দীপক গিরি

আর জি কর মেডিকাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের স্নাতকোত্তর স্তরের ছাত্রীর নৃশংস খুনের ঘটনা আজ বাংলা সহ সারা দেশের বিবেকবান ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে উদ্বেল করে তুলেছে। সোশাল মিডিয়ায় যেমন দলমত নির্বিশেষে এই ঘটনার নিন্দা ও সুবিচারের দাবি উঠছে, তেমনি এ রাজ্যের বর্ষীয়ান চিকিৎসক থেকে শুরু করে মানবাধিকার কর্মী – সকলেই এই পাশবিক ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন। দিল্লির সফদরজং মেডিকাল কলেজ থেকে বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসাইন্সেজের (নিমহন্স) রেসিডেন্ট ডাক্তাররা (স্নাতকোত্তর ও জুনিয়র চিকিৎসক) প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। প্রশ্ন উঠেছে, একজন ডাক্তারকে যদি হাসপাতালের মধ্যে পৈশাচিকভাবে ধর্ষণ করে খুন করা যায়, তাহলে হাসপাতালের নার্স ও মহিলা কর্মীদের, এমনকি মহিলা রোগীদের নিরাপত্তার কী ভরসা আছে?

ঘটনার পরের দিন, অর্থাৎ ১০ অগাস্ট, এ রাজ্যের ভাতার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এক ব্যক্তি মহিলা ডাক্তারকে হুমকি দিয়ে বলে, তার কথা শুনে চিকিৎসা না করলে আর জি কর করে দেবে। ১১ অগাস্ট সেই আর জি কর মেডিকাল কলেজ ও হাসপাতালেরই একজন ওটি নার্সকে দুজন লোক রোগীর পরিজন পরিচয় দিয়ে আক্রমণ করে। সেই নার্স চিৎকার করলে তারা ছুটে পালিয়ে যায়। সুতরাং হাসপাতালের নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের টনক এখনো নড়েনি। শুধু এরাজ্যেই নয়, দেশজুড়েই প্রতিদিন ডাক্তার, নার্সদের উপর আক্রমণের একাধিক খবর প্রকাশিত হয়। কোথাও রোগীর উত্তেজিত পরিজন চিকিৎসায় গাফিলতি হয়েছে অভিযোগ করে তৎক্ষণাৎ শারীরিক আক্রমণ ও যৌন হেনস্থা করে, আবার কোথাও ক্ষমতাসীন দলের দুষ্কৃতীদের হামলায় ডাক্তার গুরুতর আহত হন, মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশ নিষ্ক্রিয় থাকে এবং অভিযোগ দায়ের করলেও অপরাধীরা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব প্রতিপত্তি খাটিয়ে বেরিয়ে যায়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

অন্যদিকে আকন্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত সরকারগুলো ক্রমাগত স্বাস্থ্য বাজেটে কাটছাঁট করছে। এমতবস্থায় স্বাস্থ্য সাথী কার্ডের মত প্রকল্পগুলো পশ্চিমবঙ্গ সহ বহু রাজ্যের জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার ব্যবস্থা। সরকারি হাসপাতালে সরকার কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসা বিনামূল্যে করানোর ব্যবস্থা করে দিলেও সেখানে ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। পরিকাঠামো বলতে শুধু কিছু ডাক্তার, নার্স ও প্যারামেডিকাল কর্মী। তাই রোগী মারা গেলে বা অন্য কোনো শারীরিক ক্ষতি হলে তার সব দায় পরিষেবা প্রদানকারী ডাক্তার, নার্সদের ঘাড়ে চাপে। বেশকিছু সরকারের পেটোয়া সংবাদমাধ্যম পরিকল্পিতভাবেই কিছু অসৎ ডাক্তারের কাণ্ড তুলে ধরে ডাক্তারদের সম্পর্কে জনমানসে অবিশ্বাস তৈরি করে দিয়েছে। ফলে ঘটনা যা-ই হোক, মার খাবে ডাক্তারই।

