স্কুলে দশম শ্রেণির টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে ফিরছে এক নাবালিকা। বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই হঠাৎ তার দিকে ধেয়ে এল গোটা দুয়েক মানুষের প্রশ্নের ঝড় – ‘নাম কী?’ ‘কোথায় থাকো?’ ‘বাবা মা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন’? কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুলিশি জেরার মত তাকে দিয়ে প্রায় কবুল করিয়ে নেওয়া হল যে তার পরিবার এদেশে অনুপ্রবেশকারী এবং আপাতত ভীত সন্ত্রস্ত কারণ এসআইআরকেই সার ধরে নিয়ে ছারখার করে দেওয়া হবে তাদের জীবন। ভাবতে আশ্চর্য লাগে, দেশভাগ ও উদ্বাস্তু জীবনের যন্ত্রণায় সর্বাধিক জর্জরিত যে রাজ্য, আজ সেখানে মানুষের পলায়ন টিভিতে বা মোবাইলে দেখার বিনোদনে পরিণত হয়েছে।
সেই বিনোদন জোগানোর কাজটি প্রবল উৎসাহে করে চলেছে সংবাদমাধ্যম – গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রে সংবাদমাধ্যমের কাজ ছিল তন্ত্রকে প্রশ্ন করা, যখন সে জনগণকে নিষ্পেষিত করে। কিন্তু এখন এই স্তম্ভটি পরিণত হয়েছে তন্ত্রধারীর খড়কে কাঠিতে। গণকে খুঁচিয়ে তোলার গোদি মিডিয়া। সে শুধু প্রশ্ন করে না, সে তাড়িয়ে বেড়ায় জনগণকে। প্রতি মুহূর্তে আসল খবর চাপা দেওয়া, অথবা সেটাকে ছোট অক্ষরে দায়সারাভাবে চালিয়ে দিয়ে উপরে তুমুল গলার জোরে তৈরি করা গালগল্প চলছে। খবরের জোর এখন বিজ্ঞাপনের চেয়েও বেশি। তাসের দেশ নাটকের সেই দৃশ্য মনে পড়ে যায়
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
রাজা। তুমি তো সম্পাদক।
গোলাম। আমি তাসদ্বীপপ্রদীপের সম্পাদক। আমি তাসদ্বীপের কৃষ্টির রক্ষক।
রাজা। কৃষ্টি! এটা কি জিনিস। মিষ্টি শোনাচ্ছে না তো।
গোলাম। না মহারাজ, এ মিষ্টিও নয়, স্পষ্টও নয়, কিন্তু যাকে বলে নতুন, নবতম অবদান। এই কৃষ্টি আজ বিপন্ন
সকলে। কৃষ্টি, কৃষ্টি, কৃষ্টি।
রাজা। তোমার পত্রে সম্পাদকীয় স্তম্ভ আছে তো?
গোলাম। দুটো বড়ো বড়ো স্তম্ভ।
রাজা। সেই স্তম্ভের গর্জনে সবাইকে স্তম্ভিত করে দিতে হবে। এখানকার বায়ুকে লঘু করা সইব না।
পুরোটাই এখন জর্জ অরওয়েলের ১৯৮৪ উপন্যাসের দুনিয়া হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ বহু আগে তাসের দেশে যার আভাস দিয়েছিলেন। বড় দাদা সর্বক্ষণ সাধারণ মানুষের উপর নজর রাখছে আর সেই নজরদারির জানলা, থুড়ি স্ক্রিন, থেকেই হাতেগরম খবর বেরোচ্ছে। কীরকম খবর? নিউটাউন খালি হয়ে গেল, ফ্ল্যাটবাড়িতে পরিচারিকা আসছে না। যেন এক তুমুল উৎসব। আবার তালাবন্ধ ঘর দেখলেই বলে দেওয়া হচ্ছে পরিবার পলাতক। যেন সবাই ঘরেই বসে থাকে সারাক্ষণ। নিদারুণ সব শত্রুরা আমাদের চারপাশে জমিয়ে বসেছিল, এসআইআর সব্বাইকে গর্ত থেকে টেনে বার করছে। ওদিকে আসাম থেকে বিহার, দিল্লি থেকে গুরুগ্রাম – বাংলা শুনলেই তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে সেখানকার মানুষ। কিন্তু তাদের দোষ দিই কেন? খোদ বাঙালিই আজ তার প্রতিবেশীকে সন্দেহ করে। বিশিষ্ট লেখিকা বাংলা টিভি চ্যানেলে জোর গলায় বলছেন — একটু ‘অন্যরকম’ বাঙালি দেখলেই তিনি ঘাবড়ে যান। বামপন্থী বুদ্ধিজীবী রবীন্দ্রসঙ্গীতের অপমান নিয়ে যতটা বিচলিত, মানুষের অপমানে ততটা নয়। সবাই যে বড় সন্দেহজনক।
