বিদ্বত্ত্বঞ্চ নৃপত্বঞ্চ নৈব তুল্যং কদাচন।
স্বদেশে পূজ্যতে রাজা বিদ্বান্ সর্বত্র পূজ্যতে।।

নীতিকথার দেশ ভারতবর্ষ। কিন্তু বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগ অকিঞ্চিৎকর। ফলে কিছু মানুষের মৃত্যুর পরে মনের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া প্রশ্নগুলো বেদনা দেয়।

নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার পাশে দাঁড়ান

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। স্বাধীন মিডিয়া সজীব গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কথাগুলো বলা আবশ্যক এবং যে প্রশ্নগুলো তুলতে হবে, তার জন্যে আমরা আমাদের পাঠকদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করি।
নাগরিক ডট নেটে সাবস্ক্রাইব করুন

~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

কাঁসারিপাড়ার সবাই নায়ারবাবুকে চেনেন – এইটুকুই। কেন হঠাৎ করে বৃদ্ধ বয়সে কলকাতা শহরের ইতিহাস লেখক মানুষটি শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তা কেউ জানেন না। জিজ্ঞাসা করলে বলেন, বহুতল হবে, বাড়ি ভাঙা পড়বে, তাই। কিন্তু বাড়ী ভাঙা পড়লে এই শহরকে ২২ বছর বয়স থেকে নিজের জীবন, যৌবন, শিকড়, চাকরির নিরাপত্তা, অক্লান্ত গবেষণা – সবকিছু দিয়ে যাওয়া মানুষটিকে ৮৬ বছর বয়সে কেন কেরালায় নিজের গ্রামে চলে যেতে হয়? এর কোনো উত্তর নেই।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের স্নাতক ছিলেন, অ্যানথ্রোপোলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার চাকরির নিরাপত্তা ছিল তাঁর। বদলি হয়েছিলেন শিলং শহরে। সেখানে মন টেকেনি। কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন চাকরির নিশ্চিন্ত নিরাপত্তার বলয় থেকে বেরিয়ে শুধুমাত্র গবেষণায় মনোনিবেশ করার জন্যে।

প্রথমে উঠেছিলেন দেশপ্রিয় পার্কের কাছে এক ভাড়াবাড়িতে। কিন্তু পড়াশোনার জন্য নিয়মিত জাতীয় গ্রন্থাগারে যাওয়া প্রয়োজন। তাই ওই বাড়ি ছেড়ে উঠে এসেছিলেন ভবানীপুরের কাঁসারিপাড়ায়। যে পাড়ার লোকজন তাঁকে ডাকত নায়ারবাবু বলে। ছাপোষা গৃহস্থ পাড়ায় সবাই সম্ভ্রমের চোখে দেখতেন তাঁকে। সমীহ করতেন, জানতেন নায়ারবাবু খুব সাদাসিধে জীবন যাপন করেন। তিনি খুব বিদ্বান। ইংরিজিতে বই লেখেন আর বিদেশে সেই বইয়ের খুব কদর। তাঁর লেখা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। কিন্তু কলকাতা তাঁর নখদর্পণে। বুদ্ধিজীবী মহলের অনেককেই নিজের লেখার জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে তাঁর কাছে যেতে হয়েছে। তবুও পরমেশ্বর থঙ্কপ্পন নায়ার থেকেছেন নির্জনে সাধনায় মগ্ন তাপসের মত।

যতদিন এই শহরে ছিলেন, সংবাদমাধ্যমের আশ্চর্য উদাসীনতা ছিল তাঁর সম্পর্কে। সংবর্ধনা, সাক্ষাৎকার, পুরস্কার জুটেছে কালে ভদ্রে। তিনি নিজেও সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু যে মানুষ ‘গড’স ওন কান্ট্রি’ থেকে এই কংক্রিটের শহরটাকে ভালবেসে এর আনাচে কানাচে ইতিহাস অনুসন্ধান করে বেড়ালেন, তাঁর শ্রম, মেধা, একাগ্রতা, তারুণ্য ব্যয় করলেন এই শহরের ইতিকথায়, তাঁর কি আরেকটু মনোযোগ, উৎসাহ, স্বীকৃতি প্রাপ্য ছিল না? সবার উদাসীনতা সঙ্গে নিয়ে ২০১৮ সালের নভেম্বরের এক সকালে শহর ছাড়লেন তিনি। তাঁর শরীর জুড়েও তখন হেমন্ত।

কিন্তু মনে তো হেমন্ত আসেনি। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন গবেষক। গবেষকদের স্বপ্ন তো কখনো শেষ হয় না। তাঁর গ্রাম কালাদিতে গিয়েই শুরু করেছিলেন কাজ – প্রিন্টিং প্রেস, ভারতে ইংরিজি শিক্ষার বিস্তারে খ্রিস্টান মিশনারীদের অবদান নিয়ে। সেখানেও শ্রীরামপুর আর কলকাতা ছিল গবেষণার কেন্দ্রে।

কখনো কখনো কলকাতা নায়ারবাবুর মানসপটে উঁকি দিত। একাদিক্রমে ৬০ বছর নিজের শিকড়ের থেকে ভিন্ন রুচি, ভিন্ন সংস্কৃতির একটা শহরে থেকে যাওয়া, তার ইতিহাস, ঔপনিবেশিকতা, স্থাপত্য, অলিগলির নামের ইতিহাস, এই শহরের দক্ষিণ ভারতীয়দের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা – সবই ছিল বৈচিত্র্যপূর্ণ, তথ্যবহুল। অথচ বৈদগ্ধ্যের বাগাড়ম্বর ছিল না।

