অর্ক মুখার্জি

শুরু হয়ে গেছে সেমিস্টার ব্যবস্থায় প্রথম উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। এর আগের বছর থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ উচ্চমাধ্যমিকে সেমিস্টার ব্যবস্থা চালু করেছে। তাদের ঘোষণা অনুযায়ী, একাদশ শ্রেণিতে হবে প্রথম ও দ্বিতীয় সেমিস্টার, দ্বাদশ শ্রেণিতে হবে তৃতীয় ও চতুর্থ সেমিস্টারের পরীক্ষা। আগেরবার এই ব্যবস্থায় একাদশ শ্রেণির পরীক্ষা আয়োজিত হলেও উচ্চমাধ্যমিক পুরনো নিয়মেই হয়েছিল। এবারই প্রথম উচ্চমাধ্যমিকের তৃতীয় সেমিস্টারের পরীক্ষা আলাদা করে হচ্ছে। সংসদ স্থির করেছিল, দ্বাদশ শ্রেণির তৃতীয় সেমিস্টার এমসিকিউ নির্ভর হবে আর চতুর্থ সেমিস্টারে সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও রচনাধর্মী প্রশ্ন থাকবে। প্রথম সেমিস্টারের বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষাগুলোর জন্য এক ঘন্টা ১৫ মিনিট সময় ধার্য করা হয়েছে এবং চতুর্থ সেমিস্টারের বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষাগুলোর জন্য দু ঘন্টা সময় বরাদ্দ করা হয়েছে। উচ্চমাধ্যমিকের তৃতীয় সেমিস্টার পরীক্ষা ৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয়েছে, শেষ হবে ২২ সেপ্টেম্বর।

পরীক্ষা ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ছাত্রছাত্রীর বক্তব্য – বাংলা, ইংরিজি, শারীরবিদ্যা, ভূগোল, পুষ্টিবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মত বিষয়ের জন্য সংসদ নির্ধারিত সময় এক ঘন্টা ১৫ মিনিট ঠিক আছে। কিন্তু যেসব বিষয়ে হিসাব করার ব্যাপার থাকে, যেমন অঙ্ক, পদার্থবিদ্যা, হিসাবশাস্ত্র – সেখানে এই সময় যথেষ্ট নয়। ছাত্রছাত্রীদের ভেবে, পড়ে, বুঝে, কষে পুরো প্রশ্নপত্রের উত্তর করার মত সময় মিলছে না। এছাড়া ওএমআর শিটে নাম, রোল নম্বর লিখতে গিয়ে অনেক ছাত্রছাত্রী ভুল করে ফেলছে। ফলে নতুন করে ওএমআর নিয়ে আবার সবকিছু পূরণ করে লিখে পরীক্ষা দিতে গিয়ে অনেক ছাত্রছাত্রী উৎকণ্ঠিত হয়ে জানা প্রশ্নের উত্তরও ভুল করে ফেলছে। পদার্থবিদ্যা এবং হিসাবশাস্ত্র পরীক্ষার পর বহু ছাত্রছাত্রী অভিযোগ তুলেছে ওএমআর পূরণ করতে দেরি হওয়ায় তারা পুরো প্রশ্নপত্রের উত্তর দেওয়ার সময় পায়নি।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে থেকে এই অভিযোগও উঠছে যে সংসদ তাদের গিনিপিগের মত ব্যবহার করে সেমিস্টার ব্যবস্থার নামে পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। পুরনো উচ্চমাধ্যমিক ব্যবস্থায় পরীক্ষার মাস তিনেক আগে স্কুলে টেস্ট পরীক্ষা হত। ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের প্রস্তুতি ঝালিয়ে নিতে পারত। ফাইনাল পরীক্ষায় কী কী সুবিধা বা অসুবিধার সম্মুখীন হতে পারে, তার ধারণাও সেই পরীক্ষার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জন করত। এবারে এই সেমিস্টারের পঠনপাঠন শুরু হয়েছিল এপ্রিল মাসে। তারপর প্রায় দুমাস ছিল লম্বা গরমের ছুটি। কোনো স্কুলই খোলা ছিল না। আবার জুন মাস থেকে স্কুলগুলোতে পঠনপাঠন শুরু হয়েছে। এই সেমিস্টারে অন্যান্য ছুটিছাটা বাদ দিলে মোট ১০০ দিনও লেখাপড়া হয়েছে কিনা সন্দেহ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি পড়িয়ে সিলেবাস শেষ করে স্কুলগুলো তাদের কর্তব্য শেষ করেছে। এত দ্রুত পঠনপাঠনের সঙ্গে হয়ত ৫%-১০% ছাত্রছাত্রী নিজস্ব ক্ষমতায় খাপ খাওয়াতে পারে, বাকিরা সমস্যায় পড়বে বা পড়েছে। অগত্যা বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীর প্রধান ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে টিউশনির ব্যাচ বা অনলাইন কোচিং। বলা যেতে পারে, এই সেমিস্টার ব্যবস্থায় ক্লাসের দিন কম থাকায় তারা আরও বেশি মাত্রায় সমান্তরাল বেসরকারি ব্যবস্থা, অর্থাৎ কোচিং সেন্টার, গৃহশিক্ষক বা অনলাইন শিক্ষার দিকে ঝুঁকেছে।

