গত ৯ অগাস্ট রাত থেকে ভোররাতের মধ্যে আর জি কর হাসপাতালে একজন মহিলা ডাক্তার ভয়ংকরভাবে ধর্ষিত এবং খুন হন। তারপর থেকেই তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ছে গোটা রাজ্য। এই বাদ-প্রতিবাদ নিঃসন্দেহে গতি পেল ১৪ অগাস্ট রাতে, মেয়েরা রাত দখল করো – এই বার্তা নিয়ে একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিকে ঘিরে। সেই রাতে হাজার হাজার মহিলা এবং পুরুষ রাত বারোটায় রাস্তায় হেঁটে, জমায়েত করে আর জি করের ঘৃণ্য ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইলেন। তারপর থেকেই প্রতিবাদ তীব্র হয়ে ওঠে এবং প্রতিদিন রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন চেহারায় প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছে। আন্দোলনের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে সময় নষ্ট করতে চাই না। সেসব সকলেই জানেন। সকলেই প্রতিনিয়ত তার অংশীদারও বটে। বর্তমানে ঘরে বসে আছে কম লোকই। সুতরাং আমাদের আলোচ্য নয় সেসব। এই অবসরে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করতে চাইব, যে আলোচনাগুলি ছাড়া কোনো আন্দোলনই এগোতে পারে না, প্রকৃত অর্থে বড় হয়ে উঠতে পারে না।
কার বিরুদ্ধে আন্দোলন? কাদের আন্দোলন?
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
ঘটনাটি যদি একটু ঠান্ডা মাথায় দেখি, তাহলে সহজেই বোঝা যায়, এই যে ডাক্তারটি ধর্ষিত এবং খুন হলেন, তিনি ঘটনাচক্রে একজন মহিলা। তিনি পুরুষ হলেও খুন হতেন। সেক্ষেত্রে অবশ্যই তাঁকে ধর্ষিত হতে হত না। যেহেতু আমরা রয়েছি একটি প্রবলভাবে হিংস্র পিতৃতান্ত্রিক সমাজে, তাই মহিলা হবার কারণে তাঁকে ধর্ষিত হতে হল। অর্থাৎ এক্ষেত্রে তাঁর ডাক্তার পরিচয়টিই প্রথম এবং প্রধান। মহিলা পরিচয় অপ্রধান। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি হাসপাতালে চলা একটি চক্রের কথা জেনে গিয়েছিলেন এবং তা ফাঁস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। কিসের চক্র? নানারকম খবর বেরিয়ে আসছে। কোনো সংবাদমাধ্যম বলছে টাকার বিনিময়ে ডাক্তারদের ট্রান্সফারের চক্র, কোথাও বলা হচ্ছে মৃতদেহ বিক্রির চক্র। জাল ওষুধ কেনা ও ব্যবহারের চক্র। হাসপাতাল বর্জ্যের অবৈধ লেনদেনের চক্র। এছাড়া আরও অনেক ভয়াবহ অবৈধ ব্যবসা নিশ্চয়ই এই চক্র চালায়। এই চক্রের মধ্যে হাসপাতালের সর্বোচ্চ প্রশাসন থেকে শুরু করে ইনটার্নরা পর্যন্ত যুক্ত। অনুমান করা যেতে পারে, এই চক্রটির সাথে মন্ত্রী পর্যায়ের লোকেদের যুক্ত থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। একইসঙ্গে অনুমান করা যেতে পারে, এই চক্রের সাথে ওষুধ কোম্পানিগুলিরও যোগসাজশ আছে। অর্থাৎ রাজনীতির লোকেরা, প্রশাসনের লোকেরা, হাসপাতালের প্রশাসনিক লোকেরা, কর্পোরেট কোম্পানি, ডাক্তার থেকে শুরু করে নিরাপত্তারক্ষী, পুলিস – এতগুলি অংশের লোকের সম্মিলিত চক্র আর জি কর হাসপাতালের এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
