সম্প্রতি গলগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের একটি ভাইরাল ভিডিও নেটদুনিয়া জুড়ে হাসির হুল্লোড় এবং বিতর্কের ঢেউ তুলেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, এঁরা দিল্লিতে কংগ্রেস সদর দফতরের বাইরে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। এক সাংবাদিক তাদের বিক্ষোভের উদ্দেশ্য জিজ্ঞাসা করায় যা ঘটে তা ব্ল্যাক কমেডির চেয়ে কিছু কম নয়। গায়ে গোদি মিডিয়ার ছাপ লেগে থাকা আজ তক চ্যানেলে সম্প্রচারিত এই ভিডিওতে বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। প্রতিবাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে একজন ছাত্র বিপুল আবেগে উন্নত ভারত, বিকশিত ভারতের জন্য এই উদ্যোগে সামিল হওয়ার কথা বলেন। নিঃসন্দেহে এটি সেই ছাত্রের প্রশংসনীয় অনুভূতি। কিন্তু দুঃখজনক হল, সেই উদ্দেশ্য পূরণ করতে ঠিক ওই মিছিলেই কেন এসেছেন তা তিনি বলতে পারেন না। অন্য একজন ছাত্র কংগ্রেসের ইশতেহার সম্পর্কে ওই ভিডিওতেই নিজের অজ্ঞতার কথা স্বীকার করেছেন। আবার বেশ কয়েকজন তাঁদের প্ল্যাকার্ডে বিকশিত ভারতের শত্রু হিসাবে মুদ্রিত ‘আরবান নকশাল’ কথাটির পাঠোদ্ধার করতেই হিমশিম খেয়েছেন। বলেছে ‘আরবান ম্যাক্সওয়েল’।
নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান
প্রিয় পাঠক,
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।
উত্তরাধিকার কর থেকে শুরু করে মঙ্গলসূত্র, শহুরে নকশালবাদ এবং নারীর ক্ষমতায়ন (নারী শক্তি) বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অবস্থান পর্যন্ত অনেককিছুই ছাত্রছাত্রীদের এই মিছিলের ইস্যু ছিল বলে মনে হচ্ছে। তবে উদ্দেশ্যের স্বচ্ছতা অধরা রয়ে গেছে। ভিডিওটি সোশাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের কাটাছেঁড়ার হাত থেকে রক্ষা পায়নি, নেটিজেনরা সচেতনতার আপাত অভাবের জন্য শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছিত করতে সময় নষ্ট করেননি। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ধরনের প্রতিবাদ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতিমধ্যেই একাধিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। চলমান লোকসভা নির্বাচনের ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ে গঠিত এই মিছিল দেখে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক বিষয়গুলির মৌলিক বোঝাপড়ার খামতি সম্পর্কে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গলগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার কয়েক দিন পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রখ্যাত হিন্দি সংবাদপত্র অমর উজালা-য় গোটা পাতা জুড়ে একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে, সম্ভবত ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায়। গ্রেটার নয়ডাভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখানে ‘রেকর্ড ব্রেকিং প্লেসমেন্ট’ পায়, এবং এটি ‘চাকরি সন্ধানকারীদের চেয়ে চাকরির নির্মাতাদের’ বেশি নির্মাণ করে। গলগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী লক্ষ্মী শর্মা বাস্তব পরিস্থিতি না জেনে কংগ্রেস পার্টির বিরুদ্ধে সহপাঠীদের সঙ্গে প্রতিবাদ করার জন্য সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি তাঁর পোস্টে বলেছেন, ‘আমরা আমাদের ভুল বুঝতে পেরেছি। আমরা জানতাম না যে এটি প্রোপাগান্ডামূলক প্রচার ছিল; আমাদের কেবল বলা হয়েছিল যে আমরা কঙ্গনা রানাওয়াতের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাব।’ তাঁর অভিযোগ, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট আমাদের জোর জবরদস্তি জোগাড় করা ওই প্ল্যাকার্ডগুলো দিয়েছিল। আমরা বেশিরভাগই অরাজনৈতিক, কিন্তু ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে আমাদের পরীক্ষায় পুরো নম্বর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।’ লক্ষ্মী আরও দাবি করেছেন যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের বলেছিল যে কঙ্গনার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাওয়া যাবে যদি তারা কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কঠোর বিবৃতি দেয়।
গলগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সিইও ধ্রুব গলগোটিয়া ওই বিক্ষোভের ভিডিও ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করেছেন। তার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই নেটিজেনদের ক্ষোভ আছড়ে পড়েছে। তাঁরা মন্তব্য করেছেন যে এই ছাত্রছাত্রীরা সাধারণ হিন্দি, ইংরেজিও পড়তে পারে না। এটা লজ্জাজনক। বিশ্ববিদ্যালয়ের এর জন্য জবাবদিহি করা উচিত। তাদের জবাব দেওয়া উচিত যে তারা তাদের ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা নিয়ে কী ধরনের ব্যবসা করছে?
