পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘রাতের সাথী’ নারী সুরক্ষা প্রকল্প দেখে আমার স্কুলের ক্যারাটে ক্লাসের কথা মনে পড়ে গেল।
টানা ৩-৪ মাস সপ্তাহের নির্দিষ্ট দুদিন ক্যারাটে ক্লাস করতে হত মেয়েদের, সরকারি নির্দেশ এবং কলকাতা পুলিশের উদ্যোগে। মেয়েদের আত্মরক্ষায় সক্ষম করে তোলার জন্য ক্যারাটে শেখানো খুবই ভালো কাজ। কিন্তু দেখা গেল বেশিরভাগ মেয়ে তেমন উৎসাহ পাচ্ছে না। ওই দিনগুলো এলেই তাদের মাথা ব্যথা, কোমরে ব্যথা, পা ঝিনঝিন শুরু হয়ে যায়। অনেকেই পালিয়ে বেড়ায়, কেউ কেউ করুণ মুখে বলে ‘আজ ছেড়ে দিন না ম্যাম।’ প্রশিক্ষকরা বিরক্ত হতেন,অভিযোগ করতেন, আমরাও রাগ করতাম ভাল জিনিসে ছাত্রীদের এমন অনীহা, আলসেমি আর অবাধ্যতা দেখে। তারপর একসময় বুঝলাম, এই কম সময়ের অপরিকল্পিত ক্যারাটে প্রকল্পে ছাত্রীদের শরীরে মনে সচেতন ও পোক্ত করে তোলার, ক্যারাটে শেখার আনন্দ তাদের মধ্যে সঞ্চারিত করার ভাবনা যতখানি, তার চেয়ে অনেক বেশি তৎপরতা হাজিরা খাতায় লম্বা তালিকা পেশ করার। যাঁরা প্রশিক্ষণ দিতে আসছেন, এ তাঁদের ওপরওলার কাছে কৈফিয়ত দেওয়ার দায়। তাঁরাও অসহায়। সবটাই চলছে খানিকটা প্রাণহীন হুকুম তামিলের মত করে। তাও কোনো স্কুলে কয়েকজন মেয়েও যদি এতে করে শরীরচর্চা, ক্যারাটে, জুডোতে আগ্রহী হয়, আশার কথাই। কিন্তু ‘রাতের সাথী’ যেন আরও হাস্যকর।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
যাকে বলে, মাথা ব্যথা সারাতে মাথা কেটে ফেলার উপক্রম। মেয়েরা রাতে নিরাপদ নয়, ফলে মেয়েদের নাইট ডিউটি দেওয়া যথাসম্ভব কমিয়ে আনো, পারলে বন্ধ করে দাও। মেয়েরা একা থাকলে আরও বিপদ। কাজেই তারা যেন যতটা সম্ভব দল বেঁধে থাকে। প্রতিটি রাস্তার মোড়ে সিসিটিভি, আরও বেশি সংখ্যায় কড়া পুলিসি পাহারা। দুদিন আগে একটি প্রথম সারির বাংলা দৈনিকের সম্পাদকীয় পড়ে মনে হল, পুলিসবাহিনীর তৎপরতা আর দক্ষতার উপরেই রাজ্যের, দেশের নারী সুরক্ষা নির্ভরশীল। অর্থাৎ ব্যাপারখানা দাঁড়াল এরকম – সমাজে চতুর্দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে হিংস্র নারীমাংসলোলুপ শ্বাপদের দল, আমাদের মেয়েদের বাঁচতে হলে থাকতে হবে রাষ্ট্রের তৈরি করা পুলিসি প্রহরা এবং নজরদারির খাঁচায়। সদা সাবধানে, সন্ত্রস্ত হয়ে। দিনে দুপুরে রাস্তাঘাটে, কর্মক্ষেত্রে যৌন নির্যাতন, অবমাননা কিছু কম হচ্ছে না মেয়েদের উপর। তাহলে কি এরপর সুরক্ষিত থাকতে যে কোনো সময় বেরোবার আগেই দুবার ভেবে দেখার নিদান দেবে সরকার? এভাবে যতদূর, যতদিন বাঁচা যায় – সেই জীবনই মেয়েদের প্রাপ্য? মেয়েদের অধিকার?
