অর্ক মুখার্জি

পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২১-৪০ বছর বয়সী যুবক-যুবতীদের জন্য নতুন উৎসাহ প্রকল্প যুব সাথী চালু করেছেন। এই প্রকল্পে সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে কর্মসংস্থানহীন তরুণ নাগরিকরা প্রতি মাসে নগদ টাকা পাবেন। টাকা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর মাসিক ১,৫০০ টাকা করে পাবেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, তারপরেও এই ভাতা চালু থাকবে কিনা তা সেইসময় আবেদনকারীর অর্থনৈতিক অবস্থার উপর নির্ভর করবে। প্রথমে অগাস্ট মাস থেকে চালু করার কথা বললেও, এখন এপ্রিল মাস থেকেই এই উৎসাহ ভাতা চালু করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে মাথায় রেখেই যে এই সিদ্ধান্ত, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে উপকৃত অধিকাংশ মানুষের ভোট তৃণমূল কংগ্রেসের ঝুলিতে গিয়েছিল। তাদের দুশোর বেশি আসনে জয়ের সেটাই অন্যতম কারণ ছিল। এবারের নির্বাচনে যুব সাথী দিয়ে যে একই ফল পাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে তা নিয়ে দ্বিমত থাকা উচিত নয়।

লক্ষ করলে দেখা যাবে, ২০০৬ সালে প্রথম এই ধরনের প্রকল্প তামিলনাড়ুতে চালু হয়। সেই প্রকল্প অনুযায়ী দশম শ্রেণি ও দ্বাদশ শ্রেণি পাশ করা, ডিপ্লোমা বা ডিগ্রিধারী যুবকরা পাঁচ বছর ধরে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নাম লিখিয়েও কর্মহীন থাকলে মাসিক ২০০-১০০০ টাকা ভাতা পান। প্রতিবন্ধী যুবক-যুবতী নাম লেখানোর পর এক বছর কর্মহীন থাকলেই এই ভাতা পেতে পারেন। ওড়িশাতেও বিজু জনতা দলের সরকার স্বয়ম প্রকল্পে ১৮-৩৫ বছর বয়সী কর্মসংস্থানবিহীন যুবকদের নতুন ব্যবসা চালু করতে বা চালু ব্যবসার সম্প্রসারণে এক লক্ষ টাকার সুদবিহীন ঋণ দিত। তেলেঙ্গানায় রাজীব যুব বিকাশম প্রকল্পে কর্মসংস্থানবিহীন যুবকদের সাহায্য করা হয়, যাতে তারা প্রশিক্ষণ এবং ছোট ব্যবসা খোলার জন্য ঋণ পায়। দিল্লিতেও বেকার যুবকদের জন্য মাসিক ভাতা চালু আছে। মহারাষ্ট্রেও প্রশিক্ষণ ও ভাতার ব্যবস্থা আছে।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

বেকারদের হাতে নগদ টাকা দেওয়া নিয়ে অর্থনীতিবিদরা দ্বিধাবিভক্ত। জন মেনার্ড কেইনসের তত্ত্বের উপর ভরসা রেখে অনেক অর্থনীতিবিদ এই উদ্যোগকে স্বল্পমেয়াদি চাহিদার উদ্দীপক বলে অভিহিত করেন। আবার এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে অনেক নয় উদারনীতিবাদী এই ধরনের ভাতাকে কাজের উদ্দীপনা হ্রাসের সম্ভাব্য কারণ বলে মনে করেন। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জি এবং এস্থার ডুফলোর মতে, নগদ হস্তান্তর প্রকল্প দারিদ্র্য কমায় এবং যুবকদের দক্ষতার উন্নতিতে ব্যয় বাড়ায়, ফলে সরকারের খরচ করা টাকা পরে আরও বৃদ্ধি পেয়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ফিরে আসে। অন্যদিকে মিল্টন ফ্রিডম্যান অনুসারী অর্থনীতিবিদরা, যেমন জগদীশ ভগবতী, মনে করেন যে এই ধরনের প্রকল্প চাকরি খোঁজা কমিয়ে সরকারের উপর নির্ভরশীলতা বাড়ায়। ফলে এক ধরনের ‘মরাল হ্যাজার্ড’ তৈরি হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের উৎপাদনশীলতা কমে, সরকারি ঘাটতি বাড়ে এবং মুদ্রাস্ফীতি দেখা যায়।

তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে যুবশ্রী প্রকল্প চালু করে। সেই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে অষ্টম শ্রেণি পাশ (ন্যূনতম) করতে হত, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নাম নথিভুক্ত করতে হত এবং বয়স হতে হত ১৮-৪৫। বামফ্রন্টের আমলে শ্রমমন্ত্রকের অধীনে বেকার যুবক-যুবতীদের মাসে ৫০০ টাকা করে দেওয়া হত এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে। তবে প্রাপক সংখ্যা এত বেশি ছিল না। পরবর্তীকালে টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে ১,০০০ টাকা করা হয়েছিল।

একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ১৮-২৯ বছর বয়সী যুবক-যুবতীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৯%। পুরুষদের মধ্যে ৮.৫%, মহিলাদের ১০%। দেশের মধ্যে যুবকদের বেকারত্বের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ নবম স্থানে আছে। পশ্চিমবঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কলকাতাভিত্তিক সংস্থাগুলো নিয়মিত কর্মী নিয়োগ করে। অনেকের হয়ত মনে নেই, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে স্পেনে গিয়ে বাংলার মহারাজ সৌরভ গাঙ্গুলি ঘটা করে শালবনীতে ইস্পাত কারখানা খোলার কথা ঘোষণা করেছিলেন ২০২৩ সালে। শালবনী আজও সেই কারখানার উদ্বোধনের আশায় দিন গুনছে। শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারি বিদ্যালয় এবং কলেজগুলোতে অবশ্য নিয়োগ হয়। বিভিন্ন বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানেও হয়। ২০২৪-২৫ আর্থিক বর্ষে পশ্চিমবঙ্গ থেকে কাজের খোঁজে বাইরে যাওয়া লোকজনের সংখ্যা ২১-২২ লক্ষ। বলা বাহুল্য, এদের অধিকাংশই যুবক-যুবতী।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, পশ্চিমবঙ্গের বেসরকারি ক্ষেত্রে যারা কাজ করেন তাঁদের একটা বড় অংশ অর্থনৈতিকভাবে শোষিত হন। নামমাত্র বেতনে তাঁদের দিয়ে কাজ করানো হয়। বিভিন্ন পেশার কর্মী এই সমস্যার মুখোমুখি। মাসের শেষে তাঁরা মাইনে হিসাবে যে টাকা পান, সেই টাকায় সংসার চালানো মুশকিল, বিশেষ করে যদি কেউ ৪-৫ জনের পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য হন। যুব সাথী প্রকল্পে ভাতা পেতে যে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে, তা দেখে এমন সরলীকৃত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না যে এরা সবাই কুঁড়ে, বা লাইন দিয়েছে মানে কাঠবেকার, বা টাকাটা নিচ্ছে মানেই সরকারকে ভোট দেবে। আর্থিক সমস্যায় জর্জরিত, ঋণের বোঝা বয়ে বয়ে ক্লান্ত, সরকারের নিয়োগ দুর্নীতির ফলে চাকরি না পাওয়ার যন্ত্রণা নিয়েও বহু বেকার যুবক, যুবতী আবেদন করবেন বা করছেন এবং লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।

