উপনির্বাচনের ফল সাধারণত শাসকের পক্ষেই যায়। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন যেমন, তাতে ছয় কেন্দ্রের উপনির্বাচন নিয়ে বিশেষ তাপ-উত্তাপ নেই। বিরোধীরা হীনবল, শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের শক্তিশালী সংগঠনের জোরে বিপুল জয় পাওয়া কার্যত সময়ের অপেক্ষা। তৃণমূলের অন্দরের গুঞ্জন – একমাত্র মাদারিহাট আসনে তাঁদের কড়া টক্কর দিতে পারে বিজেপি। সেখানেও আবার গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর ডাকসাইটে নেতা তথা প্রাক্তন সাংসদ জন বার্লা। যাঁকে নিয়ে জল্পনা, তিনি নাকি পদ্মফুল ছেড়ে জোড়া ফুলকে সাহায্য করবেন উপনির্বাচনে। এর বাইরে বাকি পাঁচ কেন্দ্রে সহজ জয় পাওয়ার বিষয়ে মোটামুটি নিশ্চিত তৃণমূল।
আপাত নিরুত্তাপ এই আবহেও রাজনৈতিক মহলের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী পরিসরে নজর কাড়ছে নৈহাটি বিধানসভার উপনির্বাচন। একদা সিপিএমের দুর্গ নৈহাটিতে এবার বামফ্রন্ট সমর্থন করছে সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের প্রার্থী দেবজ্যোতি মজুমদারকে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ঘটনা নজিরবিহীন। প্রচারে গিয়ে একসঙ্গে জনসভা করেছেন লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এবং সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। ‘দূরত্ব’ এবং ‘প্রাথমিক জড়তা’ কাটিয়ে একযোগে প্রচারেও নেমেছেন সিপিএম, লিবারেশনের নেতা কর্মীরা।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
জয়ের সম্ভাবনা যে কার্যত নেই, তা ভালই জানেন বামপন্থীরা। এমনকি বিজেপিকে সরিয়ে দ্বিতীয় স্থান দখল করাও কঠিন বামফ্রন্ট সমর্থিত নকশাল প্রার্থীর পক্ষে। কিন্তু সংসদীয় রাজনীতির হিসাবনিকাশের বাইরে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বহু আলোচনার পরিসর তৈরি করেছে এই নতুন বামপন্থী জোট। ২০২৬ সালে বৃহত্তর বাম জোট তৈরি হতে পারে কিনা, বামফ্রন্টের নাম পরিবর্তনের সম্ভাবনা সহ বিভিন্ন প্রশ্ন উঠে আসছে আলোচনায়। কংগ্রেস অন্য কেন্দ্রগুলির মত এখানেও একাই লড়ছে। সংগঠন দুর্বল, তবে হাত চিহ্নের প্রার্থী পরেশ সরকার এলাকায় পরিচিত মুখ। বিজেপির রূপক মিত্র বরং বহু ভোটারের কাছেই অপরিচিত।
লিবারেশনের দেবজ্যোতির প্রবল প্রতিপক্ষ তৃণমূলের সনৎ দে। এলাকার প্রভাবশালী নেতা এবং কাউন্সিলর সনৎ ব্যারাকপুরের সাংসদ পার্থ ভৌমিকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ক্রীড়া সংগঠক হিসাবেও তাঁর পরিচিতি আছে। রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে কলকাতা ময়দানের তিন প্রধান এবং আইএফএ কর্মকর্তাদের সমর্থনসূচক বিবৃতি তিনি আদায় করেছেন। এ-ও এক নজিরবিহীন ঘটনা বঙ্গ রাজনীতিতে।
খেলার মাঠে রাজনৈতিক প্রভাব চিরকালই ছিল। সোমেন মিত্র, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, সোমনাথ চ্যাটার্জির মত নেতারা সরাসরি ময়দানের মানুষ ছিলেন। কিন্তু ভোটযুদ্ধে ময়দানকে সরাসরি ব্যবহার করার সংস্কৃতি চালু করেছিল তৃণমূল। মোহনবাগানের দুর্গ হাওড়া লোকসভা কেন্দ্রে প্রাক্তন ফুটবলার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনে সবুজ মেরুন জার্সি পরে মিছিল করেছিলেন তৃণমূল সমর্থকরা। এবার তাকেও ছাপিয়ে গেলেন সনৎ। ক্লাবকর্তারা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে বিবৃতি দিচ্ছেন – কলকাতা ময়দানের জন্য এই দৃশ্য রীতিমত লজ্জার।
