‘মোটকু মাইতি বাঁটকুল রায়/ক্রুদ্ধ হয়ে যুদ্ধে যায়/বেঁটেখাটো লিকপিকে পায়/ছেতরে চলে কেতরে যায়/মোটকু মাইতি বাঁটকুল রায়।’

45RPM-এর গ্রামোফোন রেকর্ডে কাজী সব্যসাচীর ভরাট গলায় যখন কবি নজরুলের এই শিশুপাঠ্য ছড়ার আবৃত্তি শুনেছি তখন ওই মজাদার উচ্চারণটাই ছিল মূল আকর্ষণ। সব্যসাচী তাঁর গলার কেরামতিতে লেখাটার মজা শ্রোতার মধ্যে সঞ্চারিত করার কাজে অসম্ভব সফল হয়েছিলেন বলেই এতবছর পরেও ওই ছড়ার লাইনগুলো এখনো মনে থেকে গেছে কার্যত ওই শোনার আনন্দে। অনেক পরে ক্লাস ফোর বা ফাইভের একটা বাংলা পাঠ্যবইতে লেখাটা আমি খুঁজে পাই। কিন্তু মাঝের বছরগুলোতে অনেকবার মনে মনে জোরে জোরে বলে এসেছি ছড়াটা। তা করতে গিয়ে লাইনগুলোর ভিতর থেকে উঠে এসেছে একটা দৃশ্যকল্প। একজন মোটা ও বেঁটে মানুষ নড়বড় করতে করতে যুদ্ধে চলেছেন – ব্যাপারটার মধ্যে কেমন একটা সহজ হাসির স্ফুলিঙ্গ আছে। কী জানি, বাঁটকুল রায়ের চরিত্রটা যদি রোগা হত, ছড়াটার মজা হয়ত তেমন জমত না! প্রত্যেকটা শব্দই আমাদের মনে একটা দৃশ্যরূপ বা বস্তুরূপ বা অনুভূতির জন্ম দেয়। মোটকু মাইতি বাঁটকুল রায়ও ঠিক তেমনি আমাদের সামনে তুলে ধরে এক পৃথুল চরিত্রের ছবি। আমাদের অবচেতন থেকে যে হাস্যরসের ধারাজলে স্নায়ুর উদ্দীপ্তি, তার পিছনেও কি আসলে এই পৃথুল চরিত্রের আকারগত বৈশিষ্ট্যই সক্রিয় নয়?

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কথা যখন উঠলই, তখন মনে আসতে পারে আরও একটা ছড়ার কথা। এই ছড়াটা আমরা অনেকেই ক্লাস ফাইভের পাঠ্যবইয়ে পড়েছি। কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের লেখা ওই ছড়ার মুখ্য চরিত্র রামসুক তেওয়ারি। রামসুকের আদি নিবাস উত্তর ভারতে হলেও সে বাংলায় এসেছিল জীবিকার সন্ধানে। প্রকাণ্ড চেহারা, উচ্চকিতভাবে স্ফীত তার মধ্যদেশ, চমকে ওঠার মত দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা, গড়পড়তা বাঙালি যার ধারেকাছেও আসে না। কাহিনিসূত্রে রামসুককে আমরা পৌঁছতে দেখি এক ট্র্যাজেডির কিনারায় – বাংলার জলহাওয়া তার ধাতে সইল না। ফলে কবিবর্ণিত ওই বিরাট বপু উত্তর ভারতীয় অচিরেই রোগে ভোগে হয়ে উঠল এমনই শীর্ণ যে কবি তার উপমা দিয়েছেন ‘পাঞ্জাবি হল তার পুরাতন গেঞ্জি’। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, শিশুপাঠ্য এই ছড়ায় স্বাস্থ্যবান রামসুকের রোগাক্রান্ত পরিণতি পাঠকের মনে কোনো বেদনা বা সহানুভূতি তৈরি করে না। কবির মনেও তেমন কোনো অভিপ্রায় ছিল বলে মনে হয় না। ছড়াটা আসলে পরিবেশিত হয়েছে একটা মজার জায়গা থেকে। এক স্থূলকায় খাদ্যরসিক কেমনভাবে পেটের অসুখে ভুগে ভুগে বিশীর্ণ হয়ে অবশেষে নিজের প্রদেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হল – ছড়ার উপাদান আসলে সেটুকুই। আবার খেয়াল করলে দেখব, রামসুক তেওয়ারিকে ছড়ায় মোটাসোটা চেহারায় না দেখালে ছড়ার মজা মাঠে মারা যায়।

