মানতাশা আহমেদ
মানতাশা আহমেদ
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
বহুবছর হল ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারদের H-1B ভিসা হাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পা দেওয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সাফল্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই দৃশ্য তৈরি হল মানে আপনি সিলিকন ভ্যালির টিকিট পেয়ে গেছেন। আরও ভাল আয় আর আন্তর্জাতিক কেরিয়ার আপনার হাতের মুঠোয়। কিন্তু ওই ছবি এবার বদলে যেতে পারে কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার ভিসা নীতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটিয়েছে। গত রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে H-1B ভিসার আবেদন করতে হলে এককালীন এক লক্ষ ডলার ফি দিতে হচ্ছে। এই মুহূর্তে ভারতীয় মুদ্রায় সেটা ৯০ লক্ষ টাকার কাছাকাছি।
এই পদক্ষেপের পক্ষে হোয়াইট হাউসের যুক্তি হল, H-1B ভিসার অপব্যবহার করে মার্কিন কর্মীর বদলে শস্তায় বিদেশি কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে এবং এতে সে দেশের কর্মীদের পারিশ্রমিক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিপন্ন। মোট H-1B ভিসাধারীর প্রায় তিন চতুর্থাংশ ভারতীয়, ফলে এই সিদ্ধান্ত কর্মী ও কোম্পানিগুলোর উপর তো বটেই, বিশ্বব্যাপী অভিবাসনের ধারার উপরেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে চলছে।
H1-B ভিসা কী?
H-1B ভিসা হল সবচেয়ে প্রার্থিত ওয়ার্ক পারমিটগুলোর অন্যতম। এর মাধ্যমে মার্কিন কোম্পানিগুলো প্রযুক্তি, আর্থিক ক্ষেত্র, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং স্থাপত্যের মত বিশেষ পারদর্শিতা প্রয়োজন এমন কাজের জন্যে বিদেশি পেশাদারদের নিয়োগ করে। কিন্তু ট্রাম্পের এই নতুন এক্সিকিউটিভ অর্ডার যে বিরাট অঙ্কের ফি চাপিয়ে দিয়েছে, তাতে কাজটা কঠিন হয়ে দাঁড়াল।
হোয়াইট হাউসের বক্তব্য, H-1B ব্যবস্থার বিপুল অপব্যবহার ঘটেছে। ফলে সার্বিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পারিশ্রমিক কমেছে এবং মার্কিন STEM (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং, গণিত) গ্র্যাজুয়েটরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন সরকার একটা পরিসংখ্যানও তুলে ধরেছে। ২০০৩ সালে H-1B ভিসাধারীদের হাতে থাকা তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের চাকরি ছিল ৩২%, যা আজ ৬৫% ছাড়িয়ে গেছে।
লক্ষণীয়, ভারতীয় নাগরিকরা মার্কিন H-1B প্রকল্পের সবচেয়ে সক্রিয় ব্যবহারকারী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪,৪২,০০০ H-1B ভিসাধারী কর্মী আছেন। তাঁদের ৭৩ শতাংশই ভারতীয়। আপাতত যা ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে এই মুহূর্তে যে ভারতীয়রা H-1B ভিসার অধিকারী বা যাঁদের ভিসার মেয়াদ ফুরিয়েছে এবং নতুন করে করাতে হবে, তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। কারণ এক লক্ষ ডলার ফি দিতে হবে শুধুমাত্র নতুন আবেদনকারীদের।
মার্কিন বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক ব্যাখ্যা করেছেন যে নতুন নীতির অধীনে কোম্পানিগুলোর পক্ষে বিদেশি কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নিয়োগ করা লাভজনক থাকবে না। বড় বড় টেক ফার্মগুলো এই বদলকে সমর্থন করছে দাবি করে তিনি বলেন ‘অত টাকা খরচ করার চেয়ে আপনি বরং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো গ্র্যাজুয়েটকেই প্রশিক্ষণ দেবেন।’
কদিন আগেই ট্রাম্প ভারত থেকে আমদানি করা জিনিসপত্রের উপর চড়া হারে শুল্ক বসিয়েছেন, কারণ হিসাবে দেখিয়েছেন ভারতের রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার সিদ্ধান্তকে। মার্কিন সরকারের মতে রাশিয়ার থেকে তেল কিনে ভারত সরকার পরোক্ষভাবে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে সমর্থন করছে।
সিলিকন ভ্যালির কী হবে?