এরকম এক জটিল ও দুর্বিষহ পরিস্থিতিতে আর জি কর মেডিকাল কলেজের এই ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। সংঘটিত হয়েছে বলছি, কারণ ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই পুলিশ প্রশাসন, কলেজ কর্তৃপক্ষ ও রাজ্য সরকার নানাভাবে ঘটনাকে লঘু করে দোষীদের আড়াল করতে চেয়েছে। ফলে মনে করা অযৌক্তিক নয়, যে এই পৈশাচিক অপরাধের সঙ্গে সরকারি দলের কোনো ব্যক্তি জড়িয়ে আছেন।

ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, ৯ অগাস্ট সকাল থেকেই ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসাবে দেখাচ্ছিল পুলিশ প্রশাসন। আর জি কর মেডিকাল কলেজের প্রিন্সিপাল ডাঃ সন্দীপ ঘোষ নির্লজ্জের মত প্রশ্ন তুলেছিলেন, মেয়েটি কেন ডিউটির জায়গা ছেড়ে ওই সেমিনার রুমে ঘুমাতে যাবে? ঘটনার তদন্ত হওয়ার আগেই কিসের জন্য সন্দীপবাবুর এমন নিষ্ঠুর ও অমানবিক প্রতিক্রিয়া? একমাত্র সন্তানের এমন নৃশংস খুনের পর আত্মহত্যার কথা বলে অসহায় বাবা ও মাকে পুলিস ফোন করে ডেকে আনলেও মেয়ের মৃতদেহ দেখতে দেয়নি। দুপুর গড়িয়ে গেলেও ময়না তদন্ত না করে উল্টে পুলিস প্রশাসন তাঁদের হেনস্থা করতে থাকে বলে খবরে প্রকাশ। এরপর খবর পেয়ে মেডিকাল সার্ভিস সেন্টারের মত কতিপয় সংগঠন, সিনিয়র চিকিৎসক-নার্স এবং ডাক্তারির ছাত্রছাত্রীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছন এবং দাবি তোলেন – অবিলম্বে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে এবং বাড়ির লোক রেখে ভিডিওগ্রাফি সহযোগে ময়না তদন্ত করতে হবে এবং এই রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে। আশ্চর্যের কথা, মহামান্য প্রিন্সিপাল সাহেব তখন পর্যন্ত মেডিকাল কলেজে পৌঁছতেই পারেননি। সুপারের অফিসের সামনে পুলিসের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধস্তাধস্তি শুরু হয়। চাপে পড়ে কর্তৃপক্ষ দাবি অনুযায়ী বিকেলে ময়না তদন্ত করে। ফলে জানা যায় – শেষ রাতে ৩৬ ঘণ্টা ডিউটির পর ক্লান্ত, অবসন্ন ওই ছাত্রীকে ঘুমের মধ্যে আক্রমণ করে, পৈশাচিকভাবে ধর্ষণ ও খুন করেছে কয়েকজন মানুষরূপী পিশাচ। এমন নৃশংসতা এক দশক আগে দিল্লির নির্ভয়ার স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। একটা সরকারি হাসপাতালের ভিতর একজন ডাক্তারকে ধর্ষিত এবং খুন হতে হবে – এমনটা আমরা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।

বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে নির্ভয়ার বাবা-মায়ের কান্না ভেজা আর্তনাদ। মা বলছেন ‘আমার একমাত্র মেয়েকে শুধু বড় ডাক্তার করতে চেয়েছিলাম…. কেন এমন হলো গো…?’ মেডিকাল কলেজ হাসপাতালের প্রধান কিম্বা শহরের পুলিস কমিশনার অথবা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কি এই প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারবেন? আমাদের এই ডাক্তার বোনটা তো বেশি কিছু চায়নি। পড়াশোনা শেষ করে একজন দক্ষ পালমোনোলজিস্ট হতে চেয়েছিল.। এটাই কি তার অপরাধ? কেন নাইট ডিউটিতে নিযুক্ত ডাক্তারদের জন্য পর্যাপ্ত ডকটর্স রুম থাকবে না? কেন মহিলা চিকিৎসকদের জন্য আলাদা রেস্ট রুম তৈরি নেই?

আরো পড়ুন পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করা হয়েছিল ফয়জান আহমেদকে?

