অনলাইনে জুয়াচুরি করে টাকা গায়েবের ঘটনা আমাদের দেশে আকছার ঘটছে। কিন্তু সফটওয়্যারের সাহায্যে ভোটার তালিকা থেকে কারোর নাম গায়েব করে দেওয়ার ঘটনা আমাদের জানা ছিল না। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাহুল গান্ধী সাংবাদিক সম্মেলন করে সেই অভিযোগই আনলেন। শুধু তাই নয়, তাঁর অভিযোগ – খোদ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার অপরাধীদের সুরক্ষা দিচ্ছেন।
দিল্লিতে সেদিনের সাংবাদিক সম্মেলনে রাহুল বলেন, বিরোধী সমর্থকদের বাছাই করে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। দলিত, আদিবাসী, অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (ওবিসি), ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিশানা করা হচ্ছে। ২০২৩ সালে কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনের আগে আলন্দ বিধানসভা কেন্দ্রে কারচুপি করে ৬,০১৮ জন ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। ওই বিধানসভা কেন্দ্রের দশটা বুথে সবচেয়ে বেশি নাম কাটার চেষ্টা হয়, যারমধ্যে আটটা বুথে কংগ্রেসের বেশি ভোট পাওয়ার ইতিহাস ছিল। অর্থাৎ বাছাই করে কংগ্রেসের শক্তিশালী বুথগুলোতেই এই অপচেষ্টা হয়েছিল।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
সাংবাদিক সম্মেলনে রাহুল বলেন, ঘটনাচক্রে সেই চুরি ধরা পড়ে যায়। একজন বুথ স্তরের আধিকারিক (বিএলও) দেখেন যে তাঁর আত্মীয়ের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তিনি তখন খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন তাঁর এক প্রতিবেশীই অনলাইনে এই আবেদন করেছিলেন। প্রতিবেশীকে জিজ্ঞেস করে জানা যায়, তিনি মোটেই কোনো আবেদন করেননি। তাহলে কাজটা করল কে? তা খুঁজতে গিয়েই ধরা পড়ে অনলাইনে এই জুয়াচুরির ঘটনা।
আইনত, কোনো ভোটার অন্য কারোর নাম বাদ দেওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ভোটারের নাম আবেদনকারী হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। আবেদনকারী হিসাবে যাঁদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে, তাঁরা এসবের কিছুই জানেন না। রাহুল কর্ণাটকের বাইরের বেশকিছু মোবাইল নম্বর সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। ওই ফোন নম্বর ব্যবহার করে অনলাইনে আবেদন করা হয়েছিল। গোদাবাঈ নামে এক বৃদ্ধা ১২ জন ভোটারের নাম কাটার আবেদন করেছিলেন। সাংবাদিক সম্মেলনে রাহুল গোদাবাঈয়ের ভিডিও বার্তা দেখান। তাতে ওই বৃদ্ধা বলছেন যে এমন কোনো আবেদন তিনি করেননি। সূর্যকান্ত নামে এক ব্যক্তি ১৪ মিনিটে ১২ জনের নাম কাটার আবেদন করেছিলেন বলে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট দেখাচ্ছে। সম্মেলনে তিনি সশরীরে হাজির হয়ে বলেন, এসব জানেন না। যে ১২ জনের নাম কাটার আবেদন তিনি করেছিলেন বলে জানা যাচ্ছে, তাঁদের অন্যতমা ববিতা চৌধুরীও এই সাংবাদিক সম্মেলনে হাজির ছিলেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এর আগে বিহারের এসআইআর-এ মৃত বলে ঘোষিত কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে দিল্লিতে সাক্ষাৎ করে এবং তার ভিডিও প্রচার করে রাহুল হাতেনাতে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, কী নিদারুণ অনিয়ম হয়েছে। একই কায়দায় তিনি ১৮ সেপ্টেম্বরের সাংবাদিক সম্মেলনে সূর্যকান্তকে হাজির করেন।
আবার এ-ও জানা যায় যে নাগরাজ নামে এক ব্যক্তি মাত্র ৩৬ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুজন ভোটারের নাম কাটার আবেদন করেন। আবেদনের সময়টাও অদ্ভুত – ভোর চারটে। রাহুল উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্ন করেন, মাত্র ৩৬ সেকেন্ডে দুজনের নাম কাটার আবেদন করা কি কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব?