বেশ ভালো করেই বিনা আদমশুমারি, বিনা পরিসংখ্যানে, শুধু গণমাধ্যমের অকুণ্ঠ মিথ্যাচারে একথা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে যে অনুপ্রবেশকারীতে দেশ ভরে গেছে, বিশেষ করে বাংলার কোণে কোণে ‘ঘুসপেটিয়া। এসআইআরের এক তাড়ায় তারা নাকি কিলবিল করে বেরিয়ে পড়ছে, পালিয়ে যাচ্ছে সীমান্ত পেরিয়ে। সীমান্ত ব্যপারটি বাংলায় বড়ই দুর্বল মনে হয়। কাঁটাতারের বেড়া টপকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীন আধাসামরিক বাহিনীর নজর এড়িয়ে এবেলা ওবেলা নাকি যাতায়াত চলে। গোটা দুনিয়ার পরিসংখ্যানে রোহিঙ্গা মেরে কেটে যতই হোক, আমাদের এখানে সবসময়ই সংখ্যাটি অসীম। শুধু বাংলা নয়, গোটা ভারতেই নাকি তারা ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতের অন্য প্রান্তে তাদের চেনার উপায় তাদের বাংলা ভাষা, আর বাংলায় চেনার নিশ্চিত উপায় তাদের মুসলমান হওয়া। এই আশ্চর্য সমীকরণটি একেবারে প্রধান সেবক কথিত a+b হোল স্কোয়্যারের এক্সট্রা 2ab-র মত। এখানে 2ab হল রোহিঙ্গা। প্রতি রাতে বাংলার গোদি মিডিয়ার চ্যানেলে চ্যানেলে বীরপুঙ্গবরা তা নিয়ে আস্ফালন করে চলেছে।
আরেকটা কথাও ভেবে দেখার মত। বঙ্গীয় সংবাদমাধ্যমের এমন সুস্পষ্ট শ্রেণিবোধ আগে কখনো কি এমনভাবে দেখা গেছে? এসআইআরের শুরু থেকে এক চাপা নারকীয় উল্লাস দেখা যাচ্ছে। খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষের দুর্দশা কী চমৎকার বিক্রি হচ্ছে চ্যানেলে চ্যানেলে! বাংলার ঘরে ঘরে ভীত সন্ত্রস্ত মানুষ, বিশেষ করে মেয়েরা, বঙ্গবালারা, যাদের বড় অংশ নির্বাচন কমিশনের ২০০২ সালের তালিকায় নাম খুঁজতে বিভ্রান্ত। তারা মাধ্যমিক পাশ করেননি, তাদের পাসপোর্ট নামক কেতাদুরস্ত বইটির কখনো দরকার পড়েনি, ডান বাম কেউ তাদের জমির মালিকানা দেয়নি, তফসিলি জাতি বা উপজাতি হওয়ার সার্টিফিকেট লাগতে পারে – একথাও তারা ভাবেনি। ফলে এখন ছুটে যাচ্ছে বহুকাল ছেড়ে আসা বাপের বাড়িতে, যেখানে বাপ-মা আর হয়ত নেই। যাচ্ছে ছোট্টবেলায় ছেড়ে আসা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক টুকরো কাগজের খোঁজে, যার দ্বারা ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম থাকা বাবার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক স্থাপন করা যায়।
কই, এই নিয়ে তো কোনো আলোচনা হল না? সেইসব এগিয়ে থাকা মেয়েরা, যাঁরা রাত জাগিয়ে এক বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন, আজ কি তাঁরা সবাই শীতঘুমে? কেননা এ সমস্যা সেই মেয়েদের, যারা ‘শুধু শুধু’ লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা পায়? হয়ত এটাও খুশির যে সেইসব টাকা এখন কাগজ জোগাড় করতে খরচ হচ্ছে। কাগজ কি সে রেখেছিল যে মেলা খেলাতে দোকান দেয়, যে মশলা মুড়ি বেচে, যে সারাদিন পাঁচ বাড়ি কাজ করে? আজ যখন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি, যার তথ্যের সূত্র হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি, এদের পিছনে বুম নিয়ে নাগরিকত্বের প্রমাণ দাবি করে, তখন কোথায় থাকে মানবাধিকার?
আরো পড়ুন মহিলা ভোটাররা কি এখনো ততটা মানুষ নন পশ্চিমবঙ্গে?
এরা কিন্তু সোনালীর কথা বলে না। সোনালীর বাবা, মা দুজনেরই ২০০২ সালের তালিকায় নাম আছে। তাঁদের কেউ স্টুডিওতে ডাকে না। আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া সোনালীদের আজও কেন দেশে ফেরানো হল না – তা নিয়ে কত ঘন্টা কথা হয়েছে চ্যানেলে চ্যানেলে? বিদ্বেষ আর গালি ছাড়া আর কিছুই তো দেখা যায় না।
এই ২০২৫ সালে আমরা কি সত্যিই বিস্মৃত হলাম বেনাগরিক হওয়ার যন্ত্রণা? অথচ অদ্ভুতভাবে এই সময়েই দেশভাগের আখ্যানকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় আসার চেষ্টা চলছে। একদিকে মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ, অন্যদিকে জওহরলাল নেহরুর উপর এদেশের যাবতীয় দুর্দশার ভার চাপিয়ে দিয়ে প্রতিবেশীর প্রতি অবিরত ঘৃণা বর্ষণ চলছে। আজকে বুম হাতে যারা বিপন্ন প্রান্তিক মানুষের ঘরে ঘরে আক্রমণ করছে, তারা কি এই বাংলার মর্মান্তিক দেশভাগ ও উদ্বাস্তু ইতিহাসের অংশীদার নয়? কী আশ্চর্য সমাপতন যে এ বছরই ঋত্বিক ঘটকের জন্মশতবর্ষ!
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








