শেষাংশ

ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতিতে সংখ্যালঘু ভোটে এবারেও মোটের উপর তৃণমূলের একাধিপত্য বজায় রয়েছে। আবার এই ভোটের পরেও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিপদ কিন্তু কমেনি। সংখ্যাগুরু ভোটব্যাঙ্ক তাদের পক্ষে সংহত হচ্ছে। বিধানসভা ভোটে মুসলমানগরিষ্ঠ মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলার শহরকেন্দ্রিক আসনগুলিতে বিজেপি সফল হয়েছিল। ইংলিশবাজার, বহরমপুর ও মুর্শিদাবাদ বিধানসভায় বিজেপি জিতেছিল। এবারে বহরমপুর লোকসভায় বিজেপি ১৫.৮৬% ভোট বাড়িয়ে পেয়েছে ২৬.৮৬%। তাই ভোটের হার কমলেও তৃণমূল মর্যাদাপূর্ণ এই আসনটি কংগ্রেসের থেকে ছিনিয়ে নিতে পেরেছে। জঙ্গীপুরে বিজেপি ২৪.৮৮% ও মুর্শিদাবাদে ১৮.৯৪% ভোট পেয়েছে। দক্ষিণ মালদায় পেয়েছে ৩২.৪২% ভোট। বিজেপিকে হারাতে এই কেন্দ্রের মানুষ কংগ্রেসকে বেছে নিলেও, বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক প্রায় অটুট।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের মতই এবারেও রাজ্যের মানুষ বিজেপিকে হারাতে চেয়েছেন। সেবার ছিল বিজেপি রাজ্যের ক্ষমতায় চলে আসার আশঙ্কা। এবার কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারকে হারানোর তাগিদ। কেবল ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাই নন, সম্প্রদায় নির্বিশেষে উদার মনের মানুষ বিজেপিকে হারাতে এককাট্টা হয়েছিলেন। মোদী-শাহ জুটি যত ঘৃণাভাষণ চালিয়েছেন, তত রাজ্যের মানুষের মধ্যে এই ঐকমত্য গড়ে উঠেছে। তাই এবার মোদী রাজ্যের যে কেন্দ্রগুলিতে প্রচারে এসেছিলেন তার সিংহভাগেই দল হেরেছে। যে দুজন প্রার্থীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন, সেই দুজনই হেরেছেন। দলীয় রাজনীতির বাইরে পরিবেশ আন্দোলন, এনআরসিবিরোধী আন্দোলন, গ্রামসভা, বনাধিকার, শিক্ষা, লিঙ্গসাম্য সহ বিভিন্ন অধিকার আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংগঠকরা তাঁদের মত করে মোদী সরকারের বিপদ নিয়ে প্রচার করেছেন। এমনকি ভাষা আন্দোলনের সংগঠকরাও হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সভা করেছেন। এইসব সংগঠনগুলি খুব ছোট পরিধির মধ্যে কাজ করলেও, সবাইকে একত্রিত করলে পরিধিটা কম নয়। অনেকেই প্রান্তিক মানুষের মধ্যে কাজ করেন। সারা দেশেই এবারে দলীয় পরিসরের বাইরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক আন্দোলন ভোটে বড় নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করেছে। এই রাজ্যও তার ব্যতিক্রম নয়। বলা যেতে পারে আরএসএসের সামাজিক কাজের পালটা ভাষ্য নির্মাণে তাঁরা অনেকটা সফল হয়েছেন।