রাহুলের অভিযোগ, কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করে এই অপচেষ্টা করা হয়েছে। বেশ কয়েকটা উদাহরণ পেশ করে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন, যে কোনো বুথের ভোটার তালিকায় প্রথমে যাঁর নাম আছে, তাঁকেই আবেদনকারী হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। নির্ঘাত সফটওয়্যারটাই সেরকমভাবে তৈরি। রাহুল আরও বলেন, ৬,০১৮ জন ভোটারের ক্ষেত্রে এই অপচেষ্টা ধরা পড়েছে। এই উপায়ে আরও অনেক ভোটারের নাম বাদ গিয়ে থাকতে পারে।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অভিযুক্ত করার কারণ, তিনি নাকি তদন্তে সাহায্য করছেন না। কর্ণাটক সিআইডি এই ঘটনার তদন্তে নেমে ১৮ মাসে ১৮ বার ভারতের নির্বাচন কমিশনে চিঠি পাঠিয়েছিল। তারা অনলাইনে আবেদন করার জন্যে ইন্টারনেট প্রোটোকল (আইপি) অ্যাড্রেস, ডিভাইস পোর্ট, এককালীন পাসওয়ার্ডের (ওটিপি) গন্তব্য জানতে চায়। এসব থাকলে কে বা কারা, কোথা থেকে এইসব ভুয়ো আবেদন করেছিল তা জানা সম্ভব। কর্ণাটক রাজ্য নির্বাচন কমিশনও ভারতের নির্বাচন কমিশনকে চিঠি লেখে। কারোর কোনো চিঠিরই সদুত্তর জ্ঞানেশ কুমাররা দেননি। রাহুল কবে কবে চিঠি দেওয়া হয়েছিল, তাও উল্লেখ করেন। ব্যঙ্গ করে বলেন ‘ক্রনোলজি সমঝিয়ে’। রাহুলের অভিযোগ, তদন্তে সাহায্য না করা থেকেই প্রমাণিত, জ্ঞানেশ জানেন এইসব অপকর্মের পিছনে কে আছে। ভোট চোর, দেশের গণতন্ত্র ও সংবিধান ধ্বংসকারীদের জ্ঞানেশ সুরক্ষা দিচ্ছেন।
রাহুল নির্বাচন কমিশনকে এক সপ্তাহের মধ্যে কর্ণাটক সিআইডির কাছে যাবতীয় তথ্য পেশ করতে বলেছেন। এই সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার বিশেষ কারণ আছে। এর আগে রাহুলের আনা অভিযোগের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন এক সপ্তাহের মধ্যে হলফনামা জমা দিয়ে তাঁকে লিখিত অভিযোগ জানাতে বলেছিল। এভাবে অন্যের নাম ব্যবহার করে একজন কী করে লগ ইন করল, ওটিপি পেল – তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।
এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যদি নিরাপত্তা ঢিলেঢালা থাকে, তাহলে যে কোনো ব্যক্তির নাম ব্যবহার করেই আরও অনেকরকম অপরাধ করা যেতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের প্রত্যক্ষ যোগসাজশ ছাড়া এই জুয়াচুরি কি সম্ভব? রাহুল সরাসরি বলেননি, বল ঠেলে দিয়েছেন জনতার আদালতের দিকে।
সেদিনের সাংবাদিক সম্মেলনে রাহুল মহারাষ্ট্রের রাজুরা বিধানসভা কেন্দ্রে ৬,৮৫০ জন ভুয়ো ভোটারের নাম তালিকায় যোগ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন। নমুনা হিসাবে যা দেখিয়েছেন, তাতে অনেক ভোটারের নামের জায়গায় ইংরিজি বর্ণমালা এলোমেলো করে লেখা রয়েছে। ঠিকানা হিসাবে স্বস্তি শব্দটা বেশ কয়েকবার ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ ভুয়ো ভোটারের নাম ঢোকানো এবং প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া – দুই কৌশলেই ভোট চুরি হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ এবং কাজটা চলছে একাধিক রাজ্যে।