অনেকেরই হয়ত ২০১৯ সালে এনআরএস মেডিকাল কলেজের ডাঃ পরিবহ মুখার্জির ঘটনা মনে আছে। সেদিন ছেলেটা যখন অন ডিউটি অবস্থায় জরুরি বিভাগে দুষ্কৃতীদের হাতে বীভৎসভাবে আক্রান্ত হওয়ার পর মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিল; সারা রাজ্যের ছাত্র, জুনিয়র ডাক্তার সহ শিক্ষক, চিকিৎসক ও নাগরিক সমাজ ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। আমরা ডাক্তাররা নিরাপত্তার দাবি এবং হাসপাতালের পরিকাঠামোর উন্নতি সহ দশ দফা দাবিতে সাত দিন ও সাত রাত অবস্থান বিক্ষোভ করেছিলাম। আন্দোলনের চাপে সেদিন বাধ্য হয়ে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী আমাদের সব দাবি মেনে নিয়েছিলেন। এবারেও এক বাংলা টিভি চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ডাক্তারদের ক্ষোভ খুব স্বাভাবিক, তিনি তাদের সব দাবির সঙ্গে সহমত পোষণ করছেন।

তাহলে গত পাঁচবছর ধরে তিনি ও তাঁর পুলিশ প্রশাসন কী করেছে? এই নিরাপত্তার দাবি উত্থাপন করার জন্য কি নিয়মিত একজন করে জুনিয়র ডাক্তারকে প্রাণ দিতে হবে? এই প্রশাসন-পুলিস-রাষ্ট্র তাহলে আমাদের দেওয়া করের টাকায় কাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে?

আজ আমাদের দেশে প্রতি ১৫ মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ নারী পাচারে দেশের মধ্যে শীর্ষস্থান অধিকার করেছে। একদিকে মদের দোকানের ঢালাও লাইসেন্স দিচ্ছে সরকার। জুয়া, সাট্টার ব্যাপক প্রসারে সামাজিকভাবেও কিশোর এবং যুবকদের মানসিকভাবে বিকৃত করে তোলার ষড়যন্ত্র চলছে। অন্যদিকে কোটি কোটি বেকারের দেশে ভোটের স্বার্থে কিছু শস্তা দুষ্কৃতী পোষে রাজনৈতিক দলগুলো। তাদের দিয়ে সন্ত্রাস চালিয়ে ভোট লুঠ করে। যখন ভোট থাকে না তখন এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দানবরা কী করবে, কোথায় যাবে? এরা শয়ে শয়ে সাধারণ মানুষের ঘর ভেঙে, লুঠপাট চালিয়ে এবং শত শত নির্ভয়ার সর্বনাশ করে আবার ভোটের আগে গোয়ালে ফিরে যায়। এরা জানে, ধরা পড়লে বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারি দল আছে, তারাই আশ্রয় দেবে। এই বিষচক্রের বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

তাই আজ আমরা যতই চিৎকার করি – সুবিচার চাই, যাদের কাছে চাইছি তারাই পরোক্ষে এই ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাগুলোর জন্য দায়ী। ফলে আজ যদি সত্যি সত্যি আর জি করের মৃত মেয়েটার জন্যে সুবিচার এবং অন্যান্য ডাক্তার সহ রাজ্যের সমস্ত নারীর জন্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হয়, তাহলে ডাক্তারদের এই আন্দোলনকে গণআন্দোলনের রূপ দিতে হবে। তাই দাবি করা দরকার – পুলিস নয়, আমরা বিচারবিভাগীয় তদন্ত চাই। ধর্ষণ ও খুনের অপরাধ দমনে বর্তমান আইনকেই নিরপেক্ষ ও কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। মদের ঢালাও লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ হোক।

সবশেষে রাজ্যের সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের উদ্দেশ্যে বলব, জনতাকে বোকা মনে করবেন না। ছাত্রসমাজকে দুর্বল ভাববেন না। পৃথিবীর সব দেশেই কালবেলা উপস্থিত হলে ছাত্রসমাজ নিজেরা জেগে ওঠে এবং জনতাকে জাগায়। সম্প্রতি প্রতিবেশী বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আশা করি এপার বাংলাতেও হবে না।

নিবন্ধকার পেশায় ডাক্তার। মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.