হুগলী জেলার এক বিখ্যাত শহর চন্দননগর। সমৃদ্ধ ইতিহাস, বিপুল ঐতিহ্যের শহর। কিন্তু নিঃশব্দে এই শহরের বুক থেকে হারিয়ে গেছে একটি দুর্গাপুজো, যে পুজোর পত্তন হয়েছিল স্বাধীনতা অর্জনের বছরে, আজ থেকে ৭৫ বছর আগে। হারিয়ে না গেলে এ বছর সেই পুজোর প্ল্যাটিনাম জয়ন্তী উদযাপিত হত।

আজ থেকে মাত্র ১৪-১৫ বছর আগেও সেই পুজোর সময়ে চন্দননগরবাসীদের অবশ্য গন্তব্য ছিল শহরের এক প্রান্তে অবস্থিত গোন্দলপাড়া জুটমিলের দুর্গাপুজো। পুজোটি শুরু হয় মিলের তদানীন্তন ম্যানেজার শ্রী প্রাণকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে। মিলে কর্মরত শ্রমিকদের থেকে চাঁদা তুলে এই পুজোর আয়োজন করা হত। তখন এই মিলের মালিক ছিলেন কোঠারিরা। তাঁদেরও সক্রিয় সহযোগিতা ছিল। এই উদ্দেশ্যে পরবর্তীকালে নির্মিত হয় আনন্দভবন । সেই ভবনেই প্রতিমা গড়া হত এবং পুজো হত। এই পুজো এবং আনন্দ উৎসবকে কেন্দ্র করে মেলা বসত ওই চত্বরে, হত লটারি। লটারির টিকিট বিক্রির টাকা এবং শ্রমিকদের চাঁদা — এই ছিল পুজোর অর্থের উৎস। যে টাকা উঠত তা থেকে পুজোর আয়োজন করা ছাড়াও মোটর সাইকেল, রেডিও ইত্যাদি লটারির পুরস্কার হিসাবে কেনা হত। গোটা অঞ্চল উৎসবের আনন্দে মুখর হয়ে উঠত, আলোয় ঝলমল করত।

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

২০০৯ সালের মে মাসে মুরলীধর রতনলাল এক্সপোর্ট লিমিটেড গোন্দলপাড়া জুটমিল অধিগ্রহণ করে। মালিকানা হাতে নিয়েই তারা পুজোটি বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় কারখানা বন্ধের নোটিস। ফলত বন্ধ হয়ে যায় ৬০ বছরেরও বেশি সময়ে ধরে চলা পুজো। সে বছর প্রতিমা গড়ার কাজ তখন প্রায় শেষের মুখে। দীর্ঘ সাত মাস বন্ধ থাকার পর মিলটি যখন আবার খোলে, শ্রমিকরা সেই অর্ধসমাপ্ত প্রতিমাই নিরঞ্জন করেন। কালক্রমে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় শ্রমিকদের প্রিয় আনন্দভবন। একইসঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হয় এলাকার প্রাথমিক স্কুলটিও। শ্রমিক পরিবারগুলোর উৎসব এবং তাঁদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখা — দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিকই আক্রান্ত হয় একসঙ্গে। একটা সময়ে এই পুজো উপলক্ষে শহরের দরিদ্র প্রান্তিক মানুষের মধ্যে বস্ত্র বিতরণ কর্মসূচিও নিতেন উদ্যোক্তারা। সময়ের ফেরে গোন্দলপাড়া জুটমিলের সেই শ্রমিকরা নিজেরাই আজ বিনামূল্যে বস্ত্র বিতরণের লাইনে দাঁড়ান।

রাজ্যের সংবাদমাধ্যমগুলির প্রধান খবর এখন আনন্দময়ীর আগমন। রাজ্য সরকারের অনুদানের পরিমাণ, বিভিন্ন বারোয়ারী পুজোর থিম — এসব নিয়েই আলোচনা দিনরাত। সেই উৎসব মুখরতার মধ্যে এই রাজ্যেরই এক অঞ্চল থেকে আনন্দময়ী কীভাবে কতিপয় মানুষের লোভ এবং অপশাসনের কারণে চিরবিদায় নিলেন সে খবর থেকে যায় লোকচক্ষুর অন্তরালে। গোন্দলপাড়ার মানুষজন এখন বাস করেন হতাশা, দারিদ্য, দুশ্চিন্তার অন্ধকারে। একই চিত্র রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বন্ধ হয়ে থাকা কারখানাগুলির শ্রমিক মহল্লায়। 

আরো পড়ুন রুগ্ন জুটমিল: চাই শ্রমিক, কৃষকের যৌথ লড়াই

পুজো তো বন্ধ সেই ২০০৯ সাল থেকেই, এখন মিলও বন্ধ। শ্রমিক মহল্লার প্রবীণ-প্রবীণাদের কাছে এসব এখন স্মৃতিকথা। আপনমনে তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনার করেন হারিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলোর কথা, যখন আনন্দভবনে প্রতিমা গড়া হত আর তখন থেকেই পুজোর আনন্দে মেতে উঠত শ্রমিক পরিবারের কচিকাঁচাদের দল। সব হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে একসময় চন্দননগরে সাড়া জাগানো একটি দুর্গাপুজো।

মতামত ব্যক্তিগত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.