সঞ্চিতা হাসান
১৪ নভেম্বর, ২০২৫ ক্যালেন্ডারে আরেকটা মামুলি দিন। কিন্তু হিন্দুত্ববাদীদের কাছে আরও একটা উল্লাস করার দিন, হিংসা ছড়ানোর দিন, মুসলমানদের ‘অওকাত’ দেখিয়ে দেওয়ার দিন। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করুক বা না করুক, সব বামপন্থীর বিহারের ভোটগণনার দিকে চোখ ছিল, একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার আশায়। আমিও চোখ রেখেছিলাম ফলাফলে। শেষমেশ আবার সেই একই উল্লাস, একই যন্ত্রণা। কানে বাজতে লাগল অনুরাগ ঠাকুরের উল্লাস ‘গোলি মারো শালোঁ কো’। তারপর দিল্লি দাঙ্গা।
এবার আর গুলি মারো স্লোগান নয়, আরও এক ধাপ এগিয়ে সরাসরি গণহত্যার ডাক। মোবাইলের পর্দায় ভেসে উঠল বিহারে বিজেপির জোটের বিপুল জয়ের পরে আসামের ক্যাবিনেট মন্ত্রী অশোক সিঙ্ঘলের সোশাল মিডিয়া পোস্ট। মন্ত্রীমশাই ফুলকপি খেতের ছবি দিয়ে লিখেছেন ‘বিহার ফুলকপি চাষের অনুমোদন দিল’। প্রথমে ভাবলাম, এই পোস্ট বোধহয় কোনো ভুয়ো হ্যান্ডেল থেকে করা। আসলে ভালোবাসার আশায় থাকা আমি এখনো প্রেম খুঁজে বেড়াই ছাইয়ের মধ্যে। ভীষণভাবে চাইছিলাম, প্রমাণ হোক ওই পোস্ট কোনো মন্ত্রী করেননি। কিন্তু না, এই ভারতে ঘৃণাই এখন নিয়ম, স্বাভাবিক।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ওই পোস্টের ফুলকপি কোনো সাধারণ সবজি নয়। ফুলকপি হল লোগাইন গণহত্যার প্রতীক। স্বাধীন ভারতের কুখ্যাত সাম্প্রদায়িক হত্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল লোগাইন গণহত্যা। ১৯৮৯ সালের ভাগলপুর দাঙ্গার সময়ে ঘটা ওই গণহত্যায় শতাধিক মুসলমানকে খুন করে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়, প্রমাণ লোপাট করতে উপরে লাগিয়ে দেওয়া হয় ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা। অতিরিক্ত জেলাশাসক এ কে সিং ঘটনার ২৫ দিন পর মৃতদেহগুলো উদ্ধার করেন। তখন থেকেই ফুলকপিকে মুসলমানদের কাতারে কাতারে হত্যা করার প্রতীক হিসাবে দেখা হয়। এবছর এই নিয়ে তিন তিনবার ফুলকপির ছবি বা ভিডিও পোস্ট করে পরোক্ষে গণহত্যার হুমকি দেওয়া হল। মে মাসে নাগপুরে সাম্প্রদায়িক অশান্তির সময়েও কিছু উগ্র দক্ষিণপন্থী হ্যান্ডেল ফুলকপির ছবি পোস্ট করে। এবছরেই ছত্তিসগড়ে মাওবাদী নিধনের ডাকও দেওয়া হয়েছিল একইরকম পোস্টের মাধ্যমে। কিন্তু একটা রাজ্যের একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী প্রকাশ্যে এমন পোস্ট করছেন – এ ঘটনা বিরল।
বিহার বিধানসভা নির্বাচনের ফল বেরোবার দিন আসামের ক্যাবিনেট মন্ত্রীর এই পোস্টে জানি ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল মেরুদণ্ড বেয়ে। ফোন খুলতেই চোখে পড়ল হোয়াটস্যাপ স্ট্যাটাস – আমার মেয়ের গৃহশিক্ষকের। বাচ্চা ছেলে – জেন জি। সেই প্রজন্ম, যারা কিছুদিন আগেই পালটে দিল নেপালের ক্ষমতার সমীকরণ। মুসলমানবিদ্বেষে ভরপুর তার স্ট্যাটাস। থম মেরে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। কী করে মেয়েকে