বিরোধীদের একাংশ দাবি করছে, আর জি কর কাণ্ডের প্রেক্ষিতে তৃণমূল নৈহাটির জয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে। তাই ময়দানকে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে ব্যবহার করছেন সনৎ। তবে নৈহাটি চষে ফেলে কিন্তু সেই অনিশ্চয়তার লেশমাত্র চোখে পড়ল না। জয় নিয়ে চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসী তৃণমূল। সংগঠনে শাসক দলকে টক্কর দেওয়ার মত জায়গায় নেই কোনো বিরোধী দল। গত লোকসভার নিরিখে নৈহাটিতে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান ছিল ১৫,৫১৮। ২০২১ বিধানসভা ভোটে তা ছিল ১৮,৮৫৫। বিধানসভার তুলনায় লোকসভায় তৃণমূলের ভোট কমেছে ঠিকই, তবে পার্থ বলছেন, উপনির্বাচনে তাঁদের টার্গেট ৫০ হাজারের ব্যবধান। প্রার্থীও গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। দাপুটে নেতা হিসাবে পরিচিত সনৎ করোনাকালে দারুণ কাজ করেছেন বলে প্রচার করছে তৃণমূল। নৈহাটি স্টেডিয়ামে ২৮২ বেডের সেফ হোম জেলার অন্যতম সেরা সেফ হোমের তালিকায় নাম লিখিয়ে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে। সেই কর্মকাণ্ডের নেপথ্য সনৎ ছিলেন বলে বাড়ি বাড়ি প্রচার করছে তৃণমূল। শাসক দলের দাবি, নিজে দুবার করোনায় আক্রান্ত হয়েও দলমত নির্বিশেষে সেইসময় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। আত্মবিশ্বাসী সনৎ বলছেন, পার্থর অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার পাশাপাশি নৈহাটি হাসপাতালের পরিকাঠামোর উন্নয়নই তাঁর প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি বিরোধীদের অভিযোগ – আর জি কর আন্দোলনের সময় নৈহাটিতে প্রতিবাদীদের উপর চড়াও হয়েছিলেন এই তৃণমূল নেতা।
লোকসভা নির্বাচনের পর এই এলাকায় হীনবল হয়ে পড়েছে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। ভোট আছে, কিন্তু সংগঠন ভঙ্গুর। ঠিক পাশেই প্রাক্তন সাংসদ অর্জুন সিংয়ের গড় ভাটপাড়া বিধানসভা। সেখানকার বিধায়ক অর্জুনের ছেলে পবন। ব্যারাকপুর লোকসভার সাতটি বিধানসভার মধ্যে এই একটিই বিজেপির দখলে। নৈহাটির উপনির্বাচনে অর্জুন কিছু প্রচার করলেও পবন তেমন গা ঘামাচ্ছেন না। শুভেন্দু অধিকারী, শান্তনু ঠাকুররা প্রচার করে গিয়েছেন। তবে তা কেবলই নিয়মরক্ষা। চূড়ান্ত অর্ন্তকলহ বিজেপিতে, রয়েছে অনেকগুলি গোষ্ঠী। শাসককে টক্কর দেওয়ার মত অবস্থাতেই নেই গেরুয়া শিবির। নৈহাটি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে পুরসভার ৩১টি ওয়ার্ড। এছাড়াও রয়েছে কাপা-চাকলা, পলাশি-মাঝিপাড়া, জেঠিয়া, শিবদাসপুর এবং আরও চারটি পঞ্চায়েত। ভোটার সংখ্যা কমবেশি ১,৯০,০০০। লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে বিজেপির শক্তি আরও কমেছে। শক্তিবৃদ্ধি হয়েছে তৃণমূলের। কংগ্রেস এবং বামেদের অবস্থাও তথৈবচ।
এই আবহেই রাজনৈতিক মহলের উৎসাহ বাড়িয়েছে সিপিএমের সঙ্গে লিবারেশনের জোট। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় মাত্র একবারই একজন নকশালপন্থী নেতা বিধায়ক হিসাবে প্রবেশ করেছিলেন। ১৯৭৭ সালে জেল থেকে ভোটে লড়ে জয়ী হয়েছিলেন সন্তোষ রানা। তারপর থেকে আর কোনো নকশালপন্থী বিধায়ক পায়নি পশ্চিমবঙ্গ। তবে পাশের রাজ্য বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং আসামে বহুবার জয়ী হয়েছেন নকশালপন্থীরা। বিহার এবং আসামে লিবারেশনের নেতারা সাংসদও হয়েছেন। গত বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনে বিহারে দুর্দান্ত ফল করেছে দল। সেই রাজ্যে এখন তাদের ১২ জন বিধায়ক, দুজন সাংসদ। ঝাড়খণ্ডেও লিবারেশন বিরাট শক্তি। সম্প্রতি ঝাড়খণ্ডের শক্তিশালী বামপন্থী দল এমসিসি মিশে গিয়েছে লিবারেশনে। সব মিলিয়ে বলাই যায়, দেশজুড়ে বামপন্থীদের শক্তি সার্বিকভাবে কমলেও লিবারেশনের শক্তি বাড়ছে। বিহার এবং ঝাড়খণ্ডে এখন লিবারেশন অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি।
