আজকাল দেশ বিদেশের এমন অনেক খবর গোচরে আসে, যা পড়ে প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় – এ হতে পারে না। নির্ঘাত কেউ ইয়ার্কি করছে! আরও দু-এক জায়গায় একই খবর দেখলে বা শুনলে তখন মরিয়া হয়ে কামনা করতে হয় – যেন খবরটা ঠাট্টা ইয়ার্কি প্রসূত হয়, যেন সত্যি না হয়। কিন্তু পরিশেষে দেখি, “পালাবার পথ নাই”, খবরটা সত্য।

সম্প্রতি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, খড়্গপুরের সমাবর্তন উপলক্ষে এরকম একটা পোশাক পরিধানের নির্দেশাবলী নজরে এসেছে, যা দেখে হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছি না। বলে রাখা ভাল, আমি কস্মিনকালে আইআইটিতে পড়িনি, কিন্তু ঠিক ওই ক্যাম্পাসটাতেই বড় হওয়ার সুবাদে সমাবর্তনের সময়ে বেশ একটা উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হত, সেটা মনে পড়ে। পরবর্তীকালে ভারতে থাকাকালীন নিজের কোন সমাবর্তন থেকে ডিগ্রি গ্রহণ করার সৌভাগ্য হয়নি (সার্টিফিকেট মেডিকাল কলেজের অফিস থেকে নিয়ে নেওয়াই ছিল দস্তুর) বলে “ভালই একদিকে। ওই আলখাল্লা পরে গরমে দাঁড়িয়ে ডিগ্রি নিয়ে কী হবে” গোছের আঙুর ফল টক মনোভাব হত। আমার প্রথম ধড়াচূড়া (শিক্ষা জগতের আনুষ্ঠানিক পোশাক বা ডিগ্রি নেওয়ার পর্বে পরিধেয়; academic regalia) পরে ডিগ্রি নেবার সুযোগ হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসে। ভালই লেগেছিল।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

একথা অনস্বীকার্য যে তথাকথিত যে পোশাক বিধি পৃথিবী জুড়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানগুলোতে পরা হয়, তার মধ্যে ঔপনিবেশিকতার প্রভাব সুস্পষ্ট। কিন্তু তার পরিবর্তে বা তার প্রতিবিধান হিসাবে আরেক দফা নির্দেশিকা পালন না করলে এত বছরের পরিশ্রমের স্বীকৃতিটুকুও জুটবে না – এটাই বা কীরকম নিয়ম? তা ছাড়া এই নির্দেশিকার মধ্যে নিহিত অনেকগুলো লজ্জাজনক দিক। প্রথমেই যেটা মনে হয়, পুরুষ বা স্ত্রী – এই দুই তকমার বাইরে কি কোনো মানুষ আইআইটি থেকে সফলভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার যোগ্য নন? রূপান্তরকামী বা বস্তাপচা ব্যাটাছেলে/মেয়েছেলে তকমা যারা মেনে নিতে নারাজ, তারা যদি ডিগ্রি নিতে না পারে, আইআইটির বাবু বিবিরা তাদের শিক্ষা বাবদ নেওয়া বেতন ফেরত দেবেন তো? নাকি, “তোদের এখানে পড়তে দিয়েছি, এটাই তোদের ভাগ্যি” – এই জাতীয় কিছু বলা হবে?

দ্বিতীয়ত, এ ধরনের যে কোনো বিধি যে বিশেষ করে মহিলাদের প্রতি অসম্মানজনক, এটা কেউ ন্যাকামি করে অস্বীকার করতে পারেন, কিন্তু নিজেকে ফাঁকি দিতে পারবেন কি? পুরুষদের সাদা পাঞ্জাবির নিচে সাদা গেঞ্জি পরতে পরামর্শ দেওয়া আর মহিলাদের সাদা শাড়ির সাথে সাদা পেটিকোট ব্যতীত কিছু না পরার এরকম সুচিন্তিত পরামর্শ দেওয়া আইআইটি কর্তৃপক্ষের মানসিক সুস্থতার পরিচয় কি? অবশ্য একথা অনস্বীকার্য যে ব্লাউজেরও নিচে কী পরতে হবে তা নিয়ে আরও বিশদে নির্দেশ না দিয়ে ওঁরা অপরিসীম পরিমিতিবোধ দেখিয়েছেন। দেখেছেন তো, আমার মতন ছিদ্রান্বেষীদেরই চিন্তাভাবনা নোংরা।

তৃতীয়ত, এসবের আসল লক্ষ্য বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। একটু পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটলে দেখতে পাচ্ছি, সেই ২০১৭ সালে বিভিন্ন আইআইটি, এনআইটি ইত্যাদি কেন্দ্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমাবর্তনে ঔপনিবেশিকতার পশ্চিমী প্রভাব প্রতিহত করে ভারতীয় সংস্কৃতির পরিচায়ক পোশাক বিধি চালু করার সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক। এসব জানতাম না। বাবা চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন অনেকদিন, তাই এসবের আর খোঁজ রাখার প্রয়োজন পড়েনি। যদিও খুব অবাক হওয়ার কিছু দেখছি না। গৈরিক রাজনীতির যুগে ভারতীয় সংস্কৃতির সংজ্ঞা যে খুব সংকীর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফেসবুকে প্রাপ্ত ২০১৪ সালের একটা নির্দেশে দেখছি তখনো কীরকম পোশাক বাঞ্ছনীয় তার একটা হালকা উপদেশ দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। তবে এখনকার মত গেঞ্জি, পেটিকোট নিয়েও দৃঢ় আদেশ সে যুগে বিরল ছিল। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইটি (IIT-BHU) ২০১৩ সালে স্বদেশী সমাবর্তনের পথে যাত্রা শুরু করে