পড়তে পাঠাব এই শিক্ষকের কাছে? কী নজরে সে দেখে আমার মেয়েকে? তার হাতে আমার মেয়ে কি নিরাপদ? আমার অন্য সব পরিচয় ছাপিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতে হল একজন মুসলমান মা হয়ে। আমি বরাবর শ্রেণি রাজনীতিতে বিশ্বাস করে এসেছি। সেই আমাকেও ঢুকে পড়তেই হল ধর্মীয় পরিচয়ের বাক্সে। ওই পরিচয়টা অস্বীকার করার ক্ষমতা আজকের রাজনৈতিক আবহে আমার নেই। বাজারে, রাস্তায়, কর্মক্ষেত্রে – এখন আমার নামটাই আমি।
বিহারের ফল প্রকাশিত হওয়ার পর আমার অনেক বাঙালি বামপন্থী বন্ধু গালাগাল দিচ্ছে ‘অশিক্ষিত বিহারীদের’। এই উন্নাসিকতায় ভর করে আমিও একদিন ভেবেছিলাম – আর যেখানেই হোক, বাংলায় এরকম হবে না। কিন্তু অভিজ্ঞতা বহুবছর আগেই সেই বিশ্বাস চুরচুর করে দিয়েছে। তবু, আমি তো চাষার বেটি। আশায় বাঁচে চাষা।
আরো পড়ুন মুর্শিদাবাদ দাঙ্গার পর: আমরা মানলে গান্ধী আজও সম্ভব
কত গরমের দিনে আমার মেয়েক পড়াতে আসা সেই ছেলেটিকে শরবত দিতে গিয়েও পিছিয়ে এসেছি। আমার বাড়িতে আসা কোনো শিক্ষকই আমাদের বাড়িতে কিছু খান না। আমরা তা মেনেও নিয়েছি যুগ যুগ ধরে। সংখ্যাগুরুর ধর্মনিরপেক্ষতার দেশে এমনই হয়। সেই না খাওয়া হিংস্র ঘৃণায় বদলে যাচ্ছে ক্রমশ। চারিদিক থেকে এক এক সরে যাচ্ছে বন্ধুরা। যারা ‘হম কাগজ নেহি দিখায়েঙ্গে’ বলে সুর চড়াচ্ছিল বছর পাঁচেক আগেও, তারাও এখন কাগজ খুঁজছে। আচ্ছা, কাগজ মিললে কি ঘৃণা উবে যাবে?
বাড়ির সকলে বলে ‘তুই বড্ড ফালতু ভাবিস’। বাচ্চাদের মধ্যে বাড়তে থাকা মুসলমানবিদ্বেষ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে এক ‘কমরেড’-কে মেসেজ করলাম। সে আমাকে বোঝাল – ‘শুরু থেকেই এসব বিপন্নতার মুখোমুখি হলে মেয়ে স্ট্রং হবে?’ তাকে প্রশ্ন করলাম – হলোকস্টের শিকার ইহুদীরা সারা বিশ্বে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দারুণ সাফল্য অর্জন করেছে হলোকস্টের পরে। তাই বলে আমরা কি হলোকস্টের জন্য অপেক্ষা করব ‘স্ট্রং’ হওয়ার জন্য? সে একটা হাসির ইমোজি পাঠাল। রাতকে রাত হিসাবে স্বীকার না করলে কি ভোরের স্বপ্ন দেখা সম্ভব? উত্তর আসে না কোনো দিক থেকে। অশিক্ষিত বলে দাগিয়ে দেওয়া বিহারীদের উত্তরটা অন্তত স্পষ্ট। কিন্তু বাঙালিদের?
আমি জানি উত্তর আর পাব না কারও থেকে। বন্ধু বলে যাঁদের ভাবি, ভেবে এসেছি বারবার, তাঁরা নিজস্ব ইকো চেম্বারে নিজেরা যা শুনতে চান তাই শুনতে পাচ্ছেন। আমাদের এখন কোনোমতে বেঁচে থাকতে হবে। কে জানে কতজন হলোকস্ট এড়িয়ে বাঁচতে পেরেছিল!
আমি মেয়েকে শেখাই পদবি ছাড়া বাঁচতে, শেখাই ক্লাসে একটাও বাড়তি কথা না বলতে। যেন সে বন্ধুদের সঙ্গেও খুব সাবধানে কথা বলে, অথবা চুপ করে থাকে। আমি আর শেখাই না যে আমরা সবাই সমান। অবশ্য আমাকে খুব বেশি আর শেখাতে হচ্ছে না, সে নিজেই শিখে যাচ্ছে চারপাশ দেখে। বুঝে নিচ্ছে যে যতদূর সম্ভব নামহীন হয়ে টিকে থাকাই জীবন।
নিবন্ধকার পেশায় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