পুলিসি নিরাপত্তা, মেয়েদের জন্য বিশেষ হেল্পলাইন দরকার নেই বলছি না। তবে নিরাপত্তার কড়া বেষ্টনী পেরিয়ে অপরাধী পৌঁছে গেছে অনায়াসে, রক্ষকই ভক্ষক হয়েছে – এমন উদাহরণ দেখে দেখে ক্লান্ত আমরা। পুলিস-টুলিস শুনলেও আজকাল তেমন ভরসা পাই না। পুলিসি পাহারা, নিরাপত্তার প্রয়োজনকে মাথায় রেখেও মনে করিয়ে দিতে চাই – ধর্ষণের মত ভয়ঙ্কর সামাজিক ব্যাধি আটকানোর জন্য আইন বা সুরক্ষার দরকারটা হচ্ছে ভয় দেখিয়ে ঠেকিয়ে রাখার আয়োজন। সেটা তুচ্ছ বা অদরকারি নয়, কিন্তু শেষ কথাও নয়। আর পুলিস বা পুলিসবাহিনীকে দেখলেই যে মানুষ অন্তর থেকে আশ্বস্ত হবেন, এমন পরিস্থিতিও আজ আছে কি? আর জি করের ঘটনায় আপাতত ধৃত সঞ্জয় রায় একজন সিভিক ভলান্টিয়ার, রাজ্যের পুলিসি ব্যবস্থারই একটা অঙ্গ। রাস্তাঘাটে আমরা সাধারণ মানুষ পুলিশ ভেবেই এঁদের সহায়তা আশা করি। আর জি করের দুদিন পরেই অন্যত্র এক সিভিক ভলান্টিয়ার রেগে হুমকি দিয়েছেন একজন ডাক্তারকে, ‘আর জি করে কী হয়েছে শোনেননি?’
আচ্ছা, এঁদের সবার কথাই বাদ দিলাম। এই রাজ্যে, দেশে এমনকি বিদেশেও ধর্ষণ, খুন, প্রমাণ লোপাটসহ কোন ঘৃণ্য অপরাধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকার নজির পুলিসকর্মী বা পুলিশ অফিসারদের মধ্যেও নেই? পুলিসকে চালায় সরকার, আর একটি পুঁজিশাসিত রাষ্ট্রে সরকারকে চালায় পুঁজিপতি শ্রেণি। একজন ব্যক্তি পুলিস মানবিক বা অমানবিক, দায়িত্বশীল বা দায়িত্ববোধহীন যা-ই হোন, পুলিসবাহিনীর একজন হয়ে, চাইলেও ক্ষমতাসীন দলের নির্ধারণ করে দেওয়া গণ্ডির বাইরে গিয়ে নির্যাতিতের পক্ষ নেওয়া তাঁর পক্ষে খুব কঠিন। আর জি করে ভাংচুরের দিন যে পুলিসবাহিনী কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে থেকে তাণ্ডব চলতে দিয়েছে এবং পরে উল্টে আন্দোলনকারীদের উপরেই চড়াও হয়েছে, তা চূড়ান্ত নিন্দনীয় হলেও খুব অস্বাভাবিক কি? ‘পুলিশ কখনও কোনও অন্যায় করে না তারা যতক্ষণ আমার পুলিশ’ – এই ধারা তো চলে আসছে বহুদিন ধরেই।
রাজ্য সরকার প্রবল আন্দোলনের চাপে কোণঠাসা হয়ে এই সুরক্ষা কবচের আড়ালে নিজেদের অপদার্থতাকে আড়াল করছে। কিন্তু যে সমাজের গোড়ায় পচন ধরেছে, যে সমাজ মানুষের চেহারা নিয়ে জন্মানো একটি সম্ভাবনাময় প্রাণকে ধর্ষকে পরিণত করছে, শুধুমাত্র পুলিস-মিলিটারির সুরক্ষার চাদরে মুড়ে তাকে বাঁচানো যাবে না। আমরা যারা আন্দোলনে নেমেছি, দিনরাত এক করে শেষ পর্যন্ত লড়ব বলে ঠিক করেছি ভয়ানকভাবে শেষ হয়ে যাওয়া মেয়েটির জন্য, আমাদের যেন এই গোড়ার কথাটা গোলমাল হয়ে না যায়।