অবশ্যই এই চক্রটি প্রবল রাজনৈতিক শক্তির অধিকারী। অর্থাৎ এই চক্রের রাজনৈতিক যোগাযোগ অনেক উচ্চস্তরের। একথা পরিষ্কার হয়ে যায়, যখন ঘটনা ঘটার দিন দুয়েক পরে আর জি কর মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ পদত্যাগ করেন। কিন্তু ঘন্টা চারেকের মধ্যেই তাঁকে ন্যাশনাল অধ্যক্ষ হিসাবে নিয়োগ করা হয়।
আরো পড়ুন ফয়জান মামলার পুনরাবৃত্তি আর জি করে, বলছেন রেহানা
তাহলে এই চক্র যদি ঘটনার মূল আক্রমণকারী হয়ে থাকে, তাহলে আক্রান্ত কে? আক্রান্ত একজন ডাক্তার, যিনি তাঁর কর্মক্ষেত্রেই আক্রান্ত, ধর্ষিত এবং নিহত হয়েছেন। একজন ডাক্তার আজকের দিনে একজন দক্ষ শ্রমিক ছাড়া কিছুই নন। হতে পারে তিনি সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রমিক (সাদা কলারের শ্রমিক), কিন্তু শ্রমিক। সুতরাং এটি মূলত একটি শ্রমিক প্রশ্ন এবং শ্রম সংক্রান্ত প্রশ্ন। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক সুরক্ষার প্রশ্ন। সুতরাং এটি হওয়া উচিত একটি শ্রমিক আন্দোলন। এক্ষেত্রে এই প্রশ্নের সঙ্গে একটি লিঙ্গ রাজনীতির মাত্রা যুক্ত আছে, যেহেতু এক্ষেত্রে শ্রমিক একজন নারী এবং তিনি ধর্ষণেরও শিকার হয়েছেন। এই হল পরিষ্কার ব্যাপার।
আন্দোলনের ভুল নেতৃত্ব, ভুল দিশা
অথচ দেখুন, প্রথম থেকেই আন্দোলনটিকে কেমনভাবে বিপথে চালানো হল। প্রথমত, এত যে আন্দোলন হচ্ছে, তাতে একবারও আন্দোলনের বর্শামুখ হাসপাতালগুলিতে তৈরি হওয়া উক্ত চক্রের দিকে নিবদ্ধ হল না। ব্যক্তি সন্দীপ ঘোষের প্রতি ক্ষোভ ব্যক্ত হল। কিন্তু হাসপাতালগুলির সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়ে কথা উঠল না। দুর্বৃত্ত কর্পোরেট ওষুধ কোম্পানিগুলি নিয়ে একটা লাইনও কেউ বলেছেন বলে শুনিনি। ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই এটিকে একটি সাধারণ ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড বলে ধরে নিয়ে আন্দোলনটিকে শুধুমাত্র নারী অধিকারের প্রশ্ন হিসাবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল। বিশেষ করে একথা প্রযোজ্য ১৪ অগাস্ট রাতে যে কর্মসূচি নেওয়া হল তার বেলায়। ফলে কেন্দ্র, রাজ্য উভয় সরকারই ১৪ তারিখের আন্দোলনকে সাহায্য সহযোগিতা করতে এগিয়ে এল। রাজ্য মেয়েদের জন্যে ওইদিন রাতে বিনা ভাড়ায় বাস চালাল, তো কেন্দ্র চালাল অতিরিক্ত মেট্রো। এমনিতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিস যেখানে জমায়েত করতে গেলেই লাঠি নিয়ে ঠ্যাঙাতে যায়, সেখানে ১৪ তারিখ রাতের আন্দোলনকে সাহায্যই করল। ফলে আন্দোলন একটা কার্নিভালের চেহারা নিল। আর তার দুদিন পর থেকেই আন্দোলনের ডাক প্রথম কে দিয়েছেন, তা নিয়ে তরজা শুরু হল। একজন দাবিদার তো মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ‘স্ট্রাকচারাল পরিবর্তন’ সংক্রান্ত দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনায় বসার প্রস্তাবই দিয়ে বসলেন। অন্য পক্ষ তার বিরোধিতা করল। কেউ কেউ তাঁকে বয়কট করার ডাক দিল। কেউ মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করল। যেন মুখ্যমন্ত্রী পাল্টে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। একজন অন্যকে বলল, ‘তুই ধান্দাবাজ’, অন্যে প্রথমকে বলল, ‘তুই কুৎসাকারী’! এই হল নিজেদের নেতৃত্ব বলে দাবি করা লোকেদের অবস্থা।
যে নারীবাদী অবস্থান থেকে নারী অধিকারের প্রশ্নটিকে নাড়াচাড়া করা হল, তাও কিন্তু যথেষ্ট সমস্যাজনক। যেহেতু ঘটনাটি ঘটেছে রাতে, তাই আওয়াজ তোলা হল – মেয়েদের রাত দখল করতে হবে। অর্থাৎ অব্যক্ত কথাটি হল, পুরুষেরা রাতে নিরাপদ, মেয়েরা নয়। তাই মেয়েদের রাতের দখল নিতে হবে। ভুলিয়ে দিতে চাওয়া হল, যে দুর্বৃত্তদের রাজত্বে নারী, পুরুষ কেউই নিরাপদ নয়। রাতের বেলায় তো নয়ই। অধিকন্তু, ঘটনাটি রাস্তায় ঘটেনি, ফাঁকা মাঠে ঘটেনি বা অলিগলিতে ঘটেনি। ঘটেছে কর্মক্ষেত্রের চার দেওয়ালের মধ্যে। অথচ কর্মক্ষেত্র কথাটি বেমালুম গায়েব হয়ে গিয়ে কেন যে ‘রাত দখল’ মূল ব্যাপার হয়ে উঠল, তা দুর্বোধ্য। হয়ত এইভাবে বিষয়টিকে বুঝতে চাওয়া হল ইচ্ছাকৃতভাবেই, যাতে আন্দোলনটিকে একটি বিকৃত নারীবাদী চেহারা দেওয়া যায়। নারীবাদের অনেক ঘরানার মধ্যে এটিকে বলা যেতে পারে নয়া উদারবাদী নারীবাদ, যেখানে পরিষ্কার বলা হল, আন্দোলনটি একান্তভাবেই নারীদের, সুতরাং পুরুষরা এই আন্দোলনে কাঙ্ক্ষিত নন। ফলে আন্দোলনের শক্তিকে বিভাজিত করতে চাওয়ার সচেতন প্রয়াস প্রথম থেকেই আমরা দেখলাম। আন্দোলনকে কুক্ষিগত করতে চাওয়ার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াল ভুল রাজনীতি। আর বিভাজনের রাজনীতি একবার শুরু হলে তা ছড়িয়ে পড়ে। মহারাষ্ট্রের একটি প্রতিবাদে আবাসিকদের সঙ্গে গৃহশ্রমিক মেয়েরা যোগ দিতে চাইলে তাঁদের বের করে দেওয়া হয় এই বলে, যে ‘এটা তোমাদের আন্দোলন নয়’। আন্দোলনটিকে অভিজাত নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দিতে চাইল এই নয়া উদারবাদী নারীবাদ। সুতরাং আন্দোলনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ল।
