কথায় বলে যেখান দিয়ে দেবদূতরা হাঁটতে ভয় পায়, মূর্খেরা সেখানেই লাফালাফি করে। বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে কারিকুরি করার সাহস বিজেপির প্রভু ঔপনিবেশিক শাসকদেরও ছিল না। ১৯০৫ সালে বাংলাকে ভাগ করতে গিয়ে যে প্রতিরোধের তারা সম্মুখীন হয়েছিল, তাতে বুঝে নিয়েছিল যে এখানে হাত না দেওয়াই মঙ্গল। ১৯১১ সালে তারা কলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লিতে তুলে নিয়ে গিয়ে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল। আর এখন ব্রিটিশ মনিবের ভৃত্য রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ তথা বিজেপি বাংলায় সামাজিক কারিকুরি করে নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে তাদের সাম্প্রতিক আদিখ্যেতা এবং তাকে রাজনৈতিক হিন্দুত্বের অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের চেষ্টা এরই অংশ ছাড়া আর কিছু নয়।

‘বন্দে মাতরম’ গানটির জন্ম ১৮৭৫ সালে। সেবছর ৭ নভেম্বর বঙ্গদর্শন পত্রিকায় গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়। রচয়িতা ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সেই হিসাবে এবছরের ৭ নভেম্বর তার ১৫০ বছর পূর্তি। পরের বছরের প্রথম ভাগে আবার বাংলায় ভোট। ব্যাস! বিজেপি ভেবে নিল – এই তো সময়। এবারে ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে কিছুটা হাওয়া গরম করা যাবে। সুতরাং হঠাৎ করে তারা শুরু করে দিল তারস্বরে ‘বন্দে মাতরম’ -এর সার্ধশতবর্ষ উদযাপন। মেট্রো স্টেশনে ‘বন্দে মাতরম’ বাজছে, বিজেপি বড়-কচি নেতারা মোবাইল ফোনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে গুগল খুলে গানের কথা বার করে অপ্রশিক্ষিত উচ্চারণে তোতলাচ্ছে, আবার এই দৈন্য ঢাকার জন্যে মাইকেও গানটা চালিয়ে রেখেছে। যন্ত্র ও মানবের সমবেত অসংস্কৃত চিৎকারে সংস্কৃতে লেখা গানের নাভিশ্বাস আর সমবেত দর্শকমণ্ডলীর হাস্যরোল যেভাবে গমক দিয়ে উদ্গীরণ হল তাতেই বোঝা যায় যে, বিজেপি গোটা ভারতের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তথা সংস্কৃতিতে কতটা বহিরাগত।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ভারত এক জটিল দেশ। এর কারণ হল তার বহুত্ব। বহু জাতি, বহু ভাষাভাষী, বহু ধর্মীয় বিশ্বাসের মিলনভূমি ভারত। এমন এক দেশের শাসক হবার যোগ্যতা যে আরএসএস তথা বিজেপির নেই তা প্রতি মুহূর্তে প্রমাণিত হয়। বিজেপি যেমন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের কিছুই বোঝে না, কারণ কোনোকালেই তারা এর অংশ ছিল না, তেমনই বিজেপি ভারতের বিভিন্ন জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যও বোঝে না বা বোঝার চেষ্টা করে না। ফলত, বিজেপি বন্দে মাতরম’-এর ইতিহাস ও জটিলতাও বোঝে না। কংগ্রেসকে ঠেকায় পড়ে এসব বুঝতে হয়েছিল। এখানে কংগ্রেস আর সংঘ পরিবারের মৌলিক ফারাক আছে। কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকে বাংলার সঙ্গে সম্পর্ক খুবই গভীর। কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশন বসেছিল মুম্বাইতে, যেখানে বেশ কয়েকজন বাঙালি যোগদান করেছিলেন। উমেশচন্দ্র ব্যানার্জী হয়েছিলেন কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি। এর পর থেকে কংগ্রেসে অনেক অনেক বাঙালি নেতা যোগ দিয়েছেন। সুভাষচন্দ্র বসুও কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে অনেক নামজাদা বাঙালি ব্যক্তিত্বের ভিড়ে কংগ্রেস সর্বদাই পূর্ণ থেকেছে। বাংলা হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র, অন্যদিকে কংগ্রেসও হয়ে উঠছিল ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের প্রধান মঞ্চ। সুতরাং বাংলার সঙ্গে কংগ্রেসের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য এবং গভীর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তদুপরি ১৯১১ সাল পর্যন্ত কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। কলকাতায় সর্বভারতীয় কংগ্রেসের বহু সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে বাংলার নেতৃত্বদানকারী বুদ্ধিজীবীদের ছিল বন্ধুত্বের সম্পর্ক। মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে যেমন রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত সখ্য ছিল, জওহরলাল নেহরু তেমনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের স্নেহের পাত্র। বিভিন্ন জটিল সময়ে উপদেশ নিতে রবীন্দ্রনাথের কাছে আসতেন গান্ধী-নেহরুরা।