খুব সূক্ষ্ম বিচারে মোটা আর স্বাস্থ্যবানের মধ্যে একটা প্রভেদ নিশ্চয়ই আছে। স্বাস্থ্য বিশারদ, পুষ্টি বিশেষজ্ঞ কিংবা চিকিৎসকের পরিভাষায় হয়ত সেটা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া যায়। সাহিত্যে সেই সূক্ষ্মতা নির্দেশ করার তেমন সুযোগ নেই, কারণ সেখানে রসসৃষ্টিই প্রধান উপজীব্য। আর অন্যতম সেরা হাস্যরসের অব্যর্থ উপাদান হিসাবে একটা মোটা চেহারা একেবারে সঠিক রেসের ঘোড়া, না জিতে তার উপায় নেই। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এইসব চরিত্রের মধ্যে দিয়ে হাস্যরসের আদল ফুটিয়ে তুলতে গেলে তার সঙ্গে কিছু সাধারণ লক্ষণ বা চেনা রীতি যুক্ত করে দেওয়া হয়। যেমন দেখা যাবে এদের খাদ্য তালিকা লম্বা। ধরে নেওয়া হয় এরা সকলেই প্রচুর খেতে পারে আর এই বিশেষ প্রবণতা নিজেই যেন একটা হাসির উপাদান। এই সূত্রে আমাদের মনে পড়ে যাবে খাপছাড়া-র দামোদর শেঠকে – ‘অল্পেতে খুশি হবে/দামোদর শেঠ কি/মুড়কির মোয়া চাই,/চাই ভাজা ভেটকি’। এই লেখায় রবীন্দ্রনাথ দামোদর দামোদর শেঠের জন্য বাঞ্ছনীয় খাবারের একটা তালিকা দিয়েছেন আর শেষে তার কারণটাও জানিয়ে দিয়েছেন

মনে রেখো বড়ো মাপে
করা চাই আয়োজন,
কলেবর খাটো নয় –
তিন মোন প্রায় ওজন।

এর পাশাপাশি কোনো চরিত্রকে অপদার্থ, অকর্মণ্য, কৌতুককর বা বিদ্রুপের লক্ষ্য করে তুলতে হলে তাকে মোটা চেহারায় আঁকা। অপদার্থ বা দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিসকে সাধারণত সিনেমায়, নাটকে দেখানো হয় বিশালবপু। এ যেন এক আশ্চর্য বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে দর্শকমনে। তাঁরা শুধু হেসে কুটিপাটি হন না, বিশ্বাস করেন যে এই লোকটা এই ধরনের কুকর্ম করতেই পারে। হেমেন্দ্রকুমার রায়ের গোয়েন্দা উপন্যাসের দারোগা সুন্দরবাবুর অকর্মণ্যতার পাশাপাশি যেভাবে তার খাওয়ার বর্ণনা দেওয়া হয়। তাতে যেন অকর্মণ্যতার সঙ্গে ওই চরিত্রের একটা যোগ সামাজিকভাবেই পাঠকের কাছে প্রশ্রয় পায়। আসলে প্রত্যেকটা শব্দের একটা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মাত্রা থাকে। মোটা বা স্থূল শব্দটা সাধারণত তর্জনী উঁচিয়ে রাখে এক ধরনের অপকৃষ্টতার দিকে। একমাত্র ‘মোটা রোজগার’ কথাটা ছাড়া ‘মোটা মাথা’, ‘মোটা রসিকতা’, ‘মোটা গলা’ সবই ঘুরেফিরে একরকম আপাত রুচিহীনতার কথাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়।