এখানে একটা কথা উত্থাপন করে রাখা দরকার বিস্তারিত ব্যাখ্যার মধ্যে না ঢুকে। তা হল নয়া উদারবাদী নারীবাদের এই ‘অল মেন’ স্লোগানটি একটি অবৈজ্ঞানিক ও ধূর্ত স্লোগান। এর অর্থ হল পুরুষ মানেই সম্ভাব্য ধর্ষক। মার্কসবাদী নারীবাদ অবশ্যই মনে করে নারী-পুরুষের দ্বন্দ্ব একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব। পুরুষ ছাড়া তো আর পিতৃতন্ত্র হয় না। বরং নয়া উদারবাদীদের এই ‘পিতৃতন্ত্র’ কথাটিই আজকের দিনে অন্তঃসারশূন্য। এঁরা একদিকে বলছেন ‘অল মেন’, অন্যদিকে বলে চলেছেন ‘পিতৃতন্ত্র’। হাস্যকর জট পাকানো চিন্তা বটে। মার্কসবাদী নারীবাদ নারী-পুরুষ দ্বন্দ্বকে মৌলিক দ্বন্দ্ব বলে মানলেও পুরুষকে জৈবিক বিষয় হিসাবে দেখে না। দেখে মনস্তাত্ত্বিক-সামাজিক গঠন হিসাবে। তাই জৈবিকভাবে পুরুষ হয়েও কেউ পুরুষ না-ও হতে পারেন, আর জৈবিকভাবে নারী হয়েও কেউ পুরুষ হতেই পারেন। রাজনৈতিকভাবে এটি হল শ্রেণিচ্যুতি। রাজনৈতিক উত্তরণ বা অবতরণের প্রশ্ন। আর দার্শনিকভাবে হল বস্তু যা (thing in itself), তা থেকে ‘কার্যকরী বস্তু’ (thing for itself) -তে রূপান্তরের প্রশ্ন।
আন্দোলনে আরও বলা হল, এই আন্দোলনে রাজনীতি চলবে না। দলীয় পতাকা নিয়ে কেউ আসতে পারবে না। কেন?
রাজনীতি নয়?
এটি আমাদের দেশের, বিশেষ করে আমাদের রাজ্যের একটি বিশেষ আবদার হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আন্দোলনে যোগ দিতে হবে রাজনীতি বাদ দিয়ে, দল বাদ দিয়ে। হয়ত শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপস্থিতি এবং প্রতিবাদী কর্মকাণ্ডে তাদের ঘোরতর নেতৃত্বকারী অবস্থাই এই আবদারকে জোরালো করে। এই যে আমরা ইউরোপে বা আমেরিকায় অতি সম্প্রতি প্যালেস্তাইনের মুক্তির পক্ষে এবং জায়নবাদী ইজরায়েলের বিরুদ্ধে এত বড় বড় সমাবেশ দেখলাম, কোথাও কি দেখেছি পতাকা ছাড়া মিছিল হচ্ছে? না, দেখিনি। বরং উল্টোটাই দেখেছি। বড় বড় সমাবেশে বহু পতাকার একত্র উপস্থিতি আমরা দেখেছি। কেবল আমাদের এখানেই এই সৃষ্টিছাড়া দাবি দেখা যায়। এর যুক্তিটি কী? যুক্তি একটিই।
তা হল যদি রাজনৈতিক দলগুলি আন্দোলনে আসে তাহলে তৃণমূল বা বিজেপি আসতে চাইলে কী বলা হবে? কী অদ্ভুত কথা! বলতে হবে, ‘না আসবেন না। আমরা লড়ছি আপনাদেরই বিরুদ্ধে, ভাই। যাদের প্রশাসনের সঙ্গে দুর্বৃত্ত আর অপরাধী কর্পোরেটের মিলিত চক্র এই ভয়ংকর ধর্ষণ তথা হত্যার জন্যে দায়ী, তাদের সঙ্গে একত্রে আন্দোলনের কোনো প্রশ্ন আছে? যে পার্টি প্রকাশ্যে ধর্ষকদের পক্ষে মিছিল করে, যার গোটা সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্বই দাঁড়িয়ে আছে ধর্ষকামের উপর, তাদের সঙ্গে একত্রে আন্দোলনের কোনো প্রশ্ন আছে?’ এই সামান্য কথাটুকু বলা যাবে না? এইটুকু রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া যাবে না? যারা এইটুকু কথা বলতে পারে না, তারা কী আন্দোলন করবে? আন্দোলন কি তাদের কাছে সত্যিই আন্দোলন, নাকি বিখ্যাত হওয়ার চাবিকাঠি?
কোন দিকে রাজ্য?