গত ৭ জুন দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজে প্রকাশিত এক নিবন্ধে রাহুল মহারাষ্ট্রের বিধানসভা নির্বাচনে পাঁচরকম পদ্ধতিতে ভোট চুরির অভিযোগ এনেছিলেন। সে রাজ্যের ভোটার তালিকায় অস্বাভাবিক হারে নতুন ভোটারের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল। সেই নিবন্ধে তিনি অভিযোগ করেছিলেন, মহারাষ্ট্রে প্রায় এক লক্ষ বুথের মধ্যে মাত্র ১২,০০০ বুথে ভোটার সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বুথগুলো রাজ্যের এমন ৮৫ খানা বিধানসভা কেন্দ্রে ছড়িয়ে আছে, যেখানে ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ফল খারাপ হয়েছিল। এরপর ৭ অগাস্ট সাংবাদিক সম্মেলন করে তিনি কর্ণাটক রাজ্যের ব্যাঙ্গালোর সেন্ট্রাল লোকসভা কেন্দ্রের মহাদেবপুরা বিধানসভায় ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ করেন। অভিযোগ, সেখানেও পাঁচরকম পদ্ধতিতে মোট ১,০০,২৫০ জন ভুয়ো ভোটারের নাম ঢুকিয়ে ২০২৪ নির্বাচনে বিজেপিকে জিতিয়ে দেওয়া হয়।
রাহুলের পেশ করা তথ্যে জানা যায়, সেখানকার ভোটার তালিকায় যেমন প্রচুর ভুয়ো ঠিকানা আছে, তেমন অনেকের বাবার নামের জায়গায় ইংরিজি বর্ণমালার কিছু অক্ষর এলোমেলোভাবে লেখা আছে। ১৯ তারিখের সাংবাদিক সম্মেলনে রাহুল দেখালেন, খোদ ভোটারের নামেই ওই কাণ্ড করা হয়েছে, ভুয়ো ঠিকানাও আছে।
আগে প্রকাশিত নিবন্ধ এবং সাংবাদিক সম্মেলনে ভুয়ো ভোটারের নাম তোলার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। ইতিমধ্যে বিহারে এসআইআর নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। সেখানেও প্রকৃত ভোটারদের নাম কাটার অভিযোগ উঠেছে। ১ অগাস্ট প্রকাশিত খসড়া তালিকায় ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম যেমন বাদ গেছে, তেমন অনেক ভোটারের ঠিকানার জায়গায় এক বা একাধিকবার শূন্য সংখ্যাটা বসানো আছে। মহাদেবপুরার মতই বাড়ির কোনো নির্দিষ্ট নম্বর, রাস্তার নাম – কিছুই নেই। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কায়দায় ভোটার তালিকায় ভোটারের নাম যোগ করা ও বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠছে।
রাহুলের ১৮ সেপ্টেম্বরের সাংবাদিক সম্মেলনে পেশ করা তথ্য নবতম সংযোজন। এতে যুক্ত হয়েছে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ব্যবহার করার অভিযোগ।
রাহুল বারবার অভিযোগ করছেন, কিছু কেন্দ্র ও বুথকে নিশানা করে ভোটার তালিকায় কারচুপির মাধ্যমে ভোটের হিসাব ওলটপালট করা হচ্ছে। ভোটে জনমত প্রতিফলিত হচ্ছে না, চুরি করে বিজেপি জিতছে। তিনি তথ্যপ্রমাণ হিসাবে প্রতিবার নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকাই পেশ করছেন। সর্বশেষ সাংবাদিক সম্মেলনেও তিনি বলেছেন, ১০০ শতাংশ তথ্য প্রমাণ না নিয়ে তিনি অভিযোগ করবেন না। কারণ তিনি দেশের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, সংবিধানকে শ্রদ্ধা করেন। পুরো তথ্যপ্রমাণ নিয়ে খুব শীঘ্রই ‘হাইড্রোজেন বোম’ ফাটানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