বিজেপিকে হারাতে বেশিরভাগ মানুষের কাছেই তৃণমূল গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। বিধানসভার মতই এবারেও বিজেপির হুঙ্কার যত বেড়েছে তত তৃণমূলের উপকার হয়েছে। রাজ্য সরকারের বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পও তাদের ভোট বাড়াতে সাহায্য করেছে। মহিলাদের মধ্যে তৃণমূলের সমর্থন বেড়েছে। ভোটের আগে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অর্থের পরিমাণ বাড়িয়ে তৃণমূল সেই সমর্থন আরও দৃঢ় করেছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে তফসিলি জাতি, উপজাতির মহিলাদের বেশি অর্থ দেওয়া, তাঁদের পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য নানা সামাজিক প্রকল্প, অনুন্নত অঞ্চলে বিশেষ রেশন দেওয়ায় তৃণমূল প্রান্তিক মানুষের সমর্থন পেয়েছে। একশো দিনের কাজ, আবাস যোজনার বরাদ্দ কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ায় লাভ হয়েছে তৃণমূলের। তার মানে এই নয়, যে মানুষ মনে করেন তৃণমূল এসবে দুর্নীতি করেনি বা মানুষ দুর্নীতিকে সমর্থন করেন। আবাস যোজনা, মিড ডে মিল নিয়ে ঘনঘন কেন্দ্রীয় দলের আসা, একশো দিনের কাজের দুর্নীতি নিয়ে বিজেপি নেতাদের হুঙ্কারে অনেকে আশা করেছিলেন দুর্নীতিগ্রস্তদের শাস্তি হবে। কিন্তু দেখা গেল শাস্তি হল না, কাজই বন্ধ হয়ে গেল। দুর্নীতি হলেও একশো দিনের কাজ চালু থাকলে কিছু আয় হত। আবাস যোজনায় বাড়ির আশা ছিল। কাজ একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বকেয়া মজুরি পাওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হল। ঠিক এই সুযোগটাই নিল তৃণমূল। কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগ তুলে রাস্তায় নামল। রাজ্যের অর্থ থেকেই আবাস যোজনার কাজ এবং ৫০ দিনের কাজের প্রকল্প ঘোষণা করল। ভোটের আগে বকেয়া মজুরি মেটাল। দুর্নীতিও করল, আবার রাজনৈতিক ফায়দাও তুলল।

 

একশো দিনের কাজের দুর্নীতি নিয়ে বিজেপি নেতাদের হুঙ্কারে অনেকে আশা করেছিলেন দুর্নীতিগ্রস্তদের শাস্তি হবে।
কিন্তু দেখা গেল শাস্তি হল না, কাজই বন্ধ হয়ে গেল। দুর্নীতি
হলেও একশো দিনের কাজ চালু থাকলে কিছু আয় হত। আবাস যোজনায় বাড়ির আশা ছিল। কাজ একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বকেয়া মজুরি পাওয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হল।

 

ভোটের আগে কেন্দ্র সিএএ কার্যকরী করাতেও লাভ হয়েছে তৃণমূলের। বিজেপি রানাঘাট ও বনগাঁ (যদিও দুটি কেন্দ্রেই ভোটের হার কমেছে) ছাড়া বাড়তি কোনো আসন জেতেনি। শর্তাধীন নাগরিকত্বের ফলে আগামীদিনে বিজেপির মতুয়া ভোটব্যাঙ্কেও ধ্বস নামার সম্ভাবনা। সিএএ ইস্যু আবার সামনে চলে আসায় এই সর্বনাশা আইনের বিরোধীদের ভোটও তৃণমূল পেল। শেষ দুই পর্বের ভোটের আগে ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে আদালতের রায়েও সংখ্যালঘু ভোট বেড়েছে তৃণমূলের। বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদ এবং রাজ্যগুলিকে দুর্বল করার রাজনীতি তৃণমূলকেই সুবিধা করে দিয়েছে। বিজেপির বিপদ সম্পর্কে মানুষ যত সজাগ হয়েছেন, তত তৃণমূলের লাভ হয়েছে।

সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠতে পারে, বিজেপিকে হারাতে মানুষ তৃণমূলকে বেছে নিলেন কেন? বাম-কংগ্রেস জোট গ্রহণযোগ্য হল না কেন? তৃণমূলের জেতার সম্ভাবনা বেশি বলে অনেকেই বাম-কংগ্রেসের উপর ভরসা রাখতে পারেননি। গত বিধানসভা নির্বাচনেও তাই হয়েছিল। এবারে জোটের জটিলতায় প্রার্থী ঘোষণা করতেই অনেক দেরি হয়েছে। তারপরেও যৌথ সভা, সমাবেশ অনেক হলেও, নিচুতলায় মানসিক ঐক্য গড়ে ওঠেনি। বহু লড়াই, আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বামফ্রন্টের গুরুত্ব কমিয়ে, পাটিগণিতের হিসাবে নতুন জোটসঙ্গীকে নিয়ে মাতলে মানুষের কাছে তো বটেই, কর্মীদের কাছেও সঠিক বার্তা যায় না।