দ্বাদশ শ্রেণির পুনঃসম্পাদিত বাংলা এবং ইংরিজি বই ছাত্রছাত্রীরা হাতে পেয়েছিল জুন মাসে। আগের বছর বই ছাপা হলেও এবারে কিছু গল্প এবং নাটক বদল করা হয়েছে। স্বভাবতই এই বিলম্বে ছাত্রছাত্রীদের প্রস্তুতিতে নানারকম সমস্যা তৈরি হয়েছে। পাঠক্রমে এই বদলের কথা ২০২৪ সালের নভেম্বরে জানানো হলেও পুনঃসম্পাদিত বই ছাত্রছাত্রীদের হাতে তুলে দিতে এত দেরি কেন হল তা অতি আশ্চর্যের। শুনতে যতই তেতো লাগুক, এহেন বিলম্ব কিন্তু সংসদের ছাত্রছাত্রীদের প্রতি উদাসীনতা এবং শিক্ষাবর্ষ পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিকল্পনাহীনতার নিদর্শন।

আরো পড়ুন সেমিস্টার: স্কুলশিক্ষার হাড় জিরজিরে চেহারা ঢেকে রাখার কল

সেমিস্টার ব্যবস্থা এবং এমসিকিউ নির্ভর পরীক্ষা চালু করার পিছনে সংসদের যুক্তি ছিল – এই ব্যবস্থাপনায় ছাত্রছাত্রীরা আরও গভীরভাবে শিখবে, শিখতে আনন্দ পাবে এবং পরবর্তীকালের বিভিন্ন প্রবেশিকা বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণি থেকেই তৈরি হয়ে যাবে। সংসদের যুক্তি মাথায় রাখলে বলতে হয়, ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করতে হলে বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক শিক্ষার উপযোগী পরিকল্পনা দরকার। এরকম খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত বা সিদ্ধান্তের নামে পরীক্ষানিরীক্ষা কখনো শিক্ষার্থীদের ভাল করতে পারে না।

সংসদ স্কুলগুলোকে আগেকার টেস্ট পরীক্ষার মত কোনো পরীক্ষার আয়োজন করতে না দিয়ে সরাসরি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আয়োজন করেছে এবং অভ্যাসের অভাবে ছাত্রছাত্রীরা আরও বেশি সমস্যায় পড়েছে। এই দায় সংসদকেই নিতে হবে। সেমিস্টার ব্যবস্থাকে পরীক্ষা ব্যবস্থা হিসাবেই দেখা উচিত, পরীক্ষানিরীক্ষা হিসাবে নয়। ছাত্রছাত্রীরা যে গিনিপিগ নয়, সেকথাও মনে রাখা দরকার।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.