আরএসএসের জন্ম ১৯২৫ সালে। তথাপি বিংশ শতকের তৃতীয়, চতুর্থ দশকে তারা ছিল সম্পূর্ণভাবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বাইরের শক্তি। স্বাধীনতা সংগ্রামের ব্যাপারে যেমন তারা মাথা ঘামায়নি, তেমনি বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কেও তারা কখনোই শ্রদ্ধাশীল ছিল না। তারা খুব ভালো করেই জানত যে, বঙ্কিমচন্দ্র যখন ১৮৭৫ সালে লেখা ‘বন্দে মাতরম’ গাকে তাঁর বিখ্যাত আনন্দমঠ (১৮৮২) উপন্যাসে নিয়ে এলেন, তখন তার প্রেক্ষাপট ছিল সন্ন্যাসী বিদ্রোহ। সন্ন্যাসী বিদ্রোহ বাংলা তথা ভারতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম ব্যাপক সশস্ত্র সংগ্রাম। ভবানী পাঠক এই বিদ্রোহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। আর ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম থেকে যারা শত হস্ত দূরে, তারা ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরবে না – এটাই স্বাভাবিক।

অথচ এই বিদ্রোহী সন্ন্যাসীদের বড় অংশ ছিলেন হিন্দু। মনে হতেই পারে যে এই বিদ্রোহী সন্ন্যাসীদের মধ্যে আরএসএস বা হিন্দু মহাসভার মত হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো স্বাভাবিকভাবেই খুঁজে পাবে তাদের পূর্বসুরিদের। কিন্তু বিজেপি বা আরএসএস সন্ন্যাসী বিদ্রোহকে কখনো গৌরবান্বিত করে কি? ইতিহাস খুঁড়ে যেভাবে তারা তাদের অনুপ্রেরণা খুঁজে বেড়ায় – কখনো রাণাপ্রতাপ কখনো বা শিবাজীকে নিজেদের অগ্রজ বলে চিহ্নিত করতে চেষ্টা করে – সন্ন্যাসী বিদ্রোহের নেতাদের কখনো তারা সেভাবে দেখেছে কি? আজ যে গান নিয়ে তারা মহা শোরগোল ফেলেছে, সেই গানের প্রথম দুই স্তবক বাদে বাকি অংশ (যেখানে দুর্গা বন্দনা আছে) কেন বাদ দিয়ে জাতীয় সংগীত হিসাবে গ্রহণ করা হল – এই নিয়ে তারা কংগ্রেসকে আক্রমণ করছে। অথচ আরএসএস কি ‘বন্দে মাতরম’ কি কখনো তাদের সভায় বা অনুষ্ঠানে গেয়েছে? গায়? উত্তর হল – না।

সুতরাং, ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে বিজেপির আদিখ্যেতা একটা বিরাট চালাকি বা ধান্দাবাজি। এখন আমাদের একটু বিশদে বুঝতে হবে যে কেন ‘বন্দে মাতরম’ -এর প্রতি বিজেপির প্রেম কেবল ভান। এর কারণ কী? কারণ বাংলাকে উত্তর ভারতীয় হিন্দুত্বের ছকে ফেলা অসম্ভব।

বিজেপি যাদের রাজনৈতিক সংগঠন, সেই আরএসএস কখনো ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে অংশ নেয়নি। অনেকেই ভাবেন এর কারণটা বোধহয় শুধুই কৌশলগত। ব্যাপারটা তা কিন্তু নয়। আরএসএস গভীরভাবে বিশ্বাস করত (এখনো করে) যে, ভারতের ব্রাহ্মণ্যধর্মের কুশীলবরা আর্য এবং ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদীরাও আর্য। ২০২২ সালে নরেন্দ্র মোদী সরকার জাতিগত বিভাগ খোঁজার চেষ্টায় ব্যাপক জিন পরীক্ষার যে কর্মসূচি নিতে চেয়েছিল, যা রোমিলা থাপার সহ বহু ঐতিহাসিক এবং বুদ্ধিজীবীদের কঠোর প্রতিবাদে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই গিলে ফেলতে বাধ্য হয়েছিল, তা ক্ষণকালের জন্যে তাদের মনের গহনে লুকনো এই আর্য গৌরবকে প্রকাশ্যে এনেছিল। তাদের কাছে ব্রিটিশরা ছিল পরিত্রাতা, যারা মুসলমান শাসনে দমিত আর্যাবর্তকে তাদের হয়ে মুক্ত করেছে। তাদের ব্রিটিশ প্রেম শুধু কৌশলগত ব্যাপার ছিল না, ছিল আরও বেশি কিছু। সুতরাং সন্ন্যাসী বিদ্রোহের মত ব্যাপার থেকে যে তারা শত হস্ত দূরে থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।