আরো পড়ুন রাষ্ট্র মেরামতি লাগবে: কলকাতার বুকে ঢাকার স্পন্দন
পশ্চিমবঙ্গে কোনোদিনই লিবারেশন বড় শক্তি নয়। তবে বিক্ষিপ্ত কিছু এলাকায় তারা নজরকাড়া গণআন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছিল। রাজ্যের বামপন্থী মানুষজনের অনেকের মনেই ‘করন্দা গণহত্যা’-র স্মৃতি এখনো টাটকা। নদীয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে, হুগলি ও বর্ধমানের কিছু এলাকাতেও লিবারেশনের কাজ আছে। এই রাজ্যে লিবারেশনের নিবিড় কাজের জায়গাগুলির মধ্যে অন্যতম প্রধান এলাকা নৈহাটিও। মধ্যবিত্ত এলাকায় খুব জোরালো সংগঠন না থাকলেও গৌরীপুর জুটমিল এলাকায় নকশালপন্থীদের কাজ বহুদিনের। লিবারেশনের প্রার্থী দেবজ্যোতি, নেতা সুব্রত সেনগুপ্তরা বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের প্রতিদিনের সংগ্রামের সাথী হিসাবে পরিচিত। নৈহাটি বিধানসভার অর্ন্তগত শিবদাসপুর এলাকাতেও লিবারেশনের দীর্ঘদিনব্যাপী নিবিড় কাজ রয়েছে। যদিও সংসদীয় রাজনীতির সমীকরণে কখনোই খুব সুবিধা করে উঠতে পারেনি তারা।
সাম্প্রতিক অতীতে লিবারেশন এবং সিপিএম জোটবদ্ধভাবে বহু রাজ্যে নির্বাচনে লড়াই করেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে দুই দলের কর্মীবাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক বেশ তিক্ত। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে লিবারেশন বিজেপিকেই প্রধান শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করে। নো ভোট টু বিজেপি আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় দল। দীপঙ্করবাবুদের এই অবস্থান তখন ভালভাবে নেননি সিপিএমের অনেকেই। কটাক্ষ, পাল্টা কটাক্ষে জড়িয়েছে দুপক্ষই। আর জি কর আন্দোলনের পরেই উপনির্বাচনে জোটের আবহে উঠছে এই প্রসঙ্গ। দীপঙ্কর বলছেন, ‘আমরা বলেছিলাম বিজেপিকে একটিও ভোট নয়, কিন্তু তার সঙ্গে একটা কথা বলেছিলাম যে তৃণমূলকে একটুও ছাড় নয়। সেটা অনেকেই খেয়াল করেননি৷’ সিপিএম প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘অতীতে তাঁদের সঙ্গে সমীকরণ কী ছিল তা এখন ভাবব না। কারণ রাজনীতি অতীতে আটকে থাকে না, তা ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়। তাই সবাই মিলে এই সঙ্কট থেকে বাংলাকে বাঁচাতে হবে।’
দীপঙ্কর অতীত পেরিয়ে আসার কথা বলছেন। উস্কে দিচ্ছেন ২০২৬ নির্বাচনে বৃহত্তর বাম জোটের সম্ভাবনা। এই প্রসঙ্গে উঠে আসছে বামফ্রন্টের নাম বদলের কথাও। লিবারেশন নেতা বলেছেন, ‘বৃহত্তর বাম ঐক্য দরকার, নাম বদল দরকার। নামটা বদল করতে পারলে ভাল হয়।’ সেলিম অবশ্য সাবধানী। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকের মন্তব্য, ‘বামপন্থীদের নেম চেঞ্জার নয়, গেম চেঞ্জার হতে হবে।’
খেলা কি ঘুরবে নৈহাটিতে? সম্ভাবনা কম। তবে সে তো সংসদীয় রাজনীতির অঙ্ক। বামপন্থী রাজনীতির বৃহত্তর প্রেক্ষিতে এই বৃহৎ বাম জোট গঠন নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। ভোটের ফল যা-ই হোক, বামপন্থী শক্তিগুলি যদি পারস্পরিক কটাক্ষ, পাল্টা কটাক্ষের পরিবর্তে জনজীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলি নিয়ে একত্রে পথে নামেন, আজকের এই দুঃসময়ে সেটুকুও অনেক।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








