ডলি হালদার

আমরা, কল্যাণীর গৃহ পরিচারিকারা, অনেকদিনের চেষ্টায় নিজেদের একটা সংগঠন গড়ে তুলেছি। গত ২৫ নভেম্বর তার প্রথম সম্মেলন হয়ে গেল কল্যাণী শহরে।

এই সংগঠন কীভাবে গড়ে উঠল সেকথা বলি। আমি একসময়ে তিনটে বাড়িতে কাজ করতাম। এই কাজ করতে গিয়ে আমরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হই। যেমন বাথরুম ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না, বাসি খাবার দেওয়া হয়, খাবার দেয়ার পাত্রটাও ভাঙা, পুজোর আগে আগে বাড়ির লোকেরা এমন খারাপ ব্যবহার করে যাতে কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হতে হয়। ছেড়ে দিলে আর পুজোর বোনাস দেয়ার চাপ থাকে না। নতুন কেউ ঢুকলেও একমাস কাজ করেই বোনাস পাবে না।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

যখন বুঝতে পারলাম এটা একটা বড় সমস্যা, তখন আরও যারা যারা বাড়ি বাড়ি কাজ করে, তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করি। আমি থাকি দক্ষিণ চাঁদামারীতে, তার কিছুদূরেই রবীন্দ্র কলোনি। এসব পাশাপাশি অঞ্চলের পরিচারিকাদের সঙ্গে একটু একটু করে আলোচনা বাড়তে থাকে। কল্যাণী সেন্ট্রাল পার্কের ওখানে একটা বসার জায়গা আছে, কাজের ফাঁকে সেখানে আমরা বসে আলোচনা করতাম। এভাবে প্রায় ৩০ জন মত জুটে যায়। সবাই একমত হয় যে সত্যিই কিছু একটা করা উচিত। এটা মোটামুটি দেড় বছর আগের ঘটনা। আর জি করের ঘটনার আগেই আমাদের এই আলোচনাগুলো শুরু হয়েছিল।

আলোচনা করে দেখলাম, একেক বাড়িতে একেকরকমের সমস্যা। বুঝলাম, আমাদের মধ্যে একতা থাকা খুবই প্রয়োজন। একজন বললে ‘কোনো বাবুই শুনবে না, কিন্তু যদি দশজনে একসঙ্গে মুখ খুলি, তাহলে হয়ত শুনতে বাধ্য হবে। যদি জোট বাঁধতে পারি, তবেই কিছু হতে পারে।’ আমরা দেখেছি, আমাদের বাড়ির পাশে একজন আছেন, তিনি টোটো চালান। যেখান থেকেই লোক তুলুন, একই ভাড়া। অন্যান্য টোটোচালকরাও একই ভাড়া নেন। কেউ কিছু বলে না। অথচ আমাদের বেলায় তেমনটা হয় না। আমাকে হয়তো দিচ্ছে ১,৫০০ টাকা, আমাকে ছাড়িয়ে দিয়ে কাউকে ১,২০০ টাকায় নিয়ে নিচ্ছে। এগুলো দেখেই আমাদের মনে হয়েছে, নিজেদের ইউনিয়ন থাকা খুবই জরুরি।

তা ইউনিয়ন করার সিদ্ধান্ত তো নিলাম, পথেও বেরোলাম। কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়াল টাকা। আমরা তো খেটে খাই, রাস্তায় নেমে যে প্রচার করব, সবাইকে জানাব, তার জন্য তো অনেক টাকার দরকার। সে টাকা আমরা কোথায় পাব? সরাসরি কোনো পার্টির কাছে আমরা যাইনি। তবে শুনেছিলাম, আশেপাশে এমন অনেকে আছেন, যাঁরা খেটে খাওয়া মানুষজনকে নিয়ে কাজ করেন, তাদের বিপদে আপদে পাশে থাকেন, সমস্যায় পড়লে সমাধান করেন। আমরা তখন তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। এঁরা সারাজীবন খেটে খাওয়া মানুষের জন্য রাস্তায় নেমেছেন, আর জি করের মিছিলেও হেঁটেছেন। ওঁদের সঙ্গে দেখা করলে ওঁরা আশ্বাস দিয়ে বলেন ‘হ্যাঁ, এটা তো হওয়া উচিত। তোমরা করো, আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি।’