‘বন্দে মাতরম’ লেখা হয়েছিল আনন্দমঠ লেখার সাত বছর আগে। ফারাকটা খুব বেশি নয়। এই দুটো রচনা কি একই ভাবনাচিত্রের লিখিত অনুবাদ? নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। কিন্তু ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে কথা বলতে গেলে আনন্দমঠ নিয়ে কথা না বলে উপায় নেই। প্রসঙ্গত বঙ্কিমের হিঁদুয়ানি নিয়েও দুকথা বলতে হবে। কারণ সবটা মিলে মিশে আছে। আমরা সকলেই জানি যে, আনন্দমঠের প্রথম সংস্করণ ছিল ইংরেজের বিরুদ্ধে। কিন্তু ব্রিটিশদের চাকুরে বঙ্কিম স্বাভাবিকভাবেই প্রবল ঝড়ঝাপটায় পড়লেন এই লেখা বেরনোর পর। তারপর স্থানে স্থানে এই উপন্যাসের বদল হয়েছে, ইংরেজের জায়গায় আক্রমণের অভিমুখ বেশি করে রাখা হয়েছে মুসলমানদের দিকে। এসব বহু আলোচিত। কিন্তু তা সত্ত্বেও যা রয়ে গেছে, তাতে ব্রিটিশবিরোধিতা সম্পূর্ণ মুছে যায়নি। ব্রিটিশদের দ্বারা বাংলার যে শোষণ শুরু হল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের মধ্যে দিয়ে, তার প্রত্যক্ষ ফলই যে দুর্ভিক্ষ, তা তো বঙ্কিম নানা ছলে বলে দিয়েছিলেন তাঁর উপন্যাসে। বস্তুত, সেই ভয়ংকর দুর্ভিক্ষের বর্ণনার মধ্যে দিয়েই তো শুরু হচ্ছে এই রচনা, সেই অমোঘ ঘোষণা ‘তাহাদের সম্মুখে মন্বন্তর।’

মন্বন্তরের কারণ ভয়ংকর শোষণ এবং অনাবৃষ্টির মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বঙ্কিম মুসলমান শাসককে গাল পাড়ছেন বটে, কিন্তু ইংরেজকেও বিদ্ধ করতে ছাড়ছেন না। লিখছেন

তখন টাকা লইবার ভার ইংরেজের, আর প্রাণ সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের ভার পাপিষ্ঠ নরাধম বিশ্বাসহন্তা মনুষ্যকুলকলঙ্ক মীরজাফরের উপর। মীরজাফর আত্মরক্ষায় অক্ষম, বাঙ্গালা রক্ষা করিবে কি প্রকারে? মীরজাফর গুলি খায় আর ঘুমায়। ইংরেজ টাকা আদায় করে ও ডেসপাচ লেখে। বাঙ্গালী কাঁদে আর উৎসন্নে যায়।

এই দিয়ে শুরু। শেষে গিয়ে ইংরেজ যখন বিদ্রোহ দমন করতে এল, তখন ক্যাপ্টেন টমাস এবং ক্যাপ্টেন হে-র সঙ্গে যুদ্ধের প্রাক্কালে সত্যানন্দের ভাষণ নিশ্চয় আমাদের মনে থাকবে

সত্যানন্দ তাহাদিগকে পুনরায় আশীর্ব্বাদ করিয়া বলিলেন, ‘হে সন্তানগণ, তোমাদের সঙ্গে আজ আমার বিশেষ কথা আছে। টমাসনামা একজন বিধর্ম্মী দুরাত্মা বহুতর সন্তান নষ্ট করিয়াছে। আজ রাত্রে আমরা তাহাকে সসৈন্যে বধ করিব। জগদীশ্বরের আজ্ঞা – তোমরা কি বল?

ভীষণ হরিধ্বনিতে কানন বিদীর্ণ করিল। ‘এখনই মারিব – কোথায় তারা, দেখাইয়া দিবে চল!’ ‘মার! মার! শত্রু মার!’