মাত্র চারটি আসনে বাম প্রার্থীদের এবারের প্রাপ্ত ভোটের হার, গতবারের বাম-কংগ্রেসের মিলিত হারের থেকে বেশি হয়েছে। তারমধ্যে তিনটিই কলকাতা সংলগ্ন এলাকায়। গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) নামে এক নতুন দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। লোকের মনে হয়েছিল বামেদের তত্ত্বাবধানেই এই দলের জন্ম। এবারে তাদের সঙ্গে বামেদের জোট শেষ পর্যন্ত হয়নি, কিন্তু দেখা যাচ্ছে এই দলটি চারটি লোকসভা কেন্দ্রে বামেদের থেকে বেশি ভোট পেয়েছে। বামেদের ভোটে তারা ভাগ বসাচ্ছে। মথুরাপুরে তারা ৮৭,০০০-এর বেশি ভোট পেয়েছে আর বামেদের ভোট ৩১,০০০ এর বেশি কমে হয়েছে ৬১,১০০। গতবার কংগ্রেসের পাওয়া ভোট ধরলে বাম প্রার্থীর ভোট আরও কমেছে। বসিরহাটে সন্দেশখালির ঘটনার প্রেক্ষিতে আশা করা গিয়েছিল বাম ভোট বাড়বে। যে কারণে সিপিআইয়ের ঐতিহ্যশালী ওই আসনটিতে এবার সিপিএমের প্রার্থী দেওয়া হয়েছিল। গতবার ওখানে কংগ্রেস প্রার্থী তৃতীয় আর বাম প্রার্থী চতুর্থ হয়েছিলেন। দুজন মিলে পেয়েছিলেন ১,৭২,০০০ ভোট। এবার বাম প্রার্থী পেয়েছেন ৭৮,০০০-এরও কম ভোট। আইএসএফ পেয়েছে ১,২৩,৫০০ ভোট। বারাসাতে গতবার বাম-কংগ্রেসের মিলিত ভোট ছিল ১,৬১,০০০; বামের একার ১,২৪,০০০। এবার সেখানে বাম প্রার্থী পেয়েছেন ১০,০০০ ভোট। অর্থাৎ আগেরবারের সব বাম ভোটও পাননি। এই আসনে আইএসএফ পেয়েছে ১,২১,০০০ ভোট। জয়নগরে বাম, কংগ্রেসের মিলিত ভোট গতবার ছিল প্রায় ৮৭,০০০। বাম প্রার্থীর একার ছিল প্রায় ৬৮,০০০। এবার বাম প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট কমে হয়েছে ৪০,০০০। আইএসএফ পেয়েছে ৬৫,০০০ ভোট। যাদবপুর লোকসভার অন্তর্গত বিধানসভা কেন্দ্রগুলির মধ্যে একমাত্র ভাঙড়ে গত বিধানসভায় আইএসএফ জিতেছিল, ভোট পেয়েছিল ১,০৯,০০০। সদ্যগঠিত এই দলের কোনো ভোট ব্যাঙ্ক গড়ে ওঠে নি। বাম ভোটেই তারা জিতেছিল। এবারের লোকসভা ভোটে সেই ভাঙড়ে আইএসএফ পেয়েছে ৭৫,০০০ ভোট আর বামেরা মাত্র ১০,০০০।

প্রান্তিক মানুষের বামেদের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার বড় কারণ হল শ্রেণি রাজনীতি রাজ্যের বামেদের কাছে গৌণ হয়ে যাওয়া। মধ্যবিত্ত দৃষ্টিভঙ্গিতে সবকিছু বিচার করার ফলে দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের কথা যেমন বামেদের কর্মসূচিতে কম উঠে আসছে, তেমন মানসিক দূরত্বও তৈরি হচ্ছে। সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা নিয়ে যারা সরব, তারাই যদি নানা সামাজিক ভাতাকে ভিক্ষা বলে ব্যঙ্গ করে, তাহলে গরিব মানুষ তো দূরেই সরে যাবেন। তৃণমূল এটা ভাল বোঝে বলেই, মহার্ঘ ভাতা না দিয়ে গরিব মানুষের ভাতা বাড়ায়।

অধিকার কেড়ে নিয়ে গরিব মানুষকে অনুদাননির্ভর করা আজ পুঁজিবাদী অর্থনীতির অন্যতম অঙ্গ। এতে গরিবকে যেমন শাসকের অনুগত করে রাখা যায়, তেমন কিছু অর্থ লোকের হাতে এলে বাজারে চাহিদাও বাড়ে। অনুদাননির্ভর এই রাজনীতির বড় লক্ষ্য হলেন মহিলারা। কেবল এই রাজ্য বা দেশে নয়, সারা বিশ্বেই এই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। সুতরাং লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, স্বাস্থ্যসাথীর মত প্রকল্প তৃণমূলের মস্তিস্কপ্রসূত নয়। স্বাস্থ্যের বেসরকারিকরণের পাশাপাশি স্বাস্থ্য বীমা এক পুঁজিবাদী প্রকল্প। পুঁজিবাদ মানবিকতার দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, এসব করছে নিজে বাঁচার তাগিদে। কিন্তু এগুলিকে ব্যঙ্গ না করে বামেদের কাজ অধিকারের কথাগুলিকে আরও বেশি বেশি করে তুলে ধরা। মহিলাদের হাতে নগদ অর্থ, তাঁদের নামে সরকারি স্বাস্থ্য বিমা তাঁদের কাছে সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। মজুরিতে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের বিরোধিতা করে সম কাজে সম বেতনের দাবি, মহিলাদের বিনা মজুরিতে শ্রমের অবসানের দাবি না তুলে সামাজিক প্রকল্পকে ভিক্ষা বলে ব্যঙ্গ করলে গরিব মানুষের থেকেই দূরে সরে যেতে হয়। অধিকার আদায়ের আন্দোলনই বামেদের জনভিত্তি গড়ে তুলেছিল। শ্রেণি রাজনীতির সেই পথ থেকে বামেরা অনেকটাই সরে গেছে।