নথি হিসাবে নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তালিকাই তুলে ধরা, সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়া অভিযোগ না করার প্রতিশ্রুতি রাহুলের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াচ্ছে।
প্রত্যুত্তরে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যে সন্দেহ আরও বাড়ছে। কমিশন কিছুতেই বলতে পারছে না যে, পেশ করা ভোটার তালিকার তথ্য মিথ্যে। সেটা মিথ্যে না হলে ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ যে সত্যি তা নতুন করে বলার দরকার হয় না। নির্বাচন কমিশন কেবল হুমকি দিচ্ছে, বিরোধী নেতাদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করছে। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের কাছেও জবাবদিহি করতে বাধ্য নয় – এমন এক ভাষ্য তৈরি করতে চাইছে।
১৮ সেপ্টেম্বরের সাংবাদিক সম্মেলনের পরেও কমিশন কেবল বলেছে অভিযোগগুলো অসত্য ও ভিত্তিহীন। অথচ পাশাপাশি বলেছে, কারচুপি করে নাম বাদ দিতে চাওয়ার ঘটনা তাদের নজরে আসায় এফআইআর করা হয়েছিল। আরও বলেছে, অনলাইনে আবেদন করলেই নাম বাদ দেওয়া যায় না, শুনানি হয়। রাহুল বলেছেন, জুয়াচুরির মাধ্যমে ৬,০১৮ জনের নাম কাটার চেষ্টা হয়েছিল, ধরা পড়ে গেছে। নির্বাচন কমিশন কিন্তু এফআইআর করার কথা বলে তাঁর অভিযোগের সত্যতাই ঘুরিয়ে মেনে নিল।
প্রশ্ন উঠে আসছে, এই ভয়ানক জালিয়াতির কথা জেনে নির্বাচন কমিশন কী পদক্ষেপ নিয়েছে? কেন কর্ণাটক সিআইডিকে তথ্য দিয়ে তদন্তে সাহায্য করছে না? তাহলে নির্বাচন কমিশন ভোট চোর ও গণতন্ত্র বিরোধীদের সুরক্ষা দিচ্ছে – এই অভিযোগ না মেনে তো উপায় থাকছে না।
কংগ্রেসের, আরও নির্দিষ্টভাবে বললে রাহুল গান্ধীর, আক্রমণের প্রধান নিশানা এখন বিজেপি সরকার বা দলের থেকেও বেশি – নির্বাচন কমিশন। বিহারে এসআইআর বিতর্কের পর এই আক্রমণ আরও তীব্র হয়েছে।
কোনো বিরোধী দলকে এই কৌশল অবলম্বন করতে সচরাচর দেখা যায় না। আসলে নির্বাচন কমিশন সহ নানা সাংবিধানিক সংস্থাকে একরকম দলীয় শাখা সংগঠনে পরিণত করার ফ্যাসিবাদী অনুশীলনের প্রতিস্পর্ধাতেই এই রাজনৈতিক কৌশলের জন্ম হচ্ছে। গতবছর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির আসন সংখ্যা অপ্রত্যাশিতভাবে কমে যাওয়ায় বিরোধী পক্ষ উজ্জীবিত হয়েছিল। কিন্তু তারপর মহারাষ্ট্র, হরিয়ানায় বিজেপির অপ্রত্যাশিত সাফল্যে তারা ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে। বিজেপিও তাদের এজেন্ডা অনুসারে কাজের গতি বাড়ায়। ভোটে কারচুপি নিয়ে নানা মহল থেকেই অভিযোগ উঠে আসছিল। রাহুল সেটাকেই কাজে লাগিয়ে প্রমাণ করতে চাইছেন যে, ভোটে জুয়াচুরি করেই বিজেপি জিতছে। রাহুলের অভিযোগের তীব্রতা যত বাড়ছে, তত নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির বক্তব্য এবং আচার আচরণে অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হচ্ছে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা আবার কারচুপি করে ভোটে জেতার অভিযোগ প্রকারান্তরে মেনেই নিয়েছেন। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বলেই দিয়েছেন, ৭০ বছর ধরে অন্যরা ইভিএমে কারচুপি করল আর এখন আমরা করলেই খারাপ লাগছে!