ভাষাবিদ্যায় আগ্রহী যে কেউ এই সূত্রে খেয়াল করে দেখতে পারেন, স্থূলতার চরিত্র বৈশিষ্ট্য বোঝাতে কেমনভাবে আমাদের ভাষা দুহাত ভরে উজাড় করে নেয় নানা শব্দ। ব্যবহারে চলে আসে কিছু বাছাই শব্দ, যেমন ভোঁদা, গাবদা, গোদা, গাবলু, মোটকা ইত্যাদি। এর কোনোটারই স্পষ্ট আভিধানিক অর্থ নেই। শব্দগুলো ব্যবহারের নির্দিষ্ট কারণ হিসাবে যুক্ত হয়ে আছে কোনো না কোনো স্থূলতার আভাস। হলিউডের জনপ্রিয় কমেডি জুটি লরেল-হার্ডির মধ্যে একজন স্থূল আকৃতির। পুরনো বাংলা সিনেমায় নৃপতি চ্যাটার্জি-নবদ্বীপ হালদার জুটির পাশে মোটাসোটা শ্যাম লাহাকে আনতে না পারলে হাসি ঠিক জমে না। নারায়ণ দেবনাথের তুলিতে কিংবদন্তি হয়ে ওঠা জনপ্রিয় হাঁদা-ভোঁদা জুটিতে ভোঁদা চরিত্রটা কিন্তু মোটাসোটা। গল্পগুলোয় আমরা হাঁদাকে বারবারই দেখি ভোঁদাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে। একই ব্যাপার নন্টে-ফন্টের কাহিনীতে। হোস্টেল সুপার বেজায় মোটা। তাঁকে কেন্দ্র করে ঘটে চলে অনাবিল হাসির কাণ্ডকারখানা। পরশুরামের গল্পের মিস পৃথুলা প্রায় একই গোত্রের। রসসঞ্চারে অদ্বিতীয় চার্লি চ্যাপলিনের নানা ছবিতেই তো কৌতুক রসের আধার এইসব মোটা লোকেরাই।

কিন্তু এত কথা বলার পরে এটাও নিশ্চয়ই একটু ভেবে দেখা দরকার যে সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য, বিনোদন জগৎ চিহ্নিত করে দিয়েছে – স্থূলতা উপহাসের ব্যাপার। এর একটা বিপজ্জনক দিক আছে। মোটা হওয়ার সঙ্গে একজন মানুষের বুদ্ধিমত্তার কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক যে নেই – এই বৈজ্ঞানিক সত্য আড়াল হয়ে যায়। কেউ শখ করে মোটা হতে চায় না। বরং মোটা থেকে রোগা হওয়ার হরেক কিসিমের বন্দোবস্তের কথা আমরা প্রতিনিয়ত বিজ্ঞাপনে পড়ি। ছয় সপ্তাহে ছ কেজি মেদ ঝরিয়ে দেওয়ার গ্যারান্টি দেওয়া ক্লিনিকের প্রকাণ্ড ব্যানার, বিলবোর্ড চোখের সামনেই জ্বলজ্বল করে, বোধহয় খানিকটা প্ররোচনাও দেয়।

এরপরও যদি কোন শিশু বা কিশোর শারীরিক বা বংশগত প্রবণতায় কিছুটা রোগা (কম ওজন নয়) হয়, তাদের একনায়কতন্ত্রী মায়েরা বাচ্চাদের প্রয়োজনের বাইরে গাদাগুচ্ছের খাবার খাইয়ে নাদুসনুদুস করে তুলে আহ্লাদিত হন। একটু বড় হলে তারা যখন স্কুলে যাবে, সমাজ সংস্কৃতির নির্দিষ্ট অভিমুখ কিন্তু তাদের ‘গাবদা’ বিশেষণে বিদ্রুপ করবে, ধরেই নেওয়া হবে যেহেতু তারা শারীরিকভাবে স্থূল, তাদের বুদ্ধি বিবেচনা অন্যদের তুলনায় কম। অনায়াসে তাদের মোটা বলে খেপানো যায়, পিছনে লাগা যায়, মাস্টারমশাই দিদিমণিরাও তাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। এই লাইসেন্স তাঁরা পেয়ে যান, কারণ উদ্দিষ্ট ছাত্র বা ছাত্রী শারীরিকভাবে স্থূল, তার ডাকনাম হয়ে গেছে ‘কুমড়োপটাশ’ বা ‘ষষ্ঠীচরণ’। এই চরিত্রগুলোর স্রষ্টাকে বিন্দুমাত্র অশ্রদ্ধা না করেই কথাটা লিখলাম। বানানো কথা নয়, বড্ড অপ্রিয় বাস্তব হল, ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিকেল বা ডিগ্রি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাগত ছাত্রছাত্রীদের যে র‍্যাগিং চলে, তাতে বেশি নজর দেওয়া হয় তুলনায় মোটা পড়ুয়াদের উপর। হয়ত এটাও ওই বিশেষ শব্দের প্রতি বহমান সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ফল।