এরপর ওঁদেরই কিছু বন্ধুবান্ধব, যাঁরা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসেন, তাঁদের কেউ ২০০ টাকা দেন, কেউ বা ৫০০। কিছু টাকা জমে, তা দিয়েই আমাদের টুকিটাকি আলোচনা শুরু হয়, প্রচার শুরু হয়। তার কয়েকদিন পরেই (৪ জুলাই ২০২৪) আমরা কল্যাণীতে নেতাজী সুভাষ হল (নেতাজী সুভাষ রিজিওনাল ইনস্টিটিউট ফর কো-অপারেটিভ ম্যানেজমেন্ট) ভাড়া করে একটা বড় মিটিং করি। টোটোতে ঘুরে আমরা কল্যাণীর সকলকে সেই মিটিংয়ের ব্যাপারে জানাই। সেই মিটিংয়েই কল্যাণী পরিচারিকা কল্যাণ সমিতি গঠন করা হয়।

আর জি কর আন্দোলনের সময়ে আমাদের কাজ একটু থমকে ছিল। একটা সময়ের পর আমরা আলোচনা আরও বাড়াতে থাকি। কিছুদিন পরে (অক্টোবর ২০২৪) আমরা কলকাতায় যাই, আমাদের সমিতির সরকারি রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করতে। ১৮ নভেম্বর ২০২৪, আমরা মেয়েরা সকলে মিলে কল্যাণীতে যে ডিসি বিল্ডিং আছে, সেখানকার লেবার দফতরে গিয়ে ডেপুটেশন জমা দিই। ডেপুটেশনে পাঁচটা দাবি ছিল – ১) আমাদের শ্রমিক হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে, ২) ঘন্টা পিছু ন্যূনতম মজুরি দিতে হবে, ৩) সপ্তাহে একদিন ছুটি দিতে হবে, ৪) কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেয়ার একমাস আগে জানাতে হবে, ৫) কাজ থেকে হঠাৎ ছাড়িয়ে দিলে একমাসের মাইনে বোনাস দিতে হবে।

ওখানে যিনি বড় সরকারি অফিসার (ডেপুটি লেবার কমিশনার) ছিলেন, তিনি দাবিগুলো দেখে বলেন ‘এটা সত্যিই জরুরি কাজ। কিন্তু শুধু কল্যাণীতে করলে সরকার শুনবে না, সব জায়গার জন্যই দাবিগুলো তুলতে হবে।’

এবছর মে দিবসে আমরা একটা মিছিল করেছিলাম। মাসে চারদিন ছুটির দাবি নিয়ে পরিচারিকাদের মধ্যে প্রচার চলেছিল।

দুর্গাপুজোর আগে কাজ ছাড়িয়ে দেয়া এখানে প্রায়ই ঘটে। গত পুজোর আগেও আমাদের পরিচিত একজনের সঙ্গে এ ঘটনা ঘটেছে। পুজোর একমাস আগে, মাসের ৫ তারিখে হঠাৎ করে তাকে বলা হয় ‘তোকে আর আসতে হবে না।’ আমি এবং আরও অনেকে মিলে বলি, এটা ঠিক কাজ নয়, কিছু একটা করা উচিত। সেইমত আমরা বেশ কয়েকজন পরিচারিকা মিলে সেই বাড়িতে যাই। সকলে মিলে তাদের বলি, পুজোর একমাস আগে এভাবে ছাড়িয়ে দিলে তো হবে না, মেয়েটা দেড় বছর কাজ করেছে। বোনাসটা তার প্রাপ্য। এখন প্রত্যেকটা সংসারে কিছু না কিছু লোন চলে, হঠাৎ করে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিলে লোনটা কী করে শোধ হবে? তাই আমাদের দাবির মধ্যে একমাসের মাইনে বোনাস দেয়ার কথা রয়েছে। আমাদের সমবেত দাবিতে কাজ হয়, সেই বাড়ি থেকে মেয়েটার জন্যে একমাসের মাইনে আর একমাসের বোনাস আমরা আদায় করতে পেরেছিলাম।