প্রধানমন্ত্রী মোদী অভিযোগ করেছেন যে কংগ্রেসের ইশতেহারে জনগণের সোনা, মঙ্গলসূত্র ইত্যাদি কেড়ে নিয়ে, নতুন কর আরোপ করে দরিদ্র সংখ্যালঘুদের মধ্যে সম্পদের পুনর্বণ্টন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। যদিও ইশতেহারে তেমন কিছুই বলা হয়নি।
বরং ইশতেহারে নিপীড়িত জাতিবর্গগুলির জন্য বৃহত্তর সংরক্ষণের নীতির রূপরেখা দেওয়া হয়েছে এবং শিক্ষা, ব্যবসা, সরকারি কাজের বরাত, চাকরি, ঋণ এবং বাজেটের মত বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই জাতি গোষ্ঠীগুলির প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর জন্য উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এটি নিপীড়িত জাতিগুলির জন্য সম্পদের সুষম বণ্টন এবং দেশে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপের নীতি গ্রহণ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। রাহুল গান্ধী একে ‘জিতনি আবাদি উতনা হক’ (জনবিন্যাস অনুসারে সমানুপাতিক সমানাধিকার) বলে অভিহিত করেছেন। একটি ন্যায্য সমাজব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য এগুলি সঠিক নীতি কিনা তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু কেউ অস্বীকার করতে পারে না যে আমাদের দেশের বর্তমান অসাম্য দূর করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সর্বোপরি নিপীড়িত জাতিগুলির জন্য আনুপাতিক অধিকারের পিছনের দর্শন, অর্ধেক জনসংখ্যার অধিকারী মহিলাদের জন্য সমান সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের আকাঙ্ক্ষার থেকে আলাদা কিছু নয়। প্রধানমন্ত্রী মোদী এই আখ্যানে একটি মুখরোচক মোচড় দিয়েছেন। রাজস্থানের এক জনসভায় তিনি বলেন ‘কংগ্রেস পার্টি তার ইশতেহারে বলেছে যে তারা আপনার সোনা, মঙ্গলসূত্র এবং সম্পদ কেড়ে নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে সম্পদ পুনর্বণ্টন করবে।’ মোদী স্পষ্টতই মিথ্যা বলেছেন। ওই মন্তব্য ছিল আরএসএস-বিজেপি বাস্তুতন্ত্রের জন্য উচ্চস্বরে উস্কানি, যাতে ভোটারদের মধ্যে ভয়, ক্ষোভ এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা যায়। তারপরেই হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রচারিত হল যে ‘কংগ্রেস পার্টি জওহরলাল নেহরু ন্যাশনাল ওয়েলথ রিডিস্ট্রিবিউশন স্কিমের অধীনে বেতনভোগী পেশাদারদের দুই-তৃতীয়াংশ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করবে’। কিন্তু এই হল্লার ঐতিহাসিক উৎস কি?
