভুলে যাব একই বৃন্তে দুটি কুসুমের কথা, বাঙালি বাঁচাও না মানুষ বাঁচাও – সেকথা উঠবে না। আবার এ দেশেরই কোনো প্রান্তে বাংলা বলার জন্য মার খেতে হবে। দেশের শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বিভ্রান্তিকর ভুয়ো পোস্ট করবেন। একজন হুমকি দেবেন বাইরে থেকে লোক এনে মুর্শিদাবাদ খালি করার। আরেক দল বহিরাগতদের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে বসে থাকবে।

কী চাওয়ার আছে?

‘বিনা প্রেমসে নহি মিলে নন্দলালা।’ অপরকে আপন না করলে, ভালবাসতে না পারলে ভালবাসা পাওয়া যায় না। এ তো অত্যন্ত মামুলি কথা, তবু আমরা মানি না। সাম্প্রদায়িকতার ভয়াবহ পরিস্থিতিতে গান্ধীর জীবনের সেই আশ্চর্য ঘটনাটি মনে করি, এ ঘটনা উল্লেখিত আছে একভাবে, রিচার্ড অ্যাটেনবরো গান্ধী (১৯৮২) ছবিতে দেখিয়েছিলেন তুলনায় নাটকীয়ভাবে। অনশনরত গান্ধীর কাছে আসেন এক হতদরিদ্র হিন্দু। তিনি গান্ধীর গায়ে উপর রুটি ছুড়ে দিয়ে খেতে বলেন। তারপর বলেন – আমি মেরেছি মুসলমানকে। কারণ আমার ৮-৯ বছরের ছেলেকে ওরা মেরে ফেলেছে। গান্ধী তাঁকে বলেন – খুঁজে বার করো ওই বয়সী একটি অনাথ ছেলেকে, কিন্তু সে যেন মুসলমান হয়। তারপর তাকে বড় করো, প্রকৃত মুসলমান তৈরি করো।

গান্ধী সবার জন্য ছিলেন। নিজেকে তিনি হিন্দু মনে করতেন বলেই তিনি একইসঙ্গে মুসলমান, খ্রিস্টান – সবার মত হতে পারতেন। স্বাধীনতার পর একটা গোটা বছরও পাননি তিনি, কিন্তু প্রতিনিয়ত দেশজুড়ে বিভেদের ক্ষতস্থানে মলম লাগিয়েছেন। পঞ্চাশ হাজার সেনা যা পারেনি, গান্ধী তা পেরেছেন বারবার। সত্য ও অহিংসার পাশাপাশি অসামান্য প্রেম দিয়ে তিনি জুড়তে চেয়েছিলেন মানুষকে। মৃত্যু দিয়েই সিলমোহর দিয়েছিলেন নিজের বিশ্বাসকে।

সুধীর চন্দ্র তাঁর গান্ধী: অ্যান ইমপসিবল পসিবিলিটি বইতে বলেছেন – একদিন আমরা মেনেছিলাম, আমরা করেছিলাম, তাই গান্ধী সম্ভব হয়েছিলেন। আজ আমরা মানছি না বলেই তিনি অসম্ভব হয়ে গেলেন। তাও এমন এক সময়ে, যখন গোটা দুনিয়ায় আগের চেয়ে তাঁকে অনেক বেশি প্রয়োজন।‌

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

1 মন্তব্য

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.