আজ থেকে ঠিক ১৭ বছর আগের কথা। সেই সময়টাও ছিল উত্তাল। ২০০৭ সালের ১০ নভেম্বর নন্দীগ্রামে দ্বিতীয়বার গুলি চালনা ও তাণ্ডবের বিরুদ্ধে কলকাতায় ১৪ নভেম্বর মিছিল ডাকা হল বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্বে। বলা হল মিছিলে স্লোগান হবে না, পতাকা আনা যাবে না, নাগরিক মিছিল হবে। আজকে যে যুব-ছাত্রছাত্রীরা আর জি কর কাণ্ডে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, তাঁরা কেউই সেই মিছিল দেখেননি বা সেই সময়টির উত্তুঙ্গ উত্তেজনা সম্পর্কে সম্যক অবগত নন। কিন্তু বড়রা জানেন, অনেকেই সেই মিছিলে হেঁটেছেন। অত বিপুল মানুষের মিছিল কলকাতা এই শতকে আর দ্বিতীয় হয়নি। সকলেরই মনে থাকবে, সেই মিছিলে তৃণমূল কংগ্রেসের আসা বারণ ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং মিছিলে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে সবিনয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়, ‘আপনারা মিছিলে স্বাগত নন’।
কলেজ স্ট্রিট থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত মিছিলের দুইদিকে জায়গায় জায়গায় তৃণমূলের লোকেরা দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু মিছিলে ঢোকার অধিকার তাঁদের ছিল না। তৃণমূলকে মিছিলে তো আটকানো গেল। কিন্তু আন্দোলনের রাশ তাদের হাতে যাওয়া কেউ আটকাতে পারল না। কেন? কারণ সেদিনও তৃণমূলকে আটকাতে সেই একই হাতিয়ার ব্যবহার করা হয়েছিল। মিছিলকে অরাজনৈতিক চেহারা দাও। সহজ কাজ। কিন্তু এটিই ছিল লৌহকঠিন বাসরঘরের সূক্ষ্ম ছিদ্র, যা দিয়ে বিষাক্ত সর্পের প্রবেশ ঘটে। আমাদের সেলিব্রিটি বুদ্ধিজীবীদের মিষ্টি অরাজনীতি, যা আসলে নিজ নিজ ধান্দার পথ ছাড়া আর কিছু নয়, শেষমেশ তাই ঘটিয়ে ছাড়ল।
সেদিন যদি মিছিলকে অরাজনৈতিক না করে পরিষ্কার রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া হত, বলা হত ‘দক্ষিণে ঢলে পড়া বামেদের বিপক্ষে আমরা বামে ঢলে পড়ার অভিনয় করা দক্ষিণপন্থীদের চাই না’, তা হলে রাজনৈতিক পরিবেশ এত দ্রুত তৃণমূল কংগ্রেসের অনুকূল হতে পারত না।
আজ ইতিহাস কি দ্বিতীয়বার একই চেহারায় দেখা দেবে? ইতিমধ্যেই বিজেপি নানা কৌশলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ২০২৬ সালের আগেই তারা সরকার ফেলে দিতে উদগ্রীব। যাতে অন্য কোনো বিরোধী শক্তি উঠে আসার সুযোগ না পায়, তা অবশ্যই তাদের মাথায় আছে। কিছু অবিবেচক বাম নামধারী তাদের সেই কাজে একপ্রকার সহযোগিতাই করে চলেছে।
তাই এটিই সময় প্রবলভাবে রাজনীতি করার। এই সময়েই সকল গণআন্দোলনে রক্তে ভেজা পতাকার জোরালো উপস্থিতি নিশ্চিত করা দরকার। সেদিন সময়ের কথা আমরা সোচ্চারে বলতে পারিনি। আজকের সময়ের কথা আমাদের হেঁকে বলতে হবে। আমাদের বলতে হবে, ‘দক্ষিণপন্থার বিপরীতে আমরা ফ্যাসিবাদ চাই না’। সময় কম। দ্রুত বিকল্প চাই। নইলে তিলোত্তমাদের কাছে আমরা কোন মুখে দাঁড়াব? বিচার চেয়ে রাত জাগা কি শস্তা নাটক হয়ে দাঁড়াবে না?
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