১৯৩৮ সালে হিটলার ইয়ুথ হ্যান্স উলফের একটি গল্প ‘কমরেডশিপ’ পাবলিক স্কুল প্রাইমারের অংশ হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল। হ্যান্স উলফের গল্প সাম্প্রদায়িক হিটলার ইয়ুথ অভিজ্ঞতার সারমর্মকে ধারণ করে। অনুকরণীয় কায়দায় এই গল্প ব্যাখ্যা করে, কেন হিটলার অনুসারী যুবকরা আকর্ষণীয় ছিল এবং লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়েদের জন্য দারুণ কাজ করেছিল, অবশ্যই নাজি শাসনের প্রথম দিকে। কারণ এটি মূল নাজি মূল্যবোধ প্রদর্শন করে। এই গল্পটিকে প্রাথমিক পাঠের উপাদান হিসাবে স্কুলের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বিতরণ করা উচিত বলে মনে করা হয়েছিল। বৃহত্তর যুব সমাজেও হিটলার অনুসারী যুবকরা, শক্তিশালী সদস্যরা তাদের দুর্বল বন্ধুদের সাহায্য করবে এবং নেতাসুলভ আচরণে তাদের শারীরিক ও মানসিক অভিমুখ নিজের হাতে রাখবে। হিটলার ইয়ুথের শারীরিক ক্রিয়াকলাপ – অনেকটা বৃক্ষবিহীন পথে রৌদ্রের জ্বলন্ত উত্তাপে লং মার্চের মত – অসহনীয়। তবে পুরুষের পেশী এবং শরীরী ভঙ্গিকে তা ইস্পাতের মত করে তোলে। এই সম্মোহনী আনুগত্যই যুবকদের মনকে জার্মান জাতির মহত্ত্ব এবং নাজি মতাদর্শে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, যার একটি অংশ ছিল যুব দলকে ফুয়েরার কাল্টের, একনায়কতন্ত্রের অঙ্গীভূত করা। থার্ড রাইখের অনেক প্রতিষ্ঠানের মত হিটলার ইয়ুথের ভাবনাও পদ্ধতিগত পরিকল্পনার ফলে উদ্ভূত হয়নি। এটি সর্বদা একচেটিয়া সংহতির প্রকাশও ছিল না, অন্তত অ্যাডলফ হিটলারের সর্বগ্রাসী একনায়ক হয়ে ওঠার আগে পর্যন্ত। যা-ই হোক, একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে বেশিরভাগ হিটলার অনুসারী যুবক নিয়মিত কার্যক্রমের ব্যাপারটি পছন্দ করেছিল এবং তারা নতুন রাইখের ধারক হওয়ার জন্য সেগুলি নিজেদের কঠোর অভ্যাসে পরিণত করেছিল। কঠোর কিন্তু যত্নশীল নেতাদের আদেশ অনুসরণ করতে ইচ্ছুক হওয়ার অনুভূতির মধ্যে কোনো ফাঁকি ছিল না।
আরো পড়ুন ছিল সমাবর্তন, হল এ কী পরিবর্তন!