 

মহিলাদের হাতে নগদ অর্থ, তাঁদের নামে সরকারি স্বাস্থ্য বিমা তাঁদের কাছে সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। মজুরিতে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের বিরোধিতা করে সম কাজে সম বেতনের দাবি, মহিলাদের বিনা মজুরিতে শ্রমের অবসানের দাবি না তুলে সামাজিক প্রকল্পকে ভিক্ষা বলে ব্যঙ্গ করলে গরিব মানুষের থেকেই দূরে সরে যেতে হয়।

 

পরাজয়ের গ্লানিতে রেশনকে কেউ কেউ ভিক্ষা বলে বিদ্রূপ করছেন। ভুলে যাচ্ছেন যে সকলের জন্য রেশনের দাবি বামেদের দাবি। বামেদের দাবিতেই দেশে ইউপিএ সরকারের আমলে খাদ্য নিরাপত্তা আইন এসেছিল। কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার রেশন দিতে বাধ্য। বরং যা দিচ্ছে তা পর্যাপ্ত নয়। মানুষের খাদ্যের অধিকারের জন্য রেশন ব্যবস্থাকে প্রসারিত করার বদলে যদি রেশন নিয়েই বিদ্রূপ করা হয়, তাহলে সেটা আদতে চরম বামবিদ্বেষী রাজনীতি। বাম নেতাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অত্যধিক প্রচার, ভাল ডিগ্রি আছে বলেই তিনি যোগ্য – এই দাবি দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত মানুষের থেকে বামেদের দূরে সরিয়ে দেয়। অর্থাভাবে যিনি বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেননি। তাঁর কার কটা ডিগ্রি আছে তাতে কিছু যায় আসে না। সরকারিভাবে অবশ্য কোনো বাম দল থেকে এইসব ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করা হয় না। বরং নেতৃত্ব এসবের বিরোধিতায় বিবৃতিও দেন। কিন্তু বামেদের হয়ে যাঁরা প্রচার করছেন, নিষ্ঠার সঙ্গে কোনো না কোনো বাম দলের কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন, তাঁদের চেতনার মান এমন হলে, নেতৃত্বের দায় থেকেই যায়।

বামেদের নেওয়া কর্মসূচিতেও এসবের প্রতিফলন ঘটছে। এবারের নির্বাচনে সারা দেশে কৃষক আন্দোলন বড় ইস্যু ছিল। অনেকগুলি আসনেই এই আন্দোলন বড় নির্ণায়কের ভূমিকা পালন করেছে। অথচ সেই আন্দোলনের রেশ এই রাজ্যে সেরকমভাবে পড়ল না কেন? যে রাজ্যে বেশিরভাগ ফসলেরই সহায়ক মূল্যে বিক্রির সরকারি ব্যবস্থা নেই, ধান কেনাকে কেন্দ্র করে চলে অনিয়ম, অভাবী বিক্রিই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়, সে রাজ্যে আন্দোলন আরও জোরদার হওয়ার কথা ছিল। কৃষিতে সংকট গ্রামীণ অর্থনীতি বদলে দিচ্ছে। কৃষিকাজ ছেড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বদলে যাচ্ছে ভূমি সম্পর্ক। কৃষি সংকটের সুযোগে বদলাচ্ছে জমির চরিত্র, গড়ে উঠছে জমি মাফিয়াদের নিয়ে এক অর্থনীতি। মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্তভাবে কিছু মিছিল, ডেপুটেশন আর শহরে জমায়েত ছাড়া ধারাবাহিক কৃষক আন্দোলন নেই। গ্রাম ও শহরে ক্রমশ বেড়ে চলা অসংগঠিত শ্রমিকদের সমস্যা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে আজও অনেকখানি গুরুত্বহীন। শস্তা শ্রমের যোগানদার বিপুল শ্রমবাহিনীকে সংগঠিত করা, তাঁদের জন্যে কথা বলার লোকের বড় অভাব। বামেদের সভা, মিছিল হচ্ছে। বহু মানুষ তাতে যোগও দিচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযন্ত্রণা নিয়ে আন্দোলনের উদ্যোগে রয়ে যাচ্ছে ঘাটতি।