বিহারে ভোটাধিকার যাত্রায় বিপুল সাড়া পাওয়ার পর বিরোধীরা স্বভাবতই আক্রমণের তীব্রতা বাড়াবে। রাহুল বিহারের ভোটাধিকার যাত্রার সভা থেকে শুরু করে সাংবাদিক সম্মেলন, সর্বত্র বলছেন, কে কাকে ভোট দেবেন তার থেকেও আজ বড় প্রশ্ন, নিজের ভোট নিজে দেওয়ার অধিকার থাকবে কিনা। সরাসরি কংগ্রেস বা ইন্ডিয়া জোটকে ভোট দেওয়ার কথা না বলে তিনি অধিকার রক্ষা, সংবিধান রক্ষার কথা বলছেন। বিহারে ভোটাধিকার যাত্রায় যুবসমাজের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া মেলার পর, ১৮ সেপ্টেম্বর সাংবাদিক সম্মেলনে ভারতের গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষায় ছাত্র, যুবদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন রাহুল।
দেখুন SIR নিয়ে আমাদের পডকাস্ট
বলেছেন, লোকসভার বিরোধী দলনেতা হিসাবে সরকারকে চাপে রাখা তাঁর কাজ, দেশের নাগরিকদের কাজ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করা। তাই তিনি তথ্যপ্রমাণসহ অভিযোগ পেশ করে গোটা বিষয়টাকে জনতার আদালতে পেশ করছেন।
ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ধরার মত সাংগঠনিক কাঠামো বা শক্তি কোনোটাই এখন কংগ্রেসের নেই। কংগ্রেস কোনোকালেই ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন করেনি। কঠোর সাংগঠনিক শৃঙ্খলাও ওই দলে নেই। অন্যদিকে বিজেপির রয়েছে তৃণমূল স্তরে কাজ করে – এমন নানা শাখা সংগঠন। সঙ্গে আছে প্রশাসনিক ক্ষমতা, সর্বোপরি নির্বাচন কমিশন। খোদ মুখ্য নির্বাচন কমিশনারই যাকে নতুন ধরনের বলে দাবি করছেন। সংঘ পরিবারের সামাজিক কারিকুরি, ভোটারদের নাড়িনক্ষত্র জানার নেটওয়ার্কের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন যদি কারচুপিতে হাত মেলায়, তাহলে লড়াইটা একেবারেই অসম হয়ে দাঁড়ায়।
আরো পড়ুন কতটা পথ পেরোলে পরে ভারত পাওয়া যায়?
এই সীমাবদ্ধতা রাহুল ভালোই বোঝেন। তাই তিনি সংঘ পরিবারের তৈরি ভাষ্যের এক বিকল্প ভাষ্য নির্মাণ করতে চাইছেন, যেখানে রাজনৈতিক দল জনগণের রক্ষাকর্তা সাজবে না, জনগণকেই এগিয়ে আসার ডাক দেওয়া হবে। নিজেদের অধিকার রক্ষা এবং আদায় করার ডাক। লোকসভা নির্বাচনের আগে ভারত জোড়ো যাত্রায় সংবিধান রক্ষাকে প্রধান ইস্যু করে সেই প্রক্রিয়ার সূচনা করা হয়েছিল। সেবার ছিল সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক সাম্য রক্ষার ডাক। এবারে ভোটাধিকার, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, নাগরিকত্ব রক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দেশজুড়ে এসআইআর নিয়ে বিতর্ক যত বাড়বে, কংগ্রেস সমেত বিরোধীরা এই আহ্বান আরও তীব্র করবে। সংঘ পরিবারের সামাজিক কারিকুরির বিকল্প হিসাবে আদিবাসী, দলিত, ওবিসি, সংখ্যালঘুদের প্রতি অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে ঐক্যের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। গরিব বলেই যে তাদের ভোটাধিকার, নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কা বেশি – সেকথাও বলা হচ্ছে। এভাবে আর্থিক ও সামাজিক বৈষম্যের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে অধিকার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নতুন ভাষ্য নির্মাণের চেষ্টা চলছে।
২০১৯-২০ সালে এনআরসি – সিএএবিরোধী নাগরিক আন্দোলন বিজেপিকে প্রবল চাপে ফেলেছিল। ভোটাধিকার ও নাগরিকত্ব রক্ষা করার জন্য নাগরিক আন্দোলন গড়ে উঠলে সেই চাপ আরও বাড়বে। বিকল্প ভাষ্য নির্মাণের কাজে রাহুল অনেকখানি এগিয়ে গেছেন। যৌথ নেতৃত্বের কথা বলা হলেও, ভারতের ভোট রাজনীতিতে বরাবরই ব্যক্তির বড় ভূমিকা থেকেছে। আজ নরেন্দ্র মোদীর মত স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে বিরোধী পক্ষের একজন শক্তিশালী নেতার প্রয়োজন আরও বেশি। সন্দেহ নেই, ভোট কারচুপির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক লড়াই বিরোধী নেতা হিসাবে রাহুলের গ্রহণযোগ্যতা অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। বিগত লোকসভা নির্বাচনে বড় ধাক্কা দেওয়ার পর অদূর ভবিষ্যতে মোদী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে কিনা, তা এখনই বলার সময় আসেনি। কিন্তু একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, মোদীর সঙ্গে টক্কর দেওয়ার মত প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত পেয়ে গেছে।
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।