১৯৪৪ সালে ফিয়ার নাটকে বার্টোল্ট ব্রেখ্ট এক দম্পতিকে দেখিয়েছেন, যারা হিটলারবিরোধী অবস্থানের জন্য নিজের ছেলে ক্লাউস-হেনরিকের নিন্দার সম্মুখীন হয়। সে কিছু ক্যান্ডি কেনার জন্য বাইরে যায়। ওইটুকু সময়েই সে বাড়িতে ফিরে আসার পরেও তার বাবা-মা ভাবতে থাকেন, ছেলে গেস্টাপো হয়ে গেছে কিনা। অথচ তা জানার কোনো উপায়ও নেই। তাঁরা নিশ্চিত যে ক্লাউস-হেনরিক তাঁদের হিটলারি শাসনবিরোধী মন্তব্য শুনেছে। তাঁরা এও জানেন যে সে হিটলার ইয়ুথের একনিষ্ঠ সদস্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের বেশকিছু ঘটনা জানা যায়, যেখানে পুত্রসন্তানরা বাবা-মাকে পুলিসের হাতে তুলে দিয়েছিল। যেমন কমিউনিস্ট হের হেস। তিনি ফুয়েরারকে ‘একজন রক্তপিপাসু পাগল’ বলেছিলেন। তাঁর ছেলে ছিল একজন মাঝের সারির হিটলার ইয়ুথ নেতা। সে-ই তাঁর বিরুদ্ধে রিপোর্ট করে এবং ওই মন্তব্য করার রাতেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীকালে তাঁকে ডাকাউ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি ৪০ বছর বয়সে হৃদরোগে মারা যান।
আদপে হিটলারের জনপ্রিয় উত্থানের জন্য দায়ী যে যুব দল, তারা হল ১৯৩২ সালের ছয় মিলিয়ন জার্মান বেকার। তারাও ঘুরত হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে। তাতে লেখা থাকত ‘আমি একটি চাকরি খুঁজছি, সে যেরকমই হোক না কেন!’
ভারতীয় যুবকদের সমাজতত্ত্ব নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা করতে থাকা সমাজতাত্ত্বিক সঞ্জয় কুমার প্রাক-মোদী যুগের ভারতীয় যুবা এবং মোদী পরবর্তী সময়ের ভারতীয় যুবা বিষয়ে অন্তত দুটি বইয়ে প্রচুর সমীক্ষা করেছেন। ২০১৪ সালের আগে, মূলত ১৯৯৫-২০০৯ সময়কালের ভারতবর্ষীয় যুবার ‘ভোটিং প্যাটার্ন’ সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেছেন ‘শিক্ষিত যুবকদের মধ্যেও বিজেপি গত এক দশকে সমর্থন হারিয়েছে। সুতরাং এই উপসংহারে আসা যেতে পারে যে শহুরে এবং শিক্ষিত তরুণ ভোটারদের মধ্যে বিজেপির যে সমর্থন ছিল তা বিগত কয়েকটি লোকসভা নির্বাচনে হ্রাস পেয়েছে। দলটির এখন যে ধাঁধার মোকাবিলা করার চেষ্টা করা উচিত তা হল গত দুটি নির্বাচনে এই অল্পবয়সী ভোটের ক্ষয়।’ অথচ ২০১৯ সালে যখন এই একই বিষয়ে তিনি আরেকটি বইয়ের সম্পাদনা করছিলেন, সেখানে জ্যোতি মিশ্র ও প্রণব গুপ্তার সমীক্ষায় ধরা পড়ছিল ভারতীয় যুবসমাজের মানসিক মানচিত্রে রাজনৈতিক হিন্দুত্বের প্রকট প্রভাব। তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে পছন্দ করে না। দলীয় পরিচয়ের অভাবকে দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দলের প্রতি বিভ্রান্তি বা বৃহৎ রাজনীতির প্রতি উদাসীনতা হিসাবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, কোনো দলকে পছন্দ না করা ৪৮% তরুণ বলেছে, রাজনৈতিক দলগুলির দেশের সমস্যা সমাধান করতে পারা উচিত। এই তরুণদের মধ্যে কেউ কেউ রাজনীতিতে আগ্রহী হলেও কোনো দলের সঙ্গে একাত্মবোধ করে না। এরা ‘ফ্লোটিং ভোটার’ হতে পারে। বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে দলীয় পরিচয় থাকার মাত্রায় বিপুল পার্থক্য দেখা গেছে। দেশের পূর্বাঞ্চলের তরুণদের মধ্যে দলীয় পরিচয় তুলনামূলকভাবে বেশি। সেখানে দশজন যুবকের মধ্যে চারজনের কম (৩৭%) কোনো দলকে পছন্দ করে না। পশ্চিমাঞ্চলে এই হার সবচেয়ে কম ছিল। সেখানে যুবকদের অর্ধেকেরও বেশি (৫৪%) নিজেদের কোনো না কোনো দলের ঘনিষ্ঠ বলে মনে করেনি। উত্তর ভারতীয় যুবকদের মধ্যে বিজেপির প্রতি সমর্থন ছিল সবচেয়ে বেশি – ৩০% যুবক বলেছিল যে তারা বিজেপির ঘনিষ্ঠ। বিজেপি এবং কংগ্রেসের মধ্যে ব্যবধান কম ছিল পূর্ব ভারতে – ১৯% যুবক বিজেপিকে সমর্থন করেছিল আর ১১% কংগ্রেসকে।