আবার বলি, ঔপনিবেশিকতার ছায়া থেকে বেরোবার চেষ্টা নিয়ে বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। কিন্তু এক ধরনের শৃঙ্খল মোচন করতে যদি আরেক দফা বিধানের বজ্র আঁটুনি প্রয়োগ করতে হয়, তাহলে লাভ কী? এ তো আর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় নয়, যে প্রথম থেকেই সম্পূর্ণ আলাদা রকমের সমাবর্তন চালু ছিল, যার অঙ্গ হিসাবে কখনোই robes/regalia দেখা যায়নি। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল, ২০১০ সালে তদানীন্তন মনমোহন সরকারের মন্ত্রী জয়রাম রমেশ ঔপনিবেশিতার চর্বিতচর্বণ উপেক্ষা করে মেরুন সোনালী জোব্বা পরতে অস্বীকার করেন ভূপালের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ফরেস্ট ম্যানেজমেন্টের সমাবর্তনে। এটা পড়ে কেউ “দেকেচ, কী ভেবেচ? আমাদের দলের নেতা দেশমাতাকে কম ভালোবাসে নাকি” বলতে পারেন। আবার কেউ বলতে পারেন “দ্যাখ, তোদের নেতাও বলেছিল। আমরা বললেই যত দোষ দিলীপ, থুড়ি নন্দ ঘোষ!” কিন্তু ঘটনাটা অনস্বীকার্য। বলা বাহুল্য যে অধুনা কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় বলীয়ান, মাতৃশক্তির পরম পূজারী দেশের জন্য সর্বত্যাগী, মনের কথা প্রয়োজনে ঘাড় ধরে জানাতে উতলা কর্তাব্যক্তিরা মহিলাদের কতখানি অঙ্গ দর্শন বাঞ্ছনীয় সেসব খুঁটিনাটি ব্যাপারে দারুণ যত্নবান। আর ‘ঊর্ধাঙ্গের বস্ত্র যদি নাহি ঢাকে রমণীর বাহু, তবে সরলমতি বালক/যুবা/বৃদ্ধের মন করিয়া উঠিবে হু হু’ – এ তো সকলের জানা।

আরো পড়ুন সবই ব্যাদে আছে ক্যালেন্ডার: একটি গর্বের মৃত্যু

ইয়ার্কি বাদ দিলেও, যে কোনো ঐতিহ্য দাঁড়িয়ে থাকে কিছুটা সম্ভ্রম, কিছুটা শ্রদ্ধা, কিছুটা ভাললাগা মিলিয়ে। তা সে সমাবর্তনের পশ্চিমী আলখাল্লা হোক বা সাদা ধোপদুরস্ত সংস্কারী পোশাক। বিধিনিষেধের বিরোধিতাই যদি উদ্দেশ্য হয়, তাহলে অনুষ্ঠানের গুরুত্ব মাথায় রেখে নিজের পছন্দের পোষাক পরবেন – এটাই হতে পারত প্রতিষ্ঠানের অবস্থান। বড়জোর ‘ফর্মাল’ পোশাক পরার পরামর্শ দেওয়া যেত। অবশ্য ওই বিশেষ দিনটায় পরিধেয় পোশাক নিয়ে উপদেশ দেওয়ার প্রবণতা বোধহয় সমাবর্তন ঐতিহ্যের মতই প্রাচীন, এমনকি পশ্চিমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও। মার্কিন এক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরামর্শের তালিকার মধ্যে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা আছে “পোশাক পরা আবশ্যিক”! আসলে আলখাল্লা তো কিছুর উপরে পরাই অভিপ্রেত, কিন্তু ওই হাঁটু দৈর্ঘ্যের ওভারকোট যদি কেউ নির্বস্ত্র শরীরে পরে ফেলে!

রবিঠাকুরকে আমরা জলে জঙ্গলে, বিপদে আপদে, সদুদ্দেশ্যে বা কার্যসিদ্ধির স্বার্থে – সর্বত্রই আমরা ব্যবহার করে থাকি বলে আমার মনে হয়। এই নতুন পোশাক বিধির যথার্থতা প্রমাণেও ওই মানুষটিকে এবং ওঁর বিশ্বভারতীকে নিয়ে টানাটানি চলবে নিশ্চয়ই। বিজেপির মানুষজন তো আগেই দেখিয়েছেন যে দরকারে ওঁরা রবিবাবুকে গেরুয়া রঙে ছোপাতে পটু। তাই রবিঠাকুরের নাইট উপাধি ত্যাগ করাকে সম্মান জানানোর অছিলায় তাকে নির্ভেজাল জাতীয়তাবাদী বলে দেগে দেওয়া হয় সুচতুরভাবে। কখনো আবার বিশ্বকবিকে ইসলামবিরোধী প্রমাণ করার চেষ্টা হয়।

যাকগে। ভালয় ভালয় ছেলেমেয়েরা ভারতীয় সংস্কৃতি গায়ে মাথায় মেখে ডিগ্রি নিয়ে ধুতি-পাঞ্জাবি, শাড়ি-ব্লাউজ পরে বিলেতে বা আমেরিকায় গিয়ে সুখে শান্তিতে ‘সেটল’ করে যাক আর মাঝে মাঝে ২০১৪ সাল থেকে দেশের যে অভূতপূর্ব উন্নতি হচ্ছে তার ফিরিস্তি দিক, তাহলেই নিশ্চিন্দি।

বাবার অধ্যাপনার সূত্রে লেখক বেড়ে উঠেছেন আইআইটি খড়্গপুর ক্যাম্পাসে। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.