গল্প হলেও সত্যি (১৯৬৬) মনে পড়ে? বিজ্ঞাপন অফিসের কর্মচারি টাইয়ের বিজ্ঞাপনের সাথে নগ্ন নারীদেহের সম্পর্কটা ঠিক ধরতে পারছিলেন না। বস তাঁকে বোঝান, এখন বাজার ধরতে গেলে মানুষকে ধরে ধরে শক দিতে হবে। সেই ‘শক থেরাপি’ কয়েক দশক পার করে এখন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অঙ্গ হয়ে গেছে। বাজারের ইচ্ছায় উঠতে বসতে অভ্যস্ত আমাদের মন টের পায়নি, নারীদেহের এই পণ্যায়ন, মদের ফোয়ারা, সেলুলয়েডে উচ্চবিত্তের সাজানো ড্রয়িং রুমে হতাশ পানাহার দেখতে দেখতে আমরা কখন পাশের মানুষটির ক্লান্ত মুখের দিকে তাকাতে ভুলে গিয়েছি। আমরা খেয়াল করিনি, আমাদের ‘অরাজনৈতিক’ থাকতে পারার মোহ কীভাবে প্রতিনিয়ত আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার রাজনীতিকে জিতিয়ে দিয়েছে। এসব দীর্ঘ লালিত ভুলকে ভুল বলে চিনতে পারার এবং শুধরে নেওয়ার সুযোগ আজ সময় দিচ্ছে আমাদের।
শ্যামবাজারে রাত দখলের আন্দোলনে এসেছিলেন এক মা, কোলে বছর দুইয়ের শিশুকন্যা। মাইক হাতে ধরা গলায় বললেন ‘যে গেছে সেও তো কারও সন্তান। এসেছি তার জন্য, নিজের সন্তানের জন্য। না এলে নিজের কাছেই ছোট হয়ে যেতাম।’ অন্যের যন্ত্রণা নিজের বুকে বহন করে হাজার লক্ষ মা-বোনেদের এমন উচ্চারণ বহুদিন পর শুনছে আমার শহর, রাজ্য। আমরা চোখের সামনে দেখছি এক উত্তাল সময়, প্রতিদিন বিদ্রোহ, প্রতিদিন বিক্ষোভ-আন্দোলন। এ এক আশ্চর্য সুন্দর সমাপতন, যে বাংলাদেশের স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরপরই আমাদের দেশেও এমন এক আন্দোলনের জোয়ার উঠছে। ওপার বাংলার ছাত্ররা শেখ হাসিনার নামাঙ্কিত হলের নাম পাল্টে রেখেছেন শান্তি-সুনীতি হল, প্রীতিলতা হল, ইলা মিত্র হল। এপার বাংলায় স্বাধীনতার মধ্যরাতে আওয়াজ উঠেছে, ‘মাতঙ্গিনী প্রীতিলতার কসম খেয়ে বলছি ভাই, মধ্যরাতে রাস্তা দখল, স্বাধীনতার দখল চাই।’ বহুদিন অযত্নে ফেলে রাখা এই স্মরণীয় উত্তরাধিকার এই ভয়ানক প্লাবনে আবার উঠে আসছে জনগণের মধ্যে থেকেই। যে মা গতকাল পর্যন্ত মেয়েকে স্কুল আর কোচিং ছাড়া কোথাও পা বাড়াতে দিতেন না, তিনিও সন্তানের হাত ধরে মাঝরাতে রাজপথে নেমেছেন। যে স্কুলশিক্ষিকা মন দিয়ে পড়িয়ে যাওয়াকেই একমাত্র কর্তব্য বলে জানতেন, তাঁরও মনে হয়েছে এবার পথে না নামলে নিজের সামনে দাঁড়াতে অসুবিধা হবে। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান জোট বেঁধে হটিয়ে দিয়েছে শাসকের প্রিজন ভ্যান। এমন সব প্রেরণাময় দৃশ্য, প্রতিরোধের পরেও কিছু জরুরি কথা থেকে যায়, ওই গোড়ার কথা।