সমীক্ষাটিতে যেসব বিষয় স্বাধীনতা ও প্রগতিশীল বিশ্বাসের উপর চলমান বিতর্কের কেন্দ্রে থাকে, যেমন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন সিনেমা নিষিদ্ধ করা, গরুর মাংস খাওয়া এবং মৃত্যুদণ্ড, তা নিয়ে তরুণদের মতামতও ছিল। দেখা গেছে, দশজন যুবকের মধ্যে ছয়জন (৬০%) ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন সিনেমা নিষিদ্ধ করা সমর্থন করে। প্রায় অর্ধেক যুবক (৪৬%) গরুর মাংস খাওয়ার অনুমতি দিতে আপত্তি জানিয়েছে। প্রায় অর্ধেক যুবক (৪৯%) মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করেছে। প্রায় একই পরিমাণ যুবক বিশ্বাস করে যে মুসলিম যুবকদের সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কিত মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয় না (৪৫%)। এই সমীকরণ স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, যে বেশিরভাগ ভারতীয় তরুণ অনেক বিতর্কিত বিষয়ে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ, উদারপন্থী, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকারের কথা বলে আজীবন মুখে ফেনা তুলে মরে যাওয়া মানুষের সঙ্গে সহমত পোষণ করে না।
আজকের ভারতে বেকারত্ব তরুণদের এক বড় উদ্বেগের কারণ। ব্যক্তিগত সুযোগ বাড়ায় এমন যে কোনো পদক্ষেপকে তারা সমর্থন করতে পারে। একাধিক সমীক্ষার তথ্য এও ইঙ্গিত করে, যে যুবকদের চাকরি এবং কর্মসংস্থান সম্পর্কে উদ্বেগ বেশি, তারা ‘ঘুসপেটিয়া’ তত্ত্বে বিশ্বাসী এবং তাদের ভূমিপুত্রদের জন্য সংরক্ষণ সমর্থন করার সম্ভাবনা বেশি। সুতরাং গলগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের মধ্যে ব্যঙ্গাত্মকভাবে হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রূপ না খুঁজে বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক চাকরির মন্দা কাটানোর রাজনৈতিক উদ্যোগ, উদ্যম, নীল নকশা তৈরি করা জরুরি। তাকে বাদ দিয়ে এই আলোচনা চললে আমাদের দোরগোড়ায় দিশি হিটলার ইয়ুথের পদধ্বনি শীঘ্রই শোনা যাবে।
তথ্যসূত্র
১। YOUTH IN INDIA: Aspirations, Attitudes, Anxieties Edited by Sanjay Kumar [POLITICAL ENGAGEMENT AND POLITICAL ATTITUDES OF INDIAN YOUTH; Jyoti Mishra and Pranav Gupta]
২। Indian Youth and Electoral Politics AN EMERGING ENGAGEMENT Edited by Sanjay Kumar [The Voting Pattern – Sanjay Kumar]
৩। Hitler Youth, 1922–1945 An Illustrated History; JEAN-DENISG.G. LEPAGE
৪। Hitler Youth; Michael H Kater; HARVARD UNIVERSITY PRESS
মতামত ব্যক্তিগত
নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:
আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন।
টুইটারে আমাদের ফলো করুন।
আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপে যোগ দিন।