একসময় চেন্নাইতে এক পত্রিকা অফিসে কর্মরত ছিলেন। তখনো কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা জব চার্নকই কিনা, তা নিয়ে প্রচুর তথ্য জোগাড় করেছিলেন চেন্নাইয়ের ফোর্ট সেন্ট জর্জের তথ্যাগার থেকে। তা নিয়ে প্রকাশিত হয় গবেষণাপত্র জব চার্নক: দ্য ফাউন্ডার অফ ক্যালকাটা (ইন ফ্যাক্টস অ্যান্ড ফিকশন); অ্যান অ্যান্থলজি

গত শতাব্দীর সাতের দশকে যখন নায়ারয়াবাবু গবেষণা আরম্ভ করেন, তখন ইতিহাসবেত্তাদের কাছে শহরের ইতিহাস, আঞ্চলিক ইতিহাস সেভাবে আদরণীয় ছিল না। তাই তাঁর সামনে না ছিল কোন আলো বিছানো পথ, না কোনো দলিল, দস্তাবেজ বা বইপত্র। তাঁকে পুলিস সংগ্রহশালা, মহাফেজখানায় দিনের পর দিন কাটাতে হয়েছে, সকাল থেকে সন্ধ্যা কেটেছে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে।

সাধনায় মগ্ন এক জ্ঞানতপস্বী অতিসাধারণ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত করে নিয়েছিলেন নিজেকে, সংসার চালানোর ভার পড়েছিল শিক্ষিকা স্ত্রী সীতা দেবীর উপর। সংসার সামলানো, সন্তানদের পড়াশোনা, নিজের স্কুল আর সুদূর কলকাতায় থাকা স্বামীর সব দায়িত্ব হাসিমুখে সামলেছেন তিনি। ‘পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য, নহিলে খরচ বাড়ে।’ তাই তিনি থেকে গিয়েছেন সুদূর কালাদি গ্রামে। তাই নায়ারবাবুর নিশ্চিন্ত মনে মেধার চর্চা করার সুযোগ ঘটেছে।

তিনি ৬২টি বই লিখেছিলেন ইংরিজিতে। ছোট ছোট প্রকাশনা সংস্থা থেকে সেগুলি প্রকাশিত হয়েছিল। ঐতিহাসিক তনিকা সরকার ও শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের সম্পাদনা করা ক্যালকাটা: দ্য স্টর্মি ডিকেডস বইতে অষ্টাদশ থেকে বিংশ শতাব্দীর কলকাতার রাস্তাঘাট, পুলিসি ব্যবস্থা, হাইকোর্টের ইতিহাস এবং মহানগরীর দক্ষিণ ভারতীয় সমাজ সম্পর্কে তথ্যের জন্য নায়ারবাবুর কাছে ঋণ স্বীকার করেছেন।

১৯৯৪ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের ৭৫ বছর পূর্তিতে আয়োজিত প্রদর্শনীতে রাওলাট কমিটির অফিসের ঠিকানা এলস্যুম রো যে আদতে লর্ড সিনহা রোড – একথা নির্দ্বিধায় জানিয়ে দেন পিটি নায়ার।

সারাজীবন কৃচ্ছ্রসাধন করে তৈরি হয়েছিল নায়ারবাবুর ছয় হাজার দুর্লভ বইয়ের সংগ্রহ। কলকাতা ছেড়ে যাওয়ার সময়ে সেসব দিয়ে গিয়েছেন কলকাতার টাউন হল সোসাইটিকে। শহরটাকে ভালবেসেছিলেন প্রথম দর্শনেই। নিরহংকারী মানুষটি তাই বলেছিলেন, আমি নতুন কিছু করিনি। কলকাতা আছে কলকাতাতেই।

আরও পড়ুন সন্দীপ দত্তের পর কে আগলাবেন লিটল ম্যাগাজিন?

হয়ত ভাবীকাল নায়ারবাবুর যথাযথ মূল্যায়ন করবে, বিদেশের মত স্বদেশেও সমাদৃত হবে তাঁর কাজ। শুধু জীবদ্দশায় যা পাওয়া উচিত ছিল, তা তিনি পেলেন না। তাঁর জীবদ্দশায় আমরা বোধহয় আরেকটু সংবেদনশীল, আরেকটু উৎসাহী, বিবেকবান হয়ে এই শহরে তাঁর থাকা স্থায়ী করতে পারতাম।

কলকাতা সংলগ্ন ভাগীরথী, জাতীয় গ্রন্থাগার, ধর্মতলা স্ট্রিটের ইংরিজি বইয়ের দোকান, পুরনো কলকাতা, তার ঔপনিবেশিক স্থাপত্য এবং মানুষ নায়ারবাবুকে উদ্বেলিত করেছিল। এই শহর নিয়ে গবেষণা সেই ভালবাসারই প্রকাশ। তাঁর ঋণ অপরিশোধ্য।

মতামত ব্যক্তিগত

নাগরিকের পক্ষ থেকে আবেদন:

 প্রিয় পাঠক,
      আপনাদের সাহায্য আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন। নাগরিক ডট নেটের সমস্ত লেখা নিয়মিত পড়তে আমাদের গ্রাহক হোন।
~ ধন্যবাদান্তে টিম নাগরিক।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.