 

অধিকার বা পরিবেশ আন্দোলন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন
সংগঠনের সঙ্গেও বামেদের ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠছে না। আসলে
পুঁজিবাদী উন্নয়নের পথটি নিয়ে বামেদের একাংশের মোহ আছে।
সেই মোহ এখনো তারা কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

 

একশো দিনের কাজে বা আবাস যোজনার অর্থ কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার বিরুদ্ধেও ধারাবাহিক কোনো কর্মসূচি নেওয়া হয়নি। সে কি তৃণমূলকে অসুবিধায় ফেলা যাবে – এই ভাবনা থেকে? অথচ একশো দিনের কাজের আইনি অধিকার বা গ্রাম সংসদের মাধ্যমে আবাস যোজনার তালিকা তৈরিতে মানুষের অংশ নেওয়ার সুযোগ নিয়ে বামেদেরই সরব হওয়ার কথা ছিল। একশো দিনের কাজের আইন বামেদেরই দাবির ফসল। গ্রাম সংসদ, গ্রামসভায় মানুষের অধিকার বাম আমলের পঞ্চায়েত আইনেই দেওয়া হয়েছে। সেই আইনি অধিকার নিয়ে লড়াই হলে আজ কেন্দ্রীয় বঞ্চনার অভিযোগ তুলে তৃণমূল জনসমর্থন আদায় করতে পারত না। বনাধিকার আইন, অরণ্য সংরক্ষণ আইন লঘু করে দেওয়া, একের পর এক আইন বা নীতির মাধ্যমে রাজ্যের ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে রাজ্যের বামেরা খুব একটা সরব হন না। শহরে কিছু ঘরোয়া সভা, লেখালিখির মধ্যেই মূলত এইসব সীমাবদ্ধ থাকে। এই রাজ্যে তৃণমূল সরকার আছে বলে কি আলাদা কর্মসূচি? অথচ কেন্দ্রের পরিবেশ নীতির বড় শিকার শ্রমজীবী মানুষ। তাঁদের কাছে গিয়ে এইসব বিষয়ে প্রচার করলে তৃণমূলের আসল রূপও মানুষের কাছে তুলে ধরা যেত। কারণ তৃণমূল সরকারও আইন না মেনে জঙ্গল থেকে বনবাসীদের উচ্ছেদ করছে, গ্রামসভার গুরুত্ব কমাচ্ছে। তৃণমূলকে অসুবিধায় ফেলার জন্য কেন্দ্রীয় বঞ্চনা, নীতির প্রতিবাদ না করলে আসলে তৃণমূলেরই সুবিধা হয়। বিজেপিবিরোধী পরিসরটা তাদের সম্পূর্ণ আয়ত্তে চলে আসে।

এ রাজ্যে ঠিক সেটাই হচ্ছে। যে কারণে অধিকার বা পরিবেশ আন্দোলন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গেও বামেদের ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠছে না। আসলে পুঁজিবাদী উন্নয়নের পথটি নিয়ে বামেদের একাংশের মোহ আছে। সেই মোহ এখনো তারা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বামপন্থীদের শক্তিক্ষয়ে মানুষের লড়াই, আন্দোলনই দুর্বল হয়। রাজ্যে এখন দুই দক্ষিণপন্থী শক্তির প্রতিযোগিতা চলছে। তারা দুজনেই নয়া উদারনীতির ‘উন্নয়ন’ নামক সর্বনাশা স্বপ্নের শরিক। একজনের কাছে যা বিকশিত ভারত, আরেকজনের কাছে সেটাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা উন্নয়ন। আক্রমণ যত বাড়ে, তত প্রতিরোধের ক্ষেত্রও প্রস্তুত হয়। বাম আন্দোলনেও শূন্যতা থাকে না। প্রতিরোধই নতুন দিশা দেখায়। কিন্তু সেই বাম আন্দোলনে আজকের এই বাম নেতৃত্বের স্থান কী হবে তা ভবিষ্যতই বলবে।

মতামত ব্যক্তিগত

প্রথম পর্ব

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.