এই নতুন ফি H-1B কর্মীদের নিয়োগ করার খরচ অনেক বাড়িয়ে দেবে, ফলে প্রতিষ্ঠিত টেক জায়েন্ট আর স্টার্টআপ – সকলের উপরেই চাপ পড়বে। অনেক ফার্ম, বিশেষ করে যারা ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারদের উপর নির্ভরশীল, হয়ত এই খরচ করতে পারবে না। ফলে তারা নিজেদের নিয়োগ কৌশলের পুনর্মূল্যায়ন করবে – এমন সম্ভাবনা রয়েছে।
এই উদ্বেগের পরিবেশে কিছু কিছু কোম্পানি হয়ত L-1 ইন্ট্রাকোম্পানি ট্রান্সফার ভিসার মত বিকল্প পথ নিতে পারে। কিন্তু তার কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, যেমন ওই ভিসা পেতে গেলে আগে থেকে ওই কোম্পানিরই অন্য দেশের কর্মী হতে হয়। অন্য অনেক কোম্পানি আমেরিকার খরচ এড়াতে অফশোর অপারেশন বাড়াতে পারে। তার ফলে আমেরিকা থেকে চাকরি অন্যান্য দেশে চলে যাবে। তার ফলেও ভারতীয় পেশাদারদের সিলিকন ভ্যালিতে কাজ করার সুযোগ প্রভাবিত হবে।
এই নতুন ভিসা নীতি আমেরিকায় ভারতীয় পেশাদারদের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। অনেকেই চিন্তিত যে ভিসার খরচ পাবেন কিনা, কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন কিনা অথবা নিশ্চিন্তে এদিক ওদিক যাতায়াত করতে পারবেন কিনা। এই ঝটিতি নিয়ম বদল H-1B ভিসাধারী আর আবেদনকারী – দুই পক্ষের মধ্যেই আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। টেক কোম্পানিগুলো জটিলতা এড়াতে কর্মীদের আমেরিকা ছাড়তে নিষেধ করেছে এবং বাইরে থাকলে ঝটপট ফেরত যেতে বলেছে। ভারত সরকার ‘মানবিক ফলাফল’ সম্পর্কে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করেছে, বলেছে এই নীতি পরিবারগুলোকে ভেঙে টুকরো করে দিতে পারে, জীবিকা নির্বাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই ওয়াশিংটন যেন সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে।
আগামীদিনে এই সিদ্ধান্তের দলে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি ফার্মগুলো হয় H-1B ভিসার উপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অফশোর অপারেশনের উপর নির্ভরতা বাড়াবে। এই মুহূর্তে যাঁদের ভিসা রয়েছে তাঁরা এখুনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না ঠিকই, কিন্তু নিয়োগের অর্থনীতি বদলে যাওয়ার ফলে নতুন ভারতীয় পেশাদারদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার উচ্চাশা পূরণের সুযোগ অনেকটাই কমে যেতে পারে।
সামগ্রিকভাবে দেখলে, এই নীতির ফলে টেক প্রতিভার আন্তর্জাতিক মানচিত্র বদলে যেতে পারে।
অন্য দেশের পৌষমাস?
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত তার প্রতিযোগী অর্থনীতিগুলোর দিকে ভারতীয় টেক পেশাদারদের গমনের গতি বাড়িয়ে দিতে পারে। বহু দশক ধরে ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ার ও টেক গ্র্যাজুয়েটদের স্বাভাবিক গন্তব্য ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু ও দেশের সেই একাধিপত্য এবার ভেঙে যেতে পারে।
নিউজ মোবাইল অ্যান্ড ওয়াশিংটনের এডিটর ইন চিফ সৌরভ শুক্লা বললেন, সংযুক্ত আরব আমীরশাহী, ব্রিটিশ যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশ নিঃশব্দে তাদের অভিবাসন নীতির সংস্কার করে গেছে। এখন ওইসব দেশে ভিসা পাওয়ার নিয়মাবলী আগের চেয়ে সহজ হয়েছে এবং অধিবাসী হওয়ার ছাড়পত্র পাওয়ার প্রক্রিয়াও আগের চেয়ে মসৃণ। ভিসার খরচ বাড়িয়ে দিয়ে এবং নিয়মকানুনের কড়াকড়ি করে আমেরিকা যে শত্রুভাবাপন্ন আচরণ করল, তাতে এই দেশগুলোর লাভ হতে পারে। কারণ যেসব ভারতীয় পেশাদার আমেরিকাকে আর সুযোগ পাওয়ার পক্ষে নির্ভরযোগ্য মনে করছেন না তাঁরা এইসব দেশে যেতে পারেন।
আরো পড়ুন যুদ্ধ থামানোর বদলে বাড়িয়ে চলেছেন ট্রাম্প
সব মিলিয়ে এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক উদ্ভাবন নেটওয়ার্কের ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। কানাডার গ্লোবাল ট্যালেন্ট স্ট্রিম, ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট পরবর্তী পয়েন্টস ভিত্তিক ব্যবস্থা এবং ইউরোপের ব্লু কার্ড প্রকল্প কেবল আমলাতান্ত্রিক বদল নয়। ওগুলো আমেরিকা যে কর্মীবাহিনিকে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে তাকে আকর্ষণ করার ভূরাজনৈতিক কৌশল।
ভারতের জন্যে অভিবাসন এইভাবে নানা দেশে ছড়িয়ে যাওয়া একইসঙ্গে স্বস্তিদায়ক এবং চ্যালেঞ্জের হয়ে দাঁড়াতে পারে। রেমিট্যান্স এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়তে থাকবে। কিন্তু গত তিন দশকে যে মার্কিন-ভারত টেক অক্ষ নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছিল, তা ধীরে ধীরে গোটা পাশ্চাত্য জুড়ে বহুমেরু প্রভাবে রূপান্তরিত হতে পারে।
নিবন্ধকার স্বাধীন সাংবাদিক। প্রধানত শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে লেখালিখি করেন। অতীতে ডেকান হেরাল্ড ও দ্য হিন্দু কাগজে কাজ করেছেন। মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