আরো পড়ুন ভর্তুকি উন্নয়নের পরিপন্থী: বাজার মৌলবাদীদের কুসংস্কার

যুব সাথী প্রকল্পে আবেদন করতে ব্লকে ব্লকে লম্বা লাইনের ছবি রাজনৈতিক সমর্থনের দৃশ্য নির্মাণ করতে ব্যবহার করা যেতে পারে, হয়ত শাসক করবেও। কিন্তু রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন আর ভোটে সমর্থন পাওয়া আলাদা জিনিস। একজন ২১ বছর বয়সী বা ২৫ বছর বয়সী যুবক/যুবতীর অর্থনৈতিক চাহিদা আর ত্রিশোর্ধ্ব যুবক/যুবতীর অর্থনৈতিক চাহিদা আলাদা। প্রকল্প ঘোষণার আগে এরকম কিছু আলাদা স্তর এবং সেই স্তর অনুযায়ী ভাতার পরিমাণ নির্ধারিত হলে অনেক বেশি উপকার হত। আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য যদি ভাতার পরিমাণ বেশি হত, তাহলে এই প্রকল্পের সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা বেশি হত।

বিরোধীদের উচিত কেবলমাত্র সমালোচনা না করে আবেদনকারীদের সাহায্যের জন্য শিবির করা। আজকের পরিস্থিতিতে এই ভাতা কেবলমাত্র ভোট রাজনীতির অস্ত্র বা ‘পাইয়ে দেওয়া’ নয়। এখনকার আর্থসামাজিক অবস্থায় যুব সম্প্রদায়ের এক বড় অংশের প্রয়োজন পরিবারের জন্য আর্থিক সুরক্ষা বলয় এবং জীবনের মানোন্নয়নের কার্যকরী ভিত্তি। তাই এই মুহূর্তে যুব সাথী অপ্রয়োজনীয়, অহেতুক ব্যয়বহুল, কর্মপ্রেরণার পরিপন্থী এবং কেবল শাসকের ভোট সুরক্ষিত করার সামাজিক প্রকল্প— এমন কথা বলার অবকাশ নেই।

অবশ্যই বিরোধীরা এ প্রশ্ন তুলতে পারে যে, বয়স ও আর্থিক ক্ষমতার স্তর অনুযায়ী কেন ভাতা নির্ধারিত হল না? এছাড়া, শুধুমাত্র ভাতা না দিয়ে যদি স্বনির্ভরতা তৈরির লক্ষ্যে কিছু প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা এই প্রকল্পে থাকত, তাহলে অর্থনীতিতে আরও জোরালো প্রভাব পড়তে পারত। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচির আয়োজন করতে, বিভিন্ন প্রচারাভিযানে এবং তথ্য সংগ্রহে অনেক স্বেচ্ছাসেবক লাগে। এই যুব সাথীদের সেইসব কাজেও লাগানো যেতে পারত। তাহলে অবশ্যই তৃণমূল রাজনৈতিকভাবে তারাই ‘পাইয়ে দিচ্ছে’— এই প্রচার করতে পারত। কিন্তু প্রাপকরা অনেক বেশি সামাজিক সম্মান পেতেন এবং মিছিল বা জনসভায় যোগ দেওয়ার রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে উপেক্ষা করতে পারতেন।

তৃণমূল নেতারা দল আর সরকারকে গুলিয়ে ফেলে সরকারি প্রকল্প তাঁদেরই দান বলে মনে করেন এবং প্রকল্প থেকে উপকৃতদের দলীয় সভা সমিতিতে হাজির হতে বাধ্য করেন। তাই যুব সাথী প্রকল্প সত্যি সত্যি কতটা যুব সম্প্রদায়ের সাথী হবে আর কতটা সরকারি দলের সমর্থন আদায়ের কল, তা ভবিষ্যতে বলা যাবে। কিন্তু এই মুহূর্তে আর্থিকভাবে শোষিত যুবক-যুবতীদের জন্যে এই প্রকল্প যে দরকারি তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এই প্রকল্পের সঙ্গে আর্থিক স্বাবলম্বনের ব্যবস্থা যুক্ত না করলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো উপকার হবে না।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.