নথি আর অন্যান্য জটিলতায় আমাদের রেজিস্ট্রেশনের কাজটা আটকে থাকার পর অবশেষে দেড়-দুমাস আগে (সেপ্টেম্বর ২০২৫) আমাদের সমিতি সরকারি রেজিস্ট্রেশন পেয়েছে।

রেজিস্ট্রেশন নম্বর পাওয়ার পর মনে হতে থাকে – এবার কী করা যায়। ভাবতে ভাবতে অবশেষে ২৫ নভেম্বর আমাদের সমিতির প্রথম সম্মেলনের দিন ঠিক হয়। তার আগের দশদিন আমরা কল্যাণী জুড়ে ক্যাম্পেনিং করেছি। টোটোয় ঘুরে সকলকে জানিয়েছি, পোস্টার মেরেছি। আমাদের বহু বন্ধু টাকা দিয়ে সাহায্য করেছেন। কল্যাণী পৌরসভার ঋত্বিক সদন ভাড়া করে আমাদের অনুষ্ঠান বসেছিল। সম্মেলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, অনুষ্ঠানে আসা প্রত্যেক পরিচারিকাকে আমাদের রেজিস্ট্রেশন নম্বর সহ পরিচয়পত্র দেয়া। বাইরে থেকে অনেক অতিথিও এসেছিলেন, মঞ্চে অনেকে বক্তব্য রাখেন। নানা স্লোগান ওঠে। ওদিকে পরিচয়পত্র পেতে মাঝের চর, মুরাতিপুর, বারোহাত, কাঁঠালতলা, সুকান্ত পল্লী, বিদ্যাসাগর কলোনি, রবীন্দ্র কলোনি, কল্যাণীর আশেপাশের এমন নানা জায়গা থেকে প্রায় ৫৫০-৬০০ পরিচারিকা উপস্থিত হন। এতজন আসবেন, আমরা আশাও করিনি। তাই সম্মেলনের উদ্দেশ্য সফল হয়েছে – একথা বলাই যায়।

আরো পড়ুন বিড়ি শ্রমিক: যার কাজ আছে তার ভাত নেই

কিন্তু অন্যদিকে সমস্যা তৈরি হয়। আমাদের হল ভাড়ার সময়সীমা ছিল সকাল সাড়ে নটা থেকে দুপুর দুটো। ওই সময়ের মধ্যে সব পরিচয়পত্র দেয়া হয়ে ওঠেনি। কাজটা যাতে শেষ হয়, তার জন্য কাছাকাছি একটা মাঠে আমরা সরে যাই। কিন্তু শাসক দলের কিছু নেতা আমাদের বাধা দেয়, ওদের ফোন পেয়ে পুলিশও চলে আসে। আমাদের যিনি কোষাধ্যক্ষ, সেই দাদাকে পুলিশ থানায় ধরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। আমি তখন এগিয়ে গিয়ে বলি ‘ওঁর গায়ে একদম হাত দেবেন না। আমি সভানেত্রী, তুলে নিয়ে যেতে হয়, আমাকে নিয়ে যান।’ তখন বাকি পরিচারিকারাও একসঙ্গে বলে ওঠে ‘আমাকে নিন, আমাকে নিন। শুধু ওকে একা নিয়ে যাবেন কেন?’

পুলিশ শেষ পর্যন্ত পিছু হটে। কিন্তু এই গণ্ডগোলের কারণে পরিচয়পত্র আর সকলকে দিয়ে ওঠা হয়নি। আড়াইশোর উপর মানুষ পরিচয়পত্র পেয়েছেন, বাকিরা পাননি। মাঠ থেকে ফিরে এসে আমরা সকলে মিটিং করি। মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়, কয়েকদিনের মধ্যেই আলাদা আলাদা এলাকায় গিয়ে বাকি থাকা পরিচয়পত্রগুলো হাতে হাতে তুলে দেওয়া হবে।

এমনিতে কল্যাণী শহরে গৃহ পরিচারিকাদের পরিস্থিতি একেবারেই ভালো নয়। আগে যে সমস্যাগুলোর কথা বললাম, সেগুলো তো আছেই, সঙ্গে যৌন হেনস্থাও আছে। অনেকসময় মেয়েরা ভয়ে মুখ খুলতে পারে না, অভিযোগ জানাতে গেলে পুলিশ প্রশাসনও কোনো অভিযোগ নেয় না, রাস্তায় বেরনোই মুশকিল হয়ে যায়। যৌন হেনস্থার শিকার হওয়ার পরও কাজ করে যেতে হচ্ছে পেটের দায়ে।