ঠিক কোন সমাজ আমরা রাখছি আমাদের সন্তানসন্ততির সামনে? কোন চরিত্রের অনুসরণে বড় করছি তাদের? জীবনে সাফল্যের মাপকাঠি কীভাবে ঠিক করে দিচ্ছি? কিছুদিন আগে বারাসাতের একটি স্কুলে বাজেয়াপ্ত স্মার্টফোন ফেরত না পাওয়ার আক্রোশে অশিক্ষক কর্মচারীর উপর চড়াও হয়েছিল একদল ছাত্রছাত্রী। অসুস্থ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য ভর্তি হওয়া পড়ুয়ার ভয়ানক মৃত্যুর স্মৃতি এখনো তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় আমাদের। এই মানসিকতা কি ধর্ষণের থেকে খুব আলাদা কিছু? আমাদের সন্তান যে এই সমাজে বড় হয়ে ধর্ষক বা ধর্ষণের সহায়ক বা নীরব দর্শক হবে না – তা কি নিশ্চিত করে বলা যায়? আমাদের ক্রুদ্ধ অশান্ত মন ধর্ষকের কঠিনতম শাস্তি চায়, সুবিচার চায়। কিন্তু একথা ভুললে চলবে না, আর জি কর ছড়িয়ে আছে সারা দেশেই। উত্তরাখণ্ডে ডিউটি সেরে ফেরার পথে ধর্ষিতা হয়ে খুন হলেন এক নার্স, নন্দীগ্রামে অত্যাচার করার পর নগ্ন করে গোটা গ্রাম ঘোরানো হল এক মহিলাকে।
মহারাষ্ট্রের বদলাপুরে ঘটেছে আরও সাংঘাতিক ঘটনা। নার্সারি স্কুলের দুই শিশুকে ধর্ষণ করেছে একজন। যতক্ষণ মানুষ রেল অবরোধ করে সহিংস আন্দোলন না করেছেন, ততক্ষণ স্কুল চুপ করে ছিল, পুলিসও এফআইআর নেয়নি। ১৩ অগাস্টের ঘটনার এফআইআর হয়েছে ১৬ অগাস্ট।
তিলোত্তমার সুবিচার চাইতে গিয়ে মনে রাখতে হবে সুটিয়ার স্কুল শিক্ষক বরুণ বিশ্বাসের কথা, মনে রাখতে হবে কাঠুয়ার আসিফা, হাথরসের নির্যাতিতাকে। এইসব ঘটনায় যেসব রাজনৈতিক দল ধর্ষকদের আড়াল করেছে এবং প্রশ্রয় দিয়েছে, যে দলের নেতারা বিলকিস বানো ও তার সন্তানের ধর্ষক-খুনিদের গলায় মালা পরিয়ে সংবর্ধনা দিয়েছে, অন্য ধর্মের নারীকে ধর্ষণের নিদান দিয়েছে, তারাও আজ ধর্ষকের বিচার চেয়ে ঢুকছে, ঢুকবে এই আন্দোলনের স্রোতে। নিছক ‘অরাজনৈতিক’ প্রতিবাদ দিয়ে কিন্তু এই আক্রমণ রোখা যাবে না। আমাদের উল্টোদিকে রাজনৈতিক ভাবে সংগঠিত শাসক-অপরাধী-মালিকের দুষ্টচক্র। আমাদের চারপাশে মানুষকে অমানুষ বানানোর উপকরণ নিয়ে সদা প্রস্তুত একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। রাজনৈতিক চেতনা ছাড়া একে রুখব কী দিয়ে?
আরো পড়ুন কলকাতা সত্যিই নিরাপদ? ‘পরিচিতি’ রিপোর্টে উঠছে প্রশ্ন
আজ বরং একটু অন্যভাবে ভাবি, শুরু করি নিজেকে দিয়ে। আমার, আমাদের সন্তান জীবনে না পাওয়া বা প্রত্যাখ্যানকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শিখুক। চিত্রতারকা বা ক্রিকেটারদের আগে সে চিনুক রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিং, প্রীতিলতার ছবি। সৌরভ গাঙ্গুলির সাফল্যের খতিয়ানের আগে জানুক বিনেশ ফোগতের লড়াইয়ের কথা। ভারত-পাকিস্তান শত্রুতার চেনা ছকের বাইরে বরং তাকে চিনিয়ে দিই নীরজ চোপড়া, আরশাদ নাদিমের মায়েদের। পাশের পড়ে যাওয়া মানুষটির হাত ধরে তোলার জন্য সে যেন নিজে দু পা পিছিয়ে আসার হিম্মত রাখে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