যুদ্ধে কী হয়েছিল আমরা জানি। বহু সন্তানের প্রাণের বিনিময়ে টমাসের বাহিনী পরাজিত হয়েছিল। অতঃপর ক্যাপ্টেন এডওয়ার্ডও টিলার যুদ্ধে পরাজিত হল। ‘ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছে সংবাদ লইয়া যায়, এমন লোক রহিল না।’

বস্তুত, সন্তানযোদ্ধাদের দলপতি সত্যানন্দের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত অটল থেকেছে। মাতৃভূমির স্বাধীনতা দলিত হয়েছে শুধু আফগান, মোগল বা তুর্কি মুসলমানের হাতে – একথার পাশাপাশি সে স্বাধীনতা যে ইংরেজের মত ‘বিধর্মী’-দের হাতেও লুণ্ঠিত, তা শেষ পর্যন্ত সত্যানন্দ দৃঢ়ভাবে বলে গেছেন। যুদ্ধের শেষে যখন সত্যানন্দের গুরু তাঁকে ইংরেজ রাজত্ব করলেই ভালো হয় বোঝাচ্ছেন, তখন সত্যানন্দ তা কোনোভাবেই মানতে পারছেন না।

আরো পড়ুন মুক্তধারা: বৌদ্ধ তত্ত্বের আলোকে প্রকৃতি রক্ষার লড়াইয়ের রাজনীতিকরণ

তিনি উপরিস্থিতা, মাতৃরূপা জন্মভূমি প্রতিমার দিকে ফিরিয়া জোড়হাতে বাষ্পনিরুদ্ধস্বরে বলিতে লাগিলেন, ‘হায় মা! তোমায় উদ্ধার করিতে পারিলাম না – আবার তুমি ম্লেচ্ছের হাতে পড়িবে।

বঙ্কিম যতই রাজরোষ থেকে বাঁচার জন্যে কায়দা করুন না কেন, সত্যানন্দ এই গ্লানি আর অপরাধবোধ নিয়েই অন্তর্হিত হলেন।

আনন্দমঠ বা বন্দে মাতরমের মধ্যে থাকা এই তীব্র স্বাধীনতাপ্রিয়তা, ব্রিটিশবিরোধিতা আরএসএস বা বিজেপির রাজনৈতিক মননের সঙ্গে খাপ খায় না। ফলে তারা কোনোদিনই বন্দে মাতরম গায়নি। আজ বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এসে লোককে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে।

কিন্তু এর মানে কি এই যে, বঙ্কিমের ওই উপন্যাস সাম্প্রদায়িকতা প্রচার করেনি? মোটেই তা নয়। আনন্দমঠ নিশ্চিতভাবেই সাম্প্রদায়িক। সত্যানন্দের স্বাধীন মাতৃভূমি আসলে ‘হিন্দুরাজ্য’ গড়ার সাধনা। কিন্তু বলার কথা এই যে, বঙ্গভূমিকেই দেশমাতৃকা জ্ঞানে সত্যানন্দের যে দেবীকেন্দ্রিক হিন্দুরাজ্য কল্পনা, তার সঙ্গে আরএসএসের অযোধ্যার রামকেন্দ্রিক আর্যাবর্তীয় ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুরাষ্ট্রের তীব্র বিরোধ আছে। তার একটা চমকপ্রদ উদাহরণ হল – সন্তানদের বর্ণজাত ত্যাগ। মহেন্দ্র এবং ছদ্মবেশী শান্তিকে দীক্ষা দেবার সময়ে সত্যানন্দ তাদের একের পর এক সবকিছু ত্যাগ করার প্রতিজ্ঞা করালেন। অবশেষে

সত্য। আর এক কথা – জাতি। তোমরা কি জাতি? মহেন্দ্র কায়স্থ জানি। অপরটি কি জাতি?

অপর ব্যক্তি বলিল, ‘আমি ব্রাহ্মণকুমার।’

সত্য। উত্তম। তোমরা জাতিত্যাগ করিতে পারিবে? সকল সন্তান এক জাতীয়। এ মহাব্রতে ব্রাহ্মণ শুদ্র বিচার নাই। তোমরা কি বল?

উভ। আমরা সে বিচার করিব না। আমরা সকলেই এক মায়ের সন্তান।

অথচ, ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ব প্রবলভাবেই বর্ণবাদী। ব্রাহ্মণ, ঠাকুর আধিপত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। সেখানে সত্যানন্দ আর বন্দে মাতরমকে গিলে ফেলা সহজ নয়।

সে কারণেই বলছিলাম, যে রাস্তায় দেবদূতরাও হাঁটে না, বিজেপি সেখানেই লাফায়।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.