এই যে আমরা সকলে মিলে একটা সংগঠন গড়ে তুললাম – এটার কারণেও বাড়িগুলোতে বিরোধিতা হতে পারে। আমাদের সমিতিতে আছে বলে তাকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিতে পারে। তবে আমরা যদি জোট বাঁধতে পারি, তবে অত সহজে আমাদের কাজ কেড়ে নিতে পারবে না। কিছুদিন আগেই এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল। আমাদেরই একজন মেয়েকে একটা বাড়িতে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছিল। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিই, ওই বাড়িতে কেউ কাজে যাবে না। যদিও যতখানি আমাদের জোট বাঁধা উচিত, ততখানি এখনো হয়ে ওঠেনি। ফলে ১,৫০০ টাকার একজনকে ছাড়িয়ে ১,২০০ টাকা দিয়ে আরেকজনকে নিয়ে নেওয়া যাচ্ছে, মেয়েরা করতে রাজিও হয়ে যাচ্ছে। তা-ও বলব, আমাদের লড়াইটা একদিক দিয়ে এখন অনেক সহজ। কারণ অনেক মেয়েকে আমরা এক জায়গায় করতে পেরেছি। সমিতির সদস্য সংখ্যা আপাতত ৪০০ ছাড়িয়েছে, সদস্য নেওয়ার কাজটা টানা চলবে। সরকার যাতে আমাদের শ্রমিকের স্বীকৃতিটা দেয়, এবার সেই লড়াই লড়তে হবে। দরকার হলে কলকাতার লেবার দফতরে আমরা ডেপুটেশন জমা করব। এই স্বীকৃতিটা পেয়ে গেলে ঘন্টা পিছু ন্যূনতম মজুরির দাবিটাও জোরালো হবে। সেক্ষেত্রে ঘন্টায় যে ৬০ টাকা বা ৭০ টাকায় কাজ করছে, তাকে ছাড়িয়ে পরেরজনকে কম টাকায় কাজ করিয়ে নেওয়াটা নিয়ম করে আটকানো যাবে।

আমরা মনে করি, আমরা যে কাজটা করি, সে কাজের যোগ্যতা আছে বলেই করি। আমরা যে বাড়িতে যাই, সেই বাড়ির মালিক যে অফিসে কাজ করেন, তিনিও যোগ্যতা আছে বলেই করেন। কিন্তু আমরা যদি কাজে যাওয়া বন্ধ করি, তাহলে তিনি আর অফিস-আদালতে যেতে পারবেন না। সত্যিই যদি আমরা আর কাজ না করি, ভারতবর্ষের অনেক কারখানা, অফিস, আদালত, থানা বন্ধ হয়ে যাবে। সেজন্য আমরা এই দাবিও তুলছি, যাঁর বাড়িতে আমরা কাজ করছি, তিনি যদি মেডিকেল ছুটি বা পুজোর ছুটি পেতে পারেন, আমরা পাব না কেন?

এছাড়া আরও একটা সমস্যা নিয়ে আমরা কাজ করার কথা ভেবেছি। সেটা হল, গার্হস্থ্য হিংসা। পরিচারিকাদের অধিকার আদায়ের কাজটা তো বলতে গেলে আমাদের ঘরের বাইরের লড়াই, কিন্তু আমাদের নিজেদের ঘরের লড়াইটাও এখানে কম নয়। সারাদিন খেটেখুটে বাড়ি ফিরে তারপর যদি কাউকে শুনতে হয় ‘সারাদিন কী করেছিস?’ বা কাউকে যদি তার বাড়ির লোক সন্দেহ করে, সেটার প্রতিবাদ করতে হবে। মদ খেয়ে বউকে পেটানোর মত যে কোনো হিংসার ঘটনা দেখলেই আমরা একজোট হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব।

আমাদের লড়াই চলবে।

নিবন্ধকার কল্যাণী পরিচারিকা কল্যাণ সমিতির সভানেত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

অনুলিখন: সোহম দাস

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.