আসলে মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হল গড়পড়তা আদলের বাইরে যা কিছু, তাকেই ‘অপর’ বলে দাগিয়ে দেওয়া। শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে এই একই মানসিকতার প্রকাশ দেখা গেছে। বিদ্যাসাগর মশাই দুশো বছর আগে নীতিশিক্ষা দিয়েছিলেন ‘অন্ধকে অন্ধ বলিও না, খোঁড়াকে খোঁড়া বলিও না।’ কিন্তু সমাজে এই বোধোদয় হতে ঢের সময় লেগে গেছে। আজ এতবছর পরে সরকারি পরিভাষায় প্রতিবন্ধী শব্দটার ব্যবহার বন্ধ হয়েছে, যদিও আমরা অনায়াসেই তাদের ঢিল ছুড়ি বা আড়ালে তাদের ব্যঙ্গবিদ্রুপ করি। আমাদের জিভ অভিধান বহির্ভূত ভাষায় একইভাবে স্থূল মানুষদের সম্পর্কে বেপরোয়া।

আরো পড়ুন প্রতিবন্ধী মানুষের কি ভাল ভাষাটুকুও প্রাপ্য নয়?

তবে এ নিয়ে সাহিত্যিক বা অন্যান্য রসস্রষ্টাদের দোষারোপ করে লাভ নেই, কারণ মানুষের মনের স্বাভাবিক রসের পুষ্টি ও চর্চায় তাঁদের উপজীব্য স্থূলতা হলে, একটা কৌতুক ভেসে ওঠে। ঠিক তেমনি একটা মৃত্যুর দৃশ্য বেদনায় আচ্ছন্ন করবে – এটাই সহজাত প্রতিক্রিয়া। কৌতুক করা আর কাউকে তার শারীরিক কারণে অবিবেচক শব্দবিদ্যুতের শিখায় দগ্ধ করার মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব। আমার মনে হয় না, পৃথিবীর কোনো কৌতুক সাহিত্যে এই ধর্ষকামিতার প্রশ্রয় থাকে। ফলে এখানে ব্যক্তিবর্গের সংবেদনশীলতার কাছে আবেদন রাখা ছাড়া গত্যন্তর নেই। এক ধরনের সমানুভবী (empathetic) মনের চারাগাছ নিজেদের মধ্যে রোপণ করা ছাড়া উপায় নেই। হয়ত এই প্রশ্নের ভাবনায় কিছু সুবিধা হতে পারে একটা বিষয় উল্লেখে।

বছর কয়েক আগে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা শিশুদের বৃদ্ধি বিষয়ক গ্রোথ চার্টে পুষ্টিজনিত বিকৃতি হিসাবে অত্যধিক ওজন বা স্থূলতাকে চিহ্নিত করেছে। একে বলা হয় ‘গ্রোথ রিলেটেড ডিসঅর্ডার’। অর্থাৎ বেশি ওজনের শিশু আসলে সুস্থ নয়। কিন্তু এই দিকনির্দেশে আমাদের স্বভাব বদলাবে কিনা সেটা লাখ টাকার প্রশ্ন। ততদিন হতভাগ্য স্থূল কিশোর কিশোরীরা অপমানে, বিদ্রুপে, উপেক্ষায়, হীনমন্যতায় কুঁকড়ে থাকুক গে। আমাদের বিবেক থাকুক শীতঘুমে।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.